ইতিহাস ও ঐতিহ্য

মুক্তিযুদ্ধে পুণ্যভূমি সিলেটের সূর্যসন্তানরা

আব্দুল কাদির জীবন প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৪-২০১৮ ইং ২৩:৪৬:০৯ | সংবাদটি ৯২ বার পঠিত

বাঙালি জাতির ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম গৌরবময় অর্জন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং দেশের স্বাধীনতা। আর সে অহংকার নিয়ে এ জাতি বীরের খেতাব বিশ্বের বিচরণরত। যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এক নদী রক্তের সাগরে সিনান করে ৩০ লক্ষ শহীদ, পঙ্গুত্ব বরণ ও অসংখ্য মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বহির্বিশ্বের মানচিত্রে একটি লাল সবুজ পতাকা যার নাম বাংলাদেশ। সুসজ্জিত পাক হায়েনাদের বিরুদ্ধে জনযুদ্ধে এ অর্জন কম কথা নয়। জাতি হিসাবে গর্ব করার মতো বিষয়। বীরত্বপূর্ণ এ অর্জনের মূল নায়ক ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা- যারা এ দেশের সূর্যসন্তান, স্বপ্নের সারথি। অতচ আমাদের অবহেলার কারণে কি আমাদের সূর্যসন্তানদের বিরত্বগাঁথা হারিয়ে যাবে? না কোন অবস্থাতেই তা হতে পারে না। একজন মুক্তিযোদ্ধা বেঁেচ থাকতে কিংবা একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বেঁেচ থাকতে আমাদের পূর্বসূরিদের স্বর্ণে লিখা বীরত্বগাঁথা বিস্মৃতির অতলে আমরা হারিয়ে যেতে দেব না। হারিয়ে যেতে দিতে পারি না। এর সাথে জড়িয়ে আছে, বাঙালি জাতির অর্জনের কৃতিত্বগাঁথা জাতি হিসাবে এগিয়ে যাবার স্বপ্ন।
মুক্তিযোদ্ধারা জাতীর শ্রেষ্ঠ সন্তান ও অমূল্য সম্পদ। জাতির চেতনা বৃত্তে এদের থাকা বড়ই প্রয়োজন । মুক্তিযোদ্ধারা হারিয়ে গেলে জাতির সমৃদ্ধ ইতিহাস সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে যাবে। নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকেই আমাদের এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে । মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের প্রেরণা হয়ে হৃদয়ে থাকবেন অমর হয়ে যুগ যুগান্তর। দেশের মাতৃকার সাহসী সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা থেকে জয়নাল আবদীন বেগ রচিত “মুক্তিযুদ্ধে পুণ্যভূমি সিলেটের সূর্যসন্তানরা” প্রথম খন্ড গ্রন্থটি পাঠক সমাজের কাছে নিয়ে এসেছেন।
কবি জয়নাল আবেদীন বেগ ১৯৬৭ সালে প্রথম জানুয়ারী সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার মধ্যনগর থানার, চামরদানী ইউনিয়নের চামরদানী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা মরহুম শাহ নেওয়াজ বেগ মাতা মরহুম সরুজ বানু। পেশায় একজন ব্যাংকার হলেও সাহিত্যের প্রতি তার গভীর প্রেম-ভালোবাসা থেকেই তিনি নিয়মিত সাহিত্য চর্চা করে যান। ‘লালশাড়ী’, ‘ফিরে দেখা‘, ও ‘নারী ও সমাজ’ নামে আরোও ৩টি বই লেখকের প্রকাশিত হয়েছে।
লেখক মুক্তিযুদ্ধের বইটি লিখতে গিয়ে অনেক কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। পার করেছেন অনেক প্রতিকুলতা। লেখক গ্রামে গ্রামে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধের কাহিনী শুণে অভিভূত হয়েছেন। সংগ্রহ করেছেন তাদের জীবন কাহিনী। কত জনের কত দুঃখ, কষ্ট-দুর্দশা, অশান্তির কথা শুনতে হয়েছে লেখককে। ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে তার বইটি। তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তার এই গ্রন্থটির মধ্যে কাল্পনিক চিত্র অনুপস্থিত। তিনি মনে করেন এ প্রজন্মের পাঠকসহ সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে যুদ্ধের কাহিনী শুনতে নিশ্চয় ভালো লাগবে। তার এই ভালো লাগাতেই ভালোবাসা। অনেক মুক্তিযোদ্ধারা রয়ে গেছেন আড়ালে। হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত কত বীর সন্তান মুক্তিযোদ্ধা তারকারা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সূর্যসন্তানরা। কবি মনে করেন, আমাদের উচিত হবে বীর সন্তানরা হারিয়ে যাবার আগেই তাদেরকে কলমের মাধ্যমে হৃদয়ে বন্দি করে রাখা। এই বইয়ের মধ্যে লেখক ১৯৭১ সালের পাকিস্তানী বাহিনীর বর্বর চিত্র তুলে ধরেছেন। ফোটে উঠেছে সেই ভয়াবহ চিত্রের বাস্তব কাহিনী।
যাদেরকে নিয়ে গ্রন্থটি উপস্থাপনা করা হয়েছে সেই ৩০ বীর তারকাদের নাম উল্লেখ করছি। নন্দলাল সিংহ (রাঙ্গা), সাজিদুর রহমান, মোঃ আব্দুস সামাদ, দিনমনি সিনহা, মোঃ আব্দুল জব্বার, মোঃ আব্দুুল ওদুদ, মোঃ আব্দুল বাছির, মোঃ হাতেম আলী, মোঃ আব্দুল হামিদ, মোঃ আলী হোসেন (আজম), মোঃ সুলান মিয়া, মোঃ আলকাছ মিয়া, মোঃ আব্দুল মোতালিব, মোঃ সামসুল হক, রুস্তম আলী, আব্দুর রহিম, মোঃ আব্দুল মালেক, ইছুব আলী, মোঃ হাফিজ উদ্দিন, মোঃ আব্দুল জলিল, ইছব আলী, আব্দুল শরীফ ওরফে মোশাহিদ, তৈয়ব আলী, ধন মিয়া, কছির মিয়া, আহমদ আলী, মোঃ আব্দুস ছোবান, মোঃ সিরাজুল ইসলাম, আব্দুল কাদির, আব্দুল খালিক, নাজিম উদ্দিন, কামান্ডার
নন্দলাল সিংহ রাঙ্গার বর্ণনা কাহিনী- “আমিও মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য মনস্থির করি। মা কোনো মতেই যেতে দিবে না। কিন্তু দেশের করুণ কাহিনী আর নারী পুরুষের দুর্দশা দেখে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম। দেশকে মুক্ত করতে যুদ্ধে যাবই। মা’ সহ চলে গেলাম ভারতে। মা’কে ডিংরাই ক্যাম্পে রেখে আমি একদিন পালিয়ে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য লুকিয়ে গাড়িতে উঠে গেলাম। গাড়িতে জানালার সাথের সিটে বসলাম। মা কেমন করে যেন জানতে পারল আমি যুদ্ধে যাচ্ছি। মা পাগল বেশে গাড়ির পাশ ধরে ‘রাঙ্গা আয়, আমাকে ফেলে যাসনে,- বলে চিৎকার করতে লাগল। আমি পাষাণ হয়ে গেলাম। মা’র কান্নায় আমার মন একটুও গলেনি। ভগবানের কাছে আশীর্বাদ চাইলাম। মা‘কে যেন আবার দেখতে পারি। মা গাড়ি থাপরাচ্ছে আর কাঁদছে। এমন সময় গাড়ির সাথে মা ধাক্কা খায় এবং মাটিতে লুটে পড়ে। আমি শুধুই চেয়ে দেখলাম। কাঁদতেও যেন ভুলে গেলাম।”
সাজিদুর রহমান এর বর্ণনা কাহিনী- “দুই রাত এক দিন যুদ্ধ করি। পাঞ্জাবিরা পালিয়ে যায়। আমরা খাইরাই গ্রাম দখল করি। পাঞ্জাবিদের বাংকার দখল করে প্রচুর গোলাবারুদ পাই। তারপর চলে যাই গোয়াইন নদী পার হয়ে আজির উদ্দিন ক্যাম্প আক্রমণ করার জন্য। এই ক্যাম্পে ছিল পাঞ্জাবিদের একটি হেড কোয়ার্টার। আমরা মাঠে গর্তে অবস্থান করি। আমরা গুলি ছোড়ামাত্র বৃষ্টির মতো গুলি আসতে থাকে। আমাদের ভাগ্য ভালো কারণ ওদের গুলি আমাদের সামনে পড়ে। তাদের রেঞ্জ থেকে সামান্য দূরে ছিলাম আমরা। না হলে যেভাবে গুলি আসছিল কেউ বাঁচার কথা না।”
আব্দুস সামাদের বর্ণনা কাহিনী - “আমরা ছিলাম প্রথম ব্যাচের মুক্তিযোদ্ধা। আমরা একদিন গেলাম ছাতকের ব্রিজ উড়িয়ে দিতে বোমা ফিট করতে। আমরা ভাবছি, পাঞ্জাবিরা আসবে না। উহ!! খোদা, আমরা কেবল ব্রিজ এর কাছে গিয়ে তার বের করা মাত্র। অমনি সংকেত এল পাঞ্জাবিরা আসছে। দৌড়ে পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করলাম। প্রতিটি মুহুর্তে মৃত্যুর ঝুকি নিয়ে যুদ্ধ করেছি। দেশ মুক্ত করার জন্য। বিনিময়ে কিছু পাব, সে আশা মাথায় আসেনি।”
আব্দুল জব্বারের বর্ণনা কাহিনী- “আমরা ৩০০ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম। এই যুদ্ধে আমাদের অনেক মুক্তিযোদ্ধা মারা যায়। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ আসে ৫০০ শিখ সেনা। তারা কোম্পানীগঞ্জে অবস্থান নেয়। তেলিখালে ছিল পাঞ্জাবিদের ক্যাম্প। গুইয়ার (রেকি) মাধ্যমে পাঞ্জাবিরা খবর পেল শিখ সেনারা আসছে। তারা বের হয়ে গেল কোম্পানিগঞ্জের উদ্দেশ্যে। মুক্তিবাহিনী সামনে। শিখসেনা পেছনে। পাঞ্জাবিরা যখন সুইচ মর্টার নিক্ষেপ করলো তখন শিখসেনারা ভয় পেয়ে ইন্দিরা গান্ধীর নিকট রিপোর্ট করল। এরপরেই ভারতের উপর দিয়ে বিমান আসা বন্ধ হলো। ফলে অস্ত্র ও খাদ্যের প্রকট সংকট দেখা দিল। নিয়াজি ধীরে ধীরে দুর্বল হতে লাগল। নিয়াজির ধারণা, পাকিস্তানিরা মুক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করলে তারা যে নারী নির্যাতন করছে সেজন্য বাঙালিরা তাদেরকে জীবিত রাখবে না। ব্লেড দিয়ে কেটে কেটে রক্ত বের করে ছাড়বে- সেজন্য নিয়াজি বারবার বলেছে, আমরা আত্মসমর্পণ করব তবে মুক্তির কাছে নয়, শিখসেনাদের কাছে।’ এই পরামর্শ জেনারেল জাফর কিংবা ভারতের সেনাপ্রধানের নিকট করতে পারে।”
মোঃ হাতেম আলীর বর্ণনা কাহিনী- “এক জনতা একজন মুক্তিযোদ্ধাকে ধরে মারছে। খবর পেল ছোবহান। ওকে ধরে নিয়ে আসল। রাগে ছোবহান তেলে-বেগুণে জ্বলছে। লোকটি প্রাণভিক্তা চাইল। গুলি অর্ডার থেকে লোকটি বেঁেছ গেল। দলইরগাঁও যুদ্ধে আরেক দিনের কথা মনে পড়ল। পাঞ্জাবিরা এমনভাবে গুলি আর আক্রমণ করল আমরা বুঝতে পারিনি। আমরাও পাল্টা গুলি করছি। শেষ পর্যন্ত পাঞ্জাবিরা মর্টার শেল ছুড়ল। শেলগুলো এমনভাবে আসছে মনে হয় একবারে আমাদের উপর পড়বে। আমরা ছিলাম পুকুড় পাড়ে। আব্দুস ছোবহান দেখল, আমরা যেখানে দাঁড়ানো ঠিক সেই স্থানে শেলটা পড়বে। হয়ত ১০ সেকেন্ডের সময় মাত্র ব্যবধান পিছনে গেলে মরণ। আমরা সামনের পুকুড়ে ঝাঁপ দেই। ডুবন্ত হতে উঠতে হয়তো এক মিনিট সময় লাগছে। মাথা পানির উপর ভাসিয়ে দেখি আমরা যেখানে দাঁড়ানো ছিলাম ঠিক সেখানেই শেলটা পড়ে। এদিন ছোবহান না থাকলে আমার আপনার সাথে দেখা করার সৌভাগ্য হতো না।”
আজ আমরা স্বাধীন দেশের গর্বিত নাগরিক। আমাদের দেশের লাল সবুজের পতাকা জাতিসংঘের সদর দপ্তরে পৎ পৎ করে উড়ছে। বাঙালি জাতি বীরের জাতি। জাতিসংঘের শান্তি মিশনে বাংলার দামাল ছেলেরা বিশ্বের বুকে চমক লাগানো ভূমিকা রাখছে। একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত পাক হায়েনাদের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে বীরত্বের পরিচয় দিয়ে পরাধীনতার শৃংখল থেকে মুক্ত করতে বাংলার বীর ছেলেরা যে সাহসী ভূমিকা পালন করেছে, সেই সাহসী রক্তের উত্তরাধিকারী হিসেবে আমরা আজ গর্ব করতেই পারি। সেই সব সাহসী বীর লড়াকু সৈনিকদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রাপ্তি বাঙালি জাতির জীবনে পরম পাওয়া এ যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে রয়েছে ত্রিশ লক্ষ শহীদের জীবন দানের কাহিনী। আবাল-বৃদ্ধ- বনিতার, স্বেচ্ছায় আত্মাহুতি, রক্তপাত, অবর্ননীয় দুঃখ দুর্দশা সর্বোপরি স্বজন হারানোর মর্মস্পর্শী হৃদয় বিদারক ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন এই বইয়ের মধ্যে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT