ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন

আতিকুর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৪-২০১৮ ইং ২৩:৪৯:৫২ | সংবাদটি ৯০ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
২) (তাং-মঙ্গলবার ১১ আশ্বিন ১৪০৭ বাংলা ২৬ সেপ্টেম্বর ২০০০ খ্রি./ দৈনিক গিরিদর্পণ, রাঙামাটি)।
খরিদ বিক্রি হস্তান্তর ও বন্দোবস্তির জটিলতাই পার্বত্য ভূমি সমস্যার মূল কারণ হওয়ায়, তজ্জন্য লোকজনকে অপরাধী করে, ভূমি কমিশনের রায় দান নতুন জটিলতার সৃষ্টি করবে এবং তাতে নতুন করে দাঙ্গা হাঙ্গামা বাঁধবে। এমন কি তজ্জন্য ভূমি কমিশন নিজেও নিরাপদে দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন কি না সন্দেহ। যদি ভূমি কমিশন বিতর্কিত জায়গা জমির মালিকানা প্রশ্নে বন্দোবস্তি, হস্তান্তর ও খরিদ বিক্রির বৈধ দলিল পত্রকেই বিরোধ মীমাংসার একমাত্র সূত্র রূপে বিবেচনা করেন, তাহলে পাহাড়ি বাঙালি অনেকের পক্ষেই তা দেখান সম্ভব হবে না। কেউ কেউ বিনা বন্দোবস্তিতে পুরুষানুক্রমে ভোগ দখল করছে, এমন জমি সরকারি রেকর্ডে খাস থাকার ভিত্তিতে অন্যকে বন্দোবস্তি দেয়াও হয়েছে। কেউ খরিদ সূত্রে মালিক হয়েছে, কিন্তু দাপ্তরিক দীর্ঘসূত্রিতা ও আইনি প্রতিবন্ধকতার কারণে কবলা নিবন্ধন ও নামজারি হয়নি। অথবা দুষ্ট, লোভী ও বেয়াড়া উত্তরাধিকারীরা, পূর্বের আনরেজিস্টার্ড খরিদ বিক্রি ও হস্তান্তর মেনে নিতে অনীহ। সুতরাং এসব ক্ষেত্রে কেবল বৈধ দলিল পত্রই ন্যায় বিচারের পক্ষে বিবেচ্য, এ ভাবা সঠিক হবে না।
প্রচলিত আইন রীতি ও পদ্ধতিকে কমিশনের মীমাংসা সূত্র রূপে গণ্য করা হয়েছে। অথচ প্রচলিত আইন হিল ট্রাক্টস ম্যানুয়েল আর নতুনভাবে জারিকৃত পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ভূমি সমস্যাকে জটিলতর করেছে। সুতরাং সমস্যা সমাধানে এই আইনগুলোকে অনুসরণ করা হলে জটিলতা আরো বাড়বে। রীতি পদ্ধতিগুলি ও ন্যায় বিচারের চাবিকাঠি হতে পারে না।
পার্বত্য অঞ্চলের মৌজা প্রধান ও সার্কেল চীফেরা, জেলা প্রশাসকদের রাজস্ব সহযোগী। জমি হস্তান্তর ও বন্দোবস্তি দরখাস্তে তাদের রিপোর্ট ও সুপারিশ চেয়ে জেলা প্রশাসকেরা তদনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন, এটা একটি রীতি। এই অলিখিত রীতি বাধ্যতামূলক কিছু নয়। অনেক বন্দোবস্তি ও হস্তান্তর মামলা, হেডম্যান ও চীফের অবর্তমানে বা তাদের স্বার্থ ও বৈরীতা হেতু, তাদের রিপোর্ট ও সুপারিশ ছাড়াই, জেলা প্রশাসকেরা আমিন কানুনগোর রিপোর্টের ভিত্তিতে মীমাংসা করে থাকেন। হিল ট্রাক্টস ম্যানুয়েলের ধারা নং ১৮ (২)/ ঘ ও ৩৪ জেলা প্রশাসককে ভূমি নিয়ন্ত্রণের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দান করেছে। ধারা নং ৩৭, ৩৮, ৩৯ ও ৪০ তাকে হেডম্যান ও চীফদের উপর প্রাধান্য দিয়েছে। একমাত্র ধারা নং ৫০ পাহাড়ি লোকজনদের শহর বহির্ভুত এলাকায়, ঘর-বাড়ি সংস্থানের জন্য সর্বাধিক ৩০ শতাংশ জায়গা জমিন বিনা বন্দোবস্তিতে ভোগ দখলের অধিকার দিয়েছে। জুম চাষের জন্য সাময়িক কোনো পাহাড় দখল করা ও তাতে অস্থায়ীভাবে বসবাস করাটাও পাহাড়িদের একটি রীতি। আইনে জুমচাষ নিষিদ্ধ হলেও জুম খাজনা গ্রহণের মাধ্যমে সরকার তৎপ্রতি নীরবে সম্মত। তবে এগুলো অপরিহার্য বৈধ অধিকার নয়। জুমের প্রথাগত চর্চা ও আইনী বাধার অনুপস্থিতিতে, পাহাড় ও বনের উপর পাহাড়ীদের অবাধ অধিকার বার্তায় না। খাস জুম ভূমির মালিক রাষ্ট্র। এটি পাহাড়িদের ব্যক্তিগত বা সামাজিক মালিকানাভুক্ত কোনো সম্পত্তি নয়। বন্দোবস্তির বাহিরে কোনো রূপ ভূমি মালিকানা, কোনো কালেই পাক- ভারত-বাংলাদেশে প্রচলিত ছিলো না। ধারা নং ৩৪ ও ৫০ ই নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, গৃহস্থালী প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমিজমার প্রয়োজন হলে, তা অবশ্যই বন্দোবস্তি করে নিতে হবে, এবং তা পাহাড়ি বাঙালি সবার পক্ষে জরুরি।
মানুষের জীবন ও প্রয়োজন বাধা ও প্রতিবন্ধকতার কাছে আটক থাকে না। তাই আইনি ও দাপ্তরিক প্রতিবন্ধকতার বিপরীতে অনুষ্ঠিত প্রতিটি কাজকে ঐচ্ছিক অবাধ্যতা না ভাবাই সঙ্গত। মানুষ বৈধভাবেই নিজের প্রয়োজন মিটাতে চায়। দাপ্তরিক দীর্ঘসূত্রিতা ও আইনি প্রতিবন্ধকতা সে পথে বাধা হয়ে থাকে বলে সে তা অমান্য করে।
একজন মুমূর্ষ রোগীর জরুরি চিকিৎসা, একজন উচ্চ শিক্ষার্থী বা কর্মসংস্থান প্রার্থীর বিদেশে যাত্রা এবং একজন কন্যাদায়গ্রস্তের বয়স্কা কন্যা বিবাহ দান ইত্যাদি জরুরি কাজে গরিব জনসাধারণের তাৎক্ষণিক টাকার প্রয়োজন পড়ে। তাতে নিরূপায় অবস্থায় জায়গা জমি বিক্রয়ে বাধ্য হতে হয়। এই অবস্থায় পার্বত্য জেলা প্রশাসক ও জেলা পরিষদের তাৎক্ষণিক অনুমতি লাভ সম্ভব নয়। এটি অতি জটিল দীর্ঘ সময় সাপেক্ষ ব্যাপার এবং এটাই অত্রাঞ্চলে পালনীয় আইন। এমতাবস্থায় এই সময় সাপেক্ষ জমি খরিদ বিক্রি ও হস্তান্তরের বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে গেলে, চিকিৎসার অভাবে রোগী মারা যাবে, বিদেশগামী ছাত্রছাত্রী ও কর্মপ্রার্থীদের সময়মতো যাত্রারম্ভ সম্ভব হবে না, কন্যা দায়গ্রস্তের বিবাহ দানও আটকে যাবে। সুতরাং মানুষ বাধ্য হয়ে অবৈধ পন্থায় প্রয়োজন মিটায়। একটি সাদা কাগজে বায়না নামা লেখা, টাকার লেনদেন ও তার বিনিময়ে জমিজমা হস্তান্তরিত হয়। সঙ্গে সঙ্গে জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসনের অনুমতি চেয়ে প্রয়োজনীয় আবেদনও পেশ করা হয়ে থাকে, যার সুরাহা হতে একাধিক পুরুষ লাগে। প্রার্থীর জীবনকালে জমি খরিদ বিক্রি বন্দোবস্তি ও হস্তান্তরের বৈধ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া অতি বিরল ঘটনা। এমতাবস্থায় অবৈধ প্রক্রিয়া অবলম্বন ছাড়া উপায় কী? এই অবৈধতাকে অপরাধ সাব্যস্ত করে ভূমি কমিশন আদেশ জারি করলে তাও অমান্যই হবে এবং তাতে আহত ক্ষতিগ্রস্ত ও বিক্ষুব্ধ জনসাধারণ নিজেদের অধিকার রক্ষায় মরিয়া হয়ে ওঠবে। এটি সৃষ্টি করবে ব্যাপক ক্ষোভ অসন্তোষ ও দাঙ্গার। তখন নিজের অধিকার রক্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত একজন পাহাড়ী বা বাঙালি প্রতিপক্ষকে স্বজাতি বা বিজাতিরূপে গণ্য করবে না।
পার্বত্য চুক্তির ভাষায় ও জনসংহতি সমিতির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মনে হয়, বিষয়টি পাহাড়ি ও বাঙালিদের মাঝে সাম্প্রদায়িক। কিন্তু বর্ণিত ভূমি সমস্যা শত শতাংশে অসাম্প্রদায়িক। ভূমি খোর লোক পাহাড়ি বাঙালি উভয় সমাজে আছে। যাদেরকে বেআইনি সেটেলার বলা হয়, তারা স্বেচ্ছা প্রণোদিত ভূমিখোর নয়। তারা সরকার কর্তৃক আনিত ও আবাসিত। তাদের আবাসনে মৌজা প্রধান হেডম্যান ও সার্কেল চীফদের অনুমোদন ও সুপারিশ না থাকা, আচরিত রীতি বিরুদ্ধ হলেও, তা সরকারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন। এই কাজটি হিল ট্রাক্টস ম্যানুয়েলের ধারা ১৮ (২)/ ঘ ও ৩৪ বলেই বৈধতা সম্পন্ন। ধারা ৩৭, ৩৮, ৩৯ ও ৪০ হেডম্যান ও চীফদের জেলার নির্বাহী প্রধান জেলা প্রশাসকদের বাধ্য অনুগত করেছে। তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছার কাছে জেলা প্রশাসকদের বাধ্য করে নি।
[চলবে]

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • মুহররমের দাঙ্গাঁ নয় ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধ
  • দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিচিতি
  • সিলেটের প্রথম মুসলমান সম্পাদক
  • কালের সাক্ষী পানাইল জমিদার বাড়ি
  • জনশক্তি : সিলেটের একটি দীর্ঘজীবী পত্রিকা
  • ঋতুপরিক্রমায় শরৎ
  • সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরাকমোহনা
  • যে এলাকা পর্যটকদের হৃদয় জোড়ায়
  • উনিশ শতকে সিলেটের সংবাদপত্র
  • হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশঝাড় চাষের নেই উদ্যোগ
  • হারিয়ে যাচ্ছে বেদে সম্প্রদায়ের চিকিৎসা ও ঐতিহ্য
  • একটি হাওরের অতীত ঐতিহ্য
  • বদর বাহিনীর হাতে শহীদ হন সাদেক
  • বানিয়াচংয়ের ভূপর্যটক রামনাথ
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্র এবং বাগ্মী বিপিন
  • সিলেটের গৌরব : কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রকৃতিকন্যা সিলেট
  • ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম ক্ষেত্র
  • ইতিহাস সমৃদ্ধ জনপদ জামালপুর
  • সুনামগঞ্জের প্রথম নারী সলিসিটর
  • Developed by: Sparkle IT