শিশু মেলা

অ্যালিয়েন টিনু

জসীম আল ফাহিম প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৪-২০১৮ ইং ০১:৪৩:৩১ | সংবাদটি ১৫ বার পঠিত

ডিয়াংদের বাড়িতে একবার একটি অ্যালিয়েন এসেছিল। অ্যালিয়েনটির মাথা ছিল ইয়া বড়ো। মাথায় কোনো চুল ছিল না। ওকে দেখতে অনেকটা রোবটের মতোই লাগত। অ্যালিয়েনের ছিল বড়ো দুটো চোখ। ভোঁতা নাক-মুখ। মাথার তুলনায় ওর শরীরটা ছিল শীর্ণ-রোগা। ওর হাত পা ছিল সরু সরু। অ্যালিয়েনটি বেশি কথাবার্তা বলত না। সব সময় চুপচাপ থাকতে পছন্দ করত। সারাক্ষণ সে চিন্তিত মনে কী যেন কী ভাবনাচিন্তা করত।
তোমরা হয়তো ভাবছ, অ্যালিয়েন থাকে মহাকাশে। তাহলে ডিয়াংদের বাড়ি এল কেমন করে? সে রীতিমতো একটা গল্প। বলছিÑশোনো। ডিয়াংদের বাড়ি আমাদের বাংলাদেশে নয়। ওদের বাড়ি উত্তর কোরিয়ায়। উত্তর কোরিয়ার একটি পার্বত্য অঞ্চলে তাদের ছোট্ট একটি বাড়ি। ওর বাবার নাম সিকিয়াং। বাবা একজন খনিশ্রমিক। প্রতিদিনের মতোই ডিয়াংয়ের বাবা খনিতে কাজ সেরে বাড়ি ফিরছিলেন।
অন্যদিনের মতো সেদিনও সিকিয়াংয়ের ভালো রুজি হলো। হাট থেকে তিনি চাল, ডাল, লবণ, মরিচ আর কিছু খরগোশের মাংস কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। তার বাড়ি ফেরার পথে বড়োসড়ো একটি খোলা জায়গা পড়ে। জায়গাটাকে বালুচর বা ছোটোখাটো মরুভূমিও বলা যায়। মরুভূমির মাঝামাঝি আসতেই তিনি দেখতে পেলেন মরুচরে সুন্দর একটি পুতুল পড়ে আছে। পুতুলটি দেখে সিকিয়াংয়ের খুব পছন্দ হলো। ভাবলেন, একে তিনি বাড়ি নিয়ে যাবেন। অনেকদিন হয় পুত্র ডিয়াংকে তিনি কোনো খেলনা কিনে দিতে পারেননি। এ পুতুলটা পেলে হয়তো সে খুব খুশি হবে। ছেলের আনন্দের কথা ভেবে বাবার দু-চোখে জল এসে গেল। ছেলের কথা ভাবতে ভাবতে বাবা পুতুলটা সাথে নিয়ে বাড়ি চলে এলেন। এসে দেখলেন, ডিয়াং বেঘোর ঘুমুচ্ছে। ঘুমন্ত ছেলেকে দেখে বাবার মনে খুব মায়া হলো। তিনি ছেলের ঘুমটা ভাঙাতে চাইলেন না। ঘুম না-ভাঙিয়ে তিনি পুতুলটা ওর বিছানায় শুইয়ে দিলেন।
পরে যখন ডিয়াংয়ের ঘুম ভাঙল, পাশে শোয়া পুতুলটাকে দেখে সে আশ্চর্য হয়ে গেল। আজব পুতুলটাকে নিয়ে সে ভাবতে বসে গেল। কী সুন্দর পুতুলটা! ওর মাথাটা শরীরের তুলনায় অনেক বড়ো। পুতুলটার দু-দুটো চোখ আছে ঠিকই। তবে চোখ দুটো মুদিত। দেখে মনে হচ্ছে কোনো শিশু বুঝি ঘুমুচ্ছে। অবাক ব্যাপার হলো পুতুলটির কান দুটো দেখতে অনেকটা ঘোড়ার কানের মতো লম্বা ও খাড়া। ডিয়াং কী মনে করে যেন একবার পুতুলটির মুখে হাত বুলিয়ে দিল। সে হাত বুলিয়ে দিতেই পুতুলটি একবার সজোরে নিশ্বাস ছাড়ল। পরক্ষণেই ওটা পিটপিট করে ডিয়াংয়ের দিকে তাকাল। পুতুলটির আশ্চর্য তাকানো দেখে ডিয়াং তো ‘থ’। অবাক হয়ে সে জিজ্ঞেস করল, তুমি তো দেখছি একটি পুতুল! কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তুমি জীবিত। বিষয় কি?
ডিয়াংয়ের প্রশ্নের জবাবে পুতুলটি এবার মিটিমিটি হাসল। হেসে হেসেই বলল, আমি ঠিক জীবিত আছি তো?
ডিয়াং বলল, জীবিতই তো মনে হচ্ছে।
পরে পুতুলটি শোয়া থেকে উঠে বিছানার ওপর দু-পা মেলে বসল। তারপর আড়মোড়া ভেঙে বলল, অনেকক্ষণ ধরে ঘুমুচ্ছিলাম, তাই না?
ডিয়াং বলল, হয়তো তাই। পরে বলল, আচ্ছা, একটা বিষয় আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। তুমি কি আসলে পুতুল নও?
ডিয়াংয়ের এরূপ প্রশ্ন শুনে পুতুলটি সজোরে হেসে ওঠল। হেসে হেসে বলল, না। আমি পুতুল নই।
ওর কথা শুনে ডিয়াং অবাক হয়ে বলল, পুতুল নও বলছ! তাহলে তুমি কি?
পুতুলটি বলল, আমি একজন অ্যালিয়েন।
‘অ্যালিয়েন’ নামটা শোনামাত্র ডিয়াং একটু নড়েচড়ে বসল। অবাক হয়ে সে জিজ্ঞেস করল, সত্যি বলছ তুমি অ্যালিয়েন? তার মানে তুমি মহাকাশে থাকো।
অ্যালিয়েনটি বলল, হ্যাঁ। আমি মহাকাশেই থাকি।
ডিয়াং এবার কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, তুমি অ্যালিয়েন! মহাকাশে থাকো বলছ! তাহলে বাবা তোমাকে পেলেন কেমন করে?
ডিয়াংয়ের কথা শুনে অ্যালিয়েনটি একটু গম্ভীর ভাব করল। তারপর বলল, সে বিরাট এক দুর্ঘটনা বলতে পারো। আমি একটি দুর্ঘটনার শিকার হয়ে পৃথিবীতে আটকা পড়ে গেছি।
দুর্ঘটনার কথা শুনে ডিয়াং আরও কৌতূহলী হয়ে ওঠল। জিজ্ঞেস করল, কি রকম দুর্ঘটনা?
অ্যালিয়েন বলল, তুমি কি সেই দুর্ঘটনার কথা শুনতে চাও? শুনতে চাইলে শোনাতে পারি।
ডিয়াং বলল, বলো শুনি।
অ্যালিয়েন বলতে লাগল তার দুর্ঘটনার কথাÑআমরা ছিলাম পাঁচ বন্ধু। ইনু, মিনু, বিনু, দিনু আর আমি টিনু। পৃথিবী দেখব বলে একদিন কাউকে কিছু না-জানিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। একটি সসারে চড়ে আমরা পাঁচ বন্ধু রওয়ানা হলাম। আমরা এসে তোমাদের এ মরুভূমিতে অবতরণ করলাম। পৃথিবীর মাটিতে পা রেখেই আমরা অভিভূত হয়ে পড়লাম। এত সুন্দর পৃথিবী! এত সুন্দর এর প্রকৃতি! গাছপালা আর ফুল-ফল! দেখে আমরা রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে গেলাম।
পৃথিবীর রূপ দেখে আমরা পাঁচ বন্ধু যখন দিশেহারা প্রায়, এমন সময় আশপাশে কোথাও বিকট একটা শব্দ হলো। অনেকদূর থেকে ছুটে এসে ক্ষেপনাস্ত্রের মতো একটি বস্তু আমাদের থেকে কিছু দূরে আছড়ে পড়ল। পরক্ষণেই বিকট শব্দে ওটা বিস্ফোরিত হলো। আচমকা শব্দটা শুনে আমাদের মধ্যে একপ্রকার হুড়োহুড়ি শুরু হয়ে গেল। তাড়াহুড়ো করে আমরা সসারের দিকে ছুটতে লাগলাম। এরই মধ্যে আমার চার বন্ধু ঠিকই গিয়ে সসারে উঠে পড়ল। বাদ পড়লাম শুধু আমি। বন্ধুরা সসারে চড়ে শূন্যে উড়াল দিল।
আমি হতাশ হয়ে সসারের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ঠিক সে সময় আশপাশ থেকে গ্যাসের এক কু-লি এসে আমাকে ঘিরে ধরল। নিশ্বাসের সাথে আমার নাকে গ্যাস প্রবেশ করায় আমি অচেতন হয়ে গেলাম। মেঝেতে লুটিয়ে পড়লাম আমি। তারপর আমি আর কোনো কিছু বলতে পারব না।
এটুকু বলে টিনু নামের অ্যালিয়েনটি বড়ো বড়ো চোখ করে ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলতে লাগল।
ডিয়াং এতক্ষণ মন দিয়ে টিনুর সব কথা শুনল। তারপর সে বলল, বিরাট দুর্ঘটনাই তো দেখছি। এখন তুমি কি করবে কিছু ঠিক করেছ?
টিনু প্রত্যয়ী কণ্ঠে বলল, এখন আমাকে অপেক্ষা করতে হবে। আমার বন্ধুরা যখন বুঝতে পারবে যে আমি তাদের সাথে নেই, তারা আমাকে উদ্ধার করতে ঠিকই ছুটে আসবে। অনুগ্রহ করে সে পর্যন্ত তুমি আমাকে লুকিয়ে রেখো। রাখবে তো লুকিয়ে?
অ্যালিয়েনটির অনুরোধ শুনে ডিয়াং অভয় দিয়ে বলল, তুমি কোনো চিন্তা করো না। তোমার বন্ধুরা না-আসা পর্যন্ত আমি অবশ্যই তোমাকে নিরাপদে লুকিয়ে রাখব। কিন্তু একটি ব্যাপার আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। তোমার বন্ধুরা কি করে জানবে যে তুমি ঠিক আমার কাছেই আছো?
টিনু বলল, এটা কোনো ব্যাপার নয়। আমার সাথে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ম্যাগনেটো মিটার রয়েছে। আমাকে খুঁজে পেতে এটি তাদের সাহায্য করবে।
টিনুর কথা শুনে ডিয়াং বলল, দেখি তো তোমার ম্যাগনেটো মিটারটি। টিনু তার ম্যাগনেটো মিটারটি বের করে ডিয়াংকে দেখাল।
ঠিক সে সময় হঠাৎ ম্যাগনেটো মিটারে সবুজ রঙের একটি বাতি জ্বলে ওঠল। সবুজ বাতিটি দেখামাত্র টিনু খুশিতে একেবারে হইচই করে ওঠল। তারপর ডিয়াংকে জড়িয়ে ধরে সে বলল, বলছিলাম না আমার বন্ধুরা আমাকে নিতে আসবে। এই তারা এল বলে। ম্যাগনেটো মিটারের সবুজ বাতিটি তা-ই বলছে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT