সাহিত্য

সুরমা সৈকতে গীতাঞ্জলি বিতর্ক

নৃপেন্দ্র লাল দাশ প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৪-২০১৮ ইং ০১:২১:২১ | সংবাদটি ২৯ বার পঠিত

এক. রবীন্দ্র বিদূষণ, সুরমা উপত্যকায়
রবীন্দ্রনাথ যে পাঁচজন শিক্ষককে নিয়ে ব্রহ্মচর্য্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার অন্যতম শিবধন বিদ্যার্নব। সংস্কৃত ভাষায় সুপ-িত ও বেদজ্ঞ এই সুমেধা ব্যক্তির কাছেই রবীন্দ্রনাথ উপনিষদের পাঠ নিয়েছিলেন। হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার আদাঐর গ্রামে জন্মেছিলেন এই শিবধন বিদ্যার্নব। তিনি ‘গীতাঞ্জলি’ নামে একটি কবিতার বই লিখেছিলেন। বইট নিশ্চয়ই রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিগোচর হয়েছিলো। এই সব বিষয়ে নথিপত্র নিশ্চুপ, শুধু নষ্টালজিয়া সতত প্রবাহিত। ‘গীতাঞ্জলি’ নামকরণে শিবধনের কোন নেপথ্য ভূমিকা ছিল, কিংবা বিপ্রতীপ সময়ের প্ররোচনা ছিল কি না, জানি না। পরোক্ষের কোন প্ররোচনা, শিবধনকে নেপথ্যবর্তী করেছিল কি না, জানি না।
দুই. ‘সুরমা’ পত্রিকায় নিন্দা স্তবের দ্বন্দ্বপুরাণ
ভুবনমোহন বিদ্যার্ণব আসামের শিলচর থেকে ‘সুরমা’ নামে একটি সাপ্তাহিক বের করতেন। পরে পত্রিকাটি দৈনিক হিসেবেও প্রকাশিত হয়েছিল। এই পত্রিকার সম্পাদক ভুবনমোহন রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি’ সম্পর্কে তুমুল বিতর্ক বঙ্কিম দুইটি প্রবন্ধ লেখেন ‘সুরমায়’ বেনামিতে। ‘গীতাঞ্জলির’ জন্যে রবীন্দ্রনাথ ‘নোবেল প্রাইজ’ পান ১৯১৩ সালে। কল্লোলিত আনন্দে, যখন সভা সমিতিতে বিজয়ভেরী বেজে উঠেছিল, কলহপ্রিয়, হিংসামুখর অসূয়া স্বভাবী বাঙালি যখন ক্ষণকালের জন্যে রবীন্দ্রস্তবগান গাইতে আরম্ভ করেছে, তখন উত্তর পূর্ব আকাশে জমে উঠেছে কালবৈশাখীর কালোমেঘ। ২৬ জানুয়ারি ও ২ ফেব্রুয়ারি ১৯১৪ (১৩ ও ২০ মাঘ, ১৩২০) ভুবনমোহন ‘গীতাঞ্জলি’ সমালোচনা দুই কিস্তিতে প্রকাশ করেন। এই ভুবনমোহন ও হবিগঞ্জের মাধবপুরের বেজুড়া গ্রামের অধিবাসী। তাঁর লেখার ও বিশদ বিতর্ক মুদ্রিত হয়ে আছে সুরমার পাতায়। জনৈক ‘শ্রীহট্টবাসী শর্ম্মা’ নামে তিনি সমালোচনা প্রবন্ধগুলি লিখেছিলেন। এই লেখার প্রতিবাদ করে মৌলভীবাজারের মুনসেফ উপেন্দ্র কুমার কর (১৮৭৭-১৯৫৪) গীতাঞ্জলি সমালোচনার প্রতিবাদ নামে বই লেখেন। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে মসীযুদ্ধ। মৌলভীবাজারের আইনজীবী ঈশান চন্দ্র কর ও কলকাতার প্রফুল্ল কুমার দে চৌধুরী ও এই মসীযুদ্ধে যোগ দেন। পরে এই দ্বন্দ্ব পুরাণের সমাপ্তি ঘটে ১ ফেব্রুয়ারি ১৯১৫ সম্পাদকের বক্তব্যের মাধ্যমে-
‘অনাবশ্যক কথা লইয়া বাদানুবাদ করিতে আমাদের প্রবৃত্তি নাই। গীতাঞ্জলির প্রতিবাদে উপেন্দ্র বাবুর প্রবন্ধ তিনবার সুরমায় প্রকাশিত হয়। তিনবারেই প্রায় ‘সুরমার’ দুই পৃষ্ঠা পরিমিত প্রতিবাদপত্র প্রকাশিত হইয়াছে।... যাহা হউক, এ বিষয়ে আর কোন বাদানুবাদ ‘সুরমা’য় প্রকাশিত হইবে না।’
তিন. উপেন্দ্র করের ‘গীতাঞ্জলি’ সমালোচনা (প্রতিবাদ)
ভুবনমোহন বিদ্যার্ণবের তীব্র সমালোচনার প্রতিবাদে পর পর তিনটি প্রবন্ধ লেখেন উপেন্দ্র কুমার কর, বি.এ, বি.এল। তিনি ছিলেন মৌলভীবাজার কোর্টের মুনসেফ পরে হন সাবজজ। জন্মস্থান হবিগঞ্জ জেলার সাটিয়াজুরী গ্রামে। প্রেসিডেন্সী কলেজের প্রজ্ঞাবান এই ছাত্র ‘ম্যাকবেথ’ বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। ‘গীতাঞ্জলি সমালোচনা প্রতিবাদ’ বইটি আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় গীতাঞ্জলি প্রকাশনার শতবর্ষ উদযাপন পরিষদ মৌলভীবাজার থেকে ডিসেম্বর ২০১০ খ্রি:। দুর্লভ এই বইটি আমি সংগ্রহ করি কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, সিলেট থেকে। বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় লেখক লিখেছিলেন- চৎবংবহঃবফ ঃড় ঃযব ঢ়ৎরংব সবসড়ৎরধষ খরনৎধৎু, ঝুষযবঃ নু ঃযব ধঁঃযড়ৎ-২২.১১.১৬। ১৯১১ সালেই তিনি মুনসেফ হয়ে মৌলভীবাজার আসেন। এখানে বসেই গীতাঞ্জলি সমালোচনার প্রতিবাদ লেখেন। বইটি সহজলভ্য নয়, তাই প্রকাশনা তথ্যটি জানিয়ে দিতে চাই- ১. নাম- ‘গীতাঞ্জলি’ সমালোচনা (প্রতিবাদ) ২. লেখক- শ্রী উপেন্দ্র কুমার কর, ৩. পৃষ্ঠা সংখ্যা-১০৪, ৪. প্রকাশক: গ্রন্থকার নিজে। ৫. মুদ্রক: কৃষ্ণমোহন ধর, চন্দ্রনাথ প্রেস, মৌলভীবাজার, সাউথ সিলেট। ৬. মূল্য: উল্লেখ নেই। ৭. প্রকাশকাল নেই। ‘কৈফিয়ৎ’ নামক ভূমিকার তারিখ-১ আশ্বিন, ১৩২১ বাংলা। ৮. উৎসর্গ পত্র কোন ব্যক্তির নাম নেই। লেখা আছে যাঁহার চরণে গীতাঞ্জলি প্রদত্ত হইয়াছে, তাহার উদ্দেশ্যে এই অক্ষম আলোচনাও নিবেদিত হইল। ৯. দু’পৃষ্ঠার ‘কৈফিয়ৎ’ ১০. অধ্যয় সংখ্যা-৭, রোমান সংখ্যায় নির্দেশিত। ১১. একটি ভ্রম সংশোধন পাতাও আছে। ১২. মুসলিম সাহিত্য সংসদের বইতে লেখা আছে- ‘জ’ হড়ঃ ঃড় নব রংংঁবফ. সংখ্যা নং-১০৩, করগী-৮৮০৯/১৫৬৭০। ১৩. প্রচ্ছদে একটি সংস্কৃত শ্লোক ‘বিবেকচূড়ামনি’ থেকে উৎকলিত হয়েছে। গীতাঞ্জলি থেকে ‘রহেছ তুমি এ কথা ‘কবে’- গানটির চার লাইন উদ্ধৃত হয়েছে।
‘নানা কথা’- নামে ও উপেন্দ্র করের একটি প্রবন্ধের বই আছে। উপেন্দ্র কুমারের বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর ৭ ডিসেম্বর, ১৯১৪ সুরমায় সমালোচনা বের হয়। সমালোচক বলেন- ‘পন্ডশ্রম’।
‘গীতাঞ্জলি’র এই প্রথম আলোচনাগ্রন্থ কীভাবে রবীন্দ্রনাথের হাতে গিয়ে পৌঁছল এ বিষয়ে ড. উষারঞ্জন ভট্টাচার্য বিশদভাবে লিখেছেন তার ‘অসমে রবীন্দ্র সমালোচনার পঁচিশ বছর-১৯১৪-৩৯’ প্রবন্ধে। বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবনে রক্ষিত বইটিতে উপেন্দ্র স্বহস্তে লিখেছেন- ‘কবীন্দ্র শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহোদয়ের করকমলে শ্রদ্ধাসহকারে উপহৃত হইল।’ উপেন্দ্র ৭ আশ্বিন, ১৩২১। উপেন্দ্র করের বই পাওয়ার চারদিন পর রবীন্দ্রনাথ প্রাপ্তি সংবাদ জানিয়ে একটি চিঠি লিখেন- ঠিকানা ছিল নি¤œরূপ- ইধনঁ টঢ়বহফৎধ কঁসধৎ কধৎ, ঝযধঃরধলঁৎর, ঝুষযবঃ.
মোহরের লেখা- ঝধহঃরহরশবঃধহ, ২৮ ঝবঢ়ঃবসনবৎ (১৯১৪).
রবীন্দ্রনাথের পত্রের পূর্ণপাঠ হচ্ছে এ রকম:
শান্তিনিকেতন, বোলপুর
বিনয় সম্ভাষণপূর্বক নিবেদন,
আপনার প্রণীত ‘গীতাঞ্জলি’- সমালোচনা (প্রতিবাদ) পুস্তকখানি পাইয়া কৃতজ্ঞতা স্বীকার করিতেছি। আমার রচনা যে, আপনার মনে প্রীতির উদ্রেক করিয়াছে তাহার এই পরিচয় পাইয়া আনন্দ লাভ করিলাম।
সকলের প্রকৃতি একরকম নহে, এবং রুচিরও ভিন্নতা আছে। আমার গানগুলি, যাহাদের ভালো লাগে নাই তাহাদিগকে ভালো লাগাইবার চেষ্টা করা সফল হইবে না। তাহা ছাড়া নিশ্চয়ই আমারও রচনার অনেক অপরাধ আছে। প্রকৃতির শক্তি অল্প এবং অনেক বাধার মধ্যে দিয়া সত্যকে প্রকাশ করিতে হয়। বস্তুতঃ এই গানগুলির মধ্যে আমার জীবনের বিকাশ ব্যক্ত হইতেছে। সেই বিকাশের মধ্যে যে অসম্পূর্ণতা আছে নিঃসন্দেহেই এই গানগুলির মধ্যে তাহার প্রমাণ থাকিয়া যাইতেছে। যাঁহারা জীবনের সাধনায় সিদ্ধিলাভ করিয়াছেন তাহাদের কাছে সেই অসম্পূর্ণতা ধরা পড়িবে বৈকি। তাহা লইয়া আমি ক্ষোভ করিতে চাই না। বিশেষত এই সকল গান লইয়া আমি লোকের প্রশংসা লাভ করিতে ইচ্ছুক নহি। ইচ্ছুক নহি বলিলে মিথ্যা কথা বলা হইবে- এইটুকু বলিতে পারি সেই লোকমুখের প্রশংসা দ্বারা আমি মূল্যশোধ করিয়া লইতে চাই না। এই গানগুলি আমার জীবনের পথের পাথেয়- এগুলি আর কেহই যদি গ্রহণ না করেন তথাপি আমার ইহা কাজে লাগিতেছে সেই আমার লাভ। ইতি ১০ই আশ্বিন ১৩২১ (২৭ সেপ্টেম্বর ১৯১৪)
বিনীত
শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উপেন্দ্র কুমারকে লেখা রবীন্দ্রনাথের এই স্বল্প-পরিজ্ঞাত পত্রটির মূলকপি রবীন্দ্র ভবন অভিলেখাগারে রক্ষিত আছে। এই পত্রটির রবীন্দ্রভবনে স্থিতি লাভ করার চমৎকার তথ্য পাওয়া যায় অধ্যাপক ঊষারঞ্জন ভট্টাচার্য্যরে লেখায়। উপেন্দ্র অবসর জীবন যাপন করেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। রবীন্দ্রনাথের মূল্যবান এই চিঠি যাতে বৈরী পরিবেশে বিনষ্ট না হয় এ জন্যে তিনি আসামের কাছাড় জেলার সদরের, শিলচরের ইতিহাসবিদ অধ্যাপক দেবব্রত দত্ত মহোদয়ের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রভবনের ফাইলে একটি চিঠি আছে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে লেখা। সেই চিঠিতে সমূহ বিবরণ রয়েছে। এখানে দেবব্রত দত্তের চিঠিটা উৎকলন করা যায়:
উবনধনৎধঃধ উধঃঃধ, চৎড়ভবংংড়ৎ এ.ঈ. ঈড়ষষবমব, ঠধশরষঢ়ধঃঃু, ঝরষপযধৎ.
শ্রীচরণ কমলেষু,
সঙ্গের চিঠিখানা হইতে আমার পরিচয় পাইবেন, আজ একটা সংবাদের জন্য আপনার নিকট পত্র লিখিতেছি। কবিগুরুর গীতাঞ্জলির বিরুদ্ধে সমালোচনার প্রতিবাদ করিয়া শ্রীহট্টের অবসরপ্রাপ্ত সাবজজ শ্রীযুক্ত উপেন্দ্র কুমার কর একখানা পুস্তিকা বহুদিন পূর্বে লিখিয়া ও প্রকাশ করিয়া কবিগুরুর নিকট এক কপি পাঠাইয়া ছিলেন এবং কবি স্বহস্তে উক্ত পুস্তিকার প্রাপ্তি স্বীকার করিয়া একখানা চিঠি উপেন্দ্র বাবুকে পাঠাইয়া ছিলেন। এই চিঠিখানা বর্তমানে আমার নিকট আছে। উপেন্দ্র বাবু পাকিস্তানে (শ্রীহট্ট জেলা-পূর্ব পাকিস্তান) থাকেন বলিয়া তাঁহার অন্যান্য মূল্যবান কাগজের সঙ্গে এটাও পাঠাইয়া দিয়াছেন। এই পত্র এখন পর্যন্ত কোথাও প্রকাশিত হয় নাই। আমার ইচ্ছা একটা ব্লক করিয়া আমাদের কলেজ (গুরুচরণ কলেজ, শিলচর) ম্যাগাজিনে দেই। তবে এই রকম চিঠি প্রকাশ করিবার আগে বোধ হয় আপনাদের অনুমতি লইতে হয়। আমি এই চিঠির কপি আপনার নিকট পাঠাইয়াছিলাম। প্রয়োজনবোধে ড়ৎরমরহধষ-টাই পাঠাইতে পারি।
এই বিষয়ে আপনার পত্রের অপেক্ষায় রইলাম।
রবীন্দ্রনাথ দেবব্রত দত্তকে কোন উত্তর লিখেছিলেন কি-না সে সব তথ্য জানা যায়নি।
আমি এই চিঠি সংগ্রহ করেছিলাম বাংলাবিদ্যাবিদ অধ্যাপক যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য্যরে কাছ থেকে। খ্যাতিমান এই অধ্যাপক গবেষকের নামে কলকাতার যাদবপুরে বঙ্গীয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদে ‘যতীন্দ্রমোহন সংগ্রহশালা’ পরবর্তীকালে স্থাপিত হয়েছে। তাঁর কাছে আরো রবীন্দ্রপত্র ছিল। সতীশচন্দ্র রায়কে লেখা একটি পত্রও তিনি আমাকে দিয়েছিলেন, কয়েকটি ভট্টসংগীত সংগ্রহ করে দেবার পুরস্কার স্বরূপ তিনি আমাকে এসব মুদ্রিত পত্র দিয়েছিলেন। আমর ‘শ্রীভূমি সিলেটে রবীন্দ্রনাথ’ বইতে এই পত্রগুলো সংযোজন করেছিলাম। (মুক্তধারা, ঢাকা-১৯৯২)।
গীতাঞ্জলির মর্মার্থ জানার জন্য এ পত্রের প্রাসঙ্গিকতা বিতর্কাতীত। রবীন্দ্রনাথের অন্তরজীবন ও প্রত্যয়াতুর দর্শনপ্রস্থান অবগত হওয়ার জনেও এই পত্র অনন্য-সাধারণ। রবীন্দ্রদর্শনের বিশেষ দিক হচ্ছে মরমী সাধকদের মতো মানুষ রতনকে চিনে নেবার আকুলতা। ব্যক্তিক ঘরানার জন্যেও এ চিঠি খুব মূল্যবান টীকা স্বরূপ।
‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম ভাষ্যকার উপেন্দ্র কুমার কর সম্পর্কে জানা জরুরি। তাঁর জীবনকথা নানা গ্রন্থে আছে। তবে খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে। তাঁর মেধার মূল্যায়নমূলক কোনো প্রবন্ধাদি তেমন নেই। বিভিন্ন সূত্র, গ্রন্থ ও প্রবন্ধ থেকে মাধুকরী করেছি, এই মল্লিনাথের জীবন ও কর্মকে।
হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার সাটিয়াজুরীর বিখ্যাত জমিদার কর বংশে ১৮৭৭ সালে উপেন্দ্র কুমার জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ভৈরব চন্দ্র কর, তিনিও মুনসেফ ছিলেন। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের মেধাবী ছাত্র ছিলেন উপেন্দ্র। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ ও বি.এল পাশ করে সিলেট কোর্টে আইনজীবী হিসেবে জীবন শুরু করেন তিনি।
১৯১১ সালে মুনসেফ হয়ে মৌলভীবাজারে আসেন। এখানে বসেই তিনি ‘গীতাঞ্জলি’ সমালোচনা (প্রতিবাদ) লেখেন। তিনি প্রাবন্ধিক ও নাট্যকার হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। একজন দক্ষ অনুবাদকও ছিলেন তিনি। ‘ম্যাকবেথের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ করেন তিনি। এটা তৃতীয় প্রচেষ্টা। তেরোটি প্রবন্ধ নিয়ে বের হয়েছে ‘নানা কথা’ বইটি। এই বইতে শংকর-দর্শন সম্পর্কে তিনটি প্রবন্ধ আছে। ‘আধুনিক শিক্ষায় হিন্দু দর্শন’ বিষয়েও একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ আছে বইটিতে।
কেবলাত্র ‘গীতাঞ্জলি’ সমালোচনার প্রতিবাদই তিনি করেননি, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’ সম্পর্কে যে বিরূপ সমালোচনা করেছিলেন তারও প্রতিবাদ করেছেন ‘চিত্রাঙ্গদা প্রসঙ্গ’ নামক মননশীল প্রবন্ধে। শিবনাথ শাস্ত্রী বিষয়ে বিপিন চন্দ্র পালের সমালোচনারও যোগ্য উত্তর দিয়েছিলেন এই ধীমান লেখক। ‘বিশ্বজনীন ভারতমাতা’ (১৯২৮) গ্রন্থের লেখকের স্বদেশ ও জন্মভূমির গৌরববোধ শ্রদ্ধেয়ভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
তাঁর স্ত্রী হেমপ্রভা কর একজন কবি ছিলেন। ‘বামাবোধিনী’ পত্রিকায় তাঁর কবিতা নিয়মিত প্রকাশিত হতো। উপেন্দ্র কুমার তাঁর অনুদিত ‘ম্যাকবেথ’ গ্রন্থটি সহধর্মিনীর নামে উৎসর্গ করেন। সেখানে তিনি পতœীকে চিত্রিত করেন ‘কাব্যরসিকা’ বলে। ‘কাব্যলোচনার সঙ্গিনী’ বলেও তাঁকে অভিহিত করেছেন। রবীন্দ্রকাব্যের এক অখ্যাত ব্যাখ্যাতা উপেন্দ্র রবীন্দ্র- আভায় আলোকিত এক ধীমান লেখক।
চার. এখন শারীরীপন্থায় বিবেচনা
লেখকের মৌল স্বভাব, আলোচনার রুচির কৌলিন্য, মননের স্বরূপ, নন্দনতাত্ত্বিক অনুভবের সত্য, সবকিছুর সামীপ্যে যাওয়া যেতে পারে। মিতকথনে সেই দায়িত্ব পালন করতে চাই। প্রথমেই সমালোচক বৃত্তির দায়ভাগ সম্পর্কে তাঁর অভিমত জানা যায়- ‘এই পুস্তিকার কোন কোন অংশ গ্রন্থান্তর হইতে অনাবশ্যক উদ্ধৃতি বাক্যবাহুল্য ভারাক্রান্ত বলিয়া কোন কোন পাঠকের মনে হওয়া অসম্ভব নহে।’ তিনি ‘ব্যক্তিগত বিদ্বেষ’ ও ‘সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতাবশে’ যারা রবীন্দ্র নিন্দুক তাদের মোকাবিলা করার জন্যই প্রতিবাদগুচ্ছ বিনির্মাণ করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। ‘সত্যের মর্যাদা রক্ষণ’ ও ‘কর্বত্যবোধে’ তিনি সমালোচনার প্রতিবাদ লিখেছেন বলে মত প্রকাশ করেছেন। সমালোচক লিখেছেন-
‘নিজেরে করিতে গৌরবদান
নিজেরে কেবলি করি অপমান।’
এই বাক্য ব্যাকরণ দুষ্ট। অতএব রবি বাবু নিশ্চয়ই ‘দুষ্টা সরস্বতীর’ সেবক। গীতাঞ্জলির প্রথম গানটি ‘নির্হেতুক পূজাহীন প্রার্থনার দৃষ্টান্তস্থল’। উপেন্দ্র নানা দার্শনিক প্রসঙ্গ উৎকলন করে তার প্রতিবাদ করেছেন।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে ‘আমারে যেন না করি প্রচার’ অংশে তিনটি ভ্রান্তির কথা বলা হয়েছে : ১. দার্শনিক, ২. শুষ্ক প্রার্থনা, ৩. শাব্দদোষ। এই অভিযোগ খন্ডন করে উপেন্দ্র কুমার লিখেছেন- ‘... ... যে নিরীশ্বর সাংখ্যদর্শনের অথবা ততোধিক স্থ’ূলদৃষ্টি জড়বাদের (সধঃবৎরধষরংস) ভিত্তির উপর দাঁড়াইয়াই যিনি কাব্য বিচারে প্রবৃত্ত হইয়াছেন এবং এই কারণেই দেখিতে পাই তাঁহার প্রবন্ধ আপাদমস্তক অধর্ম্ম্য (ঝধপৎরষবফরড়ঁং) মন্তব্যাবলীতে কন্টকিত হইয়া উঠিয়াছে।’
আমারে যেন না করি প্রচার
আমার আপন কাজে;
তোমারি ইচ্ছা করহে পূর্ণ
আমার জীবন মাঝে।
এই কবিতাংশের নি¤œরেখ শব্দ তিনটি ‘অবাচকতা’ ‘নিরর্থকতা’ প্রভৃতি শাব্দদোষের দৃষ্টান্ত। এই অভিযোগের শব্দতাত্ত্বিক বিচার করেছেন আলোচক ও সমালোচকের যোগ্য জবাব দিয়েছেন। তৃতীয় অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে ‘গীতাঞ্জলি’র প্রথম কবিতাটির শব্দ প্রয়োগ বিষয়ক প্রসঙ্গ। চতুর্থ অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে ‘শুষ্ক প্রার্থনা’ শীর্ষক অভিযোগ। উপেন্দ্র আক্ষেপ করে লিখেছেন- ‘এই সঙ্গীত যদি ‘শুষ্ক প্রার্থনা’ হয়, ইহা যদি ‘ভারতীয় সাধন পদ্ধতির’ বিরুদ্ধ বলিয়া প্রতিপন্ন করিতে চাও, তবে বলিব দূরদৃষ্টবশে ভারতীয় ‘সাধনপদ্ধতির’ মর্ম বুঝিতে পারিতেছ না’। পঞ্চম অধ্যায়ে রবীন্দ্রকাব্যে বৈষ্ণব পদাবলীর প্রভাব বিষয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে। বহু কবিতা উৎকলন করে তিনি প্রসঙ্গটি বিস্তার করেছেন। ষষ্ঠ অধ্যায়ে ‘গীতাঞ্জলি’র ভাষার গীতিময় লিরিক জ্যোৎ¯œার আলোচনা করা হয়েছে। অন্য একটি বিষয়ও আলোচ্য, আর সেটা হল ঞযব ঐরহফঁ জবারবি (উবপবসনবৎ ঘঁসনবৎ ১৯১৩ চ.চ. ৪২২-২৩) প্রবন্ধের সমালোচনা। এখন সপ্তম অধ্যায়ের উপসংহার থেকে একটি উদ্ধৃতি করা যায়। যেখানে আলোচকের গভীর প্রত্যয় ও আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছে। এক শ্রেয়োবোধের ভাষ্যকার ‘গীতাঞ্জলি’ বিষয়ে আমাদের মনোযোগ শুধু আকর্ষণ করেননি, ভবিষ্যতদ্রষ্টার মতো আপ্তবাক্যও উচ্চারণ করেছেন-
‘মঙ্গলবিধাতার শুভ বিধানে জগতের মহাকল্যাণের এই প্রভাত বিহঙ্গ কাকলী যখন আরও একটু স্ফুটতর হইয়া উঠিবে তখন অবিশ্বাসীর বিরূপ কন্ঠ নী

শেয়ার করুন
সাহিত্য এর আরো সংবাদ
  • ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সাহিত্যের জনক
  • সুশাসন ও দুঃশাসনের তাত্ত্বিক পাঠ
  • মালতি
  • ‘মার্কস চিন্তার সহি তফসির’
  • নষ্ট দাঁতের যন্ত্রণা
  • সুরমা সৈকতে গীতাঞ্জলি বিতর্ক
  • রবীন্দ্রনাথ ও নীলেশ্বর মুখার্জি
  • প্রতিক্ষার শেষ প্রহর
  • ‘দায়বদ্ধ অর্থশাস্ত্রী’ ও আমাদের দায়বদ্ধতা
  • শহিদ শিবলী : বিস্মৃত এক মুক্তিযোদ্ধা
  • হাজরে আসওয়াদের ইতিহাস
  • নাশপাতি ঘ্রাণে মন : কবির অনবদ্য সৃষ্টি
  • কবিতার অক্ষরে, কবির বেদনার ভেতর
  • অন্য স্বাদের ব্রেকফাস্ট
  • ডিগবাজি
  • কবিতা
  • ছন্দ ঝরে বন্ধ ঘরে : ছড়ার চিরন্তন ব্যঞ্জনা
  • বঙ্গীয় বাস্তবতায় উত্তর-আধুনিকতা
  • এমসি কলেজ : ইতিহাস ও জ্ঞান বিকাশের বাতিঘর
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • Developed by: Sparkle IT