সাহিত্য

নষ্ট দাঁতের যন্ত্রণা

কাহলিল জিবরান প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৪-২০১৮ ইং ০১:২২:৩৪ | সংবাদটি ১৩৯ বার পঠিত

ভাষান্তর : আবদুল হামিদ মানিক
[কাহলিল জিবরান (১৮৮৩-১৯৩১) লেবাননের কবি, ঔপন্যাসিক প্রাবন্ধিক। ১৯১২ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। লেখাটি সিরিয়ার পটভূমিতে হলেও সর্বজনীন। এটি নেওয়া হয়েছে ইউবিএস পাবলিশার্স, নয়াদিল্লী থেকে ২০০১ সালে পুনঃমুদ্রিত ঞযড়ঁমযঃং ধহফ গবফরঃধঃরড়হং গ্রন্থ থেকে।]
আমার মুখে ক্ষয়ে যাওয়া একটি দাঁত নিয়ে খুব কষ্টে ছিলাম। দিনের বেলা কিছুই টের পেতাম না। কিন্তু রাতে দাঁতের ডাক্তাররা যখন ঘুমিয়ে আছেন এবং ওষুধের দোকানগুলো বন্ধ, তখনই ব্যথা মোচড় দিয়ে উঠতো। রাতের আরাম হারাম হয়ে যেত।
অধৈর্য হয়ে শেষ পর্যন্ত ডেন্টিস্টের কাছে গেলাম। বললাম, আমার এ দাঁতটি উপড়ে ফেলুন। নষ্ট ক্ষয়ে যাওয়া দুষ্ট দাঁতটি আমার রাতের প্রশান্তি কেড়ে নিয়েছে। রাতভর আমার আহাজারির কারণ এ দাঁত। তুলে ফেলুন।
মাথা দুলাতে দুলাতে ডাক্তার বললেন: আমরা বেদনা নিরাময় করতে পারলে দাঁতটি তুলে ফেলা বোকামি ছাড়া আর কিছু হবে না।’
তিনি দাঁতে ড্রিলিং শুরু করলেন। যন্ত্রপাতি দিয়ে ময়লা পরিষ্কার করে খাঁটি সোনায় ফিলিং করলেন। নষ্ট দাঁতের মেরামত শেষে সগর্বে বললেন, এবার নষ্ট দাঁতটি আপনার ভালো দাঁতগুলোর চেয়েও বেশি শক্ত হয়ে গেল।’ বিশ্বাস করে আশ্বস্ত হলাম। টাকা পরিশোধ করে বেরিয়ে এলাম।
কী মুশকিল, সপ্তাহ যেতে না যেতেই অভিশপ্ত দাঁতটি সেই আগের উপদ্রব শুরু করে দিল। আমার হৃদয়ের মধুর সঙ্গীতধ্বনি বিলাপে পরিণত হয়ে গেল।
বাধ্য হয়ে আরেকজন ডাক্তারের শরণাপন্ন হলাম। বললাম, আমার নষ্ট অভিশপ্ত দাঁতটি তুলে দিন। প্লিজ, কোনো প্রশ্ন করবেন না। কারণ যে লোক ঘুষি খায় আর যে লোক তা গুনতে থাকে- তারা দুজন সমান নয়। এবার কাজ হলো। ডাক্তার সেই দাঁতটি উপড়ে ফেললেন। ক্ষয়ে যাওয়া উৎপাটিত দাঁতের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, এই পঁচা দাতটি তুলে বেশ ভালোই হলো আপনার।
সমাজের একটি মুখ আছে। সেই মুখের ভেতর মাড়িতে রয়েছে অসংখ্য অসুস্থ ক্ষয়ে যাওয়া দাঁত। সমাজ সে দাঁতগুলো উপড়ে ফেলার কোনো চেষ্টাই করে না। পঁচা দাতের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চায় না। সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে অথবা ফিলিং করেই সন্তুষ্ট থাকে। ডাক্তারদের বেশির ভাগই সমাজের ক্ষয়ে যাওয়া দাঁত চকচকে সোনা দিয়ে ঢেকে দেন।
এই মেরামত ও সংস্কারে প্রলুব্ধ হয়- এমন লোকই সমাজে বেশি। এতে যন্ত্রণা, অসুস্থতা এবং মৃত্যুই হয় তাদের অনিবার্য পরিণতি।
সিরিয় জাতির মুখে এখন পঁচে যাওয়া দাঁত প্রচুর। কালো, নোংরা দাঁত। পুঁজ বের হয়, যন্ত্রণা দেয়। ডাক্তাররা এগুলো উৎপাটন করেন না। এর বদলে সোনা দিয়ে ফিলিং করেন। এভাবেই রোগ থেকে যায়। যে জাতির দাঁত ক্ষয় হয়ে আছে তাদের পেটে অসুখ থাকবেই। অনেক জাতিই এই অসুস্থতাজনিত বদহজমি রোগে ভুগছে।
সিরিয়ার এই রোগাক্রান্ত দাঁত দেখতে চাইলে স্কুলগুলোতে যান। এসব স্কুলেই আজকের ছেলে মেয়েরা আগামী দিনের দায়িত্বশীল নর নারী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
যান আদালত পাড়ায়, দেখুন ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার দায়িত্বে নিযুক্ত ব্যক্তিদের দুর্নীতি ও অত্যাচার। দেখবেন সহজ সরল সাধারণ মানুষগুলোর আশা আকাক্সক্ষা নিয়ে কেমন ইঁদুর বিড়াল খেলা চলছে।
অভিজাত বিত্তবান শ্রেণির দিকে তাকান। দেখবেন প্রতারণা, মিথ্যাচার ও কপটতার রাজত্ব সেখানে প্রতিষ্ঠিত।
গরিব মানুষের কুঁড়েঘরে উঁকি দিতে অবহেলা করবেন না। দেখবেন সেখানে আতঙ্ক, উদ্বেগ, অজ্ঞতা ও ভয়ভীতি বিরাজ করছে।
এরপর, এরপর দক্ষ অঙ্গুলির সেই ডেন্টিস্টদের দেখুন। তাদের হাতে আছে সূক্ষè যন্ত্রপাতি, প্লাস্টার এবং ট্রাংকুইলাইজার। পঁচা দাঁতের ক্ষয় ও ব্যথা নিবারণে তাঁরা ফিলিং এর কাজে দিনমান ব্যস্ত আছেন। জাতির ক্ষয়ে যাওয়া দাঁত তারা ঢেকে দিচ্ছেন।
কথা বলুন, কথা বলুন বুদ্ধিজীবী হিসেবে সিরিয়ায় স্বীকৃত ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে। তাঁরা সংস্থা সংগঠনের জন্ম দেন, সভা সেমিনার আয়োজন করেন, জনসমাবেশে ভাষণ দেন। তাদের সঙ্গে কথা বললে শুনতে পাবেন মিহি মধুর সুর। পাথর পেষা যন্ত্রের আওয়াজের চেয়ে মধুর, সে সুর বর্ষণমুখর জুন রাতে ব্যাঙের ঘুঙুর ঘুঙুর শব্দের চেয়ে আরামদায়ক।
আপনি বলতে পারেন, সিরীয় জনগণ ক্ষয়ে যাওয়া দাঁত দিয়ে রুটি খেতে কষ্ট পাচ্ছে। খাদ্যের প্রতিটি দানা বিষাক্ত লালা মিশ্রিত হয়ে রোগ ছড়াচ্ছে। জনগণের পেটের অসুখ বিস্তার লাভ করছে। তাঁরা তখন বলবেন, হ্যাঁ, আমরা জানি, তাই আমরা ফিলিং ও ট্রাংকুইলাইজার দিয়ে দাঁতের সুস্থতা কামনা করছি।
আপনি দাঁতগুলো উপরে ফেলার পরামর্শ দিতে পারেন। বুদ্ধিজীবীরা তখন আপনাকে নিয়ে হাসাহাসি করবেন। কারণ রোগ নিরাময়ে দন্ত চিকিৎসার মহান কলাকৌশল ও বিদ্যা এখনো আপনি শিখেননি।
আপনি এবার চাপ দিতে পারেন। তারা তখন মুখ ফিরিয়ে যেতে যেতে স্বাতোক্তির মতো বলবেন:
বিশ্বে অনেক আদর্শবাদী আছেন যাদের স্বপ্ন বড় বেশি দুর্বল, বড় ভঙুর ও হালকা।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT