ইতিহাস ও ঐতিহ্য

সুবিধাবাদীদের পরিণতি

আতিকুর রহমান নগরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৪-২০১৮ ইং ০২:২৯:৫৫ | সংবাদটি ৩৯ বার পঠিত

সুখ-দুখ, হাসি-কান্নার চার দেয়ালে বেষ্টিত আমাদের জীবনযাত্রা। স্থায়ী ক্যাম্পাসে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরার টিকিট পেতে হলে ক্ষণস্থায়ী এই ক্যাম্পাসে কেয়ারফুল হয়ে পা ফেলতে হয়।
ছোট্ট এ জীবনে আপন স্বার্থ পূরণের মধ্যেই কেউ কেউ খুঁজে পায় স্বার্থকতা। স্বার্থের জন্য ভুলে যায় অতীত। বিসর্জন দেয় বিবেক-কৃতজ্ঞতা বোধ।
উপকারীর বুকে ছুরি চালাতেও কেউ কেউ কুণ্ঠিত হয় না। আমাদের আশপাশেই আছে এ রকম সে ঘাতক-নিমকহারাম প্রকৃতির লোকজন। ইতিহাসে তাদের নাম হয়তো কখনো ঠাঁই পাবে না। তবে ইতিহাস বলে, নিমকহারাম আর সে ঘাতকদের পরিণতি হয় ভয়াবহ।
ইতিহাসের এমনই এক অমর চরিত্র মীরজাফর। যার সম্পূর্ণ নাম মীর জাফর আলী খান। তিনি ছিলেন বাংলার এক পুতুল নবাব। মীরজাফর প্রথমে নবাব সিরাজউদ্দৌলার একজন অমাত্য ছিল। ব্যক্তিগত সম্পর্কে সে ছিল নবাব সিরাজউদ্দৌলার খালু। নবাব সিরাজউদ্দৌলার শাসনামলে মীরজাফর ছিল তার প্রধান সেনাপতি।
মীরজাফর প্রথম জীবনে নবাব আলীবর্দী খানের কাছে পালিত হয়। উচ্চবংশীয় মুসলমান সন্তান হওয়ায় নবাব তাকে খুব স্নেহ করতেন। নবাব তার বৈমাত্রেয় বোন শাহ খানমকে বিয়ে দেন মীরজাফরের সাথে। মারাঠা যুদ্ধে শৌর্য-বীর্যে মীরজাফর বেশ সুনাম অর্জন করে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে ছিল খুব ক্ষমতালোভী এবং চালবাজ।
নবাব আলীবর্দী খান তার দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলাকে বাংলার নবাব করায় ক্ষুব্ধ হয় মীরজাফর। তাই সে প্রধান সেনাপতি হয়েও কখনোই সিরাজউদ্দৌলাকে নবাব হিসেবে মেনে নিতে পারেনি।
আতাউল্লাহর সাথে আঁতাত করে বাংলা দখলের ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে গেলে নবাব তাকে পদচ্যুত করেন। কিন্তু পরে ক্ষমা করে দেন। ১৭৫৬ সালে আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর নবাব সিরাজউদ্দৌলা তাকে পুনরায় সেনাপতি পদে বহাল রাখেন।
মীরজাফর কে নবাব না করায় সে সব সময় চেয়েছে বাংলার নবাবের পতন। তাই সে ঘাতকতা করে সে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রবার্ট ক্লাইভের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং পলাশীর যুদ্ধে তার কারণেই ব্রিটিশদের হাতে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ঘটে। এই যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মীরজাফরকে নবাবের মসনদে অধিষ্ঠিত করে।
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে ইংরেজ বেনিয়াদের সাথে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সৈন্যদের লড়াই হয়। এই যুদ্ধে নবাবের পক্ষে স্বাধীনতা রক্ষার লড়াইয়ে প্রধান সেনাপতি ছিল মীরজাফর আলী খান। তার সাথে ছিলেন মীর মদন আর মোহন লাল। মীর মদন আর মোহন লাল ইংরেজদের বিরুদ্ধে বীর বিক্রমে লড়াই করে পরাজিত হন। আর যুদ্ধের ময়দানে ৫০ হাজার সৈন্য নিয়ে পুতুলের মতো নীরব দাঁড়িয়েছে থেকে প্রধান সেনাপতি মীরজাফর আলী খান ও তার দোসররা ধূর্ত ইংরেজ বেনিয়া লর্ড ক্লাইভের হাতে বাংলার শাসন ক্ষমতা তুলে দেয়। পরাজিত হন বাংলা, বিহার উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। মুষ্টিমেয় ইংরেজ শাসক, সে ঘাতকদের সহায়তায় বাংলায় তাদের শাসন ক্ষমতা পোক্ত করে এবং সোয়া ২০০ বছর এ দেশ শাসন করে। সেই থেকেই মীরজাফরের নাম সে ঘাতকতার রূপক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
মীরজাফর একটা মানুষরূপী কালসাপ। মীরজাফরের সে ঘাতকতার জন্য তার নামটি সে ঘাতকের প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। একটু খেয়াল করলেই দেখা যায় বাংলাদেশে মীরজাফর নামে কারো নাম রাখা হয় না।
সুচতুর লর্ড ক্লাইভ যুদ্ধের পর মীরজাফরকে সিংহাসনে বসায় ঠিকই কিন্তু ক্ষমতা রাখে নিজের হাতে। কিছুদিন পর তার ইংরেজ প্রভুরা এ বিশ্বাস ঘাতককে বিশ্বাস করতে পারে না। এ বিশ্বাস ঘাতককে তারা ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। ইংরেজরা ভাবে, যে ব্যক্তি সামান্য ক্ষমতার লোভে তার দেশ ও জাতির সাথে যে বিশ্বাস ঘাতকতা করতে পারে তারা সাত সাগর তের নদীর ওপার থেকে এসে তাকে বিশ্বাস করবে কোন ভরসায়?
নবাবী চলে যাওয়ার পর মীরজাফর আলী খান দারুণ অর্থকষ্টে পড়ে। কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয় সে। রোগের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে এক তান্ত্রিকের পরামর্শে হিন্দু দেবী মূর্তির পা ধুয়া পানি খাওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। বেঈমান হয়ে কুষ্ঠরোগে শয্যাশায়ী অবস্থায় মারা যায় এ সে ঘাতক।
ষড়যন্ত্র আর সে ঘাতকতার মাধ্যমে নিজের জন্মভূমিকে যে বিদেশি শত্রুর হাতে তুলে দিয়েছিল তার পরিণতি ভালো হয়নি। এ ঘটনা থেকে এ শিক্ষাই পাওয়া যায়, দেশ ও জাতির সাথে যারা বিশ্বাস ঘাতকতা করে এ দুনিয়াতেই তাদের শাস্তি পেতে হয়। আর পরকালের অনন্ত শাস্তি তো তাদের পেতেই হবে।
আসুন, বিশ্বাসের দাম দেই। বিশ্বাসীদের ভালোবাসি। বিশ্বাস নামের সুউচ্চ মিনারের নিচে সমবেত হই। সম্প্রীতি আর ভ্রাতৃত্বের সমাজ গঠনে ঐক্যবদ্ধ হই।

 

 

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • জাফলং নামকরণের ইতিকথা
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • জলপ্রপাতের নাম হামহাম
  • কেমুসাসের কাচঘেরা বাক্সে মোগল স¤্রাটের হাতে লেখা কুরআন
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • বরইতলা গণহত্যা সম্পর্কে আজিজুল হক
  • ঐতিহ্যবাহী গ্রাম জলঢুপ
  • বাংলাদেশের বয়ন ঐতিহ্য
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • ইতিহাস গবেষক দেওয়ান নূরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী
  • লৌকিক শিল্প নকশি পিঠা
  • জেনারেলের বাড়িতে গণহত্যা
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • হত্যাকারির নাম বলা যাবে না
  •  প্রযুক্তির অপব্যবহারে বিপন্ন নারী-শিশু ও যুবসমাজ
  • মুক্তিযুদ্ধে লাউয়াই
  • সুবিধাবাদীদের পরিণতি
  • পার্বত্য সংকটের মূল্যায়ন
  • ঝরনা কলম : আজ বিলুপ্তপ্রায়
  • মুক্তিযুদ্ধে পুণ্যভূমি সিলেটের সূর্যসন্তানরা
  • Developed by: Sparkle IT