স্বাস্থ্য কুশল

নবজাতকের মৃত্যু প্রতিরোধে অত্যাবশ্যকীয় সেবা

সৈয়দা রওশন আরা পারভীন প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৪-২০১৮ ইং ০২:২৭:১৯ | সংবাদটি ৯০ বার পঠিত

কোন একটি নির্দিষ্ট বছরে প্রতি হাজার জীবিত শিশু জন্মের সাথে ঐ বছরের নবজাতকের মৃত্যুর আনুপাতিক হারকে নবজাতকের মৃত্যু হার বলা হয়। অর্থাৎ ১ হাজার জীবিত শিশু জন্ম নিলে, তার মাঝে যে কজন নবজাতক জন্মের ২৮ দিনের মধ্যে মৃত্যুবরণ করে তাকে নবজাতকের মৃত্যু বলে। জন্মের পর ২৮ দিন পর্যন্ত সময়টুকু একটি শিশুর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সময় সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য তাদের কিছু বিশেষ যতেœর প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে জন্মের পর প্রথম কয়েক ঘন্টার যতœ নবজাতকের জন্য খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জন্মের পর তাৎক্ষণিক পরিচর্যা ছাড়াও ২৮ দিন বয়স পর্যন্ত নবজাতকের আরও কিছু বিশেষ এবং অত্যাবশ্যকীয় পরিচর্যার প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশে শিশু মৃত্যু ও নবজাতকের মৃত্যু হার অনেক বেশি। বিগত বছরগুলোতে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যু প্রতিরোধের ক্ষেতে উল্লখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হলেও নবজাতকের মৃত্যুহার সেভাবে কমেনি। বাংলাদেশে প্রতি ১ হাজার জীবিত জন্মে প্রায় ৩৭ জনই জন্মের ২৮ দিনের মধ্যে মারা যায়।
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের চেয়ে নবজাতকের মৃত্যু হার কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বর্তমানে প্রতি বছর যেভাবে নবজাতকের মৃত্যুহার হ্রাস পাচ্ছে তার চেয়ে দ্বিগুন হারে এ মৃত্যুহার কমাতে হবে। নবজাতকের মৃত্যু বাংলাদেশের জন্য একটি বড় বোঝা। প্রতিদিন ২০০ নবজাতকের মৃত্যু আর ২৩০ নবজাতকের মৃত জন্ম হয়। ঠিক এভাবে বাংলাদেশে প্রতিবছর ৭৪ হাজার নবজাতকের মৃত্যু হয় এবং ৮৩ হাজার নবজাতকের জন্ম হয় মৃত। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর ৬১ শতাংশই মারা যায় জন্মের প্রথম মাসে এবং মোট নবজাতকের মৃত্যুর অর্ধেকই ঘটে জন্মের প্রথম দিনই। দেশে বছরে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৯০০ অপরিণত (৩৭ সপ্তাহের আগে) নবজাতকের জন্ম হয়। এদের মধ্যে পঞ্চম জন্মদিন পালনের আগেই বছরে ২৩ হাজার ৬০০ নানা জটিলতায় মারা যাচ্ছে। কম খরচে সহজ উপায়ে ৭৫ শতাংশ মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব।
যেসব নবজাতক আড়াই কেজির কম ওজন নিয়ে জন্মায়, তাদের কম ওজন বিশিষ্ট বা লো বার্থ ওয়েট শিশু বলা হয়। বাংলাদেশে প্রায় ৩০ শতাংশ নবজাতক কম ওজন নিয়ে ভূমিষ্ট হয়। এসব কম ওজন বিশিষ্ট নবজাতকের স্বাভাবিক জন্ম ওজন নিয়ে জন্মানো নবজাতকের তুলনায় সংক্রমণ ও অন্যান্য কারণে মৃত্যুহার বেশি। পরে বুদ্ধি ও বিকাশজনিত সমস্যায় ভোগার ঝুঁকিও তাদের বেশি। কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া নবজাতকের চাই বিশেষ যতœ। এদের দেহের তাপমাত্রা হঠাৎ কমে যেতে পারে। তাই জন্মের পরপর তাপমাত্রার সুরক্ষা দরকার, যা প্রসব কক্ষেই ব্যবস্থা থাকতে হবে। কম জন্ম ওজনের নবজাতকের জন্য ক্যাঙারু মাতৃসম পরিচর্যা অত্যান্ত জরুরি। তাপমাত্রার সুরক্ষার জন্য ক্যাঙারু কেয়ার পদ্ধতিতে নবজাতককে মায়ের ত্বকের সঙ্গে রেখে দেওয়াতে বেশ সুফল পাওয়া যায়। এছাড়া তিন-চার প্রস্থের পোশাক পরিয়ে সঙ্গে মাথায় টুপি, হাত পায়ের মোজা এসবের মাধ্যমে তাপমাত্রা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য মাত্রা অর্জন করতে হলে ২০৩০ সালের মধ্যে নবজাতকের মৃত্যু প্রতি হাজারে ১২, শিশু মৃত্যু ২৫ এবং প্রতি লাখে এবং মাতৃ মৃত্যু ৭০-এ নামাতে হবে। বর্তমানে যে হারে মৃত্যুহার কমছে. টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন করতে হলে তার চেয়ে ১ শতাংশ বেশি হারে কমাতে হবে। নবজাতকের এসব মৃত্যুর বেশির ভাগই প্রতিরোধযোগ্য। নবজাতকের মৃত্যুর ৮৮ শতাংশই হয়ে থাকে তিনটি কারণে: মারত্মক সংক্রম, জন্মের সময় শ্বাস নিতে না পারা এবং সময়ের আগে (অপরিণত) জন্মজনিত জটিলতা। সহজে বাস্তবায়নযোগ্য ও প্রমাণিত কিছু কার্যক্রম নবজাতকের মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণকে প্রতিরোধ করতে পারে।
নবজাতকের মৃত্যু রোধকল্পে অত্যাবষ্যকীয় সেবার গুরুত্ব অপরিহার্য। নবজাতকের পাঁচটি অত্যাবষ্যকীয় সেবা ১. জন্মের পরেই নবজাতকের শরীর মুছে শুষ্ক করা; ২. ত্বকে ত্বক স্পর্শ বজায় রেখে উষ্ণতা নিশ্চিত করা; ৩. নাড়ী কাটার পর নাভীতে ৭ দশমিক ১ শতাংশ ক্লোরোহেক্সিডিন ব্যবহার করা; ৪. কম ওজনের নবজাতকের বিশেষ যতœ নেওয়া এবং জন্মের ১ ঘন্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করা; ৫. জন্মের তিন দিনের মধ্যে গোসল না করানো নিশ্চিত করার মাধ্যমে নবজাতকের মৃত্যুহার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। এ ছাড়া জন্মের পর শ্বাস-প্রশ্বাস, তাপমাত্রা, শরীরের রং এবং নাড়ী থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে কিনা, শিশুর জন্মের প্রথম ৬ ঘন্টায় প্রতি আধা ঘন্টা থেকে ১ ঘন্টা অন্তর পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নবজাতকের বিপজ্জনক কোন অবস্থা দেখা দিলে সাথে সাথে অভিজ্ঞ ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।
এখনো প্রায় ৬০ শতাংশ নারীর প্রসব বাড়িতে হয় এবং ৪০ শতাংশ প্রসব হয় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে। প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব বাড়ানোর উপর সবাইকে কাজ করতে হবে। সচেতনতা বাড়াতে হবে জনগণের মধ্যে। লোকজনকে হাসপাতালে, ক্লিনিকে আসতে সচেতন করতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রশিক্ষিত জনবল এবং মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। প্রায় ৫০ শতাংশ মেয়ের বাল্যবিবাহ হয়। যখন তার শারীরিক গঠনের পরিপূর্ণতা আসে না, তখন এক শিশুর গর্ভে আর এক শিশুর জন্ম হয়। এ কারণে মা ও শিশুর অকাল মৃত্যু হয়। মা ও শিশুর মৃত্যু রোধে এটা কমানো অত্যন্ত জরুরি। সঠিক পুষ্টি ভ্যাকসিনেশন, মাতৃদুগ্ধ পান ইত্যাদি বিষয়ের ক্ষেত্রে আরো গুরুত্ব দিতে হবে। এটি মা ও শিশুর মৃত্যু রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মায়ের বিশেষ কোন স্বাস্থ্যগত ত্রুটি না থাকলে স্বাভাবিক অবস্থায় সুস্থ ও প্রাণবন্ত শিশু জন্ম নেয়। তাই সন্তান সম্ভবা হওয়ার আগে থেকেই স্ত্রীর পুষ্টিকর খাওয়া, বিশ্রাম, হাসিখুশি পরিবেশ বজায় রাখার প্রতি বিশেষ যতœ নিতে হবে। বাসার অন্য সবাই তার প্রতি যতœবান হবেন। এটা এক নম্বর কাজ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। নতুন শিশু আসছে, তাকে বরণ করে নেওয়ার প্রস্তুতিতে ঘাটতি থাকলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিশু জন্মের আগে ও পরে নিয়ম অনুযায়ী ডাক্তারের কাছে যাওয়ার যে প্রথা রয়েছে, তা যেন অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়। শিশু জন্মের প্রথম ঘন্টায় যেন মায়ের দুধ খেতে পারে। শালদুধের মধ্যে থাকে শিশুর রোগ প্রতিরোধের সব উপাদান। যে শিশু জন্মের পর পরই মায়ের বুকের দুধ পায়, তার অসুখ-বিসুখ কম হয়। সরকারের একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। এখানে উন্নয়ন সহযোগীসহ অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা আছে। সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করলে নবজাতক যেমন অত্যাবশ্যকীয় সেবা পাবে, তেমনি নবজাতকের মৃত্যু রোধ হবে।

শেয়ার করুন
স্বাস্থ্য কুশল এর আরো সংবাদ
  • থাইরয়েড সমস্যা ও সমাধান
  • আমের বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যগুণ
  • এলোভেরা ও প্রপোলিস : দাঁতের যতেœ চমৎকার এক জুটি
  • অর্জুনের এত্তো গুণ
  • রোগ প্রতিরোধে আমলকী
  • ঔষধি গুণের ইলিশ
  • ওমেগা-থ্রি : মানবদেহে এর গুরুত্ব
  • নিরাপদ মাতৃত্ব রক্ষায় প্রয়োজন প্রশিক্ষিত ও দক্ষ মিডওয়াইফ
  • রক্ত স্বল্পতা : জনস্বাস্থ্যের প্রধান সমস্যা
  •  তাফসিরুল কুরআন
  • দেশে দেশে রোজা
  • যাকাত দারিদ্র বিমোচনের হাতিয়ার
  • এতেকাফ ঈমানি তারবিয়াতের পাঠশালা
  • এলার্জির চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা
  • রোগ প্রতিরোধে তেঁতুল
  •  শিশুর প্রস্রাবে ইনফেকশন
  • ত্বকের সোরিয়াসিস
  • হেঁচকি উঠলে কী করবেন
  • কানে পানি জমে গেলে
  • গরমে ত্বকে র‌্যাশ উঠলে করণীয়
  • Developed by: Sparkle IT