উপ সম্পাদকীয়

বই এবং বই পড়া

আমীরুল হোসেন খান প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৪-২০১৮ ইং ২৩:৪১:৪৭ | সংবাদটি ১১ বার পঠিত

বসতবাড়ীর ঠিক পেছনে ঝকঝকে তকতকে আঙিনা! একপাশে সুন্দর ঝোপওয়ালা কামরাঙা গাছ। রোদেলা দুপুরে কিংবা সুশীতল বিকেলে আব্বা ডাক দিলেই চলে আসতাম কামরাঙ্গা গাছের নীচে। নিউটন, টমাস আলভা এডিসন মাদামকুরী সহ সব নামকরা বিজ্ঞানী দের গল্প শুনাতেন! মহানবী (সঃ) এর জীবনী পড়ে শুনাতে শুনাতে চোখের জলে ভেসে যেতেন। সুফিয়া কামাল, পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের রচনাবলী পড়ে চোখ ভরে উঠত। কি আশ্চর্য মিল নিজের জীবনের সাথে! আব্বার জানার পরিধি এত বিশাল যে এখনো চমকে উঠি। কি পরিমাণ জ্ঞানতৃষা! যখন যেখানে ভাল কোন বই মহামনীষী পীর আউলিয়াদের জীবনীগ্রন্থ পেতেন নিজের সাথে সাথে আমাদের বিমুগ্ধ শ্রোতা বানিয়ে রাখতেন। মূলতঃ তখন থেকেই বই এবং বই পড়ার প্রতি ভালোলাগা ভালোবাসা জন্ম নেয়।
কি অত্যাশ্চর্য বিশাল পৃথিবী। উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু শ্বাপদসংকুল অরণ্যে কিংবা উষর মরুভূমি যখন যেখানে মন চায় হারিয়ে যাও! সোহরাব রুস্তম ট্রয় নগরী পড়তে পড়তে মনে হত রণাঙ্গনে আমিও রক্তস্নাত বীরযোদ্ধা! আরব্য রজনী এক হাজার এক রাত্রি পড়তে পড়তে হারিয়ে যেতাম ভয়াবহ ইন্দ্রজালে! মহাভারত রামায়ণ পড়তে পড়তে লংকা থেকে গন্ধব পর্বতে!!
একটু বড় হবার সাথে আগ্রহ বাড়তে থাকে। যখন যেখানে যে বই পেতাম তা গোগ্রাসে শেষ না করা অব্দি নিস্তার নাই!স্কুলের লাইব্রেরীতে পরিচয় ঘটে সব ধরণের গল্প উপন্যাসের। নজরুল রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্র বঙ্কিম তারাপদ কালীদাস কে নেই সেখানে। মাসুদ রানা, দস্যু বনহুর কুয়াশা সিরিজ চুম্বকের মত কাছে টানত।
ভাইয়া শহর থেকে নতুন বই উপহার নিয়ে আসলে বুক ভরে ঘ্রাণ নিতাম। আহ একেবারে নতুন বই! মলাটে মলাটে ভালোলাগা। অবধারিত নিয়তির মত পরিচয় ঘটে ওয়েস্টার্ন সিরিজে সাথে। একেবারে দম বন্ধ করা তুমুল উত্তেজনা। দুর্দম দুর্জেয় পশ্চিমে হারিয়ে যাওয়া! বাতাসে বারুদের গন্ধ নাকে এসে লাগত। জিন্স লেদার জ্যাকেট হাতল গুটানো ভারী শার্ট আর লং বুটে নিজেকে দুর্ধর্ষ গান ফাইটার বলে ভাবতাম। যে কখনো হারতে জানে না। শুধু নিজে না বন্ধু বান্ধব সহ বাড়ীর সবাই দলবেধে বই পড়া! পাঠ্যবইয়ের চেয়ে আউট বইয়ে মন বেশী বলে বহু নিগ্রহের শিকার হলে ও রেজাল্ট ভাল হওয়ায় কেউ তেমন উচ্চবাচ্য করতে পারতেন না! এসএসসি পরীক্ষার আগে নিজের পঠিত বইয়ের সংখ্যা চার হাজার ছাড়িয়ে যায়। বাধ্য হয়ে মোহাম্মদী পারিবারিক লাইব্রেরী গড়ে উঠে। সকলে মিলে বই পড়া। পড়ে ফেরত না দেয়া আর চুরি করা সব অবৈধ সম্পদ দিয়ে তিন বন্ধুর আদ্যাক্ষর আতম লাইব্রেরীর সিল ছাপ্পর দিয়ে বৈধ করা! উফ কি সব দিন গেছে! স্কুল শেষ করে নতুন দিগন্তের দেখা মেলে। এমন কোন লেখক নাই যার ভাল বই পড়িনি বা সংগ্রহ করিনি। বিদেশী সব অনুবাদ গ্রন্থ পড়ে রাত ভোর হয়ে যেত। ফজরের নামাজ পড়ে রাতের ঘুম। পেশাগত শত কর্মব্যস্ততার মাঝে অফিসের রেকে প্রিয় লেখকদের গল্প কবিতা সংকলন। যখন মন চায় আপন ভুবনে!!! একেবারে নিজস্ব পৃথিবী!!!
রাস্তার মোড়ে মোবাইল হাতে জটপাকানো অথবা শয়নে স্বপনে ঘুমে জাগরণে তরুণ প্রজন্ম বুঁদ হয়ে আছে। কি এক অদৃশ্য মোহে ঘরে বাইরে শুয়ে বসে অফিস মার্কেট মল গাড়ীতে সবাই মোহাচ্ছন্ন। যেন এর বাইরে পৃথিবীর কিছু নাই। স্কুল কলেজে নতুন আসা মোবাইল ভার্সন নতুন এপ্লিকেশন নিয়ে যে ধুন্ধুমার কা- হয় তা রীতিমত অবিশ্বাস্য। পাঠ্য বইয়ের বাইরে নতুন আসা বই সাহিত্য গল্প কবিতা নিয়ে কারো ন্যূনতম আগ্রহ নেই। স্কুল পরিবার থেকে ও তেমন করে কেউ ভাবে না। নিজস্ব গ-ীর বাইরে আলাদা কোন জগত নাই। যার কারণে খুব সহজেই জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা এসে যায়।
বৈচিত্র্য হীন জীবন তারুণ্যের পছন্দ নয়। এটাই তারুণ্যের অহংকার। অন্য কোন উপায় না পেয়ে মাদক সহ অন্য অপরাধ মূলক কাজে জড়িয়ে পড়ে। বৈচিত্র চাই নতুন উত্তেজনা চাই। মেধাহীন এক দঙ্গল তরুণ প্রজন্ম!! এসব তরুণের জন্য দুঃখ হয় কষ্ট হয়। ওদের জানার বাইরে অপেক্ষা করছে কি বিশাল পৃথিবী, কি বিপ্লু সম্ভাবনা তা ওদের কখনো জানা হল না! শুধুমাত্র বই পড়লে খুলে যেত সকল বন্ধ দুয়ার। বই শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি মানুষের আতœাকে পরিশুদ্ধ করে।এই মেধাহীন জড় স্থবির বিশাল প্রজন্মের দায়ভার নিতে হবে আমাদের ই! তাই আর দেরী নয়! এঁদের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসা আমাদের সকলের দায়িত্ব!!!
লেখক : কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT