সম্পাদকীয় তোমরা যদি প্রকৃত মোমেন হও, তবে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখো। -আল হাদিস

কারাগার এখন ‘উন্মুক্ত’!

প্রকাশিত হয়েছে: ১৬-০৪-২০১৮ ইং ০২:৪৬:৫৬ | সংবাদটি ১২৩ বার পঠিত

কারাগার হয়ে যাচ্ছে সংশোধনাগার। দীর্ঘদিন ধরেই শুরু হয়েছে এই প্রক্রিয়া। শুধু শাস্তি প্রয়োগের স্থান নয়, কারাগারকে উন্নত বিশ্বের ন্যায় প্রকৃত সংশোধনাগারে রূপান্তরে এগিয়ে যাচ্ছে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। এতে ব্যয় হচ্ছে হাজার কোটি টাকা। মূলত বন্দীর হাতকে কর্মীর হাতে রূপান্তর করতেই সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে এখন দ্রুতই পাল্টে যাচ্ছে কারাগারের ভেতরের ও বাইরের দৃশ্য। কারা নিয়ম কানুনও অনেকখানি পাল্টে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে আরেকটি সংবাদ মিডিয়ায় এসেছে। তা হলো, উন্মুক্ত কারাগার। দেশে প্রথমবারের মতো সীমানা প্রাচীরবিহীন উন্মুক্ত কারাগার (ওপেন জেল) প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। দেশের কারাগারগুলোতে ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণ বন্দী রয়েছে। অপরদিকে আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার স্তুপ জমে আছে। এতে অনেক নিরপরাধ লোক মামলা শেষ না হওয়ায় বন্দীদশা থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না। বাড়ছে প্রতিদিন বন্দীর সংখ্যা। এই অবস্থায় উন্মুক্ত কারাগার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে। তবে এ নিয়ে অনেকের নেতিবাচক অভিমতও রয়েছে।
কারাগার অপরাধীদের আশ্রয়স্থল। বিচারাধীন মামলার আসামী কিংবা সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের নির্দিষ্ট মেয়াদে কারাভোগ করতে হয়। কারাবন্দীদের নির্ধারিত নিয়মকানুন মেনে ‘শৃংখলিত’ জীবন যাপন করতে হয় কারাগারে। কারাবিধি অনুযায়ী বন্দীরা অপরাধী হলেও তাদের প্রতি মানবিক আচরণ করতে হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই কারাবন্দীরা প্রাপ্য অধিকারটুকু ভোগ করতে পারছে না। বিশেষ করে কারাগারগুলোতে ধারণ ক্ষমতার বেশি বন্দী থাকায় গাদাগাদি করে থাকতে হয় তাদের। এতে বন্দীদের মৌলিক অধিকার লংঘিত হচ্ছে। জানা গেছে, দেশের কারাগারগুলোতে ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দী রয়েছে। বর্তমানে ৬৮ কারাগারে বন্দীর সংখ্যা কমপক্ষে ৭০ হাজার। যে কারণে কারাগারগুলোকে সংশোধনাগারে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনাও এগুচ্ছে না। যদিও সরকার এ ব্যাপারে বেশ জোরেশোরেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি সূত্রে বলা হচ্ছে, কারাগারে বইছে এখন পরিবর্তনের নতুন হাওয়া। পাল্টে যাচ্ছে অনেক কারা নিয়ম-কানুন। তাছাড়া, কারাবন্দীর সঙ্গে স্বজনদের মোবাইল ফোনে কথা বলার সুবিধাও চালু হয়েছে।
বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হচ্ছে। এমনি সুন্দর মুহূর্তে আমাদের কারাগারগুলোও উন্নত হবে, কারাবন্দীদের জীবনমান বদলে যাবে- এটাই স্বাভাবিক। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কারাগারগুলো ‘সংশোধনাগারে’ পরিণত হবে, এই প্রত্যাশাতো আমরা করতেই পারি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের কারাগারগুলোর বর্তমান যে অবস্থা তা থেকে রাতারাতি উত্তরণ ঘটানো সম্ভব নয়। যেখানে ধারণ ক্ষমতার দ্বিগুণ-তিনগুণ বন্দী থাকে, সেখানে বন্দীরা প্রাপ্য চিকিৎসা, খাবার কিংবা অন্যান্য সুযোগ সুবিধাগুলো পাচ্ছে না যথাযথভাবে, সেখানে বন্দীরা সংশোধন হয়ে ‘পুতপবিত্র’ অবস্থায় জেল থেকে বের হবে- এটা আশা করা যায় না। আর ফলে যা ঘটবার তাই ঘটছে। অনেক দাগী অপরাধীই জেলে সাজার মেয়াদ শেষে আরও ভয়ংকর রূপ নিয়েই বের হচ্ছে। বাড়িয়ে দিচ্ছে অপরাধের মাত্রা।
কারাগারগুলোর যখন এই অবস্থা তখনই শোনা গেলো একটি সংবাদ। এটা একটা সুসংবাদ তো অবশ্যই। তা হলো- দেশে প্রথমবারের মতো নির্মিত হচ্ছে উন্মুক্ত কারাগার। কক্সবাজারের উখিয়ায় এই উন্মুক্ত কারাগার (ওপেন জেল) স্থাপিত হবে। তিনশ’ দশ একর জমিতে এটি প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ ব্যাপারে সরকারের নীতি নির্ধারকরা বলছেন উন্মুক্ত কারাগার হচ্ছে বন্দীদের পুন:সামাজিকীকরণ’ এর একটি মাধ্যম। যেখানে প্রচলিত কারাগারের মতো থাকবে না উচু প্রাচীর, থাকবে না স্বাভাবিক চলাচলে বিধিনিষেধ। এশিয়ার শ্রীলংকা, মালয়েশিয়াসহ উন্নত বিশ্বের অন্যান্য দেশে এই ধরণের কারাগার রয়েছে। এ জাতীয় কারাগার দেশগুলোর জাতি ও সভ্যতার উন্নয়নকেও প্রতিফলিত করে। সেদিক থেকে বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রে উন্মুক্ত কারাগার প্রতিষ্ঠার বিষয়টি খুবই ইতিবাচক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে পুরো বিষয়টি নির্ভর করছে সমাজ, সভ্যতা, বিবেকবোধ সর্বোপরি মানুষের সুস্থ স্বাভাবিক মনমানসিকতার ওপর। যেখানে উঁচু দেয়ালঘেরা কারাগার থেকেও পালিয়ে যাওয়ার ফাঁক ফোঁকর বের করছে বন্দীরা, সেখানে দেয়ালবিহীন কারাগার- এর সিদ্ধান্ত কি ‘হাস্যকর’ নয়? তার পরেও আমাদের প্রত্যাশা, যেকোন ধরণের কারাগারই হোক, তা যেন সত্যি সত্যিই সংশোধনাগারে পরিণত হয়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT