পাঁচ মিশালী

রাখাল ছেলে

লোকমান হেকিম প্রকাশিত হয়েছে: ০৭-০৪-২০১৮ ইং ০০:২৭:০০ | সংবাদটি ৮০ বার পঠিত

অনেক অনেক দিন আগের কথা। শিরজান দেশে এক মস্ত বড় জমিদার বাস করতো। সে ছিল খুবই অত্যাচারী। লোকেরা ভয়ে তার বিরুদ্ধে কিছুই বলতো না, এমন কি দেশের বাদশা পর্যন্ত সম্মান করতো। জমিদারের একটি বড় শখ ছিলো পশু পালন । গরু-মহিষ, মেষ-ছাগল প্রভৃতির জন্য সে ভিন্ন ভিন্ন খামার তৈরি করেছিলো। এসব খামারে সে গরীব প্রজাদের ছেলেপিলেকে রাখাল হিসাবে নিযুক্ত করতো। জমিদারের হুকুম অমান্য করে এমন সাধ্য কারো ছিলো না। দানিশ নামে এক বিধবার একটি ছেলে ছিলো। ছেলেটি দেখতে বড়ই ফুটফুটে সুন্দর। বিধবা শখ করে তাকে গ্রামের মক্তবে পড়তে দিয়েছিলো। কিন্তু জমিদারের চোখ পড়লো তার ওপর। সে ছেলেটিকে ডেকে এনে তার কাজে লাগিয়ে দিলো। বিধবা প্রতিবাদ করলো। কিন্তু তাতে কোন ফল হলো না, বরং জমিদার কাবুদ ক্ষিপ্ত হয়ে বিধবা মহিলাকে ভিটে ছাড়া করলো। তার আত্মীয়-স্বজন কেউ ছিলো না। দু’একজন যারা ছিলো, তারাও তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলো না। অবশেষে কোন উপায় না পেয়ে বিধবা দু’তিন গ্রাম দূরে এক জায়গায় একটু আশ্রয় খুজে নিলো। জমিদার কাবুদ দানিশকে মেষ ও ছাগলের রাখাল নিযুক্ত করলো। খামার বাড়িতে রান্না-বান্নার কোন ব্যবস্থা ছিলো না। জমিদারের লোকেরা বাড়ী থেকে দু’বেলা খাবার দিয়ে যেতো। একবার সকালে আরেকবার রাতে। এভাবেই দিন কাটতো রাখাল বালকদের। দানিশেরও সে একই অবস্থা। তবে অন্য সব রাখালের চেয়ে দানিশ ছিলো বয়সে ছোট। তাই সবাই তাকে ভীষণ আদর করতো। এদিকে বিধবা অনেক চেষ্টা করেও তার ছেলেকে ফেরত নিতে পারলো না। এক দিনের কথা। তখন ছিলো হেমন্ত কাল। ক্ষেতে ক্ষেতে ফসলের বাহার। এই সময় শিরজানের সমুদ্র উপকূলে দেশী-বিদেশী ভ্রমণকারীদের খুব ভিড়। এমনি সময় পার্শ্ববর্তী দেশের একজন পর্যটক এসেছিলেন সেখানে বেড়াতে। তার নাম ছিলো মারদান। তার সাথে ছিলেন একজন দেশীয় লোক। তিনি তাকে পথ দেখিয়ে দিতেন এবং তার ভাষা তরজমা করতেন। একদিন বিকেলে মারদান তার দোভাষীসহ বেরাতে বের হলেন। হঠাৎ রাখাল ছেলেটির কাছে দেখা হলো তাদের। মাঠে মেষ ও ছাগল ছেড়ে দিয়ে সে একটি গাছের নিচে এক মনে সুর করে একটি কবিতা আবৃত্তি করেছিলো, যাহার অর্থ হলো: বাতাস বয় পাতা নড়ে, মেষ-ছাগল-মাঠে চরে’ পর্যটকের দৃষ্টি পড়লো তার দিকে। তিনি তার লোভাষীকে দিয়ে বালকটির জীবন বৃত্তান্ত জেনে নিলেন। তিনি রাখাল ছেলেটির প্রতি সদয় হলেন। বললেন: আহ্, এমন সোনার ছেলেকে যদি লেখা-পড়া শেখানো হতো! এরপর তিনি দানিশের মায়ের সাথে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। দোভাষী তাকে সে বিধবার কাছে নিয়ে গেলেন। তিনি দানিশকে তার হাতে দিয়ে দিতে অনুরোধ করলেন। মা রাজী হলো। কিন্তু নিষ্ঠুর জমিদারের ভয়ে সে চিন্তায় পড়ে গেলো। মারদান তাকে বুঝিয়ে বললেন: সে ব্যবস্থা আমি করবো। মায়ের অনুমতি পেয়ে মারদান দানিশকে নিয়ে তার দেশে চলে গেলেন। তিনি ছিলেন ওয়াকল্যান্ডের একজন বড় ‘যাঈম’। সে দেশে জমিদারকে ‘যাঈম’ বলা হয়। তিনি রাখাল ছেলেটিকে একটি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। লেখাপড়া শেষ করে বিশ বছর পর দানিশ দেশে ফিরে এলো। ইতিমধ্যে তার মা এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছে। দেশে এসে মায়ের কবরটি খুঁজে বের করলো। মায়ের কবরের পাশে বসে সে দীর্ঘ সময় ধরে কাঁদলো। সে মনে মনে মায়ের ঋণ পরিশোধ করার জন্য প্রতিজ্ঞা করলো। একদিন সে খবরের কাগজে চাকুরিতে লোক নিয়োগের একটি বিজ্ঞপ্তি দেখতে পেলো। সরকার বিভিন্ন আদালতের জন্য হাকিম নিয়োগ করবেন। দানিশ দরখাস্ত করলো। সে দেওয়ানী আদালতের বিচারক হিসাবে চাকুুরি পেলো। ইতিমধ্যে দেশে জমিদারী প্রথার উচ্ছেদ হলো। মজলুম প্রজারা অনেক জমিদার ও মোড়লের বিরুদ্ধে আদালতে নালিশ দিলো। যে আদালতের হাকিম ছিলো দানিশ সেখানেই জমিদার কাবুদ আসামি হিসাবে উপস্থিত হলো। কারণ অনেক প্রজা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলো। দীর্ঘ ছয় মাসের বিচারের পর আদালত তাকে তিন বছর তিন মাস দশ দিনের শাস্তি হিসাবে জেলে পাঠালো। রায় ঘোষণার পর দানিশ এজলাস থেকে নিচে নেমে বৃদ্ধ জমিদারের সাথে করমর্দন করলো। সে তার কাছে নিজের পরিচয় দিয়ে বললো : আইনের কাছে আমরা সবাই সমান। তা না হলে...। জমিদারও তাকে চিনতে পারলো। জমিদার তাঁর অতীত কর্মের জন্য অনুতপ্ত হলো। উপস্থিত লোকেরা এক দৃষ্টিতে দানিশের দিকে তাকিয়ে রইলো। দানিশ মায়ের স্মৃতি বুকে ধারণ করে বাঁচতে চাইলো। সে মায়ের কবরে একটি প্রকা- স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করলো। সে জমি ক্রয় করে ও অনেক টাকা-পয়সা খরচ করে স্মৃাতিসৌধের পাশে একটি বিদ্যালয়ও স্থাপন করলো। কারণ তার মা বিদুষী না হলেও জীবনভর বিদ্যা শিক্ষাকে ভালোবেসেছিলো। আর তারই ফল হলো দানিশ। বিদ্যালয়ের নামফলকে সে খোদাই করিয়ে দিলো : ‘‘পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।”

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT