উপ সম্পাদকীয়

সার্বিক উন্নয়ন : সাফল্য কতটুকু?

এম আশরাফ আলী প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৪-২০১৮ ইং ০১:৪২:১৬ | সংবাদটি ১৩ বার পঠিত

আমরা প্রতিনিয়ত গাছ দেখি। আম গাছ, জাম গাছ, বট গাছ ইত্যাদি কত রকমের গাছ চোখে পড়ে। গাছ দেখে দেখে বিচার করি। কোন গাছ কেমন পুষ্ট, তার ডালপালা দেখেই বুঝা যায়। কোন গাছে কেমন ফল ধরবে তার বাড়ন্ত কান্ড দেখেই অনুমান করা যায়। অবশ্য ব্যতিক্রমও হতে পারে সেটা ভিন্ন জিনিস। শীতকালে যখন গাছ দেখি, তখন কেমন দেখায়? পাতাহীন বৃক্ষ যেন শ্রীহীন, সৌন্দর্যহীন খাঁ খাঁ করা এক অবয়ব। চোখের দৃষ্টি পড়লে আহত হয়ে ফিরে আসে। তাহলে বছরে একবার অন্তত আমরা পাতার গুরুত্ব বুঝি, পাতাহীন বৃক্ষ অবলোকন করি। তাই পাতাহীন গাছ যেমন অনভিপ্রেত তেমনি অধিক পাতা বেষ্টিত গাছও বিপদজনক। সেজন্য একটা গাছ পরিপূর্ণভাবে বাঁচার জন্য ডাল পালা ও পাতার সমন্বয় থাকতে হবে।
আজকের লেখার শিরোনাম ভিন্ন নামে লেখার কথা ছিল। মনে মনে ঠিক করেছিলাম ‘পিঁপড়া ও মানুষের ভাবনা শিরোনামে লিখব। বেশ চিন্তা করে সেই ঠিক করা শিরোনামটি বাদ দিলাম। কারণ পিঁপড়ার মাত্র একটি চিন্তা আর মানুষের অনেক চিন্তা। পিঁপড়া ছয়পায়ে পিলপিল চলে কেবলমাত্র খাদ্য সংগ্রহের জন্য। শুকনো মৌসুমে খাদ্য সংগ্রহ করে রাখে যাতে বর্ষা মৌসুমে নির্বিঘেœ চলতে পারে। তবে এখান থেকেও আমাদের জন্য একটি বিষয় শিক্ষণীয় সেটি হচ্ছে মানুষের বর্ষা মৌসুম ট্যাকল করার জন্য আগাম কিছু চিন্তা করা। জীবনবোধ হওয়া থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত দেখছি মানুষের কতগুলো মৌলিক চাহিদা সব সময়ই পূরণ করতে হয়। তবে বিভিন্ন সময় এর বাজার মূল্য বিভিন্ন থাকে। প্রথমেই যদি চালের কথা বলি-সেটার মূল্য উঠানামা করে। এ বিষয়ে সবাই একমত হবেন। বিশেষ করে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে এবং আশ্বিন-কার্তিক মাসে চালের অগ্নিমূল্য থাকে। সরকারি সংগ্রহ শালায় যতই সংরক্ষণ করা হউক না কেন-দাম বাড়বেই। ঠিক একইভাবে রমজান মাস আসার দেড়-দু’মাস আগে থেকেই দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যায়। এ ছাড়াও সবজির সিজন পেরিয়ে গেলে সবজির দাম, পিঁয়াজের সিজন পেরিয়ে গেলে পিঁয়াজের দাম এ রকম অজ¯্র বিষয়ে সম্মানিত পাঠকরাও সাক্ষী আনসিজনে দাম বাড়বে এতে কোন সন্দেহ নেই। ঠিক একই ভাবে আরও কয়েকটি জিনিস যেমন বিদ্যুৎ-গ্যাস ইত্যাদির দাম সাথে সাথে বৃদ্ধি না পেলেও চাহিদা বেড়ে গেলে লোডশেডিং বা মার্কেটে পর্যাপ্ত নয় এই মর্মে প্রচুর ভোগতে হয়। সরকার পরিচালনার জন্য রয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়। একটা দেশের মানুষের যত ধরনের চাহিদা রয়েছে, সববিষয় মাথায় রেখেই মন্ত্রণালয়গুলো সাজানো হয়। যেমন-কৃষি মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইত্যাদি। প্রতিটি মন্ত্রণালয়েরই রয়েছে নির্দিষ্ট দায়িত্ব। প্রতিটি মন্ত্রণালয়েরই কিছু আগাম চিন্তা ভাবনা থাকে। সে চিন্তা ভাবনাটি সরকারের নির্ধারিত পাঁচ বছর মেয়াদের মধ্যে বাস্তবায়ন করতে হয়। প্রথম বছর হতে ২য় বছর এবং ২য় বছর হতে তৃতীয় বছর পর্যায়ক্রমে মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনার উন্নতি, এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন অগ্রসরমান হওয়া জরুরী। একটা মন্ত্রণালয় তখনই সফর হবে যখন সিজন এবং আনসিজন মিলিয়ে কোন ক্রাইসিস দেখা দিবে না। উদাহরণ স্বরূপ বলি যেমন-খাদ্য বিভাগের মওজুদ যদি পর্যাপ্ত থাকে তাহলে আনসিজনে বা দৈব-দুর্যোগে মূল্য স্থিতিশীল থাকবে। মজুদদার বা মিল মালিকরা যতই কারসাজি করুক না কেন, সরকারের কাছে পর্যাপ্ত মওজুদ থাকলে সেটা খোলা বাজারে ছেড়ে দিতে পারে। এতে মিল মালিকরা অবাক বিস্ময়ে দেখবে আর দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের আওতায় থাকবে। আর যদি বেশি মওজুদ করে তাহলে নির্ঘাত ক্ষতির সম্মুখীন হবে এতে কোন সন্দেহ নেই। দু-একবার অধিক মওজুদের কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হলে আর কোনদিন মজুদদারি করবে না। শিক্ষা হয়ে যাবে।
দ্বিতীয়তঃ বিদ্যুৎ বিভাগ জানে গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায়। সরকার বাহাদুরের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বিদ্যুৎ সংযোগ লাইন, ট্রান্সফরমার ইত্যাদির ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করা হল। গত শীত মৌসুমে সিলেট বিভাগের বিদ্যুৎ সঞ্চালন সত্যিই প্রশংসার দাবীদার। মাঝে মধ্যে বিদ্যুৎ গেছে সেটা ধর্তব্য নয়। সহনশীল পর্যায়ে ছিল। কিন্তু গ্রীষ্ম শুরু হতে না হতেই শুরু হয়েছে মারাত্মক লোডশেডিং। সেই আদ্যিকালেরই অবস্থা। ঝড়ের পূর্বাভাস দেখামাত্র বিদ্যুৎ নেই। একটু বৃষ্টি শুরু হলেও বিদ্যুৎ নেই। আর সদামাটা একটা কালবৈশাখি ঝড় হয়ে গেলে তো আর কথাই নেই। দেড়-দুইদিন বিদ্যুৎ থাকবে না-এটা কনফার্ম। অথচ সবাই ভেবেছিল বিদ্যুতের এত উন্নয়ন হয়েছে, কাজেই বিদ্যুৎ সমস্যা আর থাকবে না। গরমের কালেও মিল-ফ্যাক্টরি, কল-কারখানা চালাতে পারব। উৎপাদন ব্যাহত হবে না। কই না তো? গরমের শুরুতেই সেটা ভুল প্রমাণিত হল।
আমরা একটু পিছনে ফিরে দেখি। বাংলাদেশের শহর, রাস্তা-ঘাট ইত্যাদিতে পরিকল্পনা মাফিক কিছু করা হয়নি। উন্নত দেশগুলোর রাস্তা-ঘাট, ঘর-বাড়ি, বিদ্যুৎ, পানি ইত্যাদির ব্যবস্থাপনার দিকে তাকালে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার, সেটা হল পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা। যেখানেই আবাসন হবে বা মার্কেট হবে এর প্রস্তুতির আগেই ফুটপাত, রাস্তা, বিদ্যুৎ, পানি ইত্যাদির জন্য জায়গা একোয়ারের পর ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট ইত্যাদি নির্মাণ করা হয়। ফলে এক খরচে ১৫-২০ বছর যায়। কিন্তু আমাদের দেশের চিত্র ঠিক উল্টো। অপরিকল্পিতভাবে বাসা-বাড়ী, দোকান-পাট তৈরি করার পর তৈরি হয়েছে রাস্তা বা সরুগলি। ভাল মতন একটা গাড়ি নিয়ে বেশির ভাগ রাস্তায় ঢুকা যায় না। এছাড় বিদ্যুতের এক বিভাগ, পানির এক বিভাগ, সড়ক ও জনপথের এক বিভাগ। সড়ক ও জনপথ রাস্তা করে ফেলল। নতুন ঝকঝকে রাস্তা। এরই মধ্যে পানির লাইন, গ্যাস লাইন ইত্যাদি স্থাপনের জন্য সেই রাস্তা কর্তন করে এগুলো বসানো হয়। আবার দেখা গেল বিদ্যুতের পুরাতন খুঁটি উঠিয়ে নতুন খুঁটি বসাতে হবে। তাও সেই রাস্তারই বুক চিরে স্থাপিত হল বৈদ্যুতিক খুঁটি। সদ্য পাকা করা রাস্তার কী হাল হল? আবারও যেই সেই ভাঙ্গা চুরা। আবার রাস্তার কাজ ধরা হয় জুন টু জুন সেশনে। বছর শেষ হয় ডিসেম্বরে আর অর্থবছর শুরু হয় জুনে। অর্থাৎ রাস্তাঘাটে বরাদ্দটা যখন দেয়া হয় তখন বাংলাদেশে বর্ষার ভরা মৌসুম। ফলে রাস্তা খুড়াখুড়ি ইত্যাদির কারণে তৈরি হয় এক ভয়াবহ পরিস্থিতির। বড় রাস্তায় তৈরি হয় যানজট। এতে একদিকে বর্ষা মৌসুমের কারণে বরাদ্দ অনুযায়ী রাস্তা তৈরির সঠিক মান যাচাই করা পুরোপুরি সম্ভব হয় না এবং অসাধুরা ফায়দা হাসিল করার সুবিধা হয়। ফলে যে রাস্তার মেয়াদ পাঁচ বছর সে রাস্তা বছর দেড় বছরের মাথায় আবারও রিপেয়ারিং বরাদ্দ দিতে হয়। এভাবে প্রতিনিয়ত সরকারি কোষাগার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে টাকা। আমাদের দেশের মানুষের সুবিধার জন্য সংসদে অনেক আইন পাশ করা হয়। কিন্তু অর্থ বছরের ব্যাপারটি হয়ত কারও চোখে এখনও ধরা পড়েনি। যদি বার্ষিক বাজেট জানুয়ারি টু জানুয়ারি হত তাহলে হয়ত রাস্তাঘাট উন্নয়ন ও যানজটের সমস্যা অনেকখানি সহজ হত।
বলছিলাম উন্নত বিশ্বের কথা। নগর উন্নয়নে ওদের রয়েছে আগাম পরিকল্পনা। আমরা স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৪৬ বছর অতিক্রম করেছি। এখনও নগর পরিকল্পনা বলতে যা বুঝায় তার কতটুকু আমরা অগ্রসর হতে পেরেছি? পুরাতন শহরগুলোর কথা বাদই দিলাম। ওগুলোর অবয়ব পাল্টানো বেশ কঠিন কাজ। কিন্তু নতুন নতুন যে সকল আবাসন হচ্ছে-সেখানে সকল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব। প্রসঙ্গক্রমে একটি জিনিস না বললেই নয়। আমাদের বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ লোক বিদেশে থাকেন এবং বাংলাদেশের বার্ষিক আয়ের সিংহভাগ আমরাই অর্জন করে থাকি। তেল, গ্যাস, চা সহ নানা প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ সিলেট উন্নয়নের ক্ষেত্রে বঞ্চিত রয়েছে। রাস্তা-ঘাটের কথাই যদি ধরি তাহলে আন্তর্জাতিক মানের একটি রাস্তাও এখানে নেই বললেই চলে। সিলেটের গ্যাস দিয়ে, অন্যান্য জেলায় মিল-ফ্যাক্টরি, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র চললেও সিলেটের বেশির ভাগ মানুষ আজও গ্যাস থেকে বঞ্চিত। সিলেট সহ সারা বাংলাদেশে নতুন নতুন আবাসন হচ্ছে। এ সকল আবাসন প্রকল্প অনুমোদন করার আগে রাস্তা-ঘাট, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ইত্যাদির জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রেখে অনুমোদন দিলে আগামির সোনার বাংলায় উন্নয়নের ছাপ পরিলক্ষিত হবে।
সে যাক, একটা দেশের সার্বিক উন্নয়ন নির্ভর করে সে দেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়গুলোর উপর। সরকারের সবক’টি মন্ত্রণালয় নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। আমাদের দেশ উন্নয়নশীল দেশে-রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। একটা গাছের কান্ড, শাখা, প্রশাখা ইত্যাদি যত সুন্দর, গাছটাকেও তত সুন্দর দেখায়। সরকারের প্রতিটি বিভাগে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে নি¤œ আয়ের দেশ হতে উন্নয়নশীল এবং উন্নয়নশীল হতে উন্নত দেশে পরিণত হতে বেশি সময় লাগার কথা নয়। একটা স্বাধীন জাতি হয় দেশ প্রেমিক, হয় মানবতাবাদি, হয় জনদরদী। সার্বিকভাবে দেশের সকল মানুষের মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত না হলে দেশের উন্নয়ন প্রশ্নবোধকই রয়ে যাবে। দেশের মানুষ এখনও রাস্তায়, ফুটপাতে দিন কাটাচ্ছে। চিকিৎসা সবার জন্য নিশ্চিত হয়নি। সরকারি হাসপাতালগুলোর বরাদ্দকৃত ঔষধগুলোও মানুষের কাছে পুরোটা পৌঁছায় না। চাল, ডাল, তেলসহ নিত্য পণ্যের দাম অস্থিতিশীল। সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারি প্রায় বাইশ লাখ। ওদের সার্বিক উন্নয়ন মানে ১৬ কোটি মানুষের উন্নয়ন নয়। দেশের শিক্ষিত যুবাদের বেকারত্ব আর এক বুক হতাশা কোথায় লুকাব? একটা কর্মমুখী জাতি গঠনে কর্মক্ষেত্র ও কর্মী গঠন জরুরী। শিক্ষিত বেকারদের কাজে লাগাতে চাই বহুমুখী পরিকল্পনা। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হউক। অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা পাক দেশের মানুষ। তবেই বিশ্ব সভায় আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াব।
লেখক : কলামিস্ট

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT