ধর্ম ও জীবন

রাসূলে কারিমের চিকিৎসা ব্যবস্থা

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৪-২০১৮ ইং ০১:৪২:২৩ | সংবাদটি ২৪৪ বার পঠিত

সুস্থতাই নিয়ামত, স্বাস্থ্য এবং সুস্থতাই সকল সুখের মূল, স্বাস্থ্যই সম্পদ। স্বাস্থ্য ভালো থাকলে সব কিছুই ভালো লাগে, মন প্রফুল্ল থাকে, ভালো কাজের আগ্রহ সৃষ্টি করে। রোগ হলে কিভাবে চিকিৎসা করতে হবে তাঁর সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা পবিত্র কুরআন ও হাদিসে রয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন-‘আমি কুরআন নাযিল করেছি যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত’। (সূরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৮২)
হাদিসে নবী (সা.) বলেছেন-আল্লাহপাক যে কোনো রোগ সৃষ্টি করার পূর্বে এর নিরাময়কারী ঔষধ সৃষ্টি করে থাকেন। বিভিন্ন হাদিসে নবী (সা.) রোগ হলে চিকিৎসা করার নির্দেশ দিয়েছেন। হযরত উসামা বিন শুরাইক (রা.) বর্ণিত হাদিসে প্রিয়নবী (সা.) বলেছেন-তোমরা রোগের চিকিৎসা কর। কেননা, একমাত্র মৃত্যু ব্যতিত সকল রোগের নিরাময়কারী ঔষধ আছে। বিশিষ্ট সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণিত হাদিসে নবী (সা.) বলেছেন-‘তোমাদের দু’টো বস্তু দ্বারা রোগ নিরাময় করা উচিত। আর তা হচ্ছে মধু ও আল কুরআন।’ প্রিয়নবী (সা.) আরো বলেছেন-‘উৎকৃষ্ট ঔষধ হচ্ছে আল কুরআন।’ মহানবী (সা.) আল-কুরআন ও আল্লাহ তা’আলার আসমাউল হুসনা দ্বারা চিকিৎসা করার নির্দেশ দিয়েছেন। মহনবী (সা.) নিজেই আল-কুরআন দ্বারা চিকিৎসা করেছেন বলে অগণিত নির্ভরযোগ্য হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। রোম স¤্রাট হযরত ওমর (রা.) এর নিকট এক চিঠিতে জানালেন, আমার এক প্রচন্ড ও অবিরাম মাথা ব্যাথা রয়েছে। সুতরাং আমার জন্য আপনাদের চিকিৎসা পদ্ধতি থেকে কিছু ঔষধ পাঠান। হযরত ওমর (রা.) তাঁর নিকট একটি টুপি পাঠালেন। যখন বাদশাহ টুপিটি মাথায় পরতেন, তখন তাঁর মাথা ব্যাথা থাকতো না। আবার যখন টুপি নামিয়ে ফেলতেন, তখন তাঁর মাথায় ব্যাথা হতো। এতে রোমানরা আশ্চর্য হয়ে টুপির ভিতর বাহির খোঁজ করতে লাগলেন। অতঃপর তারা টুপির মধ্যে একটি কাগজ দেখতে পেলেন, সেখানে লেখা ছিল-‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’।
মধু মানুষের দৈহিক রোগের ঔষধ বলে পবিত্র কুরআনে উল্লেখ রয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে- ‘তোমার প্রতিপালক মৌমাছির হৃদয়ে ইঙ্গিত দ্বারা নির্দেশ দিয়েছেন গৃহ নির্মাণ কর পাহাড়ে, বৃক্ষে ও মানুষ যে গৃহ নির্মাণ করে তাহাতে। ইহার পর প্রত্যেক প্রকার ফলমূল হতে কিছু কিছু আহার কর অতঃপর তোমার প্রতিপালকের সহজ পথ অনুসরণ কর। উহার উদর হতে নির্গত হয় বিবিধ বর্ণের পানীয়, যাতে মানুষের জন্য রয়েছে আরোগ্যের ঔষধ। নিশ্চয়ই ইহাতে চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সূরা : নাহল, আয়াত : ৬৮-৬৯)
মহানবী (সা.) সাহাবীদেরকে মধু ব্যবহারের উপদেশ দিতেন। কেননা, এর মধ্যে রয়েছে অনেকগুলো রোগের মহৌষধ। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ গবেষণা করে দেখেছেন, মধুতে রয়েছে সতের প্রকারের ভিটামিন। পায়ে হেটে ব্যায়াম করা সকল লোকের জন্য প্রযোজ্য। ইহা রক্ত সঞ্চালন এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি স্বাভাবিক রাখতে অধিক সহায়ক। প্রিয়নবী (সা.) অধিক হাটতেন। খেজুর সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন-খেজুর বেহেশতী মেওয়া এবং বিষের প্রতিষেধক। মহানবী (সা.) আরো বলেছেন-যে ব্যক্তি সকালে সাতটি খেজুর খাবে, সেদিন যাদুটুনা ও বিষ তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। খেজুর শরীরের জন্য খুবই উপকারী। এটা হচ্ছে একাধারে খাদ্য, ঔষধ এবং মিষ্টি। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে-খেজুর ও আঙ্গুর ফল হতে তোমরা তৈয়ার কর পানীয় ও উত্তম আহার।’ (সূরা : নাহল, আয়াত : ৬৭)
মহানবী (সা.) বলেছেন-‘কালিজিরা একমাত্র মৃত্যু ছাড়া সকল রোগের মহৌষধ।’ আনারের অনেক রকম উপকারিতা রয়েছে। এতে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ও মিনারেল রয়েছে। ইহা কিডনির পাথর জমাট বন্ধ করে এবং হজম শক্তি বৃদ্ধি করে। মহানবী (সা.) যে সমস্ত ফল মূলের প্রশংসা করেছেন এবং ঔষধ হিসেবে যেগুলোকে ব্যবহার করেছেন সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-উৎরুজা (লেবু জাতীয় ফল), তরমুজ, খেজুর, তীন, জয়তুন, পিয়াজ, রসুন, হিলবা, সিরকা, আনার, যাব, বার্লি, কদু ইত্যাদি।
উৎরুজা হলো লেবু ও লেবু জাতীয় ফল যার গন্ধ খুবই আকর্ষণীয়। এর চামড়া, গোশত এমনকি এর সবকিছু স্বাস্থ্যকর। এটা হজম শক্তি বৃদ্ধি করে। প্রিয়নবী (সা.) ইরশাদ করেন-যে মুমিন কুরআন পড়ে তাঁর দৃষ্টান্ত হলো উৎরুজার মতো যা খেতে ভালো এবং যার গন্ধও ভালো।’ (বুখারী)
পিয়াজ ও রসুনের উপকারিতা আজকাল চিকিৎসা বিজ্ঞান দ্বারা স্বীকৃত। পিয়াজে রয়েছে ফসফরাস, লৌহ, ক্যালসিয়াম ও বিভিন্ন ভিটামিন সমূহ। রসুন খাদ্য অন্ত্রীগুলো পরিস্কার রাখে। উচ্চ রক্তচাপ কমাতে এবং হৃদরোগে এর গুরুত্ব অত্যাধিক। হিলবা নামক একটি ফলও ঔষধ হিসেবে প্রিয়নবী (সা.) এর সময়ে ব্যবহার হতো যা সর্দি কাশি নিবারণে সাহায্য করতো। এজন্য মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন ‘যদি আমার উম্মতগণ জানতো, হিলবা এর মধ্যে কি রয়েছে, নিশ্চয়ই তারা তখন স্বর্ণ সম ওজন দিয়ে এ ফল ক্রয় করতো।’ মহানবী (সা.) তার পরিবারের কারো বমি হলে যব পিষে খাওয়ার নির্দেশ দিতেন। প্রিয়নবী (সা.) বিভিন্ন তরি-তরকারি পছন্দ করতেন, যার মধ্যে রয়েছে কদু ও শসা ইত্যাদি। প্রিয়নবী (সা.) সিরকা পছন্দ করতেন। নবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘উত্তম ব্যঞ্জন হচ্ছে সিরকা, হে আল্লাহ সিরকাতে বরকত দিন। নবী (সা.) আরো বলেন-যে ঘরে সিরকা থাকে সে ঘর অভাবমুক্ত থাকে। সিরকা পেট ও যকৃত রোগের জন্য বিশেষ উপকারী। ইহা জন্ডিস রোগের জন্য ও উপকারী। জয়তুন তেল সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন-‘তোমরা জয়তুন তেল দ্বারা তরকারি পাকাও এবং এটাকে শরীরে ব্যবহার করো। কেননা, ইহা পবিত্র গাছ থেকে।’ এই তেলের অনেক উপকারিতা রয়েছে।
সফরজল এক প্রকার শক্তি বর্দ্ধক ফল। সমস্ত নবীগণ এ ফল পছন্দ করতেন। একটি হাদিসেতে এ ফল খেলে চল্লিশজন লোকের শক্তি অর্জিত হয়। মেথি সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন-মেথি দ্বারা অনেক রোগ আরোগ্য হয়। বর্তমানে জানা গেছে যে, মেথিগুড়ো ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে।
একথা আজ সর্বজন বিদিত যে, রোগ চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধ করাই উত্তম। আর রোগ প্রতিরোধের অন্যতম উপায় হচ্ছে অধিক খাদ্য গ্রহণ না করা। মহানবী (সা.) বলেছেন-‘সমস্ত রোগের মূলে রয়েছে অধিক খাদ্য গ্রহণ।’ পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে-‘খাও ও পান করো, তবে অপচয় করো না।’ পেটের এক তৃতীয়াংশ খাদ্যের জন্য এক তৃতীয়াংশ পানীয় বস্তুর জন্য এবং এক তৃতীয়াংশ শ্বাস প্রশ্বাসের জন্য রাখা রোগ প্রতিরোধের অন্যতম উপায়। নবী (সা.) একাধিক হাদিসের মাধ্যমে আমাদেরকে এ তথ্য জানিয়েছেন। আধুনিক চিকিৎসকগণও এ ব্যাপারে একমত। মহানবী (সা.) ঢক ঢক করে পানি পান করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন ‘তোমরা ঢক ঢক করে পানি পান করো না। কেননা, কলিজার রোগের অন্যতম কারণ হলো, ঢক ঢক করে পানি পান করা।’ বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যেভাবে মরণব্যধি এইডস রোগ ছড়িয়ে পড়েছে এবং এইডস আক্রান্ত রোগী যে হারে মারা যাচ্ছে, তাতে দুনিয়ার মানুষ আজ আতঙ্কিত। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ এ কথা এক বাক্যে স্বীকার করেছেন যে, সমকামিতা, ব্যাভিচার ও মাদকাশক্তি ইত্যাদি এইডস রোগের অন্যতম প্রধান কারণ। সবচেয়ে গৌরবের কথা এই যে, এখন থেকে চৌদ্দশত বছর পূর্বে মহানবী (সা.) এর সমস্ত বিবেক গর্হিত ও প্রকৃতি বিরোধী কার্যকলাপ হারাম বরে ঘোষণা করেছেন। সমকামিতা, অবাধ যৌনতা ও মাদকদ্রব্য বিরোধী যে সব ইসলামী আইন-কানুন রয়েছে, তা মেনে চললে মরণরোগ এইডস এর মতো দূরারোগ্য রোগ থেকে বিশ্বের মানবসমাজ নিশ্চয়ই পরিত্রাণ পাবে।
ঔষধ ব্যবহার করা মহানবী (সা.) এর একটি অন্যতম সুন্নত। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ মহানবী (সা.) এর চিকিৎসা ব্যবস্থাকে একবাক্যে গ্রহণ করেছেন এবং মহানবী (সা.) এর চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসারেই তাদের চিকিৎসা কার্য চালিয়ে যাচ্ছেন। মূলতঃ মহানবী (সা.) স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রে যে অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তাঁর কোনো তুলনা নেই। এ কারণেই মহানবী (সা.) স্বাস্থ্য রক্ষার ক্ষেত্রেও অনুকরণীয় উত্তম আদর্শ।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT