ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৪-২০১৮ ইং ০১:৪৪:০৮ | সংবাদটি ১৬৮ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
ইমাম রাগেব ইসফাহানী ‘মুফরাদাতুল কুরআনে’ হেদায়েত শব্দের অতি সুন্দর ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। এর সারমর্ম হচ্ছে-‘কাউকে গন্তব্য স্থানের দিকে অনুগ্রহের সাথে পথ প্রদর্শন করা।’ তাই হেদায়াত করা প্রকৃত প্রস্তাবে একমাত্র আল্লাহ তা’আলারই কাজ এবং এর বিভিন্ন স্তর রয়েছে। হেদায়াতের একটি স্তর হচ্ছে সাধারণ ও ব্যাপক। এতে সমগ্র সৃষ্টি অন্তর্ভুক্ত। জড়পদার্থ, উদ্ভিদ এবং প্রাণী জগৎ পর্যন্ত এর আওতাধীন। প্রসঙ্গত : প্রশ্ন উঠতে পারে যে, প্রাণহীন জড়পদার্থ বা ইতর প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের সঙ্গে হেদায়াতের সম্পর্ক কোথায়?
কুরআনের শিক্ষায় স্পষ্টতঃই এ তথ্য ব্যক্ত হয়েছে যে, সৃষ্টির প্রতিটি স্তর, এমনকি প্রতিটি অণু-পরমাণু পর্যন্ত নিজ নিজ অবস্থানুযায়ী প্রাণ ও অনুভূতির অধিকারী। স্ব-স্ব পরিম-লে প্রতিটি স্তরের বুদ্ধি-বিবেচনা রয়েছে। অবশ্য এ বুদ্ধি ও অনুভূতির তারতম্য রয়েছে। কোনোটাতে তা স্পষ্ট এবং কোনোটাতে নিতান্তই অনুল্লেখ্য। যে সমস্ত বস্তুতে তা অতি অল্পমাত্রায় বিদ্যমান সেগুলোকে প্রাণহীন বা অনুভূতিহীন বলা যায়। বুদ্ধি ও অনুভূতির ক্ষেত্রে এ তারতম্যের জন্যই সমগ্র সৃষ্টি জগতের মধ্যে একমাত্র মানুষ ও জ্বিন জাতিকেই শরীয়তের হুকুম আহকামের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। কারণ, সৃষ্টির এ দু’টি স্তরের মধ্যেই বুদ্ধি ও অনুভূতি পূর্ণ মাত্রায় দেয়া হয়েছে। কিন্তু, তাই বলে একথা বলা যাবে না। যে, একমাত্র মানুষ ও জ্বিন জাতি ছাড়া সৃষ্টির অন্য কোনো কিছুর মধ্যে বুদ্ধি ও অনুভূতির অস্তিত্ব নেই। কেননা, আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন :
‘অর্থাৎÑএমন কোনো বস্তু নেই যা আল্লাহর প্রশংসার তসবীহ্ পাঠ করে না, কিন্তু তোমরা তাদের তাসবীহ্ বুঝতে পার না।’ (সূরা : বনী-ইসরাঈল)
সূরা নূরে এরশাদ হয়েছে। অর্থাৎ ‘তোমরা কি জান না যে, আসমান-জমিনে যা কিছু রয়েছে, সকলেই আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা ও গুণগান করে? বিশেষতঃ পাখীকুল যারা দু’পাখা বিস্তার করে শূন্যে উড়ে বেড়ায়, তাদের সকলেই স্ব-স্ব দোয়া তাসবীহ সম্পর্কে জ্ঞাত এবং আল্লাহ তা’আলাও ওদের তাসবীহ সম্পর্কে খবর রাখেন।
একথা সর্বজনবিদিত যে, আল্লাহ তা’আলার পরিচয়ের ওপরই তাঁর তারীফ ও প্রশংসা নির্ভরশীল। আর এ কথাও স্বতঃসিদ্ধ যে, আল্লাহর পরিচয় লাভ করাই সর্বাপেক্ষা বড় জ্ঞান। এটা বুদ্ধি-বিবেক ও অনুভূতি ব্যতিত সম্ভব নয়। কুরআনের অন্যান্য আয়াতে দ্বারাও প্রমাণিত হয়েছে যে, সৃষ্টিজগতের প্রতিটি বস্তুরই প্রাণ ও জীবন আছে এবং বুদ্ধি ও অনুভূতি রয়েছে। তবে কোনো কোনোটির মধ্যে এর পরিমাণ এতো অল্প যে, সাধারণ দৃষ্টিতে তা অনুভব করা যায় না। তাই পরিভাষাগতভাবে ওগুলোকে প্রাণহীন ও বুদ্ধিহীন জড়পদার্থ বলা হয়। আর এ জন্যেই ওদেরকে শর’য়ী আদেশের আওতাভুক্ত করা হয়নি। গোটা বস্তজগত সম্পর্কিত এ মীমাংসা আল কুরআনে সে যুগেই দেয়া হয়েছিল, যে যুগে পৃথিবীর কোথায়ও আধুনিক কালের কোনো দার্শনিকও ছিল না, দর্শনবিদ্যার কোনো পুস্তকও রচিত হয় নি। পরবর্তী যুগের দার্শনিকগণ এ তথ্যের যথার্থতা স্বীকার করেছেন এবং প্রাচীন দার্শনিকদের মধ্যেও এ মত পোষণ করার মতো অনেক লোক ছিল। মোটকথা, আল্লাহর হেদায়েতের এ প্রথম স্তরে সমস্ত সৃষ্টিজগত যথা- জড় পদার্থ, উদ্ভিদ, প্রাণীজগৎ, মানবমন্ডলী ও জ্বিন প্রভৃতি সকলেই অন্তর্ভুক্ত। এ সাধারণ হেদায়েতের উল্লেখই আল কুরআনের ‘ইন্নাল্লাহা আ’লা কুল্লি শাই’ইন ক্বাদির’ আয়াতে করা হয়েছে।
অর্থাৎ, যিনি সমস্ত সৃষ্টিজগতের জন্য বিশেষ অভ্যাস এবং বিশেষ বিশেষ দায়িত্ব নির্ধারণ করেছেন এবং সে মেযাজ ও দায়িত্বের উপযোগী হেদায়েত দান করেছেন। এ ব্যাপারে হেদায়েতের পরিকল্পনা অনুযায়ী সৃষ্টিজগতের প্রতিটি বস্তুই অতি নিপুণভাবে নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করে চলেছে। যে বস্তুকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সে সেই কাজ অত্যন্ত গুরুত্ব ও নৈপুণ্যের সাথে পালন করছে। যথা- মুখ হতে নির্গত শব্দ নাক বা চক্ষু কেউই শ্রবণ করতে পারে না, অথচ এ দু’টি মুখের নিকটতম অঙ্গ। পক্ষান্তরে এ দায়িত্ব আল্লাহ তা’আলা যেহেতু কানকে অপর্ণ করেছেন, তাই একমাত্র কানই মুখের শব্দ শ্রবণ করে ও বোঝে। অনুরূপভাবে কান দ্বারা দেখা বা ঘ্রাণ লওয়ার কাজ করে চলে না। নাক দ্বারা শ্রবণ করা বা দেখার কাজও চলে না।
হেদায়েতের দ্বিতীয় স্তর এর তুলনায় অনেকটা সংকীর্ণ। অর্থাৎ, সে সমস্ত বস্তর সাথে জড়িত, পরিভাষায় যাদেরকে বিবেকবান বুদ্ধি সম্পন্ন বলা হয়। অর্থাৎ-মানুষ এবং জ্বিন জাতি। এ হেদায়েত নবী-রাসুল ও আসমানী কিতাবের মাধ্যমে প্রত্যেক মানুষের নিকট পৌঁছেছে। কেউ এ হেদায়েতকে গ্রহণ করে মুমিন হয়েছে আবার কেউ একে প্রত্যাখান করে কাফির বে-দ্বীনে পরিণত হয়েছে। [চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT