বিশেষ সংখ্যা

বর্ষবরণ আমাদের অসাম্প্রদায়িক উৎসব

রতীশচন্দ্র দাস তালুকদার প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৪-২০১৮ ইং ০০:৩৬:১৮ | সংবাদটি ১০৫ বার পঠিত

বাংলা নববর্ষ উদযাপন আমাদের জাতীয় জীবনে প্রধান অসাম্প্রদায়িক উৎসব। ধর্ম নির্বিশেষে সকল শ্রেণি পেশার মানুষ এ উৎসবে শরিক হন। আমাদের জাতীয়তাবাদী চেতনা উন্মেষে বর্ষবরণ অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। একটি দেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু অস্ত্রের জোরে করা যায় না। সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে হয়তো ভৌগলিক স্বাধীনতা অর্জন করা যায় কিন্তু সাংস্কৃতিকভাবে জনগণকে মুক্তির লক্ষ্যে উদ্বুদ্ধ করতে না পারলে ভূ-খ-গত স্বাধীনতা একসময় হারিয়ে যেতে পারে। তাই একটি দেশের স্বাধীনতা নিরঙ্কুশ করতে হলে সশস্ত্র যুদ্ধের সাথে সাংস্কৃতিক জাগরণও অপরিহার্য। আমাদের দেশ পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে রাজনৈতিক সংগ্রামের পাশাপাশি সমান্তরালভাবে সাংস্কৃতিক আন্দোলনও সক্রিয় ছিল।
বর্ষবরণ আমাদের সংস্কৃতির অপরিহার্য উপাদান। পাশ্চাত্যের দেশসমূহ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং দূর প্রাচ্যের যে সব দেশ এক সময় পাশ্চাত্যের ঔপনিবেশিক শক্তির শাসনাধীন ছিল, সে সব দেশে ‘নিউ ইয়ার্স ডে’ অত্যন্ত জাকজমকভাবে পালিত হয়। চীনারা চৈনিক নববর্ষ সাড়ম্বরে উদযাপন করে, ইরানীরা পালন করে ‘নওরোজ উৎসব’। আমাদের দেশের নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠী ত্রিপুরা, মারমা ও চাকমা সম্প্রদায় বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ উৎসব বৈসুক, সাংগ্রাই ও বিজু অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপন করে থাকে। এ উৎসবগুলো সম্মিলিতভাবে আমাদের কাছে ‘বৈসাবি’ নামে সমধিক পরিচিত। আমাদের গ্রাম-বাংলার জনগণ দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজ-কর্মে বাংলা সন ও তারিখই অনুসরণ করে থাকেন। তাই বৈশাখ মাসের আগে আগেই প্রায় সবই নতুন বছরের পঞ্জিকা সংগ্রহ করেন। গ্রামের হাটবাজারের ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রথম দিন পালন করেন ‘হালখাতা’ উৎসব। ‘হালখাতা’ উপলক্ষ্যে মহাজনরা ছাপানো চিঠির মাধ্যমে তাদের খদ্দেরদের আমন্ত্রণ করেন এবং নববর্ষের দিন মিষ্টি ও অন্যান্য চর্ব্য চোষ্য সহযোগে অতিথি খদ্দেরদের আপ্যায়ন করেন। এদিন অবশ্য ব্যবসায়ীদের অনেক বকেয়া পাওনা দেনা উসুল হয় এবং নতুন খেরো খাতায় খদ্দেরদের নাম লিপিবদ্ধ করা হয়। গ্রামীন জনপদের বিভিন্ন স্থানে বৈশাখী মেলা বসে। মেলায় গ্রামের জনগণের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সমাহার ঘটে। শিশু কিশোরদের খেলনা সামগ্রীও প্রচুর বেচাকেনা হয়। মেলায় মিষ্টি ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন পদের মিষ্টি পসরা সাজিয়ে খদ্দেরদের আকর্ষণ করেন। ইদানিং নাগরদোলা সহ শিশু কিশোরদের বিনোদনের বিবিধ উপকরণও মেলায় দেখা যায়। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা অবশ্য এদিন কিছু ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে থাকেন। তবে এগুলো বর্ষবরণের মুখ্য অনুষঙ্গ নয়, বরং মুখ্য অনুষঙ্গ হলো এর অসাম্প্রদায়িক চরিত্র।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাঙালিদের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটতে থাকে এবং শহরে নগরে ইংরেজি শিক্ষিত একটি শ্রেণি গড়ে ওঠে যারা ঔপনিবেশিক শক্তির তাবেদারি এবং ব্যবসা বাণিজ্য করে রাতারাতি অঢেল সম্পদের মালিক হয়। এরা সাহেবদের অনুসরণে ‘নিউ ইয়ার্স ডে’ পালন শুরু করে। সে সময় স্বদেশ চেতনায় উদ্বুদ্ধ জনগণ যারা ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর নিগড় থেকে দেশকে মুক্তির সংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন তারা আন্দোলনের অনুষঙ্গ হিসেবে ঊনিশশতকের শেষার্ধ থেকে শহরাঞ্চলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান পালন করতে থাকেন। এ উৎসবের প্রথম প্রবর্তক ছিলেন রাজনারায়ন বসু। আমাদের দেশে পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনেও বর্ষবরণ উৎসব অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। ষাটের দশকে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট ঢাকার রমনাপার্কের বটমূলে আনুষ্ঠানিকভাবে নববর্ষ উৎসব শুরু করে। শহরের মধ্যবিত্ত জনগণ সাগ্রহে এ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে এবং দ্রুত দেশের বিভিন্ন শহরে নানাবিধ আয়োজনের মধ্যদিয়ে এ উৎসব ছড়িয়ে পড়ে। পাকশাসক গোষ্ঠী এবং তাদের এ দেশীয় দোসররা নববর্ষ উদযাপনকে ভালোভাবে গ্রহণ করে নি বরং এর মধ্যে হিন্দুয়ানি গন্ধ খুঁজে বের করতে থাকে। তারা অবশ্য সঠিকভাবেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে, এর মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তি ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠবে। তাই নববর্ষ উদযাপন নিরুৎসাহিত করতে তৎপরতা শুরু করে। ছায়ানটের অন্যতম প্রধান সংগঠক ড. সনজীদা খাতুন যিনি ছিলেন ঢাকার একটি সরকারি কলেজের অধ্যাপক তাঁকে রংপুরে কারমাইকেল কলেজে বদলি করে দেয়। কিন্তু নিপীড়ক শাসক শ্রেণি এটা বুঝতে পারেনি, জনসম্পৃক্ত কোন আন্দোলনকে নিষ্পেষণ করে অবদমন করা যায় না, বরং তা ক্রমশ দাবদাহে পরিণত হয়। শুধু পাকিস্তানী শাসক ও তাদের তাবেদাররাই নয়, বর্তমান স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশেও একটি গোষ্ঠী বর্ষবরণকে মনে প্রাণে গ্রহণ করে না এবং তারই বহিঃপ্রকাশ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি ২০০১ সালে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে নৃশংস বোমা হামলার মধ্যে। তবে আনন্দের বিষয় যে, এ জঘন্য হামলার পর থেকে কিন্তু বর্ষবরণ অনুষ্ঠান সারাদেশে আরও পরিব্যপ্ত হয়ে পড়েছে এবং সকল শ্রেণি পেশার মানুষ উৎসাহভরে অংশ নিচ্ছে।
মধ্যযুগে এদেশের মোগল শাসকরা হিজরি সাল অনুসরণ করতেন। হিজরি সাল হলো চান্দ্র সাল। পৃথিবীর চারপাশে চাঁদের পরিক্রমের হিসেবে চান্দ্র সাল বা হিজরি সালের উদ্ভব ঘটে। চাঁদ পৃথিবীকে একবার পরিক্রম করতে সময় লাগে ২৯ দিন ১২ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট ৩ সেকেন্ড। সেই হিসেবে এক হিজরি বছরের ব্যাপ্তি ৩৫৪ দিন ৮ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট। হিজরি সালের মাসগুলো ঋতুর সাথে সম্পর্কিত নয়। অন্যদিকে পৃথিবীর সূর্য পরিক্রমের হিসেবে উদ্ভাবিত সাল হলো সৌর সাল এবং এর ব্যাপ্তি ৩৬৫ দিন পাঁচ ঘণ্টা আট চল্লিশ মিনিট ছেচল্লিশ সেকে-। সৌর সালের মাসগুলো ঋতুর সাথে সাযুজ্যপূর্ণ। স¤্রাট আকবর হিজরি সালকে সৌর সালে রূপান্তর করেন। হিজরি সালের মাসগুলো ঋতুর সাথে সম্পর্কিত না হওয়ায় প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ে অসুবিধা হতো। তাই স¤্রাট আকবর ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে জ্যোর্তিবিজ্ঞানী ফতেহ উল্লাহ সিরাজীকে এ অসুবিধা দূর করার নির্দেশ দেন। ফতেহ উল্লাহ বাদশাহ আকবরের মসনদে আরোহণের বছর ৯৬৩ হিজরি সালকে ৩৫৪ দিনের পরিবর্তে ৩৬৫ দিনে পরিবর্তন করে সৌর সালের প্রস্তাবনা করেন এবং ৯৬৩ হিজরিকে ভিত্তি ধরে সাল গননা শুরু হয়। একে ফসলি সালও বলা হয়। কারণ ফসল উৎপাদন ঋতুর সাথে সম্পর্কিত। বাংলাদেশে এ সালই বাংলা সন নামে পরিচিত।
আমাদের দেশের জনগণ ধর্মভীরু তবে ধর্মান্ধ নয়। ধর্মভিত্তিক অনেক অনুষ্ঠান আমরা শ্রদ্ধাবনতচিত্তে পালন করি। তবে বর্ষবরণ সহ অন্যান্য অসাম্প্রদায়িক উৎসব যেমন বসন্ত উৎসব, নবান্ন উৎসব, শরৎ উৎসব ইত্যাদি যদি আরও ছড়িয়ে দেওয়া যায় তবে দেশের আপামর জনগণের মধ্যে সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি মাথাচাড়া দেবে না এবং বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি ও সংহতি আরও দৃঢ়তর হবে। এভাবে সারাবিশ্বে ধর্মান্ধতার যে কালো থাবা বিস্তৃত হচ্ছে তা থেকে আমাদের দেশ অনেকটা নিরাপদ থাকবে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, এমসি কলেজ, সিলেট।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT