বিশেষ সংখ্যা

পহেলা বৈশাখ ঘিরে বাঙালি

মোহাম্মদ আব্দুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৪-২০১৮ ইং ০০:৩৩:১১ | সংবাদটি ৩২৮ বার পঠিত

বাংলাদেশ যে ছয় ঋতুর দেশ তা এখন আর কাউকে বলে দিতে হয়না। বরং কালে কালেই এদেশের মানুষ ছোট্ট শিশুটি থেকে বড় হতে হতেই জেনে যায় এবং জেনে গেছে পৃথিবী নামক গ্রহের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ১৪৭৫৭০ বর্গ কিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট ব-দ্বীপ রাষ্ট্র বাংলাদেশে বার মাসে ছয়টি ঋতু আপন আপন চরিত্র নিয়েই দেখা দেয়। সেই সুদূর অতীত থেকেই একেকটি কাল বা ঋতু দুইটি করে মাসকে ঘিরেই তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ ঘটিয়ে চলেছে। আবার প্রত্যেকটি কালের একেকটি মাস ও তার নিজস্বতায় থাকে সমুজ্জ্বল। সময়ের প্রয়োজনেই শুধু বৈশাখ মাস নিয়েই এখন আলোচনা হতে পারে।
আমাদের ছয়টি ঋতু হলো ঃ গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত এবং সবশেষে আসে বসন্তকাল। এর মধ্যে গ্রীষ্মকাল হচ্ছে ঋতু গণনার প্রথম ঋতু যা বৈশাখ ও জৈষ্ঠ্য মাসকে ধারণ করে। আমরা সহজভাবে বলে থাকি বৈশাখ ও জৈষ্ঠ্য এই দুই মাস নিয়েই গ্রীষ্মকাল। বৈশাখ মাস হচ্ছে বাংলা সালের প্রথম মাস। বৈশাখ মাস বাংলাদেশের মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মাসে বাংলার ঘরে ঘরে নতুন ফসল তোলার প্রস্তুতি আর সেই সাথে মনে সৃষ্টি হয় কতোনা আনন্দময় স্বপ্ন দেখার অনুভূতি। তাই বৈশাখ মাসের প্রথম দিনটি আনন্দ উদযাপনের প্রতীক হয়ে উঠে। আর বৈশাখ মাসের প্রথম দিন অর্থাৎ বাংলা বছরের প্রথম দিন মানেই পহেলা বৈশাখ। এই পহেলা বৈশাখকে ঘিরে অতীত কাল থেকেই চলছে নানা রকম উৎসব, আর আয়োজন হয়ে আসছে হরেক রকমের মেলা সারা বাংলায়। তাই সেই অতীত কাল থেকেই বৈশাখ মাসকে ঘিরে যে মেলা সেটাই কালক্রমে বাঙালির প্রাণের মেলা ‘বৈশাখি মেলা’ নাম ধারণ করে আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছে। আমরা বাঙালি। বাঙালি হিসেবে আমাদের এমন কিছু রয়েছে যা একান্তই আমাদের নিজস্ব। এর মধ্যে পহেলা বৈশাখই সর্বাগ্রে স্মরণীয়। এ পর্যায়ে আমরা সংক্ষেপে স্মরণ করি কেমন করে বাংলা সাল প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলো।
ইতিহাস খুঁজে জানা যায় বাংলায় যখন মোগল সা¤্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত ছিলো তখন কৃষক তথা প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করা হতো হিজরি সন গণনা করে। কিন্তু হিজরি আরবি সন চন্দ্রমাসের হিসেবে চলে। অথচ আমাদের বাংলায় সেই হিসাব মতে ফসল উৎপাদন হয় না। ফসল ফলানো না গেলে কৃষক প্রজারা খাজনা দিবে কেমন করে আর স¤্রাটরা নিবেই কি। সেই চিন্তা মাথায় নিয়ে সুষ্ঠু খাজনা ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে মোগল স¤্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। ফতেহ উল্লাহ সিরাজি ছিলেন ওই সময়ের বাংলার বিচক্ষণ জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং একজন বিখ্যাত চিন্তাবিদ। তিনি মূলত স¤্রাট আকবরের আদেশ অনুযায়ী প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনয়ন করেন সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের উপর ভিত্তি করেই। আর এভাবেই আমরা নতুন বাংলা সন পাই।
জানা গেছে ১৫৮৪ খ্রীষ্টিয় সালের ১০ই মার্চ অথবা ১১ই মার্চ থেকেই বাংলা সন গণনা শুরু হয়েছিলো। আর প্রকৃত অর্থে বাংলা সনের গণনা কার্যকর করা হয়েছিলো স¤্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহনের সময় থেকেই সেটা ছিলো ১৫৫৬ খ্রীষ্টিয় সালের ৫ই নভেম্বর। আমাদের এ সময়ের বাংলা বর্ষ তৎকালীন সময়ে অন্য নামে পরিচিত ছিলো। ফসল ফলানো এবং ফসল ঘরে তোলার উপর গুরুত্ব দিয়েই প্রথম দিকে আমাদের বাংলা সনকে ফসলী সন নামেই বলা হতো। পরবর্তীতে তা বঙ্গাব্দ এবং বাংলা বর্ষ নাম ধারণ করে। আমরা এখন যে বৈশাখি উৎসব পালন করি তা মূলত স¤্রাট আকবরের সময় থেকেই হয়ে আসছে। তখন থেকেই বৈশাখ মাসের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তৎকালীন সময়ে সা¤্রাজ্যের নিয়ম ছিলো চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে কৃষক প্রজাদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে হবে। তারপর নতুন বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজেদের গ্রামের মানুষদেরকে মিষ্টান্ন খাইয়ে সমাদর করতেন। এই ধরনের পরিবেশে বাংলার কৃষকেরা বেশ আনন্দ উপভোগ করতেন শত কষ্টের মাঝেও। সমাজের মানুষেরা এ উপলক্ষে বিভিন্ন আনন্দ উৎসবের আয়োজন করতো। ওই সকল উৎসবই কালক্রমে সারা বাংলায় বাঙালির সামাজিক খুশির অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। তখনকার সময়ে এমনকি ছোটোবেলায়ও আমরা দেখতে পেতাম বিশেষ করে ব্যবসায়ী সমাজ তাদের দোকানে হালখাতা অনুষ্ঠান আয়োজন করতো। বর্তমান ফেইসবুক যুগের ছেলেমেয়েদের সহজে হালখাতার ধারণা দেয়া যেতে পারে এভাবে, হালখাতা এক ধরনের নতুন খাতা যার মাধ্যমে ব্যবসায়ীগণ ক্রেতাদের সাথে পুরনো লেনদেন শেষ করে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন করে ব্যবসায়িক সম্পর্ক হাল নাগাদ করতেন।
আমার এখনও মনে আছে আমি যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি তখন আমি বাবার সাথে সুনামগঞ্জ শহরের একটি দোকানে যাই। বাবা দোকানের মাজনকে (মহাজন) অনেকগুলো টাকা দিলে মাজন সাহেব একটি খাতা বের করে লাল কালিতে পরিশোধ কথাটা লিখলেন এবং আমাদেরকে দেশবন্ধু মিষ্টিঘর (সুনামগঞ্জের ভালো মিষ্টির দোকান) থেকে মিষ্টি আনিয়ে আপ্যায়ন করান। এই ধরণের অনুষ্ঠান এখনও ব্যবসায়ী মহলে প্রচলিত আছে। আর জীবন যাপনের ক্ষেত্রে আমাদের কৃষক ভাইদের অবস্থা এখনও নানা রকম সুবিধা বঞ্চিত হওয়া সত্ত্বেও এই বৈশাখ মাসকে ঘিরে কৃষকের মনে আজও নানান স্বপ্ন উঁকি দেয়। বৈশাখের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, খুব ঝড় তুফান হয় এবং শীলাবৃষ্টি হয়। অনেক সময় অতি বৃষ্টিতে বিল ও হাওরের ফসল তলিয়ে যায়। এতে করে কৃষকের স্বপ্নও পানিতে ভাসে অনিশ্চয়তায়। এভাবে ফসলের ক্ষতির কারণে খাদ্য ঘাটতি দেখা দেয় অনেক পরিবারে। আর তখন দ্রব্যমূল্যও নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়না। তাই কৃষক এবং সর্বস্তরের মানুষের দাবী সঠিক সময়ে সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে সরকার যেন কৃষকের কষ্টে ফলানো ফসল রক্ষার ব্যবস্থা করেন।
আমরা এখন আগেকার দিনের চেয়ে অনেক বেশি শিখেছি। সেই সাথে আমাদের চলনে বলনে সাজ পোশাকে এসেছে নতুনত্ব। আমাদের সময়ে গ্রামে চৈত্র-বৈশাখ মাসে মেলা হতো। এখন পহেলা বৈশাখকে ঘিরে সারা দেশের ছোট-বড় শহর, সিলেট মহানগরী, চট্টগ্রাম মহানগরী, রাজধানী ঢাকা সহ সর্বত্র পালিত হয় বৈশাখী মেলা। এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেখানেই বাঙালি আছে সেখানেই বৈশাখি মেলা বাঙালির পরিচয় তুলে ধরছে। যেখানেই মেলার আয়োজন হয় সেখানেই ছেলেমেয়ে, শিশু, বৃদ্ধ সকলের সমাগম ঘটে আর চলে বাংলা কবিতা পাঠ এবং বাংলা গান। কাজেই সময়ের প্রয়োজনে আমরা সাজবো। কিন্তু যেন বাড়াবাড়ি রকমের কিছু না হয় সেদিকে সচেতন থাকতে হবে। মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ির সুযোগ নিয়ে দুষ্টচক্র যাতে আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিকে কলুষিত করতে না পারে সেদিকে অবশ্যই ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষক অভিভাবক সকলকে সজাগ থাকতে হবে। আমাদের শিক্ষাসহ সকল অর্জন সার্থক হবে তখনই যদি আমরা পহেলা বৈশাখের উৎসব সহ সকল উৎসব সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে পালন করে ছেলের দল মেয়ের দল নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারি। আমাদের মনে রাখতে হবে বিশ্বে আমরা এক জাতি, আমরা বাঙালি, আমরা বাংলাদেশী। আমরা সেই বাংলার মৃত্তিকার বাঙালির উত্তরসূরী এই বাংলার মাটির বাঙালি। জয় হোক বাংলার মানুষের। সগৌরবে ছড়িয়ে পড়–ক বাঙালি সংস্কৃতি বিশ্বময়। বৈশাখের একটি দর্শন আছে, মনে থাকে যেন-“মৃত্তিকায় নতুন বিস্ফোরণ/ আকাশে মেঘের গর্জন/ বর্ষণে নতুন ফলন/ এইতো বৈশাখি দর্শন।
লেখক : কলামিস্ট, কবি ও প্রাবন্ধিক।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT