উপ সম্পাদকীয়

মাহদি হত্যার উপযুক্ত বিচার হোক

মোঃ রফিকুল ইসলাম প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৪-২০১৮ ইং ০১:৪০:২৪ | সংবাদটি ৯১ বার পঠিত

আমাদের সমাজে এমন কিছু নরপশু আছে, যারা খুন-খারাবী, ছিনতাই, রাহাজানী, ধর্ষণ-অপহরণ ইত্যাদি অপকর্মের দ্বারা সমাজে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। দয়া-মায়া, ভালবাসা, সহানুভূতি ইত্যাদি মানবিক গুণাবলী তাদের মধ্যে নেই। প্রকৃত অর্থে তারা মানুষ নয়, বরং তারা পশুর চেয়েও অধম। এসব নরপশুর নিকট মানুষের জীবনের কোন মূল্য নেই। মাত্র দশ টাকার জন্যও তারা মানুষ খুন করতে পারে। তারা এত পিশাচ এবং লোভীয়ে তারা মানুষের সর্বস্ব ছিনিয়ে নিয়েই ক্ষান্ত হয় না বরং তারা মানুষকে হত্যাও করে। মানুষের জীবনের কোন মূল্য তাদের কাছে নেই, টাকাই তাদের কাছে সবকিছু। তাই তারা টাকার জন্য মানুষ খুন করতে দ্বিধাবোধ করেনা। মানুষরূপী এসব নরপশু দেশ ও জাতির শত্রু। ইদানিং তারা দাপটের সাথে সিলেটে নানা অপকর্ম করে যাচ্ছে।
মানুষ নামের কলঙ্ক এসব নরপশুরা খুন-খারাবী, ছিনতাই, রাহাজানী ইত্যাদি অপকর্মের দ্বারা সিলেটবাসীকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। রাতের আধারে তাদের তৎপরতা আরো বৃদ্ধি পায়। সিলেটে সম্প্রতি এসব অপরাধী চক্র বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ছিনতাই ও খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে মর্মান্তিক খুন ও ছিনতাইয়ের ঘটনাটি ঘটেছে গত ২৫ মার্চ রোববার দিবাগত রাত ১টায় দক্ষিণ সুরমা বাস টার্মিনাল এলাকায়। এই ঘটনায় ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে নিহত হন মদীনা মার্কেটের সালাম ম্যানশনের বাসিন্দা মরহুম এডভোকেট আব্দুস সালামের ছেলে মাহদি আল সালাম মেহদী। তিনি গত বছর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েছেন। চাকরী সংক্রান্ত কাজে ঐদিন রাত ১২টার দিকে ঢাকা যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হন মাহদি। রাত ১টার দিকে মাহদি যখন কদমতলী হানিফ রেস্টুরেন্টের সামনে পৌঁছেন তখন মোটর সাইকেল যোগে কয়েকজন ছিনতাইকারী এসে মাহদির পথ রোধ করে এবং তার হাটুর পিছনের দিকে ছুরিকাঘাত করে তার মানিব্যাগটি ছিনিয়ে নিয়ে চলে যায়। ম্যানিব্যাগে ছিল মাত্র আড়াই শত টাকা। পুলিশ মাহদিকে উদ্ধার করে ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে আধ ঘন্টার মধ্যে তার মৃত্যু হয়। ভাবতে কষ্ট হয় যে, এসব নরপশু ছিনতাইকারীরা মাত্র আড়াইশ টাকার জন্য একজন মানুষকে খুন করে ফেলল। একজন মানুষের জীবনের চেয়ে আড়াইশ টাকার মূল্য তাদের নিকট এত বেশি! ছিনতাইকারীরা মাহদিকে খুন না করে তার মানিব্যাগটা নিয়ে যেতে পারত। কিন্তু ছিনতাইকারী নরপশুরা এতই নিষ্ঠুর যে, তারা মাহদির মানিব্যাগটিও ছিনতাই করল এবং তাকে হত্যাও করল। এসব ছিনতাইকারীরা অপরাধ করতে করতে নিষ্ঠুর এবং পশুতে পরিণত হয়ে গেছে। তাই মানুষ হত্যা করা তাদের জন্য মামুলী ব্যাপার হয়ে গেছে।
মাহদি ছিল একজন মেধাবী, সুশিক্ষিত এবং সম্ভাবনাময় তরুণ। তার এহেন করুণ মৃত্যু কখনো মেনে নেওয়া যায় না। মাহদির ন্যায় একজন সম্ভাবনাময় তরুণ সমাজকে অনেক কিছু দিতে পারত। কিন্তু ঘাতকরা তাকে সেই সুযোগ দিল না। মাহদির এহেন মর্মান্তিক মৃত্যুতে শুধু তার পরিবার, আত্মীয়, সহপাঠী এবং বন্ধু-বান্ধবই নয় বরং সমাজের বিবেকবান মানুষ মাত্রই শোকাহত। আমি যখন মাহদির এই মর্মান্তিক মৃত্যুর সংবাদটি পত্রিকায় পড়ছিলাম তখন আমি নিজেও চোখের সংবরণ করতে পারছিলাম না। অথচ আমি মাহদিকে জীবনে কোনদিন দেখিনি। ইহাই হচ্ছে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও সহানুভূতির নিদর্শন।
মাহদি হত্যার বিচারের দাবিতে গত ২৭ মার্চ মঙ্গলবার সকাল ১০টায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও এই কর্মসূচীতে অংশ গ্রহণ করেন। মানববন্ধন শেষে একই স্থান হতে একটি বিক্ষোভ মিছিল পুরো ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে। এরপর সকাল ১১ ঘটিকায় শাবিপ্রবি শিক্ষার্থীরা একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে পায়ে হেঁটে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে আধঘন্টা অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। এ সময় শিক্ষার্থীরা কাফনের কাপড় পরিধান করে মাহদি হত্যার প্রতিবাদ ও বিচার দাবি করে। একই দিন বিকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শাবিপ্রবির অর্থনীতি বিভাগের এলামনাই এসোসিয়েশন মানববন্ধন করে। এতে শাবিপ্রবির শিক্ষক, মাহদির আত্মীয়-স্বজন এবং সিলেটের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। বক্তাগণ মাহদি হত্যার সুষ্ঠু বিচার এবং ছাত্র-ছাত্রী সহ সকলের নির্বিঘেœ চলাচলের অধিকার দাবি করেন।
মাহদি হত্যার সাথে জড়িত চার ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর একজন হচ্ছে ভার্থখলার ৬১নং বাসার বাসিন্দা মির্জা মকবুল হোসেনের ছেলে মির্জা আতিক। কয়েকটি ছিনতাই মামলার আসামী মির্জা আতিক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। চার আসামীর আরেকজন হচ্ছে নগরীর একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তায়েফ আহমদ রিপন। সে একজন পুলিশ অফিসারের ছেলে। তার পিতা কুমিল্লা জেলা পুলিশে কর্মরত আছেন। সে বর্তমানে শেখঘাট পুলিশ কোয়াটার্সে বসবাস করছে। মাহদির চাচা মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এটিএম হাসান জেবুল দক্ষিণ সুরমা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় চার ছিনতাইকারীকে আসামী করা হয়েছে।
মাহদির এহেন নির্মম হত্যাকান্ডের বিচার চায় সিলেটের আপামর জনগণ। কাজেই বিশেষ ট্রাইব্যুনালে এবং ত্বরিত গতিতে মাহদির হত্যাকারীদের বিচার করে তাদেরকে ফাঁসীর কাষ্ঠে ঝুলাতে হবে। সাথে সাথে সিলেটের আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়ন করে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
পরিশেষে মাহদির রুহের মাগফেরাত কামনা করছি এবং তার স্বজনদের প্রতি জানাচ্ছি গভীর সমবেদনা।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শিক্ষা হোক শিশুদের জন্য আনন্দময়
  • ফরমালিনমুক্ত খাবার সুস্থ জীবনের বুনিয়াদ
  • জামাল খাসোগী হত্যাকান্ড ও সৌদি আরব
  • শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য কী হওয়া উচিত
  • ব্যবহারিক সাক্ষরতা ও বয়স্ক শিক্ষা
  • সুষ্ঠু নির্বাচন ও যোগ্য নেতৃত্ব
  • জেএসসি পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে
  • অন্ধকারে ভূত
  • আর্থিক সেবা ও আর্থিক শিক্ষা
  • প্রসঙ্গ : আইপিও লটারী
  • রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন
  • মূর্তিতেই দুর্গা : বিশ্বাসের বিষয় তর্কের নয়
  • শিক্ষার্থীর মনোজগৎ বিকাশে কার কী ভূমিকা
  • দুর্গের কর্তা দেবী দুর্গা
  • রাশিয়ার কাছে কি যুক্তরাষ্ট্র হেরে যাচ্ছে
  • দারিদ্র বিমোচনে সাফল্যের পথে বাংলাদেশ
  • বাংলাদেশ-সম্প্রীতি সমাবেশ ও কিছু কথা
  • পর্যটন নীতিমালার বাস্তবায়ন কত দূর
  • ওসমানীর দন্তরোগ বিভাগ
  • দুর্গার আগমন শুভ হোক
  • Developed by: Sparkle IT