উপ সম্পাদকীয়

পুতিন ও দুই মেরুর বিশ্ব

মোহাম্মদ জমির প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৪-২০১৮ ইং ২৩:৫২:৪৯ | সংবাদটি ৮৫ বার পঠিত

বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিন বিশ্বকে দেখাতে সক্ষম হয়েছেন, দেশে তার জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের গোয়েন্দা বাহিনী কেজিবির সাবেক কর্মকর্তা পুতিন প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলেৎসিনের প্রধানমন্ত্রী হন। এর পর ২০০০ সালে হন প্রেসিডেন্ট। ২০০৪ সালে পুনরায় প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০১২ সালে তিনি আবার ছয় বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট হন। সর্বশেষ ১৮ মার্চের নির্বাচনে ছয় বছরের জন্য ২০২৪ সাল পর্যন্ত চতুর্থবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে ম্যান্ডেট দিয়েছে রাশিয়ার জনগণ। পুতিন প্রায় ৭৬ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার এই চতুর্থবার ক্ষমতাসীন হওয়ার মাধ্যমে সোভিয়েত শাসনের জোসেফ স্ট্যালিনের পর পুতিন এখন দেশটির সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি নেতা।
একটা বিষয় খুব পরিস্কার, পুতিন এই পুননির্বাচনের মাধ্যমে নিজেকে রাশিয়ার গর্ব ও স্থিতি পুনরুদ্ধারে জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে প্রমাণ করতে পেরেছেন। বিশ্নেষকরা মনে করছেন, এর মাধ্যমে পুতিন প্রশাসন আন্তর্জাতিক ভূ-কৌশলে নতুন আলোচনায় হাজির। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, রাশিয়া তার দিক থেকে বিশ্বকে পরিবর্তন করছে। গত চার বছরে রাশিয়া ইউক্রেনের ক্রিমিয়াকে দখল করেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ভোট প্রক্রিয়ায় সাইবারের মাধ্যমে প্রভাব খাটিয়েছে, বাশার আল আসাদকে শেল্টার দিয়ে সিরিয়ায় নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট এখন যুক্তরাজ্যের সঙ্গে এক কূটনৈতিক সংকট মোকাবেলা করছে। ইংল্যান্ডের সলসবারিতে রাশিয়া কর্তৃক সাবেক গোয়েন্দা হত্যাচেষ্টায় উভয় দেশ ২৩ জন করে কূটনীতিককে বহিস্কার করেছে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ও যুক্তরাজ্যের নেতৃস্থানীয় প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা অভিযোগ করে আসছেন, রাশিয়া আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। ২৮ মার্চ পর্যন্ত রাশিয়াবিরোধী পদক্ষেপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ ২৫টি দেশ ও ন্যাটোও একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। বহিস্কার করেছে রাশিয়ার কূটনীতিককে। কেউ এই ইঙ্গিতও দিয়েছে, দেশগুলোর উচিত সামনের ফিফা বিশ্বকাপ বয়কট করা, যেটি রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। রাশিয়াও অবশ্য কম যায়নি। পশ্চিমা বিশ্বের পদক্ষেপে রাশিয়া টিট ফর ট্যাট হিসেবে ৬০ মার্কিন কূটনীতিককে বহিস্কারের পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা সেন্ট পিটার্সবার্গের মার্কিন দূতাবাস বন্ধ করছে। একই সঙ্গে বহিস্কার করেছে ২৩ দেশের ৫৭ কূটনীতিককে। এসব ঘটছে এই পুতিনের মনোভাব ও দেশে তার রাজনৈতিক সমর্থনের কারণেই।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিনের পদক্ষেপ স্পষ্টভাবেই বলছে, তার খায়েশ কেবল রাশিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে ক্ষমতা পোক্ত করাই নয়। বরং পুতিন এও অনুভব করছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে এক মেরুর বিশ্ব গড়েছিল; রাশিয়ারও সে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা রয়েছে।
স্ট্র্যাটেজিক বিশ্নেষকরা মোটা দাগে কয়েকটি বিষয় চিহ্নিত করেছেন, যেখানে রাশিয়া বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব ও উপস্থিতি বাড়াবে। এর মধ্যে প্রধানতম বিষয় হচ্ছে সাইবার জগৎ। রাশিয়া সাইবার নিরাপত্তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সাইবার জগতে তার প্রবেশ বাড়াচ্ছে। বলা প্রয়োজন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কিছু ইউরোপীয় দেশ- যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি অভিযোগ করে আসছে, রাশিয়া সাইবার অপরাধ করছে। বিশেষ করে এসব দেশে ভোটের ক্ষেত্রে দেশটি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।
দ্বিতীয় বিষয় হলো, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন গত চার বছরে তার দেশের সামরিক ক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার যুদ্ধবিমান সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদকে রক্ষায় বোমা নিক্ষেপ করেছে। রাশিয়ায় গুলি, যুদ্ধাস্ত্র পরিস্থিতিকে আসাদের পক্ষে এনেছে। যেখানে দেশটিকে ঘিরে নানাপক্ষীয় দ্বন্দ্ব বিদ্যমান, সেখানে রশিয়ার সমর্থনে আসাদের অবস্থান এখনও শক্তিশালী। এর মাধ্যমে রাশিয়া লিবিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যে তার অবস্থানও জোরালো করছে। রাশিয়ার সামরিক বাহিনী মিসরের সঙ্গে যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়েছে। ২০১৪ সালে রাশিয়ার সামরিক শক্তি ইউক্রেন থেকে ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করে। পশ্চিমা বিশ্ব ক্রিমিয়া প্রশ্নে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ও ঘটনায় ব্যাপক নিন্দা জানায়। এসব চিত্র স্পষ্টভাবেই দেখাচ্ছে, এ অঞ্চলের মধ্যে রাশিয়া অন্যতম বৈশ্বিক শক্তি হিসেবেই আবির্ভূত হচ্ছে।
অস্ত্র বিক্রি নিয়ে এক বিশেষ মাত্রা রয়েছে, যেখানে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অস্ত্র বিক্রি নিয়ে রয়েছে অঘোষিত প্রতিযোগিতা। বলা প্রয়োজন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পর রাশিয়া বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অস্ত্র রফতানিকারক দেশ। রাশিয়া এখন তার আরও মার্কেট খুঁজছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে, অনেক রাষ্ট্র ঐতিহ্যগতভাবে আমেরিকার তৈরি অস্ত্র ক্রয় করে, বিশেষ করে এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশ। ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্র আমদানিকারক দেশ। ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে দেশটি ৬২ শতাংশ অস্ত্র রাশিয়া থেকে ক্রয় করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও আফগানিস্তানের সামরিক কর্মকর্তারা সতর্ক যে, রাশিয়া হয়তো আফগানিস্তানে তালেবানদের অস্ত্র প্রদান করছে। রাশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমারেও অস্ত্র বিক্রি করে। ফিলিপাইনে অস্ত্র বিক্রি করার চুক্তি করেছে রাশিয়া।
এসব বিষয় ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব চ্যালেঞ্জ করছে। এটা আশা করা যায়, রাশিয়া এখন নতুন জোট গড়বে। স্মরণ করা যেতে পারে, গত বছর রাশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় সংকটগ্রস্ত ভেনিজুয়েলায় সার্বভৌম ঋণ দিয়ে সাহায্য করতে এসেছিল। এটি মস্কোকে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বৈদেশিক সাহায্যকারী হিসেবে তৈরি করে। যখন পুনরায় যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনিজুয়েলার সম্পর্ক খারাপ, ঠিক এ সময়ে এসে ভেনিজুয়েলার সঙ্গে সম্পর্ক রাশিয়ার লাতিন আমেরিকায় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করে। যার প্রমাণ আমরা পাই গত বছরের ডিসেম্বরে অফশোর গ্যাসফিল্ডের উন্নয়নে ভেনিজুয়েলা রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি রোসনেফতের একটি ইউনিটের লাইসেন্স পায়। রাশিয়া তার নিকটবর্তী বলকান অঞ্চলে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন দৃঢ় করতে আশাবাদী। এসব সম্পর্ক ব্যবহার করে ক্রেমলিন সে অঞ্চলে ন্যাটোর বিপরীত শক্তি গড়তে চায়। এটাও বলা প্রয়োজন, রাশিয়া পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতেও সম্পর্ক গড়তে চায়, যারা ন্যাটোর সদস্য নয়; যেমন বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, সার্বিয়া, মেসিডোনিয়া।
রাশিয়া হয়তো তার তেল উৎপাদনকে কেন্দ্র করে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চায়। এটাই হবে সহজতর পথ। কারণ পূর্ব ইউরোপের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দেশ যারা সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ছিল, তারা ব্যাপকভাবে রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। পোল্যান্ড, স্লোভাকিয়া, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি ও লিথুয়ানিয়া এদের অন্তর্ভুক্ত। যদিও তারা তাদের বিদ্যুৎ খাতকে বহুমুখী করে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চায়, তারপরও নিকট ভবিষ্যতে তা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। আর এরই মধ্যে রাশিয়া চেষ্টা করছে ইরাকে তার উপস্থিতি বাড়াতে। সে দেশের সঙ্গে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি রোসনেফত চুক্তি করেছে, যাতে কুর্দিস্তান অঞ্চলের তেলের পাইপলাইনের নিয়ন্ত্রণ পায়। সুতরাং, এখানেও রাশিয়ার প্রভাব বাড়ছে এবং একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হচ্ছে। রাশিয়া আরেক তেলনির্ভর অর্থনৈতিক দেশ সৌদি আরবের সঙ্গে গাঁট বাঁধছে।
মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ছে। এটা শুধু সৌদি আরবের প্রেক্ষাপটেই নয়, বরং ইরানের ক্ষেত্রেও সত্য। এমনিতেই ইরানের সঙ্গে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের শত্রুতা। সিরিয়া প্রশ্নে ইরান রাশিয়ার সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে। একই সঙ্গে পুতিন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকেও নিমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কুয়েত, কাতার ও আবুধাবির সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়াচ্ছে রাশিয়া। আবার সিরিয়ার সংকটই তুরস্ককে রাশিয়ার কাছে এনেছে।
বিশ্নেষকরা ধারণা করছেন, এসব কারণে আগামী ছয় বছরে দেখা যাবে বিশ্ব ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে দুই মেরুতে ভাগ হয়ে ভূ-কৌশলগত দিক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীন ও রাশিয়াও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • ইয়েমেন সংকট : কে কার সঙ্গে লড়াই করছে?
  • বৃটিশ আমলে সিলেটের প্রথম আইসিএস গুরুসদয় দত্ত
  • ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব
  • প্রবীণদের যথাযথ মূল্যায়ন কাম্য
  • ইতিহাসের একটি অধ্যায় : প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমান
  • সড়কে মৃত্যুর মিছিল কি থামানো যাবে না?
  • স্বাস্থ্যসেবা : আমাদের নাগরিক অধিকার
  • কে. আর কাসেমী
  • আইনজীবী সহকারী কাউন্সিল আইন প্রসঙ্গ
  • শিক্ষা হোক শিশুদের জন্য আনন্দময়
  • ফরমালিনমুক্ত খাবার সুস্থ জীবনের বুনিয়াদ
  • জামাল খাসোগী হত্যাকান্ড ও সৌদি আরব
  • শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য কী হওয়া উচিত
  • ব্যবহারিক সাক্ষরতা ও বয়স্ক শিক্ষা
  • সুষ্ঠু নির্বাচন ও যোগ্য নেতৃত্ব
  • জেএসসি পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে
  • অন্ধকারে ভূত
  • আর্থিক সেবা ও আর্থিক শিক্ষা
  • প্রসঙ্গ : আইপিও লটারী
  • রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন
  • Developed by: Sparkle IT