উপ সম্পাদকীয়

নববর্ষের প্রাসঙ্গিক চেতনার সন্ধানে

সৈয়দ মবনু প্রকাশিত হয়েছে: ১৪-০৪-২০১৮ ইং ০০:৩৯:৩৪ | সংবাদটি ৯১ বার পঠিত

নববর্ষ আসে প্রতি বছর বাংলা, ইংলিশ, আরবি ইত্যাদি বিভিন্ন ক্যালেন্ডারের হিসাবে। আমরা সম্পর্কের সূত্রে পালন করি এসব নববর্ষ। তবে বাংলা নববর্ষটা আমাদের একান্ত নিজস্ব ইতিহাসের, সংস্কৃতির এবং ঐতিহ্যের। মুসলমানদের কাছে ধর্মগত কারনে আরবি ক্যালেন্ডারের গুরুত্ব অনেক। বাংলার মুসলমানেরা তাই বাংলা এবং আরবি এ দুয়ে আত্মার আত্মীয়তা অনুভব করেন। এই দুয়ের উদ্ভাবক, প্রবর্তক হলেন মুসলমান। হিজরী ক্যালেন্ডারের শুরু আরব থেকে। হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতকে কেন্দ্র করে হযরত ওমর (রা.)-এর খিলাফতের সময় আরবি ক্যালেন্ডারের সূচনা। এর পূর্বে আরবে হস্তিসন সন চালু ছিলো। হস্তি মানে হাতি। সেই সনের সূচনা মহানবী (সা.) এর জন্মের ৫০ দিন পূর্বে ইয়ামনের বাদশা আবরাহার কা’বা ঘর ধ্বংসের উদ্দেশ্যে হাতি অভিযানকে কেন্দ্র করে। হযরত ওমর (রা.) খলিফা হওয়ার পর চিন্তা করলেন মুসলমানদের নিজস্ব একটি ক্যালেন্ডার প্রয়োজন। তাই তিনি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হিজরতের দিন থেকে হিজরী সনের গণনা শুরু করেন।
ইংরেজি সনের হিসাব বলা হয় হযরত ঈসা (আ.)-এর গোপন হওয়ার দিন থেকে, তাই এই সনকে ঈসায়ি বা খ্রিস্টাব্দও বলা হয়। ৬২২ খ্রিস্টাব্দে হযরত মুহাম্মদ (স.) মদিনায় হিজরত করেন। হযরত ওমর (রা.) এই বছরের ১৬ জুলাইকে ১লা মহরম হিসাব করে হিজরী ক্যালেন্ডারের প্রবর্তন করেন। ভারতবর্ষে হিজরী সনের প্রচলন শুরু হয় ৭১২ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ৮০ হিজরীতে। ১২০১ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ৫৭৯ হিজরীর দিকে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয়ের পর রাস্ট্রীয়ভাবে এই অঞ্চলে হিজরী সনের প্রবর্তন হয়। হিজরী ৯৬৩ সনে মোঘল সম্রাট আকবর ভারতবর্ষের সিংহাসনের অধিকারী হলেন। তাঁর ক্ষমতারোহনের দীর্ঘদিন পর্যন্ত বাংলায় হিজরী সন রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিলো।
বিশ্বের একমাত্র ছয় ঋতুরদেশ বাংলাদেশে চাঁদের তারতম্যের কারণে চন্দ্র মাসের হিসাবে খাজনা আদায়ের দিন নির্দিষ্ট করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাংলার জনগণ সম্রাটের নিকট এই অসুবিধার কথা উপস্থাপন করলে সম্রাট এই সমস্যা নিয়ে নবরতœ সভায় আলোচনায় বসলেন। সেই সভার অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য আবুল ফজল এই সমস্যার সমাধানের দায়িত্ব রাজ্যের বিশিষ্ট্য জ্যোতিষ বিজ্ঞানী আমীর ফতেহ উল্লাহ সিরাজীকে দেয়ার পরমর্শ দিলেন। শেষ পর্যন্ত সর্বসম্মতিক্রমে সম্রাট তাই করলেন। পন্ডিত সিরাজী প্রচুর গবেষনা করে একটি সন উদ্ভাবন করেন, যার নাম হয় এলাহী সন, ফসলী সন এবং বাংলা সন। বাংলা সনের উৎপত্তি মূলত হিজরী সন থেকে। সম্রাট আকবর অতঃপর বাংলা অঞ্চলের রাজস্ব আদায়ে বাংলা সন ব্যবহার করতে শুরু করেন। ইংরেজ শাসনের পূর্ব পর্যন্ত বাংলা অঞ্চলের সরকারী ক্যালেন্ডার বাংলায় চালু ছিলো।
ইংরেজরা পলাশীতে শুধু বাংলার শাসন ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়নি বরং সর্বপ্রকার চেস্টা চালিয়েছে এই অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য-সংস্কৃতির অস্তিত্ব ধ্বংস করে দিতে। ইংরেজদের আনুকূল্যে এদেশেও একদল দালাল শ্রেণীর উৎপত্তি হয় যারা এ অঞ্চলের শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ইত্যাদি ধ্বংসের পথে ইংরেজদের সহযোগি হন। এক্ষেত্রে বেশি ভূমিকা রাখেন কোলকাতা কেন্দ্রিক বর্ণবাদি হিন্দু ব্রহ্মনেরা। ওদের সহযোগিতায় ইংরেজরা শুরু করে সর্বপ্রকার অত্যাচারের সাথে ইতিহাস বিকৃতি। এক্ষেত্রে বেশি আক্রান্ত হলেন বাংলার মুসলিম সম্প্রদায়। দীর্ঘ দু’শ বছরের পরাধীনতার ফলে বাংলার মুসলমানরা আস্তে আস্তে ক্ষমতার সাথে সব কিছু হারাতে লাগলেন। এই অসহায় অবস্থার মধ্যদিয়ে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষের স্বাধিনতার পাশাপাশি বিভক্তির মধ্যদিয়ে পাকিস্তানের জন্ম।
পাকিস্তানের শাসকেরা উর্দু জাতীয়তাবাদের নামে পাঞ্জাবী শাসন শুরু করলে এক পর্যায়ে শুরু হলো সংঘাত। সংঘাতে তারা ইসলামকে করে নিলো হাতিয়ার। অবশেষে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে নয় মাস যুদ্ধের বিনিময় বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশ স্বাধীন দেশের সম্মান পেলেও শিক্ষাদীক্ষায়, অর্থনীতিতে আজও এই দেশ পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার স্বাদ নিতে পারেনি। বৃটিশদের তৈরী শিক্ষার প্রভাবে আজও দেখা যায় আমাদের শিক্ষিতদের মস্তিষ্কে চাকুরিÑনকরিÑআমলাÑকামলা হওয়া কিংবা বিদেশ যাওয়া ছাড়া স্বচ্ছ স্বদেশী চিন্তা তেমন একটা নেই। ফলে আমাদের প্রায় সকল ক্ষেত্রে আজ স্বদেশী চিন্তা থেকে বেশি বিদেশমুখিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নোংরা রাজনীতির খেলা চলছে বিদেশীদের চোখের ইশারায়। এই খেলায় জাতির বিবেক বলে খ্যাত বুদ্ধিজীবীদের পর্যন্ত বুদ্ধিলুপ্ত হয়ে আছে। বিশেষ করে ইতিহাসের বিকৃতিটা খুবই লজ্জাজনক। ফলে আমরা জাতীয়ভাবে নিজেদের আত্মপরিচয় হারিয়ে ফেলছি দিনÑদিনে। আজকের আলোচনায় আমরা সেদিকে দৃষ্টিপাতের চেষ্টা করবো। আমরা যদি এই সকল বিকৃতি থেকে আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করতে পারি তবেই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে।
১লা বৈশাখ নববর্ষ, আমাদের বাঙালিদের সংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ্বের বিভিন্ন জাতি নববর্ষ উদযাপন করলেও খুব কম জাতির নিজস্ব ক্যালেন্ডার রয়েছে। এদিক দিয়ে আমরা গর্ব করতে পারিÑআমাদের নিজস্ব ক্যালেন্ডার রয়েছে। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে বাংলা সন কিংবা নববর্ষের সাথে হিন্দু সংস্কৃতির ঐতিহ্যগত কোন সম্পর্ক নেই। তবে এখন আর এই বিভাজনের সময় নয়। বাঙালি মানেই যেকোনভাবে বাংলা সনের উত্তরাধিকারী, তা সবাইকে মেনে নিতে হবে।
বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সাবেক খতীব শায়খুল হাদীস আল্লামা উবায়দুল হক মরহুম ৩০শে মার্চ ২০০ খ্রিস্টাব্দ শুক্রবারে জুমার খুতবায় নববর্ষ উদযান ও আমাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে বলেছিলেনÑ‘আমাদের দেশে বিজাতীয় সংস্কৃতির আমদানী আশংকাজনকভাবে বেড়ে গেছে। আজ মুসলিম নামধারি লোকগণ সংস্কৃতির নামে ধুতি পরে, ভাস্কর্যের নামে মূর্তি বানিয়ে শহর সাজায়। এসব তৎপরতায় মুসলমানদের সম্মানহানি হচ্ছে। আজ আমরা এক গুরুতর পরীক্ষার সম্মুখিন হয়েছি। আগামী শুক্রবার হিজরী নববর্ষ অর্থাৎ ইসলামী নববর্ষ আর তার পরবর্তী শুক্রবার হচ্ছে বাংলা নববর্ষ। আমাদের দেশে ইসলামী নববর্ষ উদযাপনের রেওয়াজ তেমন একটা নেই। কিন্তু বাংলা নববর্ষ উদযাপন হয়। এ উপলক্ষে পহেলা বৈশাখ যে উৎসবের আয়োজন দেখা যায় তাতে মুসলমানিত্বের চিহ্নিটুকু থাকে না। বাংলা বা ঈসায়ী নববর্ষ উদযাপনে ইসলামে কোন বাধা নেই। কিন্তু হিজরী নববর্ষ মুসলমানদের ঐহিত্য। ইসলামী বর্ষ অনুযায়ী হিসাব নিকাস রাখা মুসলমানদের জন্য ফরজে কেফায়া। অন্তত এক ব্যক্তিও যদি তা না করে তাহলে পুরো উম্মাহ গুনাহগার হবে। স্মরণ রাখবেন, সকল ইজ্জত ও সম্মান আল্লাহর হাতে, মুসলমানেরা ইসলামের তাহজিব তামাদ্দুন হুবহু মানতে বাধ্য। কিন্তু মুনাফেকরা তা গ্রহণ করে না। তারা অন্য জাতির সংস্কৃতি অনুরণ করে সম্মানিত হতে চায়। এতে তাদের জিল্লতিই কেবল বাড়ে। আল্লাহ মুসলমানদের জন্য শরিয়তের সংস্কৃতি দিয়েছেন। আমাদের তাই অনুসরণ করতে হবে। মুর্খ জাহিলদের সংস্কৃতি অনুসরণ করলেও আমাদের সম্মান বাড়বে না বরং কমবে। বাংলা নববর্ষ উদযাপন করতে গিয়ে আমাদের এমন কাজ করা উচিৎ হবে না যা করলে অন্য জাতির লোকেরা উপহাস করে বলবে দেখো আমাদের সংস্কৃতি ওরা অনুসরণ করে চলছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ দেশে ভাস্কর্যের নামে ভুতপরাস্তি শুরু হয়েছে অথচ আমরা চুপচাপ বসে অছি। এই সব ভুতপরস্তির বিরুদ্ধে আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। (দৈনিক সংগ্রাম, ১লা এপ্রিল, ২০০০ পৃ ১-২) ।
দারুল উলুম হাটহাজারীর প্রখ্যাত মুহাদ্দিস এবং হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব হাফেজ মুহাম্মদ জুনাইদ বাবুনগরী ১২ এপ্রিল ২০১৮, সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে বলেন, পহেলা বৈশাখের দিন বাংলা নববর্ষ উদযাপনের নামে বিভিন্ন জীবজন্তুর মূর্তি নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা পালন করা মুসলমনাদের ঈমান-আক্বিদা বিরোধী একটি অনৈসলামিক ও বিজাতীয় সংস্কৃতি। নতুন বছরের প্রথম দিনে নারী পুরুষের মুখে উল্কি আঁকা, বড়বড় পুতুল, হুতোম পেঁচা, হাতি, কুমির সাপ, বিচ্ছু, ও ঘোড়াসহ বিভিন্ন জীব-জন্তুর মুখোশ পড়া প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ একসঙ্গে অশালীন পোশাক পরে অশ্লীল ভঙ্গিতে ঢোল বাদ্যের তালে তালে নৃত্য করে র‌্যালি করার হিন্দুয়ানি যে রীতি রাষ্ট্রীয়ভাবে মুসলমানদের ওপর জোর করে চালু করা হচ্ছে, তা ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম। (ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম। ১২ এপ্রিল ২০১৮)।
এই দুই ফতোয়ার মধ্যে মুসলমানদের জন্য কিছু দিক নির্দেশনা রয়েছে। তবে কথা থেকে যাচ্ছে, শুধু ফতোয়া দিয়ে অন্য সংস্কৃতির মোকাবেলায় নিজের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। সংস্কৃতি বিষয়টা যেমন মানুষের বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত তেমনি অভ্যাসের সাথেও। জলে যখন ঢল নামে তখন শুধু বাঁধ দিয়ে জলকে থামানো যায় না। জলের ¯্রােত এক সয়ম ভেঙে ফেলে সকল বাঁধ এবং সে তার নিজের মতো স্বাধীনভাবে চলতে থাকে। তাই বাঁধের সাথে সাথে ¯্রােত নিয়ন্ত্রনের জন্য বিকল্প পথও করে রাখতে হয়। এই বিকল্প পথ থেকেই খাল-বিল, নদী-নালা, হাওর ইত্যাদির জন্য। সাংস্কৃতিক কর্মসূচীর মোকাবেলায় সাংস্কৃতিক কর্মসূচির প্রয়োজন। নতুবা শুধু ফতোয়া দিয়ে তা থামানো যাবে না।
আরবী তাহজিব শব্দের বাংলা হলো সংস্কৃতি এবং ইংরেজী কালচার। তার আভিধানিক অর্থ গাছের কাটা বা অপ্রয়োজনীয় অংশ ছেটে ফেলা। সামাজিক পরিভাষায় বিশ্বাসলব্দ মূল্যবোধে উদ্ভুত পরিশীলিত ও মার্জিত কাজগুলোকে সংস্কৃতি বলে। সকল সংস্কৃতির উৎস মানুষের মনের বিশ্বাস। শুধু নববর্ষে নয়, আমাদের সকল কর্ম হোক শুভ এবং কল্যানময় আর নববর্ষগুলো হোক আমাদের দেশ, জাতি এবং আগামী প্রজন্মের জন্য শান্তি এবং কল্যাণের মাইলফলক।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • প্রাথমিক শিক্ষার গবেষণাধর্মী বই
  • কেমন মেয়র চাই
  • সেলফি ব্রীজ
  • সেলফি ব্রীজ
  • সেলফি ব্রীজ
  • প্লাস্টিকের ভয়াল থাবা
  • আব্দুল¬াহ আল মাহবুবশিক্ষার্থীর বিকাশে পরিবারের ভুমিকা
  • আজকের দিন আজকের দিকে তাকাও
  • সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম নেয়া হোক
  • সিলেটের ডাক
  • নারীর প্রতি সহিংসতা প্রসঙ্গে
  • সিলেটের ডাকের শিশুমেলা
  • সবুজ প্রবৃদ্ধির কৌশল : পরিবেশ-প্রতিবেশ
  • এরদোগানের শাসনে তুরস্কের ভবিষ্যৎ
  • বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান এবং নদী রÿার্থে করণীয়
  • পয়ত্রিশ বছরে সিলেটের ডাক
  • আমরা কি কেবল দর্শক হয়েই থাকব?
  • কাবিনবিহীন বিয়ে, প্রতারণা ও আমাদের আইন
  • স্মার্টফোনে বন্দি জীবন
  • দৃষ্টিপাত নেশার নাম ড্যান্ডি!
  • Developed by: Sparkle IT