উপ সম্পাদকীয়

বিশ্ব নেতৃত্বে হ্রাস পাচ্ছে মার্কিন দাপট

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৪-২০১৮ ইং ০১:৪৩:০৫ | সংবাদটি ১৪ বার পঠিত

এক সময় ভাবা হতো, আমেরিকা মানেই বিশ্বের নিয়ন্তা। বিশ্বের শাসক। প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে প্রায় পৃথিবীর সব রাষ্ট্রকেই সেই শাসন মেনে চলতে হতো। নতুবা আগ্রাসনের শিকার হতে হতো সেই রাষ্ট্রকে। ইরাক, লিবিয়া ও আফগানিস্তান তার জ্বলন্ত উদাহরণ। অবশ্য সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চিন ছিল তার ব্যতিক্রম। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব-রাজনীতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ধর্মীয় বিদ্বেষ ও বিশ্ব ভুল নীতির জন্য আমেরিকা বিশ্বজনীন অবস্থা থেকে ক্রমে খসে পড়ছে। প্রতিটি মুহুর্তে আমেরিকার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, মুক্ত সংস্কুতি, ঐতিহ্য ও বিশ্ব-নেতৃত্ব ভূলুন্ঠিত হচ্ছে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে আসা, ইরান ও বিশ্বের ছয় শক্তিধর রাষ্ট্রের সঙ্গে পরমাণু সমঝোতা চুক্তি থেকে হঠাৎ ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে ছিন্ন করা, আর্ন্তজাতিক আইনকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্ব-বিবেককে চেপে ধরে পূর্ব জেরুজালেমকে ইজরায়েলের একতরফা রাজধানী ঘোষণা, গোটা বিশ্বের কোটি কোটি শান্তিকামী মানুষের প্রতিবাদকে পাত্তা না দেওয়া ইত্যাদি অবাঞ্চিত ঘটনা আমেরিকাকে ক্রমে বিশ্বের কাছ থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। অতি ঘনিষ্ঠ ন্যাটোভুক্ত অনেক বন্ধুরাষ্ট্রও আমেরিকার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। জাতিসংঘ ছাড়াও জেরুজালেম ইস্যুতে পাশে নেই আরব লিগ, ওআইসি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বিশ্ব সংগঠনও। ছোট্ট একটি রাষ্ট্র উত্তর কোরিয়াও আমেরিকাকে গুড়িঁয়ে দেওয়ার বারবার হুমকি দিচ্ছে। ইরানও আমেরিকার হুমকি ফুৎকারে উড়িয়ে দিচ্ছে। রাশিয়া ও চিন তো আমেরিকার নিয়ন্ত্রনের বাইরে। পাকিস্তানও নিজ ভুখন্ডে আমেরিকার দাদাগিরি মানবে না বলে হুমকি দিয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বজুড়ে আমেরিকার প্রভাব প্রতিপত্তি হ্রাস পাচ্ছে। আমেরিকা ক্রমশ দূর্বল হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে আমেরিকার প্রভাব-প্রতিপত্তি ও আধিপত্য খর্ব হচ্ছে। এই প্রভাব ও শক্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে না। শত ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকা সত্তেও দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকা ছিল বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রেখেছিল। এবার ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প সবার আগে আমেরিকা‘কে স্থান দেওয়ার নামে যা করেছেন, তাতে আমেরিকা আরও দূর্বল হয়ে পড়ছে। কূটনৈতিক বিশ্বে আমেরিকা কোণঠাসা হয়ে পড়ছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর অনেকে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, মার্কিন বিদেশনীতির বিপর্যয় ঘটবে। কথাটা বহুলাংশে সত্য। তিনি প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে আমেরিকাকে প্রত্যাহার করে নিয়ে সবাইকে হতাশ করেছেন। ট্রাম্প-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ পরিত্যগ করেছেন। ন্যাটো ত্যাগ না করলেও আগের মতো এ জোট নিয়ে উচ্চকন্ঠ নয় আমেরিকা। যুদ্ধ শুরু না করলেও আফগানিস্তানে সৈন্যসংখ্যা বাড়িয়েছেন। তাঁর কথাবার্তায় মনে হচ্ছে, তিনি আমেরিকার পেশিশক্তি প্রদর্শনের আশ্রয় নেবেন এবং সেই শক্তিকে এমনভাবে হাজির করবেন, যাতে উত্তর কোরিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো ভেঙে পড়ে। একদা তিনি হুমকি দিয়েছিলেন, তাইওয়ান প্রশ্নে চীনের সঙ্গে তিনি একটা দফারফা করে ছাড়বেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল উত্তর কোরিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে তিনি চীনকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাজি করিয়েছেন। তিনি মনে করেন, ইতিহাস থেকে তাঁর শিক্ষার নেওয়ার কিছুই নেই। পুতিন ও জি জিনপিঙের মতো লৌহমানবদের তাঁর পছন্দ। জেনারেলদের তিনি পছন্দ করেন। তবে কূটনৈতিকদের প্রতি তাঁর একটা তাচ্ছিল্যভাব আছে। বিদেশ দফতর থেকে অনেক অভিজ্ঞ রাষ্ট্রদূত বিদায় নিয়েছেন। আমেরিকার শক্তির প্রধান দু‘টি উৎস হলো ভয়-ভীতি প্রদর্শন ও অনুপ্রেরণা সৃষ্টির ক্ষমতা। ট্রাম্পের আমলে প্রথম ক্ষমতাটি এখনও আছে বটে, তবে দ্বিতীয় ক্ষমতাটি মারাত্মকভাবে লোপ পেয়েছে। ন্যাটোকে বলিষ্ট সমর্থন দিতে না পারা, প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা, উত্তর কোরিয়াকে যুদ্ধংদেহি হুমকি প্রদর্শন করা এবং দেশটিকে এমন রুদ্ররোষ নিয়ে আঘাত করা হবে যা বিশ্ববাসী আগে কখনও দেখেনি- এমন উক্তি করার মধ্যে দিয়ে ট্রাম্প আসলে আর্ন্তজাতিক পরিমন্ডলে আমেরিকার মর্যাদা যথেষ্ট খর্ব করে ফেলেছেন। বিশেষ করে বর্তমান সময়কার সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যু জলবায়ু প্রশ্নে তাঁর ভুমিকা আমেরিকাকে একঘরে করার পথে ঠেলে দিয়েছে। এমনকী জলবায়ুর পরিবর্তনকেও তিনি আবহাওয়ার পরিবর্তন বলেও কটাক্ষ করেন।
আরব লিগ, ওআইসি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘের মতামতকে অগ্রাহ্য করে জেরুজালেম সম্পর্কে ট্রাম্পের অনড় অবস্থান আমেরিকার আর্ন্তজাতিক ভাবমূতিকে ধূলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। ওবামার আমলে এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, ২৫-৩০ শতাংশ ইউরোপীয় মনে করেন যে আমেরিকার শক্তি হ্রাস পাচ্ছে। এখন ট্রাম্পের আমলে ৫২ শতাংশ ইউরোপীয় তা-ই মনে করেন। যুক্তরাষ্ট্রক বিশ্বের এক নম্বরের অর্থনৈতিক শক্তি বলে মনে করে অতি সামান্য সংখ্যক দেশ। আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার ব্যাপারে বিশ্বের প্রায় ৭৫ শতাংশই ট্রাম্পের ওপর অনাস্থা প্রকাশ করেছেন। তা থেকে অনেকেই ইতিমধ্যে যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, সেটাই সত্য বলে প্রমানিত হলো, ট্রাম্প আমেরিকার মৌলিক স্বার্থকে রক্ষা করতে বা এগিয়ে নিতে অনিচ্ছুক বা ব্যর্থ।
মধ্যপ্রাচ্যে কিছু কিছু উপসাগরীয় আরব দেশের সঙ্গে মর্কিন সম্পর্ক চাপের মুখে পড়েছে। অন্যদিকে, সন্ত্রাস দমনের নামে কান্ডজ্ঞানহীন যুদ্ধ চালাতে গিয়ে আমেরিকার সম্পদের বিশাল অপচয় ঘটেছে। এসব চাপকে বাড়িয়ে তুলে আমেরিকার আধিপত্যের প্রতি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নবোত্থিত চীন। এই চীন এখন আমেরিকার গড়া বিশ্বব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে উদ্যোগ নিয়েছে। সামরিক শক্তির দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনও চীনের ওপরেই রয়েছে এবং সেই শক্তি রাতারাতি উছে যাবে তেমন হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। তবে যুদ্ধেও নতুন নতুন পরিমন্ডলে চীন আমেরিকার প্রাধান্যকে চ্যালেঞ্জ করার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। একবিংশ শতকে চীনের অগ্রগতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ক্ষেত্র হবে সাইবার স্পেস এবং মহাশূন্য অভিযান। আমেরিকা যখন ঘরে-বাইরে নিজের সমস্যা মোকাবিলায় ব্যস্ত, চীন তখন ইউরেশিয়া ও আফ্রিকাকে নয়া সিল্ক রোড দিয়ে যুক্ত করে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রচার ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রবল প্রতাপে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধর্মীয় বিদ্বেষ অপরিণামদর্শিতা ও কান্ডজ্ঞানহীনতার জন্য আমেরিকার বিশ্ব-নেতৃত্ব হাতছাড়া হতে পারে। ইতিমধ্যে যার অশনি সংকেত দেখা যাচ্ছে। শুধু কি চীন? রাশিয়া এবং ইরানও ইদানীং আমেরিকার আধিপত্যের প্রতি ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। আর সেটা আমেরিকার ভুল পদক্ষেপের কারণে। ট্রাম্প দেখেছেন চীনকে মোকাবিলা করা বেশ জটিল। রাশিয়াকেও তাই। সে কারণে শত্রুর পরিধিটা সঙ্কীর্ণ করে তিনি একটিতে নিয়ে এসেছেন এবং সেটা ইরান। এজন্য তিনি সৌদি আরবকে উসকে দিয়েছেন লেবাননে গোলমাল পাকাতে যাতে সেখানে ইরানের প্রক্সি হিজবুল্লাকে পর্যদস্ত করা যায়। কিন্তু ইরানের পেছনে রাশিয়া আছে। কাজেই ট্রাম্প যা চাইছেন, তাতে চূড়ান্ত বিশ্লেষণে এখানেও তাঁকে মার খেতে হবে। ইরানও শেষ পর্যন্ত বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে আমেরিকার। ট্রাম্পের আমলে ন্যাটোর ওপর রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে এই জোট দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রশান্ত মহাসাগর তীরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত দেশগুলো একে একে ওয়াশিংটনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তারা ঝুঁকে পড়ছে চীনের দিকে। ইউরেশিয়া ভূখন্ডে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ যত কমছে,ততই বাড়ছে চীনের নিয়ন্ত্রণ। অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও ভূ-রাজনৈতিক তথ্যপাতি থেকে এই ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, বিশ্বশক্তি হিসাবে আমেরিকার সব নেতিবাচক প্রবণতা ২০২০ সাল নাগাদ দ্রুত ও ব্যাপক আকারে বেড়ে যাবে এবং ২০৩০ নাগাদ সঙ্কটজনক অবস্থায় পৌঁছতে পারে।
বর্তমানে অস্থিরমতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের দৃষ্টি মধ্যপ্রাচ্যেই নিবন্ধ। সুন্নিপন্থী রাষ্ট্রগুলোকে শিয়াপন্থী রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিচ্ছেন। একটা যুদ্ধ বাঁধাতে চাইছেন। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ১৯৮০ সাল থেকে জাতিসংঘে বিচারাধীন পূর্ব জেরুজালেমকে ইজরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করে গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে রক্তাক্ত ও অস্থির করে তুলেছেন। গোটা বিশ্ব তার প্রতিবাদ জানালেও কোনও পাত্তাই দিচ্ছেন না ট্রাম্প। ফলে বিশ্ব-নেতৃত্বে আমেরিকা ক্রমশ ব্যাকফুট চলে যাচ্ছে।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT