ধর্ম ও জীবন

কোরআনই সর্বোত্তম নিরাময়

মুন্সি আব্দুল কাদির প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৪-২০১৮ ইং ০১:৫৫:৪৫ | সংবাদটি ১৭২ বার পঠিত

আল্লাহ তায়ালা কালামে হাকিমে বলেন, আমি কোরআনের যা নাযিল করি তা হচ্ছে মুমিনদের জন্য (সমস্ত রোগের) উপশমকারী ও রহমত, কিন্তু (এ সত্ত্বেও) জালিমদের জন্য তা ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করে না। সুরা বনী ইসরাইল আয়াত- ৮২।
তিনি আরোও বলেন, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি আমাকে চলার পথ দেখান। তিনি আমাকে আহার্য দেন। তিনিই আমার পানীয় যোগান। আর আমি যখন রোগাক্রান্ত হই তিনিই আমাকে শিফা দান করেন। তিনিই আমার মৃত্যু ঘটাবেন, তিনিই আবার পুনরায় আমার জীবন দান করবেন। শেষ বিচারের দিন তাঁর নিকট আমি এই আশাই করব যে তিনি আমার সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন। সুরা শুয়ারা আয়াত ৭৮-৮২।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের স্রষ্টা, মালিক, সাহায্যকারী, সর্বোত্তম অভিভাবক। তিনি আমাদের প্রয়োজনে সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। জলে স্থলের সব কিছু সৃষ্টি করে আমাদের অধীন করে দিয়েছেন। তিনি প্রিয় বান্দাদের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ আর পাপীদের জন্য শাস্তি বা সতর্কতা হিসেবে অসুখ বিসুখ বা বিপদাপদ দিয়ে থাকেন।
আমরা যখন রোগাক্রান্ত হই। তখন আমরা প্রথমেই ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হই। চিকিৎসা গ্রহণ করি। ঔষধ সেবন করি। রাসুল (সা.) নিজে চিকিৎসা করাতেন, পরিবার পরিজনদের বা সাহাবাদের কেউ অসুস্থ হলে তার চিকিৎসার নির্দেশ দিতেন। যাদুল মায়াদে মুসনাদে আহমাদের সূত্রে উসামা ইবনে শারিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি রাসুল (সা.) এর নিকট ছিলাম, বেদুইনরা রাসুল (সা.) কে জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসুল, আমরা কি ঔষধপত্র ব্যবহার করব? তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ। হে আল্লাহর বান্দাগন, চিকিৎসা কর। কেননা বার্ধক্য রোগ ব্যতিত আল্লাহ তায়ালা এমন কোন রোগ সৃষ্টি করেন নাই, যার নিরাময় সৃষ্টি করেননি। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা এমন কোন রোগ নাযিল করেননি, যার ঔষধ তৈরী করেননি।
আবার তিনি রোগ থেকে মুক্তি পেতে কোরআনের দ্বারস্থ হতে নির্দেশ দিতেন। ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, তোমরা যাবতীয় রোগ ব্যাধির নিরাময়ের জন্য দুটো জিনিসকে আকড়ে ধর- মধু এবং কোরআন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে আরো বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, কোন সম্প্রদায় আল্লাহর ঘরসমূহের কোন ঘরে একত্রিত হয়ে কোরআন তেলাওয়াত করলে এবং পরস্পর কোরআন চর্চা করলে তাদের উপর আসমান থেকে প্রশান্তি নেমে আসে। আল্লাহর রহমত তাদেরকে ঢেকে ফেলে, ফেরেসতারা তাদেরকে ঘিরে রাখে, আর আল্লাহ তায়ালার নিকট যারা রয়েছে, তাদের মাঝে এদেরকে নিয়ে আলোচনা করেন। সহিহ মুসলিম।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, যারা ইমানদার তাদের জন্য এটি (আল কোরআন) একটি পথ নির্দেশিকা এবং আরোগ্যদানকারী (নিরাময়)। সুরা ফুসসিলাত আয়াত ৪৪।
হে মানব জাতি, তোমাদের কাছে নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে এক হিতোপদেশ এসেছে যা অন্তর ব্যধির জন্য আরোগ্য বিধান আর বিশ্বাসীদের জন্য পথনির্দেশিকা ও রহমত। সুরা ইউনুস আয়াত ৫৭।
কোরআন আমাদের জন্য হেদায়েত, সত্য মিথ্যার পার্থক্যকারী। আমাদের জন্য পক্ষে অথবা বিপক্ষের দলিল। আমাদের দৈহিক ও আত্মিক রোগের মহৌষধ। কোরআনুল কারীম তেলাওয়াত করলে যেমন সওয়াব হয়, ইহা নফল ইবাদতের মধ্যে সর্বোত্তম তেমনি আমাদের সমস্ত রোগের প্রতিশেধক হিসেবেও এই কোরআন অতুলনীয়।
আল্লাহতায়ালা আয়াতে কারীমায় উল্লেখ করেছেন কোরআন হচ্ছে রোগের উপশমকারী ও রহমত। রোগের উপশমও তো রহমত বটে। আবার আলাদাভাবে রহমত উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে প্রতিদান যোগ্য যে ঔষধ সেবনে যে রোগ ভাল হয় তার মধ্যে অনেক পার্শপ্রতিক্রিয়া বিদ্যমান থাকে। আবার অনেক সময় একটি রোগ ভাল হয়ে আরেকটি রোগ দেখা দেয়। আবার অন্য দিকে রোগ ভাল হলতো রোগী দুর্বল হয়ে পড়ল ইত্যাদি। কিন্তু কোরআনের মাধ্যমে যে রোগ ভাল হবে তার মধ্যে উপরের কোনটিই থাকবে না।
হাফেজ ইবনুল কায়্যিম রাহঃ বলেন, মানসিক ও শারীরিক, দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় রোগ ব্যাধির পরিপূর্ণ চিকিৎসা হচ্ছে আল কোরআন। তবে এর দ্বারা নিরাময় লাভের তৌফিক সকলকে দেওয়া হয় না। সবাই এর উপযুক্তও নয়। রোগীর সততা, আস্থা, পরিপূর্ণ কবুল, অকাট্য বিশ্বাস এবং যাবতীয় শর্ত পূরণের মাধ্যমে যদি এ কোরআনকে উত্তমভাবে তার রোগের উপর প্রয়োগ করে তাহলে কোন রোগই কখনো তার মোকাবেলায় টিকে থাকতে পারে না। কিভাবে রোগ ব্যাধি আসমান জমিনের মালিকের ঐ কথার মোকাবেলা করবে, যা তিনি পাহাড়ের উপর নাযিল করলে পাহাড় চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যেত? জমিনের উপর নাযিল করলে জমিন ফেটে চৌচির হয়ে যেত? সুতরাং শরীর ও মনের এমন কোন রোগ নেই যে আল কোরআন তার চিকিৎসার পথ বাতলে দেয়নি। এর প্রতিকার ও তা থেকে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। যাকে আল্লাহ তায়ালা তার কিতাবের বুঝ দান করেছেন, সেই কেবলমাত্র এ থেকে সার্বিক সুস্থতা লাভ করে ধন্য হয়। কোরআন যাকে নিরাময় করবে না আল্লাহতায়ালাও তাকে নিরাময় করবেন না। আর যার জন্য কোরআন যথেষ্ট নয় আল্লাহ তায়ালাও তার জন্য যথেষ্ট হবেন না।
যদি কোন ব্যক্তি কোরআনকে তার চিকিৎসার প্রথম এবং প্রধান আরোগ্যকারী মনে করে তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সে অবশ্যই আশ্চর্যজনক ফল লাভ করবে। সাথে যদি যে অন্য চিকিৎসাও গ্রহণ করে তাতেওতো কোন বাধা নেই। আলী (রা.) বলিতেন, কোরআনের মধ্যে সর্বপ্রকার রোগমুক্তির উপায় বিদ্যমান রয়েছ।
আমরা পূর্ববর্তী যুগের দিকে তাকালে দেখতে পাই, তাদের রোগ হলে সর্বপ্রথম কোরআনের দ্বারস্ত হতেন, রাসুল (সা.) এর শিখানো দোয়ার দ্বারা শিফা কামনা করতেন খুব বেশী প্রয়োজন মনে করলে ঔষধ সেবন করতেন। বাহ্যিক ঔষধকেই আরোগ্য লাভের নিয়ামক মনে করতেন না। সর্বাবস্থায় আল্লাহ তায়ালাকেই শিফাদানকারী মনে করতেন।
আজকাল মুসলিম সমাজের দিকে একটু তাকিয়ে দেখুনতো কতজন লোক কোরআনকে শিফা মনে করে? যারা কোরআনকে শিফা মনে করে তাদেরকে বলা হয় পিছিয়ে পড়া জনগোষ্টি। অথচ আল্লাহ তায়ালা নিজেই কোরআনকে শিফা বলেছেন। এটা কি ইমানের অংশ নয়? আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করা যায়, একজন লোক কিছু সময় বা কয়েকদিন কোরআন তেলাওয়াত করল বা রাসুল (সা.) এর শিখানো দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নিকট শিফা কামনা করল কিন্তু রোগ ভাল হচ্ছে না, তখন বলতে শুরু করে কত দোয়া করলাম কই রোগতো সারল না? আমার দোয়াতো কবুল হয় না। কিন্তু একটি প্রশ্ন, প্রতিদিন কত লোক হাসপাতালে মারা যায়, কত লোক দিনের পর দিন মাসের পর মাস হাসপাতালে শুয়ে থাকে কই কেউতো বলে না আর চিকিৎসা করাব না? কেউ তো বলে না চিকিৎসায় কোন উপকার নেই? চিকিৎসায় পূর্ণ রোগ মুক্তির আস্থা ও বিশ্বাস রাখলেও কেউ শিরক বলে না? শয়তান আমাদেরকে কোরআনের ব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টি করে কিন্তু ঔষধের ব্যাপারে রোগ মুক্তির পূর্ণ আস্থা আর বিশ্বাসী বানিয়ে দেয়।
ওয়াইলা বিন আসকা বর্ণনা করেন, এক লোক রাসুল (সা.) এর সান্নিধ্যে উপস্থিত হয়ে তার কন্ঠনালীর ব্যথার কথা জানালেন, রাসুল (সা.) বললেন, কোরআন পাঠ করতে থাক। আবু সাইদ খুদরী (রা.) বলেন, এক লোক রাসুল (সা.) মহান সংসর্গে এসে নিবেদন করল, আমার বুকে খুব ব্যথা। তাকে রাসুল (সা.) বললেন, কোরআন পাঠ করতে থাকো। আল্লাহ তায়ালাতো নিজেই বলেছেন, শিফাউল লিমা ফিস সুদুর (বক্ষে যা আছে তার নিরাময়কারী)। তালহা ইবনে মাতরাফের বর্ণনা করেন, যখন কোন রোগাক্রান্ত মানুষের পাশে কোরআন তেলাওয়াত করা হয়, তখন দেখা যায় রোগের প্রকোপ কমে আসে। তাফসীরে মাজহারী ।
আবু সাইদ রাহঃ বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) একদল সাহাবী কোন এক সফরে যাত্রা করেন। তারা এক আরব গোত্রের নিকট পৌঁছে তাদের মেহমান হতে চাইল। কিন্তু তারা তাদের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল। সে গোত্রের সর্দার বিচ্ছু দ্বারা দংশিত হল। লোকেরা তার আরোগ্যের জন্য সব ধরনের চেষ্টা করল, কিন্তু কিছুতেই কোন উপকার হল না। তাদের কেউ বলল এখন যে কাফেলা অবতরণ করেছে তাদের নিকট গেলে ভাল হত। সম্ভবত তাদের কারো কাছে কিছু থাকতে পারে। ওরা তাদের নিকট গেল এবং বলল হে যাত্রীদল, আমাদের সর্দারকে বিচ্ছু দংশন করেছে, আমরা সব রকমের চেষ্টা করেছি। কিন্তু কিছুতেই কোন উপকার হচ্ছে না। তোমাদের কারো কাছে কিছু আছে কি? সাহাবীদের একজন বললেন হ্যাঁ, আল্লাহর কসম আমি ঝঁড়ফুঁক করতে পারি। আমরা তোমাদের মেহমানদারী কামনা করেছিলাম। কিন্তু তোমরা আমাদের মেহমাদারী করনি। কাজেই আমি ঝাড়ফুঁক করব না যে পর্যন্ত না তোমরা আমাদের জন্য পারিশ্রমিক নির্ধারণ করবে। তখন তারা একপাল বকরীর শর্তে তাদের সাথে চুক্তি সম্পাদন করল। তারপর তিনি গিয়ে আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন (সুরা ফাতিহা) পড়ে তার উপর ফুঁক দিতে লাগলেন। ফলে সে (এমনভাবে নিরাময় হল) যেন বন্ধন থেকে মুক্ত হল এবং এমনভাবে চলতে ফিরতে লাগল যেন তার কোন কষ্টই ছিল না। তারপর তাদের পারিশ্রমিক পুরোপুরি দেয়া হল। সাহাবীদের কেউ কেউ বললেন, এগুলো বন্টন কর। কিন্তু যিনি ঝাড়ফুঁক করছিলেন তিনি বললেন না এটা করব না, যে পর্যন্ত না নবী (সা.) এর নিকট গিয়ে এ ঘটনা না জানাই এবং লক্ষ্য করি তিনি আমাদের কি নির্দেশ দেন। তারা আ্ল্লাহর রাসুল (সা.) এর নিকট এসে এ ঘটনা বর্ণনা করলেন। তিনি বললেন, তুমি কিভাবে জানলে যে সুরা ফাতেহা একটি দোয়া? তারপর বললেন, তোমরা ঠিকই করেছ। বন্টন কর এবং তোমাদের সাথে আমার জন্যও একটি অংশ রাখ। এ বলে নবী (সা.) হাসলেন। সহীহ রোখারী।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT