উপ সম্পাদকীয়

শবে মেরাজের তাৎপর্য

ওলীউর রহমান প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৪-২০১৮ ইং ০০:৩৮:১২ | সংবাদটি ১৪১ বার পঠিত

মে’রাজ হচ্ছে মহানবী (সা.)-এর অন্যতম একটি মুজিযা বা অলৌকিক ঘটনা। কোন আদম সন্তানের প্রথম মহাশূণ্য পরিভ্রমণ। মহানবী (সা.) রাতের সামান্য সময়ের মধ্যে প্রথমে মক্কা মুকাররামা থেকে বায়তুল মোকাদ্দাস এবং বায়তুল মোকাদ্দাস থেকে সপ্তআকাশ, সিদরাতুল মুন্তাহা এবং আরশে আজীম সফর করে আবার এই রাতের মধ্যেই মক্কায় ফিরে আসেন। মে’রাজ ইসলামের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় এবং একটি বিষ্ময়কর ঘটনা। পবিত্র কুরঅনের ১৭ নং সূরা বনীইসরাঈলের শুরুতে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-‘পরম পবিত্র এবং মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রিবেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত- যার চারদিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি- যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। নিশ্চয় তিনি পরম শ্রবণকারী ও দর্শনশীল।’ (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত-১)
আয়াতে উল্লেখিত মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ কে ‘ইসরা’ অর্থাৎ রাতের ভ্রমণ বলা হয় আর সেখান থেকে উর্ধ্ব জগতের যে সফর হয়েছিল তাকে বলা হয় মে’রাজ। ইসরা আলোচ্য আয়াত দ্বারা সুস্পষ্ট ভাবে প্রমাণিত আর মে’রাজ সূরা নাজমে উল্লেখ রয়েছে এবং বহু মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা ও প্রমাণিত। ইরশাদ হয়েছে- ‘কুরআন ওহী যা প্রত্যাদেশ হয়, তাকে শিক্ষাদান করে এক শক্তিশালী ফেরেশতা, সহজাত শক্তি সম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে প্রকাশ পেল, উর্ধ্ব দিগন্তে। অত:পর নিকটবর্তী হলো এবং ঝুলে গেল। তখন দুই ধনুকের ব্যবধান ছিল অথবা আরও কম। তখন আল্লাহ তার দাসের প্রতি যা প্রত্যাদেশ করার তা প্রত্যাদেশ করলেন। রাসূলের অন্তর মিথ্যা বলেনি যা সে দেখেছে। তোমরা কি বিষয়ে বিতর্ক করবে যা সে দেখেছে? নিশ্চয় সে তাঁকে আরেকবার দেখেছিল সিদরাতুল মুন্তাহার নিকটে। যার কাছে অবস্থিত বসবাসের জান্নাত।’ (সূরা নাজম)
তাফসীরে ইবনে কাসীর এবং ফতহুলবারী ইত্যাদি গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, সূরা নাজমের শুরুতে যে সত্তাকে দুইবার দেখার কথা উল্লেখিত হয়েছে সেই সত্ত্বা হলেন হযরত জিবরাঈল (আ.)। জিবরাঈল (আ.) কে তাঁর আসল আকৃতিতে রাসূল (সা.) দুইবার দেখেছেন, একবার দেখেছেন মক্কায় এবং একবার দেখেছেন মে’রাজের রাতে সিদরাতুল মুন্তাহার পাশে। সিদরাতুল মুন্তাহার পাশে জিবরাঈল কে দেখা এ কথা-ই প্রমাণ করে যে, রাসূল (সা.) মে’রাজের রাত্রে সিদরাতুল মুন্তাহায় গিয়েছিলেন। হযরত আয়শা (রা.), আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আবুযর গিফারী, হযরত আবু হুরায়রা (রা.) প্রমুখ সাহাবী থেকে এই তাফসীরই বর্ণিত হয়েছে। ইবনে কাসীর সহ কুরতুবী, আবু হাইয়ান, ইমাম রাযী প্রমুখ এই তাফসীরকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
‘সিদরাহ’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো বদরিকা বৃক্ষ। আর ‘মুন্তাহা’ শব্দের অর্থ হলো শেষ প্রান্ত। সপ্তম আকাশের উপরে এবং আরশের নীচে এই বদরিকা বৃক্ষ অবস্থিত। এই বৃক্ষের মূল শেকড় ষষ্ঠ আকাশে আর তার শাখা-প্রশাখা সপ্ত আকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। (কুরতুবী) সাধারণ ফেরেশতাগণের গমনাগমনের এটাই শেষ প্রান্ত। তাই এটাকে মুন্তাহা বলা হয়। সিদরাতুল মুন্তাহার পাশেই রয়েছে জান্নাতুল মা’ওয়া। এই সিদরাতুল মুন্তাহার পাশেই রাসূল (সা.) জিবরাঈল (আ.) কে তার আসল আকৃতিতে দেখেছেন।
রাসূল (সা.) এর ইসরা এবং মে’রাজের সফর ছিল সশরীরে বা দৈহিক সফর। পবিত্র কুরআনের আয়াতে এর সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে এবং বহু মুতাওয়াতির হাদীসেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। ইসরা এর বর্ণনায় পবিত্র কুরআনের আয়াতে আশ্চর্যজনক এবং বিশাল কোন বিষয়ের জন্য ব্যবহৃত হয় এমন শব্দ (সুবহানা) ব্যবহার করা হয়েছে। মে’রাজ যদি দৈহিক না হয়ে শুধু স্বপ্ন জগতে সংঘটিত হতো, তাহলে এখানে এরূপ শব্দ ব্যবহার করা হতো না। কারণ এতে আশ্চর্যের কিছুনেই। স্বপ্নে তো যেকোন মানুষই দেখতে পারে যে, সে আকাশে উঠে গেছে এবং অবিশ্বাস্য অনেক কিছু করে ফেলেছে। এছাড়া মে’রাজের ঘটনা বর্ণনা করার পর মক্কার মধ্যে তোলপাড় সৃষ্টি হয়ে যায়। কুরাইশের লোকেরা এটাকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে প্রচার করতে থাকে। এমনকি কোন কোন মুসলমানও বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে যান। যদি এটা শুধু স্বপ্নই হতো তাহলে তো এতো কিছু ঘটতো না। অবিশ্বাস করার কোন সুযোগ থাকতো না। মূলত মে’রাজ স্বপ্নের মাধ্যমেও হয়েছে এবং সশরীরেও হয়েছে। ইমাম ইবনে কাসীর স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মোট পঁচিশ জন সাহাবী থেকে মে’রাজের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।
ইসরা ও মে’রাজের তারিখ নিয়েও বিস্তর মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, মে’রাজের ঘটনা হিজরতের ছয়মাস পূর্বে সংঘটিত হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, নবুওত প্রাপ্তির পাঁচ বছর পর। ইতিহাসবিদ ইবনে ইসহাক বলেন, মে’রাজের ঘটনা তখন ঘটেছিল, যখন ইসলাম আরবের সাধারণ গোত্র সমূহের মধ্যে বিস্তার লাভ করেছিল। আসলে এ ব্যাপারে কোন চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়নি। সাধারণভাবে প্রসিদ্ধ যে, রজব মাসের ২৭ তম রাতে মে’রাজ সংঘটিত হয়েছে।
এখন আমরা বিভিন্ন তাফসীর ও চরিতবিদের বর্ণনা থেকে ইসরা ও মে’রাজের ঘটনা সংক্ষিপ্ত ভাবে বর্ণনা করব। রাতের প্রথমার্ধ শেষ হয়েছে। সারা বিশ্বে নেমে এসেছে গভীর নিরবতা। মহানবী (সা.) এর কাছে হযরত জিব্রাঈল (আ.) আসলেন। মহানবীকে নিয়ে গেলেন যমযম কুপের কাছে। সেখানে নিয়ে তাঁর বক্ষ বিদারণ করলেন। অত:পর মহানবী (সা.) কে বুরাকে আরোহণ করানো হল। বুরাক গাদা থেকে বড় এবং খচ্চর থেকে ছোট একটি সওয়ারী। বুরাক তীর বেগে বায়ুতে উত্তর দিকে উড়ে চলল। বুরাকের সাথে জিব্রাঈল (আ.) ও উড়ে চললেন। বুরাক চোখের পলকে মক্কার পর্বত মালা আর মরু প্রান্তর অতিক্রম করে আল্ল¬াহ তায়ালা সিনাই উপত্যকার যে স্থানে মুসা (আ.) এর সাথে কথা বলেছিলেন, সেখানে গিয়ে যাত্রা বিরতী করল। এরপর পৌছল হযরত ঈসা (আ.) এর জন্মস্থান (বায়তুল লাহাম) বেতেলহামে। সেখান থেকে বুরাক হাওয়ায় উড়ে বায়তুল মোকাদ্দাস গিয়ে থামল। মহানবী (সা.) নীচে অবতরণ করেন। এবং বুরাককে একটি পাথরের সাথে বেঁধে রেখে বায়তুল মোকাদ্দাসে তিনি দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। এবার বিশেষ একটি সিঁড়ি তাঁকে নিয়ে দ্রূতবেগে আসমানের দিকে রওয়ানা দিল। মহানবী (সা.) প্রথম আসমানে পৌছান। এই আসমানে হযরত আদম (আ.) এর সাথে মহানবী (সা.) এর সাক্ষাত হয়। এখান থেকে তিনি অন্য ছয় আসমানে পদার্পণ করেন। এবং হযরত নূহ (আ.), হযরত ইব্রাহীম (আ.), হযরত দাঊদ (আ.), হযরত সুলায়মান (আ.), হযরত ইদরীস (আ.), হযরত ইয়াহইয়া (আ.), হযরত হারুন (আ.) এবং হযরত মুসা (আ.)-এর সাথে সাক্ষাত হয়।
রাসূল (সা.) সপ্তম আকাশের উপরে ‘সিদরাতুল মুন্তাহা’ থেকে আরো উপর দিকে উড়ে চললেন এবং আরশ থেকে দুই ধনুক কিংবা তার চেয়েও নিকটে পৌছান। এ সময় তিনি আল্লাহ তায়ালার নূর প্রত্যক্ষ করেন এবং এমন অবস্থা অনুভব করেন যা প্রকাশের অতীত। এসময় আল্লাহ তায়ালা প্রতিদিন প্রত্যেক মুসলমানের জন্য পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেন। অবশ্য পরে এই পঞ্চাশ ওয়াক্তকে পাঁচ ওয়াক্তে স্থির করা হয়। এরপর হযরত জিবরাঈল (আ.) মহানবীকে বেহেশতের দিকে নিয়ে যান, যা মুত্তাক্বী বান্দাদের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। এছাড়া মে’রাজের রাতে মহানবী (সা.) কে বিভিন্ন প্রকার পাপের ভয়ানক শাস্তির দৃশ্য ও দেখানো হয়। উর্ধ্বজগতের ভ্রমণ শেষে হুজুর (সা.) কে আবার বায়তুল মোকাদ্দাসে নিয়ে আসা হয় এবং তার সাথে পয়গাম্বরগণ ও নেমে আসেন তাঁকে বিদায় সম্বর্ধনা জানাতে। এখানে রাসূল (সা.) পয়গাম্বরদের নিয়ে দু রাকাত নামাজের ইমামতি করেন। নামাজে ইমামতি করার এ ঘটনা কারো কারো মতে আকাশে যাওয়ার পূর্বে ঘটেছিল। মূলত এ ঘটনা উর্ধ্বজগত থেকে প্রত্যাবর্তনের পরে সংঘটিত হয়েছে। কেননা আকাশে হযরত জিবরাঈল (আ.) বিভিন্ন পয়গাম্বরের সাথে রাসূল (সা.) কে পরিচয় করিয়ে দেন। ইমামতির ঘটনা প্রথমে হয়ে থাকলে পরে পরিচয় করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন থাকতো না। মহানবী (সা.) মে’রাজ গমনের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করেন সৃষ্টি জগতের শীর্ষ বিন্দু থেকে গোটা জগতকে। কারণ যেহেতু তার জন্যই এসবের অস্থিত্ব দান করা হয়েছে। অতঃপর রাসূল (সা.) মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন।
লেখক : প্রাবন্ধিক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শিক্ষা হোক শিশুদের জন্য আনন্দময়
  • ফরমালিনমুক্ত খাবার সুস্থ জীবনের বুনিয়াদ
  • জামাল খাসোগী হত্যাকান্ড ও সৌদি আরব
  • শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য কী হওয়া উচিত
  • ব্যবহারিক সাক্ষরতা ও বয়স্ক শিক্ষা
  • সুষ্ঠু নির্বাচন ও যোগ্য নেতৃত্ব
  • জেএসসি পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে
  • অন্ধকারে ভূত
  • আর্থিক সেবা ও আর্থিক শিক্ষা
  • প্রসঙ্গ : আইপিও লটারী
  • রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন
  • মূর্তিতেই দুর্গা : বিশ্বাসের বিষয় তর্কের নয়
  • শিক্ষার্থীর মনোজগৎ বিকাশে কার কী ভূমিকা
  • দুর্গের কর্তা দেবী দুর্গা
  • রাশিয়ার কাছে কি যুক্তরাষ্ট্র হেরে যাচ্ছে
  • দারিদ্র বিমোচনে সাফল্যের পথে বাংলাদেশ
  • বাংলাদেশ-সম্প্রীতি সমাবেশ ও কিছু কথা
  • পর্যটন নীতিমালার বাস্তবায়ন কত দূর
  • ওসমানীর দন্তরোগ বিভাগ
  • দুর্গার আগমন শুভ হোক
  • Developed by: Sparkle IT