শিশু মেলা

অভিশাপ

মোঃ ইব্রাহীম খান প্রকাশিত হয়েছে: ১২-০৪-২০১৮ ইং ০১:৪৪:১৫ | সংবাদটি ১৮ বার পঠিত

চল শহরের কোন বিখ্যাত হোটেলে যাই।
কেন? অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করল অনিক।
আজ আমি তোদের দু’জনকে খাওয়াব।
তাই নাকি।
হু।
শুধু হু বললে হবে না। কী কী খাওয়াবি? কেন খাওয়াবি? সব খোলে বল। অনিকের গলায় উত্তেজনা ফুটে ওঠে।
তোদের যার যা ইচ্ছে খাবি। কেন খাওয়াব। সে সব জানার দরকার নেই।
টাকা কোথায় পেলি? গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল সানু।
তাও তোদের জানার দরকার নেই। তোরা শুধু ভাল ভাল খাবার খাবি।
নিশ্চয় বড় কোনো দান মেরেছিস। কাকে ঠকিয়েছিস। বাপকে না মাকে। সানু অনিককে থামিয়ে দিয়ে বলল, ওর বাপকে ঠকায় এমন মানুষ এখনও দুনিয়ায় জন্ম হয়নি।
তুই কি করে জানলে? অনিকের গলায় বিস্ময়।
বাপ্পির সাথে চলতে চলতে জেনেছি।
বাপ্পিও কি তার বাপকে ঠকাতে পারে না।
পারে। মাঝে মধ্যে ধরা খায়। বলে বাপ্পির দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল সানু। ধরা খেলে বাপ্পির কি অবস্থা হয়?
ওর মা জননী আছেন না। বিপদে পড়লে মায়ের কাঁধে ভর দিয়ে শেষ রক্ষা। মায়ের আঁচল হলো শ্রেষ্ঠ আশ্রয়।
বুঝেছি। তোর পন্ডিত গপ্প থামা। এখন বল কোথায় গেলে এ ভর দুপুরে একটা ভাল ভুড়িভোজ হবে। নেতিয়ে পড়া পেটে হাত বুলিয়ে বলল অনিক।
কোন চাইনিজ হোটেলে যাওয়া যেতে পারে। মনে হচ্ছে ওর পকেট বেশ তাজা হয়ে আছে।
আমাকে নিয়ে তোদের গবেষণা শেষ হবে কখন? চোখে মুখে আনন্দের ঝিলিক ফুটিয়ে বলল বাপ্পি।
খাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত চলবে। এখন তুই বল কোথায় যাওয়া যায়। সানু উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে থাকে বাপ্পির দিকে।
আজকে আমার কাছে টাকা কোনো সমস্যা না। তোদের যেখানে ইচ্ছে যেতে পারিস। যার যা ইচ্ছে খেতে পারিস।
তাহলে চল। পেট আর দেরি সইছে না। বলে পেটে আলতু করে কয়েকটা ঘুষি দিল অনিক।
তিন বন্ধু আড্ডা ভেঙ্গে দেয়। তাড়াহুড়া করে ওঠে পড়ে। বাসে চড়ে বসে। শহরের বিখ্যাত কোনো রেস্টুরেন্টে মজা করে খাবে।
অফিস সহকারী এস.এস.সি পরীক্ষার্থীদের টাকা পয়সা ছাত্র ছাত্রীদের সংখ্যার হিসেব হেড স্যারকে বুঝিয়ে দেন। হেড স্যার তালিকায় চোখ বুলিয়ে দেখেন বাপ্পির নাম নেই। সে টেস্ট পরীক্ষায় পাস করেছে। তাহলে বাপ্পির নাম নেই কেন। তিনি বিস্মিত হন। তিনি অফিস সহকারী সাহেবকে জিজ্ঞেস করেন, বাপ্পির নাম তালিকায় নেই কেন?
অফিস সহকারী সাহেব বিনীতভাবে বলেন, স্যার বাপ্পি টাকা জমা দেয় নি।
টাকা জমা দেয় নি কেন?
জানি না স্যার। বলে অফিস সহকারী চলে যান তার কক্ষে। হেড স্যার বাপ্পিকে ডাকেন।
বাপ্পি হেড স্যারের কাছে এসে হাত কচলাতে কচলাতে কাচুমাচু হয়ে বলল, আমায় ডেকেছেন স্যার?
ডেকেছি। তুই এখনও ফরম ফিলাপের ফি জমা দিস নি কেন?
টাকা তো আমি অনেক আগেই জমা দিয়েছি স্যার।
অনেক আগে জমা দিয়েছিস মানে। হেড স্যারের চোখে মুখে বিস্ময় ফুটে ওঠে।
জ্বী স্যার। আমি টাকা জমা দিয়েছি। বাপ্পির গলায় দৃঢ়তা।
হেড স্যার ব্যস্ত গলায় ডাকেন অফিস সহকারী সাহেবকে। ছুটে আসেন অফিস সহকারী হেড স্যারের কক্ষে।
বাপ্পি টাকা জমা দিয়েছে। আপনি বলছেন সে টাকা জমা দেয় নি। হেড স্যারের গলায় রাগের সুর বেজে ওঠে।
না স্যার। বাপ্পি টাকা জমা দেয় নি। বিব্রত ভঙ্গিতে বললেন অফিস সহকারী সাহেব।
বাপ্পি নিশ্চয় টাকা জমা দিয়েছে। আপনি হয়ত জমা করতে ভুলে গেছেন।
বাপ্পি আমাকে কোন টাকা দেয় নি স্যার।
তাহলে কি আপনি বলতে চাচ্ছেন বাপ্পি মিথ্যে বলছে।
সত্য মিথ্যে আমি জানি না। আমি বাপ্পির কোনো টাকা পাই নি।
হেড স্যার পড়েন মহা সংকটে। তিনি তীক্ষè দৃষ্টি ফেলেন বাপ্পির দিকে। হেড স্যার তার দিকে তাকাতেই বাপ্পির গলা শুকিয়ে যায়। বুক কেঁপে ওঠে ধূকধূপ করে। সে মাথা নিচু করে কাঁদু কাঁদু গলায় বলে, স্যার আমি টাকা দিয়েছি সিরাজ স্যারের কাছে।
হেড স্যারের রাগের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। তিনি রেগে আগুন হয়ে বলেন, সিরাজ সাহেবের কাছে টাকা দিয়েছিস। সে কথা আগে বললে কি দোষ হত।
স্যার, ভুল হয়ে গেছে। আমাকে মাপ করে দেন।
এবঃ ষড়ংঃ. দূর হও। হেড স্যারের ধমক খেয়ে বাপ্পি প্রায় দৌড়ে অফিস হতে বের হয়। সে মনে মনে বলে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাচি। হেড স্যার গলায় রাগটা বজায় রেখেই ডাকেন সিরাজ স্যারকে। হেড স্যারের রুমে ঢোকে সিরাজ স্যার বিনীতভাবে বলেন, আমায় ডেকেছেন স্যার।
পরীক্ষার্থীদের ফরম ফিলাপের টাকা আপনি পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আর আমরা এদিকে একে অন্যকে ভুল বুঝে লঙ্কাকান্ড ঘটাচ্ছি। কথাগুলো বলে হেড স্যারের মনের রাগটা কিছুটা শীতল হয়।
বিনয়ী শান্ত স্বভাবের সিরাজ স্যার হেড স্যারের কথার আগাগুড়া কিছুই বুঝতে পারছেন না। তিনি বোবার মত ফ্যাল ফ্যাল চোখে হেড স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন।
হেড স্যার মুচকি হেসে নরম গলায় আবার বললেন, সমস্যা নেই সিরাজ সাহেব। খরচ করে ফেললে বলুন। আমি ব্যবস্থা করে দেব। আপনি আগামী মাসের বেতন পেয়ে ফেরত দিবেন।
আপনি কি বলছেন স্যার। আমি কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না। সিরাজ স্যারের গলায় সংশয়ের সুর শোনা গেল।
কিছুই বুঝতে পারছেন না মানে। হেড স্যারের মন হতে দূর হয়ে যাওয়া রাগটা আবার জেগে ওঠে।
জ্বী-স্যার। আমি আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।
আমি তো উর্দুতে বলছি না। বাংলায় বলছি। হেড স্যার চোখ মুখ কঠিন করে বলেন।
শান্ত স্বভাবের সিরাজ স্যার বুঝতে পারছেন না হেড স্যার কেন তার প্রতি রেগে যাচ্ছেন। তবে তাকে নিয়ে টাকা পয়সার কোন একটা গন্ডগোল বেঁধেছে। এটা তিনি ধরতে পারছেন। তিনি স্বভাবসুলভ বিনয়ী গলায় বললেন, প্লিজ স্যার। আমাকে নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে দয়া করে খোলে বলুন। হেড স্যার সিরাজ স্যারের কথা শুনে তিনি স্বাভাবিক সুরে বলেন, পরীক্ষার্থী বাপ্পি আপনার কাছে ফরম পূরণের ফি জমা রেখেছে। আপনি তা কেরানি সাহেবের কাছে জমা দেন নি। হয়ত ভুলে গেছেন। নয়ত প্রয়োজনে খরচ করে ফেলেছেন। সমস্যা নেই। আমি একটা ব্যবস্থা করে দেব। আপনি শুধু বলুন বাপ্পি আপনার কাছে টাকা জমা দিয়েছে।
হেড স্যারের কথা বুঝতে পেরে সিরাজ স্যার আকাশ থেকে পড়েন। তিনি বিস্মিত গলায় বলেন, বাপ্পি আমার কাছে কোন টাকা রাখেনি।
সৎ, শান্ত বিনয়ী স্বভাবের সিনিয়র শিক্ষক সিরাজ স্যারের জবাব শুনে মহা মুশকিলে পড়েন হেড স্যার। তিনি বিরক্ত সুরে আবার ডাকেন বাপ্পিকে। কঠিন গলায় বাপ্পিকে জিজ্ঞেস করেন, তুই কখন কোথায় সিরাজ সাহেবের কাছে টাকা জমা করেছিস।
গত পরশু বিকেল বেলা। স্কুলে কেরানি স্যারকে পাইনি। সিরাজ স্যারের কাছে টাকা জমা দিয়ে চলে যাই। বলেই বাপ্পি হেচকি তুলে কেঁদে ফেলে। বাপ্পির কথা শুনে সিরাজ স্যারের চোখ মুখ হাত পা পুরো শরীর শক্ত হয়ে যায়। তার সুন্দর ফর্সা চেহারা কঠিন সাদা পাথরের মত ধবধবে সাদা হয়ে যায়। তিনি মুখের চোয়াল খোলে কোন কথা বলতে পারছেন না। অচল মূর্তির মত দেয়ালের দিকে মুখ করে চেয়ারে বসে আছেন।
হেড স্যার সিরাজ স্যারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, এখন আপনার কোন কিছু বলার থাকলে বলুন।
সিরাজ স্যার কোন কথা বললেন না। তিনি ওঠে দাঁড়ান। ঘৃণা এবং ক্রোধের দৃষ্টিতে বাপ্পিকে একবার দেখেন। তারপর দ্রুত বেগে হেড স্যারের রুম হতে বের হয়ে পড়েন। তিনি স্টাফ রুমে না বসে সোজা বাড়ি যান। কিছুক্ষণ পর ফিরে আসেন। বাপ্পির ফরম পূরণের ফি জমা দেন। রহস্যেঘেরা ব্যাপারটা নিয়ে হেড স্যার আর বাড়াবাড়ি করলেন না। সিরাজ স্যার বাজার খরচ ও চালের বস্তা কেনার শেষ সম্বল দিয়ে দেন। হাত খালি। শূন্য পকেটে সিরাজ স্যার চুপ হয়ে গেলেন। কোন ছাত্র তার উপর এমন মিথ্যে কথা বলতে পারে। তিনি তা কল্পনা করে কিনারা করতে পারছেন না। সহকর্মীরা শুনলে কানাকানি হাসাহাসি করতে পারে। এ লজ্জায় তিনি প্রতিবাদী না হয়ে নিরব হয়ে যান।
তার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের পরতে পরতে রয়েছে কর্তব্য নিষ্ঠা আর সততার ছোঁয়া। তিল তিল করে নিজেকে তৈরি করেছেন একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে। সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একটি সুউচ্চ সম্মানের আসন। তিনি এসব অর্জনের উপর কালো কালির ছিটা পড়তে দিতে পারেন না। কিন্তু বাপ্পির ব্যাপারে তার মনের ভেতরে একটা কষ্টের কাঁটা গেথে যায়।
আজ ১লা ফেব্রুয়ারি। এসএসসি পরীক্ষার প্রথম দিন। বাপ্পির বাবা কৃপণ হলেও ছেলের লেখাপড়ার খরচের ব্যাপারে তার হাতখোলা। তিনি বাপ্পিকে পরীক্ষার কেন্দ্রে যথাসময়ে যাতায়াতের জন্যে কার ভাড়া করে দেন। বাপ্পি কারে চড়ে একাই পরীক্ষা হলে রওয়ানা হয়। সে পেছনের সিটে বসা। চালক স্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে। রাস্তার পশ্চিম পাশে পাইছা বিল। বিলের বুক জুড়ে কচি ধান গাছ। সবুজ রঙে সেজেছে ধান গাছগুলো। মাঘ মাসের ঠান্ডা শীতের বাতাস। বাতাসে সবুজ মাঠ নাচের ঢেউ খেলছে। কয়েকটি সাদা বক উড়ছে। একটি বকের দুই ঠোঁটের মাঝখানে সাদা রঙের একটা মাছ নড়ছে। এ বছর মাঘ মাসের মাঝামাঝিতে পাইছা বিল শুকিয়ে গেছে। কোথাও একটু পানি নেই। রাস্তার পাশের ছোট ছোট গর্তগুলোতে কাদা। কোনো কোনো গর্তে কাদা মাখানো। একটু-আধটু পানি। কারের কাচের জানালা খোলা। বাপ্পি উদাস চোখে বিলের দিকে তাকিয়ে আছে।
গাড়ি রাস্তার মোড় ঘুরতে গিয়ে ধপ করে দরজা খোলে যায়। চালক শক্ত করে ব্রেক কষে। দরজার পাশে বসা বাপ্পি। সে গাড়ি হতে ছিটকে পড়ে যায় রাস্তার কিনারে। গড়িয়ে ডিগবাজি খেয়ে সে পড়ে যায় বিলের গর্তের কাদায়। তার সারা শরীর কাদামাটিতে লেপটে যায়। হাতে ধরা এডমিট কার্ড, রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও কলম কাদা মাটিতে দেবে যায়। অবশ্য তার শরীরের কোথাও তেমন কোনো আঘাত লাগেনি। ড্রাইভার গাড়ি হতে নেমে দ্রুত তাকে তুলে আনে। তার গায়ের শার্ট প্যান্ট কাদামাটি লেগে ভারি হয়ে গেছে। তার হাত পা চোখ মুখ মাথায় শুধু কাদামাটি। কাদামাটি ধোয়ার এতোটুকু পানি বিলের কোথাও নেই।
বাপ্পি এখন কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। সময় দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছে। অনেকগুলো সিএনজি পরীক্ষার্থী নিয়ে দ্রুত পার হয়ে গেল। কেউ তার দিকে ফিরেও তাকালো না। তার কেন এমন অঘটন ঘটনা ঘটল। হঠাৎ তার মনে হলো সিরাজ স্যারের কথা। পরীক্ষার ফরম ফিলাপের টাকায় বন্ধুদের নিয়ে দুষ্টুমি করতে করতে হোটেলে মজা করে খেল। মিথ্যে দোষ দিল সিরাজ স্যারকে। বাপ্পি বুঝে ফেলে এ নিশ্চয় সিরাজ স্যারের অভিশাপ। সে আপন মনে চিৎকার করে বলে ওঠে। এহলো আমার উপর সিরাজ স্যারের অভিশাপ। অভিশাপ। অভিশাপ।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT