পাঁচ মিশালী

মহাবিশ্ব কি সম্প্রসারণশীল

মোহাম্মদ ছয়েফ উদ্দিন প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৪-২০১৮ ইং ০০:২৩:৫৫ | সংবাদটি ১৬০ বার পঠিত

আমরা যে গ্রহে আছি তার নাম পৃথিবী। এর আকৃতি চ্যাপ্টা বা সমতল বলে প্রাচিনকালে মানুষের ধারণা ছিল। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের জন্ম ৩৮৪ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে। তার ধারণা ছিল পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র এবং সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্রসহ সকল বস্তু এর চারপাশে ঘুরছে। তাঁর এ ধারণা টিকে নি। বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে প্রমাণিত হয়, ‘পৃথিবী গোলাকার’ একদম ফুটবলের মতো নয়। কমলা লেবুর মতো গোল। দু’মেরু ভূ-গর্ভের দিকে খানিকটা চাপা। পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে উপবৃত্তাকার পথে ঘুরছে।
পৃথিবী তার কক্ষ পথে প্রতি সেকেন্ডে ৩০ কিলোমিটার বেগে চলছে। সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর কক্ষপথে ৩৬০০ কৌণিক দূরত্ব অতিক্রম করতে তার সময় লাগে ৩৬৫ দিন। ইহাকে পৃথিবীর বার্ষিক গতি বলে। বার্ষিক গতির ফলে পৃথিবীর বুকে ঋতুর পরিবর্তন ঘটে।
পৃথিবীর উত্তর দক্ষিণ মেরু অর্থাৎ চাপিত স্থানদ্বয়ের মধ্য দিয়ে একটি রেখা কল্পনা করা হয়। ইহাকে পৃথিবীর অক্ষরেখা বলে। পৃথিবী সূর্যকে প্রচন্ড বেগে প্রদক্ষিণ করছে। আবার নিজ অক্ষের ওপর ২৪ ঘণ্টায় একবার ঘুরছে। ইহাকে পৃথিবীর আহ্নিক গতি বলে। অহ্নিক গতির ফলে দিন ও রাতের পরিবর্তন ঘটে। সার্বিকভাবে পৃথিবীর গতিকে ঝঢ়রহ গড়ঃরড়হ বলে। ক্রিকেট খেলায় ঝঢ়রহ বল ছুড়া হয়। বলটি ঘুরে ঘুরে সামনের দিকে অগ্রসর হয়। তাই ইহাকে ঝঢ়রহ গড়ঃরড়হ বলে। পৃথিবী তার নিজ অক্ষের ওপর প্রতি ঘণ্টায় ১৬০০ কিলোমিটার বেগে ঘুরছে। পৃথিবীর তুলনায় আমরা অতি ক্ষুদ্র বলে এর উক্ত দু’ধরনের গতিবেগ আমরা অনুভব করতে পারি না। তাছাড়া ভূ-পৃষ্ঠ বায়ু মন্ডল দ্বারা আবৃত রয়েছে। আবরণের ভেতর থেকে এর গতি-মতি কিছুই অনুভব করার কথা নয়। বাকি আটটি গ্রহ একইভাবে ভন্ ভন্ করে সূর্যকে উপবৃত্তাকার পথে প্রদক্ষিণ করছে। প্রত্যেকের কক্ষ পথ ও গতিবেগ ভিন্ন। উপগ্রহ গ্রহকে নির্দিষ্ট কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করছে। যেমন- চাঁদ পৃথিবীর উপগ্রহ। এটি পৃথিবীকে ২৮ দিনে একবার প্রদক্ষিণ করে। সূর্যও বসে নেই। সূর্য, গ্রহ, উপগ্রহ, উল্কা, ধুমকেতু ইত্যাদি নিয়ে সৌরজগৎ গঠিত। সূর্য তার পরিবার অর্থাৎ গোটা সৌরজগৎ ‘গ্যালাক্সি’ নামক বৃহৎ শক্তির আকর্ষণে প্রচন্ড গতিতে নির্দিষ্ট কক্ষপথে ক্রমাগত ঘুরছে। গ্যালাক্সিকে কেন্দ্র করে সূর্য প্রতি সেকেন্ডে ২২০ কিলোমিটার গতিতে ঘুরছে। এ সব তত্ত্ব উপাত্ত এযুগে বিজ্ঞান দ্বারা সর্ব স্বীকৃত। মহাবিশ্বে কোটি কোটি নক্ষত্র রয়েছে। সূর্য মাঝারি ধরণের নক্ষত্র। নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ, ধুমকেতু, গ্যালাক্সিসহ মহাবিশ্বের কোনো বস্তু স্থির নয়। কোনো শক্তির আকর্ষণে ক্রমাগত বৃত্তাকার বা উপবৃত্তাকার পথে ঘুরছে। কোটি কোটি নক্ষত্র নিয়ে গ্যালাক্সি গঠিত। নক্ষত্রগুলো পরস্পর থেকে এতো দূরে রয়েছে যে ভাবতে অবাক লাগে। আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল। অর্থাৎ আলো ১ সেকেন্ডে ১,৮৬,০০০ মাইল দূরত্ব অতিক্রম করে। তাহলে ১ মিনিটে, ১ ঘণ্টায় কিংবা ১ দিনে আলো কতদূর যায়? আলো ৩৬৫ দিনে বা এক বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে তাকে এক আলোক বর্ষ বলে। অর্থাৎ আলোর গতিবেগের একক ‘আলোক বর্ষ’। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে এতো দূর পর্যন্ত নক্ষত্র রয়েছে। যাদের আলো পৃথিবীতে পৌঁছেই না। হিসাব করুন বা ঠান্ডা মাথায় ভাবুন। এদের দূরত্ব কতো বিশাল! তাহলে মহাবিশ্বের আকার কি রূপ এবং এর আয়তন কতো? আর মহাবিশ্ব কি সম্প্রসারণশীল না কি স্থির? আধুনিক বৈজ্ঞানিক যুগে এর পক্ষে বিপক্ষে যুক্তি দেখানো হচ্ছে। অকাট্য তত্ত্ব-উপাত্ত দ্বারা মহাবিশ্বের স্বরূপ ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না।
মহাবিশ্ব অসীম। এর সীমা কোথায় আমরা জানি না। যদি ধরা হয়, মহাবিশ্বের আকৃতি গোলাকার। তাহলে এর বাইরে কি রয়েছে? সম্প্রসারণশীল বললে একটা সীমাবদ্ধ আয়তন থাকার কথা। না হলে কিভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে? সীমা না থাকলে কোনো বস্তুর সম্প্রসারণ ভাবাই যায় না। সুতরাং ‘মহা বিশ্ব সম্প্রসারণশীল’ এ ধারণা সঠিক নয়। বরং মহাবিশ্ব অসীম বলা যায়। এর পক্ষে যুক্তি রয়েছে। ‘এক’ হতে গুনতে শুরু করুন। হাজার, লক্ষ, কোটি, বিলিয়ন গুনতে থাকুন। সংখ্যার কি শেষ আছে? আপনার দৃষ্টিতে বৃহৎ একটি সংখ্যা কল্পনা করুন। ইহাই কি বৃহৎ সংখ্যা? না, তা হতে পারে না। আপনার কাল্পনিক সংখ্যার সাথে আরো এক যোগ করুন। কল্পিত সংখ্যার চেয়ে ইহা বড় হয়ে গেল। অনন্তকাল গুনতে থাকলে সংখ্যার সীমা, পরিসীমা পাওয়া যাবে না। সুতরাং সংখ্যার শেষ নেই। গণনারও শেষ নেই। ইহা অসীম।
রেলের চাকা দু’টি স্লিপারের ওপর দিয়ে চলে। একটির চেয়ে আরেকটির দূরত্ব সর্বদা সমান। অর্থাৎ পরস্পর সমান্তরাল। কল্পনা করুন। একটি রেল লাইন সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সমান্তরাল সরল রেখা অনন্তকাল সামনের দিকে চলমান কল্পনা করলে এর কোনো শেষ বিন্দু বা স্থান পাওয়া যাবে না। দু’টি সমান্তরাল সরলরেখা কখনো এক বিন্দুতে মিলিত হবে না কিংবা পরস্পর হতে দূরে সরে যাবে না। ইহা অসীম। অনুরূপভাবে বলা যায় মহাবিশ্ব অসীম। এর সীমা, পরিসীমা নেই। যার কোনো সীমা নেই তা সম্প্রসারণ হলেই কি বা না হলেই কি? যে নিজেই অসীম সে সম্প্রসারণশীল হওয়ার প্রয়োজন নেই।
আইন্সস্টাইনের থিওরি অব রিলেটিবিটিতে প্রশারণশীল মহাবিশ্বের কথা বেরিয়ে এসেছিল। গাণিতিক হিসাব নিকাশে এ তত্ত্ব বের হয়। কিন্তু তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন মহাবিশ্ব স্থিতিশীল। মহাবিশ্ব সর্বত্র সবদিকে একই রকম দেখাবে বলে তাঁর ধারণা ছিল। অর্থাৎ বিশ্বজগৎ সুষম ও চির শ্বাশ্বত। কিন্তু সুষম ও চির শ্বাশ্বত হলে এর বাইরে কি রয়েছে। জবাবে যদি বলা হয় বাইরের সব কিছু মহাবিশ্বের অন্তর্ভুক্ত। তাহলে তার বাইরে কি? এরপর কি? তারপর কি রয়েছে? ইত্যাদি প্রশ্ন অনন্তকাল করা যাবে। মহাবিশ্বের সীমা কল্পনা করা যাবে না। তাই মহাবিশ্ব অনন্ত ও অসীম। এর বাইরে কিছু থাকলে তা মানুষের ক্ষুদ্র জ্ঞানের আওতায় পড়ে না। বিজ্ঞান সেখানে অচল; ইহা কেবল মহান আল্লাহপাক-ই ভালো জানেন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT