উপ সম্পাদকীয়

আপন ভুবন, অচেনা আকাশ

প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৪-২০১৮ ইং ০১:৪৫:৩৮ | সংবাদটি ৬১ বার পঠিত

দীর্ঘ পথের পাঞ্জাব অংশ জুড়ে পথের দু’ধারে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ শস্যের মাঠ। মাঠগুলোতে একই ডিজাইনের অসংখ্য সেচঘর। সবগুলোতেই বিদ্যুৎ-সংযোগ দেয়া। মাইলের পর মাইল বিদ্যুতের খুঁটি ও ছোট ছোট সেচঘর দাঁড়িয়ে আছে এক লাইনে। একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও শৃঙ্খলার ছোঁয়া লক্ষণীয় মাঠে-ময়দানে। জমির আকৃতি দেখে বোঝা যায় ওগুলো বহুধাবিভক্ত নয়। যান্ত্রিক পদ্ধতিতে চাষবাস চলছে জোরে-শোরে। মহাসড়ক থেকে দূরে দূরে ছবির মত গ্রাম। রাস্তার পাশ ঘেঁষে কোথাও কোন গ্রাম বা রাস্তার ওপরে বেআইনী হাটবাজার নজরে পড়ল না। গবাদি পশু, পথচারী লোকজনও নেই বললেই চলে। পূর্ব পাকিস্তানে যা এক অপরিহার্য দৃশ্য। এটা ছিল আজ থেকে প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে পাঞ্জাবের গ্রাম ও তার কৃষি ব্যবস্থার চিত্র।
পথে দুই তিনটি উল্লেখযোগ্য স্থান দেখার জন্য যাত্রাবিরতি করতে হয়েছিল : ওয়াহ্ অস্ত্র নির্মাণ কারখানা, তক্ষশিলা পুরাকীর্তি জাদুঘর ও মংলা বাঁধ। অস্ত্র নির্মাণ কারখানা বা অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি সম্বন্ধে আমাদের কোন ধারণাই ছিল না। ওয়াহ্ ফ্যাক্টরি দেখে তো আমার চক্ষু চড়কগাছ। এই বিশাল কারখানাটি কৌশলগত কারণে মহাসড়ক থেকে অনেক দূরে অপেক্ষাকৃত নির্জন স্থানে চারদিকে নিরাপত্তা বেষ্টনী নিশ্চিত করে নির্মাণ করা হয়েছে। এটি না দেখলে ধারণা করা যায় না, মানুষ মারার জন্য কত কোটি টাকা ব্যয় করে প্রতিনিয়ত কত কোটি ‘পিস্’ গোলাবারুদ উৎপাদন করা হচ্ছে এখানে। আর মুহূর্তের মধ্যে আমার মাথায় এক অদ্ভুত চিন্তা খেলে গেল : ওয়াহ্ তো পৃথিবীর একমাত্র গোলাবারুদ উৎপাদনকারী কারখানা নয়; এ রকম এবং এর চেয়ে অনেক উন্নত মানের, অনেক বড় আরও কত শত শত অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি রয়েছে পৃথিবীতে। মানুষই এগুলো স্থাপন করেছে, এবং তা করেছে তারই মত মানুষ নামক আরেকটি জীবকে হত্যা করার জন্য। এর ভেতর হাস্যকর যে বৈপরীত্য রয়েছে তা হল, ওই মানুষকেই লালন-পালনের জন্য, আপদে-বিপদে রক্ষা করার জন্য কখনও কখনও সে নিজের জীবনও দান করতে কুষ্ঠাবোধ করে না। মানুষের সেই স্বর্গীয় সুকুমার বৃত্তিগুলোকে বন্দুক উচিয়ে তাড়িয়ে দিতে দ্রুত পৃথিবীটাকে দখল করছে হিংসা, জিঘাংসা। বিদ্যালয় ও হাসপাতালের জন্য নির্ধারিত স্থানে গড়ে উঠছে অস্ত্রাগার। অস্ত্রের এই বিস্তার, শক্তিমানের এই আগ্রাসন সারাজীবন আমাকে যন্ত্রণায় দগ্ধ করেছে, আজও করে। বহুকাল পর আশির দশকে ‘কিছু শব্দের জন্য প্রার্থনা’ শীর্ষক কবিতায় আমি এই দুঃসহ জ্বালার কথা প্রকাশ করেছিলাম এইভাবে : আমাকে কিছু শব্দ দাও ... / আমি একটি নতুন ক্ষেপণাস্ত্র বানাতে চাই / যা পৃথিবীর সব অস্ত্রাগারকে / নিমিষে শস্যাগারে পরিণত করবে ...। দুপুরের ঝাঁ ঝাঁ রোধে শরীর যতটুকু না পুড়ল, ওয়াহ্ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি দেখে তার চেয়ে বেশি পুড়ল মন।
আর উল্টো অনুভূতি হল তক্ষশিলার মিউজিয়াম দেখে। অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি যদি হয় ধ্বংসের বীজ উৎপাদনের কারখানা, তক্ষশিলার জাদুঘর তা হলে যা কিছু সুন্দর, যা কিছু শ্বাশ্বত তাকে নিজ সৃষ্টির ভেতর দিয়ে প্রকাশ করে কালাতীত রূপ প্রদানের মানুষের ঐশ্বরিক প্রয়াস। বন্দুকের একটি ছোট্ট গুলি সংহারের প্রতিভূ; একটি মৃৎপাত্রের গায়ে সযতেœ আঁকা একটি নকশা কিংবা গৌতম বুদ্ধের নির্মীলিত নয়নে সমাহিত প্রশান্তি শুধু হাজার বছর আগের কোন নিমগ্ন শিল্পীকেই স্মরণ করিয়ে দেয় না, সৃষ্টির কথা, জীবনের কথাও মনে করিয়ে দেয়। ময়েনজোদাড়ো, ময়নামতি, হরপ্পা, তক্ষশিলা, পাহাড়পুর-সবখানেই আমি জীবনকে ভালবাসার গানই শুনেছি। একই গান শোনা যায় অজন্তা, ইলোরায়-জীবনকে ভালবেসে সেই ভালবাসার ছবি মানুষ পর্বতগাত্রে, গুহাচিত্রে, তৈজষপত্রে এঁকে রেখেছে। অনাদি অতীত থেকে সেই ছবি অনন্তকাল ধরে সাক্ষী হয়ে আছে যা কিছু সুন্দর, যা কিছু সত্য, যা কিছু পবিত্র, তার।
পাকিস্তান পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, কুমিল্লার আদলে পেশাওয়ারেও একটা একাডেমি স্থাপন করেছিল পাকিস্তান সরকার। কিন্তু সেটা কুমিল্লা একাডেমির ধারে-কাছেও ছিল না। এর প্রধান কারণ ছিল, সঠিক নেতৃত্বের অভাব। কুমিল্লা একাডেমি বলা যায় এর স্বপ্নদ্রষ্টা আখতার হামিদ খানের একক প্রচেষ্টার ফসল। গ্রাম বাংলার সার্বিক উন্নয়নের জন্য আখতার হামিদ খান কৃষি-সমবায়-সেচ ব্যবস্থা-যাতায়াত-স্থানীয় সরকার ইত্যাদি সব খাতকে সম্পৃক্ত করে একটি সমন্বিত কর্মসূচী আইউব সরকারকে দিয়ে অনুমোদন করিয়ে নিয়েছিলেন। আর এই বিশাল কর্মকান্ডে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আখতার হামিদ তাঁর এই প্রোগ্রাম পরীক্ষামূলকভাবে প্রথমে শুরু করেছিলেন কুমিল্লা জেলার কোতোয়ালি থানায়। পরবর্তীতে এর সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে কুমিল্লা জেলার অন্যান্য থানায়ও এটা ছড়িয়ে দেয়া হয়।
আখতার হামিদ খান জীবনের শুরুতে ছিলেন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস (আইসিএস)-এর একজন অফিসার। পরে ওই মোহনীয় চাকরি ছেড়ে ১৯৫০-এর দশকে তিনি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষের চাকরি নেন। আইসিএস অফিসারের স্যুট-টাইকে চিরতরে বিদায় দিয়ে ভারতের উত্তর প্রদেশের এই দীর্ঘদেহী সুপুরুষ কর্মযোগী পরতে শুরু করলেন কুমিল্লার খাদি কাপড়ের পায়জামা-পাঞ্জাবি। তিনি ছিলেন এক সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ। সেই আইসিএস-এর দিনগুলো থেকেই তাঁর চিন্তা-চেতনায় ছিল সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন। বিশেষ করে, বাংলার কৃষকের। পল্লী-উন্নয়নের জন্য তিনি যে রূপরেখা দিয়েছিলেন ওটাই উন্নয়ন অর্থনীতিতে কুমিল্লা মডেল বা কুমিল্লা এ্যাপ্রোচ নামে পরিচিত।
পশ্চিম পাকিস্তানে এমন একজন আখতার হামিদ খান পাওয়া সহজ ছিল না। আর ওরকম চিন্তা-চেতনা, মেধা, উদ্যোগ-উদ্যম, সর্বোপরি আত্মনিবেদন, ক’জনেরই বা আছে। ফলে পেশাওয়ার একাডেমি চালু হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তা কেবল নামকা ওয়াস্তে বলা যায়। কাজকর্ম কিছুই ছিল না। এর প্রধান ছিলেন জনাব মাসুদ নামের একজন বলিষ্ঠ সিএসপি অফিসার। আখতার হামিদ সাহেবের মত তিনিও ছিলেন খদ্দর পরিহিত এবং বোধ করি, তাঁর ভাবশিষ্যও।
পেশাওয়ারে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল পল্লী উন্নয়ন একাডেমিতে। একমাত্র মাসুদ সাহেবের একটা ব্রিফিং-বক্তৃতা শোনা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না ওখানে। তবে হ্যাঁ, ওই ঐতিহাসিক শহর, শহরের মানুষ, তাদের পোশাক-আশাক, কথাবার্তা, চলাফেরা, সবই ছিল দারুণ বৈচিত্রপূর্ণ। পুরুষদের প্রায় সকলের হাতে বন্দুক বা রাইফেল, পরনে ঢোলা সালওয়ার-কুর্তা, ওয়েইস্ট কোট, তার ওপর ক্রস বেল্টে গাঁথা অসংখ্য গুলি। কারও কারও কোমরে গোঁজা পিস্তল বা রিভলবার। শিরোভূষণ সূচীশিল্পসমৃদ্ধ গোল টুপি। একটু মর্যাদাবানদের পাগড়ি। শহরের প্রধান যানবাহন ঘোড়ার গাড়ি, স্থানীয় ভাষায় টাঙ্গা। আর প্রধান আকর্ষণ ঐতিহাসপ্রসিদ্ধ কিস্সাখান বাজার। বাংলায় তরজমা করে বলা যায় গল্প বলার বাজার। আর চোখে পড়ার মত দৃশ্য, রাস্তার পাশে চুলা জ্বালিয়ে চাপলি কাবাব, হান্ডি কাবাব ইত্যাদি বানিয়ে বিক্রি করার ধুম। কাঁচা গোশতের তেল-মশলাবিহীন দুর্লভ স্বাদের হান্ডি কাবাব ওই চুলার পাশে বসেই পাঠানরা প্লেটের পর প্লেট নামিয়ে দিচ্ছে গলা দিয়ে। আমার এক বাঙালি বন্ধু বাহাদুরি দেখানোর লোভ সামলাতে না পেরে বোধ হয় একটু বেশিই খেয়ে ফেলেছিল ওই মোটামুটি আদিম প্রক্রিয়ায় প্রস্তুতকৃত খাদ্যবস্তুটি। এর ফল সে পেয়েছিল ‘পেটে-পেটে’। পরদিন খাইবার পাসের ভেতর দিয়ে লন্ডিকোটাল যাওয়ার সময় পথিমধ্যে তার পাকস্থলীকে নির্ভার করার জন্য বাস থামাতে হয়েছিল অনির্ধারিত স্টপেজে।
পেশাওয়ার থেকে বাসে করে আমরা যাচ্ছিলাম লান্ডিকোটাল। শহর ছাড়িয়ে কিছুদূর যেতে না যেতেই শুরু হল গাছপালাহীন উচু উচু পাহাড়শ্রেণী। ক্ষেত-গেরস্তি তো দূরের কথা, কোন লোকালয়ও চোখে পড়ে না কোথাও। ওই উষল পাষাণের বুকে এখানে-সেখানে ছোট ছোট লতাগুল্ম এবং সেগুলো পরম ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের সঙ্গে সেবা করছে কিছু কিছু ছাগল-ভেড়া। দুই পহাড়ের মাঝখানের উপত্যকাটুকুতে ক’টি জরাজীর্ণ তাঁবু গেড়ে বসবাসের ক্ষীণ প্রয়াস মনুষ্য পদবাচ্যসর্বস্ব গরীব স্বগরীর মুষ্টিমেয় কিছু যাযাবর পাঠান পুঙ্গবের। যাইবার গিরিপথের উঁচুনিচু আঁকাবাঁকা পথ, পথের দু’ধারের গভীর খাত, দিগন্ত বিস্তৃত কঙ্করাবৃত টিলা-টক্কর এবং মাথার ওপর গনগনে সূর্যের তাপে দগ্ধপ্রায় নিঃসীম নীলিমা-এর বাইরে পৃথিবী বলে আর কিছু আছে কিনা জানা নেই ওখানেই জন্ম ওখানেই মৃত্যু, নিয়তির এই অমোঘ নিগড়ে আবদ্ধ প্রকৃতির এইসব আদিম সন্তানের। এমন কি, খাবার পানিটুকুও মাথায় করে পাঠান নারীকে আনতে হয় মাইল কয়েক দূরের কোন ঝর্ণা থেকে। একটা খচ্চর যদি থাকে ভাল, তাকে কাজে লাগানো যায় পানি আনতে, মোট বইতে। হঠাৎ দূরে কোন পাহাড়ের খোঁড়লেও লক্ষ্য করা যায় গুহাবাসী পাঠান। কী বিচিত্র জীবন। আশা নেই, স্বপ্ন নেই, বৈচিত্র্য নেই, নেই কোন পরিবর্তনের ইচ্ছা। দু’বেলা দু’টো মাখাই (ভুট্টা)-এর মোটা রুটি, ঘরাভর্তি ছাগদুগ্ধ অথবা লাচ্ছি, ঘরে তোলা একটু মাখন, দুরের কোন জনপদে গিয়ে মরদের রোজগার করে পাওয়া পয়সার দু’টো আপেল, এক থোকা আঙুর, আর পায়-পরবে একটু ছাগল-ভেড়া বা দুম্বার মাংস-এই তো জীবন। এরই ভেতর নিত্যসঙ্গী গোত্রে গোত্রে মর্যাদার লড়াই-কখনও বা আধিপত্য নিয়ে, কখনও তুচ্ছ বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক থেকে, আবার কখনও বা লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে পাঠান রমণী। লড়াই শেষে এদিকে দু’টি লাশ, ওদিকে তিনটি। ও কিছু না। পরের বার ওদেরকে নির্বংশ করে ছাড়ব। হিসাবটা এখানে অতি সরল : তুমি আমার দোস্ত, তোমার জন্য আমি জীবন দেব। তুমি আমার দুশমন, তোমার জীবন না নিয়ে ছাড়ব না আমি। এখানে সম্পর্ক মাত্র দু’টি : দোস্ত আউর দুশমন।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • প্রাথমিক শিক্ষার গবেষণাধর্মী বই
  • কেমন মেয়র চাই
  • সেলফি ব্রীজ
  • সেলফি ব্রীজ
  • সেলফি ব্রীজ
  • প্লাস্টিকের ভয়াল থাবা
  • আব্দুল¬াহ আল মাহবুবশিক্ষার্থীর বিকাশে পরিবারের ভুমিকা
  • আজকের দিন আজকের দিকে তাকাও
  • সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম নেয়া হোক
  • সিলেটের ডাক
  • নারীর প্রতি সহিংসতা প্রসঙ্গে
  • সিলেটের ডাকের শিশুমেলা
  • সবুজ প্রবৃদ্ধির কৌশল : পরিবেশ-প্রতিবেশ
  • এরদোগানের শাসনে তুরস্কের ভবিষ্যৎ
  • বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান এবং নদী রÿার্থে করণীয়
  • পয়ত্রিশ বছরে সিলেটের ডাক
  • আমরা কি কেবল দর্শক হয়েই থাকব?
  • কাবিনবিহীন বিয়ে, প্রতারণা ও আমাদের আইন
  • স্মার্টফোনে বন্দি জীবন
  • দৃষ্টিপাত নেশার নাম ড্যান্ডি!
  • Developed by: Sparkle IT