পাঁচ মিশালী

একটি প্রীতি সম্মিলনী

রফিকুর রহমান লজু প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৪-২০১৮ ইং ০০:২৪:৩৫ | সংবাদটি ১১৭ বার পঠিত

বিষয়টি নোট করে রেখেছিলাম যাতে ভুলে না যাই। লক্ষ্য ছিলো মনমানসিকতায় সায় দিলে একটু লিখবো। ইদানিং লেখালেখি হয়ে ওঠে না। লেখার ইচ্ছে হলেও লিখতে পারি না আলস্য ও আরো কিছু প্রতিবন্ধকতার কারণে। তা সত্বেও সযতেœ টুকে রেখেছিলাম বিষয়টি। এক সময় মনে হলো হঠাৎ কোনো কিছু থেকে প্রেরণা পেয়ে যাবো লিখার। যে বিষয় নিয়ে ভূমিকার অবতারণা সেটি একটি প্রীতি বৈঠক। আসলে বিষয়টি সঠিক অর্থে একটি প্রীতি সম্মিলনী। কিন্তু খুব ছোট্ট পরিসরে। মাত্র ৭/৮ জনের বৈঠক। কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, কোনো পরিকল্পনা বা উদ্দেশ্য নয়। তেমন কোনো কর্মসূচিও নয়। স্রেফ দেখা সাক্ষাৎ, কুশল বিনিময়, দীর্ঘ দিনের জমে থাকা গল্প গুজব। এই আরকি।
এখন থেকে অনেক আগে কলেজ জীবনে লেখাপড়া রাজনীতির উদ্যম ও উদ্যতের প্রেরণায় আমরা ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর ছিলাম। সুন্দর জীবন, সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্নে উন্মুখ ছিলাম। এভাবে ‘কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’ আমরা। আর এখন বন্ধু-বান্ধব, সহপাঠী, সহকর্মী, সাথীÑ সবাই বিচ্ছিন্ন একে অন্য থেকে। ছিটিয়ে ছাটিয়ে রয়েছি নানা স্থানে। কেউ সিলেটে, কেউ বিদেশে, কেউ বা সিলেটের বাইরে। মোবাইলে যোগাযোগ থাকলেও দেখাসাক্ষাৎ হয় না দীর্ঘদিন। এমনি অবস্থায় দেখা সাক্ষাতের কোনো উপলক্ষ হলে আনন্দে-উচ্ছ্বাসে মন ভরে ওঠে। এ রকম আনন্দে মেতে ওঠার একটা মওকা হয়েছিলো গত ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮, বারটি ছিলো সোমবার।
প্রীতি বৈঠক বা প্রীতি সম্মিলন বা প্রীতি সাক্ষাতের অনাবিল চিন্তাটি প্রথম মাথায় আসে মনিরুজ্জামান চৌধুরী মনিরের। মনির সাবেক ব্যাংকার। সৎ ও দক্ষ ব্যাংক কর্মকর্তা। ঊীরস ইধহশ, ঐবধফ ঙভভরপব থেকে অবসরে গেছেন। এমসি কলেজ থেকে গ্রেজুয়েশন করেছেন। রাজনীতির অঙ্গনে ছাত্র ইউনিয়ন করেছেন, যুব ইউনিয়ন, ন্যাপ, উদীচী করেছেন। সামাজিক দায়দায়িত্বে তিনি অত্যন্ত সচেতন। আত্মীয়-কুটুম্ব ও বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা ও খোঁজ খবর নেয়া দায়িত্বই মনে করেন তিনি। কি জানি এই দায়িত্ববোধ থেকেই কি না প্রীতি বৈঠকটির উদ্যোগ তারই এবং সব পরিকল্পনাও তারই। সবাইকে বৈঠকের বার্তা দিয়ে অন্য কিছু না বলে প্রীতি বৈঠকটি সফল করতে যা কিছু দরকার, সব কিছুÑশুরু থেকে চ-িপাঠ পর্যন্ত তিনিই সামাল দিয়েছেন। অনানুষ্ঠানিক আয়োজনে রাতের খাবারের ব্যবস্থা ছিলো। ভাত-মাছ-ডাল-সবজির মেনু মনিরই চয়েস করেছিলেন। খেতে বসে খেতে খেতে বুঝা গেলো মনির শতভাগ ভোট কেরি করেছেন মেনুর সমর্থনে। মনে হয় রন্ধনশিল্পীকেও মনির ওহংঃৎঁপঃরড়হ দিয়েছিলেন। কেননা রন্ধনশিল্পে মনিরের পটুত্ব আমার আগে থেকেই জানা ছিলো। চাকরিসূত্রে মনির যখন ঢাকায় ঊীরস ইধহশ-এর ট্রেনিং ইন্সটিটিউট-এর পরিচালক ছিলেন, তখন তিনি নিজ হাতেই রান্না করে খেতেন।
যাকে কেন্দ্র করে প্রীতি সম্মিলনের আয়োজন তিনি ডা. ইনামুল কবীর চৌধুরী, নিকট আত্মীয়দের কাছে রানা এবং আমাদের কাছে এনাম। এনাম আমেরিকা প্রবাসী তথা টঝ ঈরঃরুবহ পরিবার পরিজন নিয়ে ভালো অবস্থানেই আছেন। এনাম (গইইঝ, উঅ, জউঈঝ) ঈধৎফরধপ ঝড়হড়মৎধঢ়যবৎ. তিনি মেরিল্যান্ডে কধরংবৎ চবৎসধহবহঃব-এ হলিক্রস হসপিটালে জব করেন। সম্প্রতি এক ধংংরমহসবহঃ-এ আমেরিকা থেকে নেপাল ট্যুরে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে সিলেটে। উদ্দেশ্য ছিলো, ছেলের জন্য কনে দেখা এবং সম্ভব হলে চিনিপান (বহমধমবসবহঃ) করে নেওয়া।
এনাম এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ থেকে গইইঝ করেছেন এবং এখানে ‘জব’ও করেছেন। ডাক্তার হিসেবে এবং রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি সিলেট জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ন্যাপ (ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি)-পার্টি-(সিপিবি)-উদীচী সংগঠনে সময় দিয়েছেন।
প্রীতি সম্মিলনী বসেছিলো সিলেট স্টেশন ক্লাবে সন্ধ্যার পরে। মনির স্টেশন ক্লাবের সদস্যÑঅন্যদের মধ্যেও সদস্য আছেন এই সূত্রে স্থানটি সকলের জন্য পছন্দনীয় ও সুবিধাজনক ছিলো। তাছাড়া একটা প্রাণদ অনুভূতির উপলব্ধি ‘আমরা সবাই মেজবান, সবাই মেহমান’ ছিলো সকলের অন্তরে।
প্রীতি সম্মিলনীতে ১২ জনের মতো মেজবান/মেহমান হাজির থাকার কথাছিলো। সবাই আসতে পারেননি। এসেছিলেন ৮ জন। তারা হলেন ব্যারিস্টার আরশ আলী, প্রকৌশলী আইয়ুব আলী, এডভোকেট কমরেড মালেক, সাবেক ব্যাংকার প্রদীপ দেব রায়, সাবেক ব্যাংকার মনিরুজ্জামান চৌধুরী, বেসরকারী চাকুরীজীবি গোলাম আলী মোস্তফা, ডা. ইনামুল কবীর চৌধুরী এবং প্রবন্ধকার ও কলাম লেখক রফিকুর রহমান লজু।
যাদের আমরা খুব মিস্ করেছি তারা হলেন ইকবাল ভাই (ইকবাল আহমদ চৌধুরী এডভোকেট, সাবেক গোলাপগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান), ব্যবসায়ী আব্দুল হান্নান (কদমতলী), বেদানন্দ ভট্টাচার্য এডভোকেট (যাকে আমি এবং একমাত্র আমিই ‘বেদা’ ডাকি।), সাবেক সম্পাদক সিপিবি সিলেট জেলা ইউনিট এবং সাবেক টেইলার্স মাস্টার এখলাসুল মুমিন। বৈঠকে যোগ দেবার প্রস্তুতি ছিলো সকলের। হঠাৎ করে অসুবিধায় পড়ে তারা আসতে পারেননি। প্রীতির আসরে আসন না নিতে পারায় নিশ্চয়ই আক্ষেপের উষ্ণ তাপ ঝরেছে তাদের নিঃশ্বাসে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক ও গবেষক তাজুল মোহাম্মদ সিলেটে ছিলেন। তিনি বৈঠকের খবর জানতে না পারায় হাজির হতে পারেন নি। পরে বৈঠকের খবর জেনে খুব আপসোস করেছেন।
মনির ওই রাতেই প্রীতি সম্মিলনীর বার্তা ফেইসবুকে চাউর করে দিয়ে দেশে-বিদেশে অন্য বন্ধুদের হৃদয়ে নাড়া দিয়েছেন। প্রাণদ্ ভাবাবেগ নিয়ে তারা মনিরের ফেইসবুকে কমেন্ট দিয়েছেন। তারা লিখেছেন, তাদের খুব ভালো লেগেছে। তারা আপ্লুত, তারা অভিভূত। এই বন্ধুরা হলেন আমেরিকা থেকে সুধীর বিশ্বাস, বিলেত থেকে আনাস পাশা, ঢাকা থেকে তবারক হোসেইন।
খাবার টেবিলে বসতে রাত ৯টা হয়ে যায়। সবাইকে রজনীগন্ধার স্টিক দিয়ে খাবার টেবিলে স্বাগত জানানো হয়। খাবার মেনু নিয়ে সবার মনে এক ধরণের কৌতুহল ছিল, উৎসুক্য ছিল। খেতে বসে পাওয়া গেলো বেগুনভাজি, মাগুর মাছ দিয়ে বিচি তরকারি, মোরগ-আলুর তরকারি এবং ডাল। খেতে খেতে মনে হলো এমন মেনুই সবাই আশা করেছিলেন। এক পবিত্র তৃপ্তি নিয়ে সবাই টেবিল ছাড়লেন। সবাই সবাইকে মড়ড়ফ নুব জানালেন, সালাম দিলেন, করমর্দন করলেন এবং তৃপ্ত হৃদয়ে ঘরমুখো হলেন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT