ধর্ম ও জীবন

অনুপম আদর্শের দর্পণ

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ১৩-০৪-২০১৮ ইং ০১:৫৮:২০ | সংবাদটি ১৪২ বার পঠিত

রাহমাতুল্লিল আলামিন প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর পবিত্র জীবন হচ্ছে সৃষ্টিকুলের জন্য অনুপম আদর্শের স্বচ্ছ দর্পণ। যাঁর আদর্শ মহান, অতুলনীয়, অদ্বিতীয়, চিরস্মরণীয়, চিরঅনুকরণীয় এবং চির প্রশংসিত। দুনিয়ার জীবনে শান্তি ও পরকালে মুক্তি লাভের জন্য মহানবী (সা.) এর আদর্শ ছাড়া মুক্তির বিকল্প কোন পথ খোলা নেই। মহান আল্লাহপাক ইরশাদ করেন- ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের উপর অধিষ্টিত’। (সূরা : কলম, আয়াত : ৪)
অন্য আয়াতে মহান আল্লাহপাক ইরশাদ করেন ‘তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখেরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে তাদের জন্য রাসুল (সা.) এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সূরা : আহযাব, আয়াত : ২১)
মহানবী (সা.) যে অনুপম আদর্শের অধিকারী এর সনদ স্বয়ং আল্লাহ পাক দিয়েছেন। যার প্রমাণ উপরোক্ত আয়াস সমূহ। মানুষের ইহকাল ও পরকালীন মুক্তির জন্য মহানবী (সা.) এর মহান আদর্শকে মানুষের জীবনে অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। তাই তো আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন- ‘রাসুল তোমাদেরকে যা দেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করেন তা থেকে তোমরা বিরত থাক।’ (সূরা : হাশর, আয়াত : ৭)
মহানবী (সা.) হাদিসে বলেছেন- ‘উৎকৃষ্ট চারিত্রিক গুণাবলীকে পূর্ণতা দান করার উদ্দেশ্যেই আমি প্রেরিত হয়েছি।’ অন্য হাদিসে নবী (সা.) বলেছেন- ‘আমি মহত্তম কার্যাবলীকে পূর্ণতা দান করার উদ্দেশ্যে প্রেরিত হয়েছি।’
মহানবী (সা.) এর জন্মের পর হতেই প্রতিটি কাজে ছিলেন ন্যায়পরায়ন ও সৎ। নবী (সা.) যখন শিশু তখন তিনি দুধ মা হালিমার ঘরে লালিত পালিত হচ্ছিলেন। যতোদিন মা হালিমার দুধ পান করেছেন ততোদিন ডান স্তন থেকে দুধ পান করেছেন। কখনও বাম স্তন থেকে দুধ পান করেন নি। বাম স্তন তাঁর দুধ ভাই আব্দুল্লাহর জন্য রেখে দিতেন। এমনি ইনসাফ ছিল নবী (সা.) এর স্বভাবের মধ্যে। নবী (সা.) শিশু অবস্থায় কখনও কাপড়ের মধ্যে প্রশ্রাব বা মলত্যাগ করতেন না। বরং নির্দিষ্ট সময়েই তিনি মলত্যাগ বা প্রশ্রাব করতেন। তিনি কখনও উলঙ্গ হতেন না। (তারিখে হাবীবে ইলাহ)
রাসূল (সা.) এর পায়খানা মোবারককে মাটি গিলে ফেলতো এবং সেখান থেকে খুশবো বের হয়ে আসতো। (খাসাইস, মাদারেজ, শিফা)
নবীজি যখন কিশোর তখন ‘হারবুল ফুজজার’ চলছে একাধারে কয়েক বছর। নির্যাতিত, নিপীড়িত, মানবতার করুণ আর্তনাদে আরবের মরু প্রান্তরও যেন ক্রন্দন করছে, তবু যুদ্ধ থামছে না তখন রাহমাতুল্লিল আলামিনের কিশোর হৃদয় হু হু করে কেঁদে উঠল। শান্তি ও সহমর্মিতায় উদ্বুদ্ধ করতে তিনি তাঁর বয়সের কিশোর-যুবকদের নিয়ে ‘হিলফুল ফুজুল সংঘ’ প্রতিষ্ঠা করলেন। ফলে আরবে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলো।
মহানবী (সা.) সর্বদা সত্য কথা বলতেন। ফলে কাফির, মুশরিকরাও তাঁকে ‘আল-আমিন’ বলে ডাকতো। মিথ্যা বলা মহাপাপ। নবী (সা.) সর্বদা সত্য কথা বলার আদেশ দিতেন। নবী (সা.) হাদিসে বলেছেন- ‘মিথ্যা সকল পাপের মূল’। মহানবী (সা.) অত্যন্ত সত্যবাদী ছিলেন বলে সকলেই তাঁকে ভালোবাসতো।
মহানবী (সা.) এর সততা, বিশ্বস্ততা ও চরিত্রগুণে আকৃষ্ট হয়ে খাদিজা নাম্মী এ রূপলাবণ্যবতী ও অতুলনীয়া ধনাঢ্য মহিলা মহানবী (সা.) কে পতিত্বে বরণ করতে অভিলাস জ্ঞাপন করেন। আবু তালিবের অনুমতিক্রমে মহানবী (সা.) খাদিজাকে পতœীত্বে বরণ করলেন। বর্ণিত আছে যে, খাদিজার অতুলনীয় রূপ ও অনুপম চরিত্রের জন্য মক্কাবাসীরা তাঁকে ‘খাদিজাতুত তাহিরা’ নামে অভিহিত করেছিল।
মহানবী (সা.) এর মহৎ চরিত্রে ছিল সকল মহৎ গুণের সমাহার। মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা ও আচার ব্যবহারে তিনি ছিলেন খুব অমায়িক ও উদার। কেউ মনে আঘাত পেতে পারে এরূপ কোনো কথা কখনও তিনি বলতেন না। মধুর ব্যবহারে তিনি সকলের মন জয় করতেন। এজন্যই শত্রু মিত্র সকলেই তাঁকে সম্মান করতো। মহানবী (সা.) দুনিয়ায় এসেছিলেন আমাদেরকে সৎপথ দেখাবার জন্য। কি করে মানুষ প্রকৃত ভালো হয়ে চলতে পারে, সে শিক্ষা দেয়ার জন্য আল্লাহ পাক তাঁকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছিলেন। তাই তাঁর প্রত্যেকটি কাজ ও আচার ব্যবহারে আমরা অতুলনীয় শিক্ষালাভ করি। নবী (সা.) ছিলেন ধৈর্য্যরে মূর্ত প্রতীক। তিনি সর্বাবস্থায়ই সহনশীলতা ও ধৈর্য্যরে বেনজির পরিচয় দিয়েছিলেন। দরিদ্রের প্রতি তাঁর অত্যন্ত মমত্ববোধ ছিল। তিনি তাদের সঙ্গে উঠাবসা করতে ভালোবাসতেন। তাদের অভাব অভিযোগ মোচন করতে সচেষ্ট থাকতেন। তাদের অভাব মোচন করতে গিয়ে অনেক সময় তাঁকে উপবাসও করতে হয়েছে। দানশীলতায় মহানবী (সা.) সমস্ত জগতবাসীর চেয়ে আলাদা বৈশিষ্টের অধিকারী ছিলেন। কোনো সাহায্য প্রার্থীকে জীবনে কোনো দিন ‘না’ বলেন নি। উপস্থিত সময়ে হাতে যা থাকত, তাই দিয়ে দিতেন। অগত্যা হাতে কিছু না থাকলে অন্ততঃ পরবর্তীতে দানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদায় দিতেন। তিনি দানশীল ছিলেন বটে; তবে তাই বলে তিনি ভিক্ষাবৃত্তি মোটেই পছন্দ করতেন না। সক্ষম ব্যক্তিকে তিনি উপার্জন করে খেতে নির্দেশ দিতেন।
মহানবী (সা.) নারী মুক্তির অগ্রদূত ছিলেন। যুগ যুগ ধরে অবহেলিত ও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত নারীকে তিনি দিয়েছিলেন রাণীর অধিকার। বলিষ্ঠ কণ্ঠে তিনি ঘোষণা করেছিলেন- ‘মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত।’ নবী (সা.) ঘৃণ্য দাস প্রথার বিলোপ সাধন করেছিলেন। বিশ্ব সমাজে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বাণী প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) এর অবদান অনস্বীকার্য সত্য। তিনি সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে কলহরত আরব সমাজে শান্তি স্থাপন করেছিলেন। বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা.) এর অবদান অতুলনীয় ও অপরিসীম।
মহানবী (সা.) এর জীবন সমস্ত জগতবাসীর জন্য উজ্জ্বল আদর্শ। মহানবী (সা.) এর গোটা জীবনটাই মহান চরিত্রের জ্বলন্ত প্রমাণ। তিনি কখনও কটু কথা বলেন নি। হযরত আনাস (রা.) বলেন- আমি সুদীর্ঘ দশ বছর কাল মহানবী (সা.) এর খেদমতে অতিবাহিত করেছি। এ দীর্ঘ সময়ে আমার কোনো ক্রটি-বিচ্যুতিতে কোনো দিনই একটি বারও তিনি আমার উপর রাগ করেন নি এবং আমার কোনো কাজে অসন্তোষ প্রকাশ করেন নি। হযরত আয়েশা (রা.) বলেছেন- প্রিয়নবী (সা.) এর স্বভাব ছিল পবিত্র কুরআন। কুরআনে পাকের যে স্থানে খুশির কথার উল্লেখ ছিল, সে স্থানে তিনিও তাঁর খুশি প্রকাশ করতেন এবং যেখানে দুঃখের কথার উল্লেখ ছিল সে স্থানে তিনিও দুঃখ অনুভব করতেন। নবী (সা.) গরিব, মিসকিন, দুঃস্থ ও অসহায় মানুষের সেবায় সদা প্রস্তুত থাকতেন। বিখ্যাত দানবীর হাতেম তাই এর পুত্র আদী বিন হাতেম খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ছিলেন। তিনি নবী (সা.) কর্তৃক গরিব, মিসকিন ও অসহায় মানুষের প্রতি সেবায় আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। নবী করিম (সা.) সর্বাবস্থায় হাসি-মুখে থাকতেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব এবং স্বভাবসুলভ আচরণে বিমুগ্ধ হয়ে বহু লোক ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিল। তিনি কঠোর কর্তব্য, নিষ্ঠা, দৃঢ় মনোবলের অধিকারী এবং সুমহান অতিথি পরায়ণ ছিলেন। মহানবী (সা.) মুসলিম-অমুসলিম যে কোন ব্যক্তি অসুস্থ হলে তাকে দেখাশুনা করতেন, সেবাযতœ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিতেন। মহানবী (সা:) এর অগণিত গুণাবলীল মধ্যে একটি ছিল যে, তাঁর দেহ মোবারক খুশবুদার ছিল, তাঁর দেহ মোবারক থেকে সর্বদা খুশবু বের হতো, কোনো অনুসন্ধানকারী তাঁর অনুসন্ধান করলে সে শুধু খুশবোর কারণেই তাঁর সন্ধান লাভ করতে পারতো। (তারিখে কবির)। তাই, তিনিই সেই অপূর্ব বিষ্ময়কর ফুল- ‘যে ফুলের খুশবুতে সারা জাহান মাতোয়ারা।’
বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক, গবেষক, ঐতিহাসিকগণ প্রিয়নবী (সা.) জীবনের উপর অসংখ্য ও অগণিত গ্রন্থ রচনা করেছেন। কিন্তু কেউই মহানবী (সা.) এর প্রকৃত প্রশংসা, গুণাবলী ও মর্যাদা বর্ণনা করতে পারেন নি। আর কেহই মহানবী (সা.) এর প্রশংসা, গুণাবলী ও মর্যাদা বর্ণনা করে শেষ করতে পারবেন না। তাঁর চেয়ে সুন্দর, তাঁর চেয়ে মহৎ, তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ, তাঁর চেয়ে পূর্ণ, তাঁর শ্রেষ্ঠ আদর্শবান আল্লাহর সৃষ্টিতে আর নেই, আর হবে না। আমাদের শান্তি ও মুক্তির জন্য মহানবী (সা.) এর আদর্শকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করতেই হবে। এ আদর্শই সার্বজনীন ও চিরন্তন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT