বিশেষ সংখ্যা

বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৪-২০১৮ ইং ০০:৩৬:৫৩ | সংবাদটি ১০৮ বার পঠিত

বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ ও নববর্ষ সর্বজনীন উৎসব। নববর্ষ উপলক্ষে ঢাকা সহ সারাদেশে যে ‘মঙ্গল শোভা যাত্রা’ বের হয় তার জন্য জাতিসংঘ সম্প্রীতির বন্ধন বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলা নববর্ষ মূলত ফসলের মৌসুমকে কেন্দ্র করে, যা-আমাদের লোকায়ত জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত, শত শত বছর ধরে যে জীবন কে আমরা আবাহন করে চলেছি। জলের ধর্ম যেমন তরলত্ব, বাঙালির ধর্ম তেমনি বাঙালিত্ব। এই বাঙালিত্ব ধারণ করে আছে তার শত বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। কাব্য-গান-বৈষ্ণব বাউলের সহজিয়া সাধনা, পূজা-পার্বণ-ঈদ-মহররম-বৈবাহিক লোকাচার-শীতল পাটি-নকশী কাঁথা-নবান্ন পিঠেপুলি উৎসব সুদূর প্রপিতামহকূলের আশীর্বাদ ও উত্তরাধিকার।
নববর্ষ উদযান বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির পরিচয় পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। চৈত্রের দাবদাহ যাত্রা শুরু করে ছয়টি ঋতুর নানা বৈচিত্র্যে কখনও রূপ মাধুরী-কখনও বৈরাগ্য দেখতে দেখতে বছর কেটে যায়। মাঝে মাঝে দেখা দেয় নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। কিন্তু সেগুলিই সব নয়। কর্ম প্রেরণা আর কর্মোদ্যোগে জেগে ওঠে নবীন আকাক্সক্ষার বলিষ্ট প্রকাশ ও দেখা যায় নতুন বছরে। পুরাতন বছরের গ্লানি থেকে শিক্ষা আর প্রেরণা নিয়ে সার্থক হয়ে ওঠে জীবনের প্রয়াস, কোন কিছুই নিরর্থক নয়, হারিয়ে যাওয়া নয়। বৈশাখী মুকুল যেমন নবীন আকাক্সক্ষার প্রতীক হয়ে দেখা দেয়, তেমনিই চৈত্র শেষের ঝরা পাতা ও রেখে যায় বিগত বছরের স্মৃতি আর সাক্ষর।
বাঙালির একান্ত নিজস্ব বৈশাখী মেলা আর হালখাতা অনুষ্ঠানের সূচনা তো নতুন বছরের শুভারম্ভেই। পুরনো বছরের ধার দেনা-হিসাব-নিকেশ শুরু হয় হালখাতার উৎসবকে কেন্দ্র করে। গ্রামে-গঞ্জে-নগরে-বন্দরে বৈশাখী মেলার আয়োজন চলে নানা ভাবে। শুধু মেলা নয়, বৈশাখের আবাহনে আকর্ষণীয় নৃত্য গীতের অনুষ্ঠান, বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান। সব কিছুর মধ্যে নাগরিক মন যেন খুঁজে পায় নতুন বছর শুরু করার আনন্দময় প্রেরণা। ভোরের আলো ফুটতেই বৈশাখী গানে গানে পথে পথে মানুষের ঢল নামে।
নববর্ষের উৎসব বাংলার গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণত নববর্ষে সকলে বাড়িঘর পরিষ্কার রাখে। ব্যবহার্য সামগ্রী ধোয়ামোছা করে এবং ¯œান করে নতুন কাপড় পরিধান করে। এ দিনটিতে ভালো খাওয়া দাওয়া-ভালো থাকা এবং ভালো কাপড় পরাটাকে ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলজনক বলে মনে করা হয়। নববর্ষে ঘরে ঘরে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং প্রতিবেশীদের আগমন ঘটে। মিষ্টি-পিঠা-পায়েশ সহ নানা রকম লোকজ খাবার তৈরির ধুম পড়ে যায়। একে অপরের সাথে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় করে। প্রিয়জনকে উপহার সামগ্রী দেওয়া হয়। নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তুলে বৈশাখী মেলা। মেলা অত্যন্ত আনন্দঘন হয়ে থাকে। মেলায় স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য কারুপণ্য লোকশিল্পজাত পণ্য-কুটির শিল্পজাত সামগ্রী। এছাড়া শিশু-কিশোর-কিশোরীদের খেলা-তাদের সাজ সজ্জার সামগ্রী এবং লোকজ খাদ্যদ্রব্য যেমন-চিড়া-খৈ-দই-মুরি-বাতাসা-গজা, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টিজাত দ্রব্য পাওয়া যায়। মেলায় চিত্ত বিনোদনেরও ব্যবস্থা থাকে। তার মধ্যে থাকে যাত্রা গান-কবি গান-জারি গান-গম্ভীরা গান-গাজীর গান-বাউল গান-মারফতি গান-মুর্শিদী ভাটিয়ালী গান-আঞ্চলিক গান-ইউসুফ-জুলেখা-রাধা-কৃষ্ণ প্রভৃতি উপস্থাপনা হয়। চলচ্চিত্র প্রদর্শনী-নাটক-পুতুল নাচ-নাগরদোলা-সার্কাস ইত্যাদি।
বর্তমানে নগর জীবনের নগর সংস্কৃতির আদলে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে নববর্ষ উদযাপিত হয়। পহেলা বৈশাখের প্রভাতে উদীয়মান সূর্যকে স্বাগত জানানোর মধ্যে দিয়ে শুরু হয় নববর্ষের উৎসব। এ সময় নতুন সূর্যকে প্রত্যক্ষ করতে উদ্যানের কোন বৃহৎ বৃক্ষমূলে বা লেকের ধারে অতি প্রত্যুষে নগরবাসীরা সমবেত হয়। নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে শিল্পীরা সংগীত পরিবেশন করেন। এদিন সাধারণত সকল শ্রেণির এবং সকল বয়সের মানুষ ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পোশাক পরিধান করে থাকে। বর্ষবরণের চমকপ্রদ ও জমজমাট আয়োজন ঘটে রাজধানী ঢাকায়। এখানে বৈশাখী উৎসবের অনুষ্ঠানমালা এক মিলনমেলায় সম্প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি করে। নববর্ষের প্রথম প্রভাতে রমনা উদ্যান ও তার চারপাশের এলাকায় উচ্ছ্বল জন¯্রােতে সৃষ্টি হয় জাতীয় মিলন মেলায়। ছায়ানটের উদ্যোগে জনাকীর্ণ রমনার বটমূলে রবীন্দ্রনাথের গান-‘এসো হে বৈশাখ এসো-এসো’ এর মাধ্যমে নতুন বর্ষকে বরণ করা হয়। ১৩৭২ বঙ্গাব্দে (১৯৬৫) ছায়ানট প্রথম এ উৎসব শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুল তলায় প্রভাতী অনুষ্ঠানেও নববর্ষকে সম্ভাষণ জানানো হয়। এখানকার চারু শিল্পীদের বর্ণাঢ্য ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নববর্ষের আহবানকে করে তুলে নয়ন-মনোহর এবং গভীর আবেদনময়। এ শোভা যাত্রা উপভোগ করে সকল শ্রেণির আবাল বৃদ্ধ বণিতা। এদিন শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ, টিএসসি এবং চারুকলা সহ সমগ্র বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পরিণত হয় বিশাল জনসমুদ্রে।
আজ বাঙালি জাতির আদর্শ লালনে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় বাংলা নববর্ষ সারা বাংলাদেশে উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়। বর্তমানে বাংলা নববর্ষ জাতীয় উৎসবে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
শেষ চৈত্রের উদ্দাম ঝড়ো হাওয়া উড়িয়ে নিয়ে যায় সব আবর্জনা। রৌদ্র ঝলসিত সুনীল আকাশের তলে আজ সমস্ত বাঙালিকে এই একটি দিনে একত্রিত করে পহেলা বৈশাখ। বাংলাদেশের জল-স্থল-অন্তরীক্ষ বনানী-প্রান্তর-সমুদ্র-পাহাড় তার জড় চৈতন্য সত্তা আজ সাক্ষী থাকুক। সবাইকে শুভ নববর্ষের প্রীতি-শুভেচ্ছা এবং ভালোবাসা। নতুন বছর সবার জীবনে নিয়ে আসুক-সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধি।

 

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT