ধর্ম ও জীবন

মহানবীর কাব্যপ্রেম

শামসীর হারুনুর রশীদ প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৪-২০১৮ ইং ০১:৪১:১০ | সংবাদটি ৭৪ বার পঠিত

কেবল কুরআনে নয়, কাব্যচর্চায় রাসূলের তাগিদও ছিল। কবিতার জেহাদে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য সাহাবী কবিদের প্রতি নির্দেশ ছিল মহানবীর। হযরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেছেন, মহানবী সা. বললেন, তোমরা কাফির মুশরিকদের নিন্দা করে কাব্য লড়াইয়ে নেমে পড়। তীরের ফলার চেয়ে তা আরো বেশি আহত করবে তাদের। ইবনু রাওয়াহাকে পাঠানো হলো। সম্পূর্ণ মুগ্ধ হতে পারলেন না রাসূল সা.। কাআব বিন মালিকও এলেন। অবশেষে যখন হাসসান এলেন, বললেন, সবশেষে তোমরা পাঠালে ওকে? শুনে আনন্দে জিভ নাড়তে লাগলেন হাসসান। বললেন যিনি আপনাকে সত্যবাণী দিয়ে পাঠিয়েছেন তাঁর শপথ! এ জিভ দিয়ে ওদের মধ্য চামড়া ছুলে ফেলার মত গাত্রদাহ সৃষ্টি করে ছাড়ব।
কাআব ইবন মালিক রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. আমাদের নির্দেশ দিলেন। যাও, তোমরা মুশরিকদের প্রতিপক্ষ কবিতার লড়াইয়ে লেগে যাও। কারণ মুমিন জিহাদ করে জান দিয়ে মাল দিয়ে। মোহাম্মদের আত্মা যাঁর হাতের মুঠোয় তাঁর শপথ! তোমাদের কবিতা, তীরের ফলা হয়ে তাদের কলজে ঝাঁঝরা করে দেবে।
এভাবে রাসূল সা. আল্লাহর কালামের অনুগত কাব্যকলাকে উৎসাহিত করে তাঁর নেতৃত্বে নব উত্থিত সমাজ বিপ্লবের সাহাবী কবিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে এক নব উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিলেন। সাধারণ সাহাবীদেরকেও তিনি কবিতার ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন। হাদিস শরীফ থেকে জানা যায়, তিনি সাহাবীদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের কবিতা শেখাও তাহলে তাদের কথা মিষ্টি ও সুরেলা হবে। এভাবেই মহানবী সা. অশিক্ষিত সাহাবীদেরকেও কাব্যচর্চায় উৎসাহী করে তোলেন।
একবার মহানবী সা. হযরত হাসসান রা. কে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি আবু বকরকে নিয়ে কোনো কবিতা কি এ পর্যন্ত লিখেছ? হযরত হাসসান রা. জবাব দিলেন, হ্যাঁ লিখেছি। রাসূল সা. বললেন শোনাও। কবি হাসসান বিন সাবিত রা. হযরত আবু বকর রা. কে নিয়ে লেখা তাঁর কবিতা শোনাতে শোনাতে যখন নিচের পঙক্তিগুলো পড়তে লাগলেন-
সুউচ্চ সওর গুহার দ্বিতীয় ব্যক্তি সে/ তিনি যখন রক্ত লোলুপ শৃগালেরা/ মুখে শুঁকে শিখরে এলো/ রাসূলের সঙ্গে আছেন সদা এক ছায়াতরু/ সবাই জানে নবীর পরে/ তিনি সৃষ্টির মাঝে সবার চেয়ে সেরা।
তা শুনে মহানবী সা. হেসে বললেন, ঠিক বলেছো হাসসান, যা বলেছো তার যোগ্য তিনিই।
তিনি ছিলেন কবিদের পৃষ্ঠপোষক। তিনি কবিদের কবিতা শুনতেন এবং তাদের পরামর্শ, উপদেশ ও দিকনির্দেশনা দিতেন। কবিদের উপহার ও উপঢৌকন দেয়ার ব্যাপারে তিনি ছিলেন সবার চেয়ে অগ্রগামী ও তৎপর। কাব ইবন যুহায়রের কবিতা শুনে তিনি এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে, নিজের শরীর থেকে চাদর খুলে তা উপহার দিয়েছিলেন কবিকে। তিনি বলেছেন, কবিদের আর্থিক সহায়তা করা পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার সমতুল্য।
রাসূল সা. কবিদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। অনেক কবিই তার স্নেহে সিক্ত হয়েছেন, ধন্য হয়েছেন। উকাজ মেলার কবি ও কবিতার লড়াই তিনি স্বচক্ষে সশরীরে প্রত্যক্ষ করেছেন। কবিদের ভাষার লালিত্য আর বিষয় উপস্থাপনের কৌশল তাঁকে মুগ্ধ করত। জাহেলি যুগের সবচেয়ে বড় কবি ছিলেন ইমরাউল কায়েস। রাসূল সা. তার অশ্লীল কবিতাগুলো অপছন্দ করতেন, কিন্তু তার ভাষা এবং কাব্যশৈলীর ব্যাপারে ছিলেন সপ্রশংস। কবি এবং কবিতার প্রতি মমত্ববোধ একজন কাব্যবোদ্ধা হিসেবে তার অবস্থানকে দৃঢ় করেছে। তিনি প্রায়ই বলতেন ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের কবিতা শেখাও, এতে তাদের জবান মিষ্টি ও সুরেলা হবে।’
তিনি আরো বলেন, নিঃসন্দেহে কোনো কোনো কবিতায় রয়েছে জ্ঞানের কথা। কবিতা কথার মতোই, ভালো কথা যেমন সুন্দর, ভালো কবিতাও তেমনি সুন্দর। আর মন্দ কবিতা মন্দ কথার মতো মন্দ। রাসূল সা. কবিতা আবৃত্তি শুনতে খুবই ভালোবাসতেন। কবিরা যখন কবিতা আবৃত্তি করতেন তখন তিনি মুগ্ধচিত্তে তা আত্মস্থ করতেন। তিনি কাব্য ও সাহিত্যচর্চাকে এত বেশি সমর্থন এবং সাহায্য-সহযোগিতা করতেন যে, সাহাবি কবি হজরত হাসসান বিন সাবিতকে তাঁর সভাকবি হিসেবে ঘোষণা করেন। মসজিদে নববীতে তার জন্য আলাদা মিম্বর তৈরি করে দেয়া হয়। তিনি সেই মিম্বরে দাঁড়িয়ে কবিতা পড়তেন। বসে স্বয়ং কবিতা শুনতেন রাসূল সা.। এটি একটি বিস্ময়কর ঘটনা। সাহিত্য এবং কাব্যচর্চার দ্বার অবারিত করার জন্য তিনি সাহাবি কবিদের পুরস্কৃত করতেন। তাদের জন্য আল্লাহর দরবারে সাহায্যের প্রার্থনা করতেন। কবি কাব রাসূল সা. এর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রচনা করেন তার প্রশংসাসূচক কবিতা ‘বানাত সুআদ’।
এতে রাসূল অত্যন্ত খুশি হয়ে কবিকে তার গায়ের ডোরাকাটা চাদর উপহার দেন। যা কবির জীবনে এক অনন্য পাওয়া। কবি আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাকে করেছিলেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। রাসূল সা. কে কবিতা এবং সাহিত্যের প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা করতে দেখে হজরত আবু বকর, হজরত উমর ও হজরত আলী রা. কবিতা আবৃত্তি করে রাসূল সা. কে শোনাতেন। কাব্যের প্রতি তাঁর কত অনুরাগ, প্রেম, ভালোবাসা ছিল তা বোঝা যায়, নিচের উক্তি থেকে। শেরটি মহানবী সা. কে শোনানো হচ্ছিল-
‘কত যে বিনিদ্র রজনী পরিশ্রম করে কাটিয়েছি/ যেন হালাল আহারের উপযুক্ত হতে পারি’।
এই কবিতাটি শুনে মহানবী সা. এত বেশি খুশি হয়েছিলেন যে, তিনি মন্তব্য করেন কোনো আরববাসীর প্রশংসা শুনে তার সাথে দেখা করার জন্য অনুপ্রাণিত হইনি, কিন্তু এই শের রচনাকারীকে একনজর দেখার জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমার অন্তরে আগ্রহ জেগেছে।
তিনি কবিতা এবং সাহিত্য চর্চার কেমন পৃষ্ঠপোষকতা করতেন নিচের ঘটনা তার আরেকটি জ্বলন্ত উদাহরণ। একবার আমর বিন আশশারীয়া রাসূলে করিম সা. এর সামনে কবি উমাইয়া বিন আবি সালতের কাসিদা পড়ে শুনাচ্ছিলেন। এতে রাসূলে করিম সা. ‘চালিয়ে যাও’ বলে মন্তব্য করে বলেছিলেন, আরে! কবিতা শুনে মনে হচ্ছে উমাইয়া তো কাব্যের মাধ্যমে প্রায় মুসলমান হয়ে গেছে। অমুসলিম কবিরা যখন ইসলাম এবং মহানবী সা. সম্পর্কে মিথ্যা, কুরুচিপূর্ণ কবিতা লিখে নিন্দা ব্যক্ত করছিল, তখন তিনি আনসারদের লক্ষ্য করে বলেন, যারা হাতিয়ার দ্বারা আল্লাহ ও তার রাসূলকে সাহায্য করছে, জিহ্বা দ্বারা সাহায্য করতে তাদেরকে বাধা দিয়েছে? এ কথা শোনার সাথে সাথে কবি হাসসান বিন সাবিত দাঁড়িয়ে বললেন আমি প্রস্তুত। রাসূল সা. তাকে বললেন, আমিও তো কুরাইশ বংশের। তাহলে তুমি কিভাবে তাদের নিন্দা করবে? হাসসান বললেন, মথিত আটার মধ্য থেকে যেভাবে চুলকে আলাদা করা হয় আপনাকেও আমি তদ্রুপ বের করে আনব। গুরুতর অপরাধে নাদর বিন হারিসকে হত্যা করা হয়। এরপর তার কন্যা রাসূল সা. এর সমীপে উপস্থিত হয়ে একটি মর্মস্পর্শী কবিতা আবৃত্তি করে। তা শুনে রাসূল সা. বলেন, যদি এ কবিতা নাদরের হত্যার আগে শুনতাম, তাহলে তাকে হত্যা করা হতো না। জাহেলি যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি তারাফার একটি চরণ রাসূল সা. এর সামনে আবৃত্তি করা হলে তিনি মন্তব্য করেন-এ তো নবীদের কথা। পঙ্ক্তিটি আল্লাহর রাসূলও প্রায় আওড়াতেন-‘সাতুবদি লাকাল আইয়্যামু মা কুন্তা জাহিলা/ওইয়া’তি কাল আখবারে মান লাম তুযাওইদি। অর্থ-‘আজ তুমি যা অবগত নও কালের চক্রে তোমার কাছে তা প্রকাশ হয়ে পড়বে। আর তোমাকে এমন সব ব্যক্তির খবর পরিবেশন করবে যারা তাদের ভ্রমণে কোনো পাথেয় সঙ্গে নেয়নি’।
একবার তামীম গোত্রের এক প্রতিনিধিদল রাসূল সা. এর কাছে তাদের কবি আকরা ইবনে হাবিসকে সাথে নিয়ে এলেন এবং চ্যালেঞ্জ জানালেন কবিতা ও গৌরব প্রতিযোগিতার। রাসূল সা. তাদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে কবিতা আবৃত্তি করতে বললেন। সঙ্গে সঙ্গে তাদের কবি আকরা ইবনে হাবিস দাঁড়িয়ে আবৃত্তি শুরু করলেন-‘তোমাদের কাছে আমরা এসেছি/গৌরবগাথা গাইতে জানি/হেযায ভূমিতে আমাদের চেয়ে/শ্রেষ্ঠ তো নেই, সেই সম্মানী’। এবার রাসূল সা. জবাব দেয়ার জন্য হাসসান বিন সাবিতকে আদেশ দিলেন। অতঃপর হাসসান জবাব দিলেন- দারিম গোত্র, দারিম গোত্র/ গর্ব করো না, ক্ষান্ত হও/তোমরা আসলে চাকর বাকর/দাস দাসী ছাড়া অন্য নও। হযরত আয়েশা রা. বলেন, একবার রাসূল সা. জুতা সেলাই করেছিলেন আর আমি তাঁর পাশে বসে কবিতা আবৃত্তি করছিলাম। হঠাৎ তাঁর কপালে ঘাম জমতে দেখে আমি আবৃত্তি বন্ধ করলে তিনি বললেন, থামলে কেন আয়েশা? আমি বললাম, আপনার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম বিচ্ছুরিত হচ্ছে। তিনি বলেন কবি আবু কাবীর আল হুজালী আজ যদি আপনাকে প্রত্যক্ষ করত তাহলে ঠিকই বুঝত যে তার কবিতার যথোপযুক্ত নায়ক আপনিই। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আয়েশা আবু কাবীর আল হুজালী কী বলেছে বল না। আমি মাত্র দু’টি চরণ আবৃত্তি করলাম-
‘সে এক যুবক নানা রোগ ভোগা/অনিষ্ট ক্ষতি অসুখ থেকেও মুক্ত/সেই যুবকের মুখমন্ডলে/যেন আকাশের মেঘের বিজলীযুক্ত’। শুনে তিনি আমার কপালের মাঝখানে চুমু খেয়ে বললেন, আয়েশা! আল্লাহ তোমাকে উত্তম বিনিময় দান করুন।
এ কথা দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে, কবিতার প্রতি ছিল রাসূল স. এর প্রগাঢ় ঐকান্তিকতা ও ভালোবাসা। তার আন্তরিক পৃষ্ঠপোষকতাতেই কাব্য ও সাহিত্য চর্চার এক নবদিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে, যা রসিক সাহিত্য ও কবিতা বোদ্ধা ছাড়া উপলব্ধি করা প্রায় অসম্ভব।
এ রকম আরো অসংখ্য ঘটনা আছে যেসব ঘটনার মধ্য দিয়ে শিল্প সাহিত্যের প্রতি রাসূলে করীমের সীমাহীন ভালোবাসা প্রকাশ পেয়েছে। কবি-কবিতাকে, সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের ভালোবাসা তথা সংস্কৃতি চর্চা করা সুন্নাতে রাসূলের অন্তর্ভুক্ত। শিল্পের প্রতি, কবি ও কবিতার প্রতি অবজ্ঞা বা অনাগ্রহ প্রকাশ সুন্নাতে রাসূলের পরিপন্থী। মহানবীর এসব সুন্নতকে সমাজে প্রচলন করা এবং জারি রাখার দায়িত্ব আজ এই উম্মাহর।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT