ইতিহাস ও ঐতিহ্য

 প্রযুক্তির অপব্যবহারে বিপন্ন নারী-শিশু ও যুবসমাজ

ফারিহা হোসেন প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৪-২০১৮ ইং ০২:৩৩:২২ | সংবাদটি ১২৩ বার পঠিত

অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে মোবাইল ফোনের অপব্যবহারে ‘মোবাইল ভিডিও’ নামক ভয়ঙ্কর উপসর্গ ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সমাজে। মোবাইলের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য, কথোপকথন, ভিডিও চিত্র মুহূর্তেই চলে যাচ্ছে সর্বত্র। আর এর প্রধান টার্গেট তরুণী ও মহিলারা।
যাযাবর তার দৃষ্টিপাতে-এ লিখেছিলেন, আধুনিক বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ। তাতে আছে গতির আনন্দ, নেই যতির আয়েস।' আজ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিস্ময়কর উত্থাপন ও প্রসারের এই সময়ে এটা নির্দ্বিধায় বলা যায়- বিজ্ঞান আমাদের বেগ দিয়ে আবেগকে কেড়ে নেয়নি বরং আমরা নিজেরেই কখনো জেনে, আবার কখনো না জেনে, না বুঝে আবেগকে বিসর্জন দিয়েছি। এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, 'বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ও সভ্যতার চাকা একই সুতোয় গাঁথা। এখন মানুষের জীবনযাপনের জন্য, জীবনকে গতিময়, ছন্দময় করে সাজাতে এসব উপকরণ প্রাসঙ্গিক এবং নিত্য অপরিহার্য। এসব ছাড়া উন্নত জীবন, সভ্যতা যেন কল্পনারও অতীত। প্রতি মুহূর্তে প্রযুক্তির নতুন নতুন উদ্ভাবনে জীবন বদলে যাচ্ছে। এখন প্রশ্নটা জরুরি যে, মানুষ প্রযুক্তির ওপর ভর করে একে পরিচালনা করবে, না প্রযুক্তিই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে? এর সহজ ও সোজাসাপ্টা উত্তর হচ্ছে, না মানুষের জন্য প্রযুক্তি হলেও মানুষ প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণে ও আয়ত্বে এনে জীবনকে, তাদের কাজকে আরও বেগবান, গতিশীল, সুন্দর করবে। সতর্কতার সঙ্গে প্রযুক্তির প্রয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জীবন, জীবনের পথ চলা, উন্নতি, অগ্রগতি সাধনে এবং সমৃদ্ধিতে যতটুকু প্রয়োজন এর সুফল ততটুকুই গ্রহণ করা। প্রযুক্তির বিশাল সাম্রাজ্যে নিজেকে 'বেহিসেবী করে প্রযুক্তির হাতে নিজেকে সফে দিলে বিপর্যস্ত হতে পারে জীবন, থেমে যেতে পারে জীবনের সবটুকু গতি, অর্জন, এমন কি মৃত্যু ঝুঁকিও তাড়া করতে পারে মানুষকে।
হএটি সত্য যে, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের অগ্রগতির এই যুগে এর অগ্রযাত্রা যেমন থামানো যাবে না, তেমনি এর অপপ্রয়োগ রোধ করা এবং সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। মানুষ সবকিছু সহজে, হাতের কাছে পেতে চায়। আজকের ইন্টারনেট প্রযুক্তি, স্মার্টফোন মানুষে মানুষে যোগাযোগ স্থাপনকে করেছে অতি সহজ। এটি যেন জাদুর কাঠি। আঙুল চাপতেই ভাগ্যের বরপুত্রের কাছে আলাদিনের দৈত্য এসে হাজির, 'হুকুম দিন জাহাপনা, কী করতে পারি'?। ব্যস, কেল্লা ফতে। কী নেই মোবাইলে, ইন্টারনেটে-গুগুলে, ইউটিউব, ইয়াহুসহ নানান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এসবে সবরকম তথ্যই মেলে। কিন্তু কোনো তথ্য গ্রহণ করবেন, ফেসবুকে কার আহ্বানে সাড়া দেব, কাকে প্রত্যাখ্যান করব এসব একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে এ ক্ষেত্রেই সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। আবার এসব বাচবিচারের ক্ষেত্রে বয়স, অবস্থানও অনেক কিছু নির্ভর করে। যেখানে যাই সেখানেই মোবাইল, ছোট-বড় সবার হাতে মোবাইল। সকাল, দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যা, রাত সারাক্ষণ হাতে মোবাইল, ফেসবুকে চোখ। ফেসবুক চর্চায় অনেকেরই বিনিদ্র রাত কাটে। এতে ঘুম ব্যাহত হয়। দিনের কাজের বিরূপ প্রভাব পড়ে। শ্রমশক্তির অপচয় হয়। কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী সবাই ব্যস্ত, এ কী কা-! বছরে একশ টাকার বই হাতে উঠবে না, কিন্তু ১০, ২০, ৫০ হাজার টাকার মোবাইল সেট কিনতে টাকা যেন ভূতে জোগায়!
প্রযুক্তি তো জীবনকে সহজ করার জন্য, সুন্দর করার জন্য। অবশ্য এর জন্য প্রয়োজন হয় সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির কারণে প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার হতে পারে, আবার হতে পারে অপব্যবহারও। এখন এর ব্যবহারের চেয়ে অপব্যবহারও বাড়ছে সমান হারে। এটা বিপদজ্জনক। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক একাউন্ট হ্যাক করে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনাও ঘটেছে প্রযুক্তির অপব্যবহারে।
এ ক্ষেত্রে মুঠোফোনের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। মুঠোফোন এখন খুবই জনপ্রিয় একটি প্রযুক্তি। প্রতিদিনই এর গ্রাহক বাড়ছে। মানবসভ্যতার বিস্ময়কর বিকাশে বিজ্ঞান যে অনন্য ভূমিকা পালন করছে তার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হলো মোবাইল ফোন। তথ্য আদান-প্রদানে মোবাইল ফোন যুগান্তকারী বিপ্লব এনেছে। বর্তমানে কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের সমন্বিত এ মিনি সংস্করণ ছাড়া যেন এক মুহূর্তও কল্পনা করা যায় না। অতিদ্রুত পৃথিবীর যেকোনো স্থানে যোগাযোগ ক্ষমতা ও নানাবিধ সুবিধার কারণে সারাবিশ্বে মোবাইল ফোন ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। মোবাইল ব্যাংকিং দেশের একটি জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে ওঠেছে। এটা প্রযুক্তির সুফল।
মোবাইল ফোনের কোম্পানিগুলো তরুণ-তরুণীদের আকৃষ্ট করার জন্য নানা অফারও দিয়ে থাকে। এর মধ্যে একটি হলো গভীর রাতের সাশ্রয়ী অফার। রাত জেগে তরুণ-তরুণীরা আসলে ফোনের কতটা সদ্ব্যবহার করে তা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা হতে পারে। মোবাইল ফোন এখন প্রতারক, তরুণী, যুবতি, অর্থ সম্পদশালীদের প্রতারণার ফাঁদে ফেলে সম্পদ, জীবন, সম্ভ্রম লুটে নেয়ার ঘটনা ঘটে। আবার সন্ত্রাসীদের জন্যও একটি মোক্ষম অস্ত্র হয়ে উঠেছে। মোবাইল ফোনের সহায়তায় বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। সাধারণ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করলেও এ বিষয়ক অপকর্মগুলো সম্পর্কে খুব একটা সচেতন নয়। ফলে প্রতিদিনই কেউ না কেউ মোবাইল ফোন প্রতারণার শিকার হচ্ছে। মোবাইল ফোনে কল বা মিসকল দিয়ে মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা, অশোভন মেসেজ পাঠানো, চাঁদাবাজি করা, হুমকি দেয়া এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করার ঘটনা ঘটছে। মোবাইল ফোনের এ অপব্যবহারের ফলে হুমকির মুখে পড়ছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। এ ব্যাপারে এখনই পদক্ষেপ না নিলে এ প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। মোবাইল ফোন আমাদের জীবনে গতি আনলেও এর অপব্যবহার নিয়ে মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের ভীতি। বাড়ছে আত্মহনন নারী নির্যাতন, অশ্লীল মেমোরি কার্ড তরুণদের হাতে, আইসিটি অ্যাক্ট থামাতে পারছে না সাইবার ক্রাইম।
এ সমস্যা সমাধানে সরকারি সংস্থাসমূহ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আইসটি সংশ্লিষ্টদের গুরু দায়িত্ব রয়েছে। একই সঙ্গে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষর্থীদের প্রশিক্ষণ, জনসচেতনা বৃদ্ধি জরুরি। মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন দিয়ে গ্রাহকদের সচেতন করে তোলা জরুরি। এ জন্য যথাযথ পরিচয়পত্র জমা দিয়ে মোবাইল সিম ক্রয় করা যেমন বাধ্যতামূলক, তেমনি অভিভাবকদের খেয়াল রাখা উচিত যে তাদের সন্তানরা মোবাইল ফোন কী কাজে ব্যবহার করছে। মোবাইল ফোনের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে আমাদের জীবন ও জগৎ বর্ণিল হয়ে উঠবে।
অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে মোবাইল ফোনের অপব্যবহারে 'মোবাইল ভিডিও' নামক ভয়ঙ্কর উপসর্গ ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সমাজে। মোবাইলের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য, কথোপকথন, ভিডিও চিত্র মুহূর্তেই চলে যাচ্ছে সর্বত্র। আর এর প্রধান টার্গেট তরুণী ও মহিলারা।
হএর হাত ধরে কলুষিত হচ্ছে গোটা যুবসমাজ। সহজলভ্য মোবাইল ভিডিওর হাত ধরে তরুণরা প্রবেশ করছে নিষিদ্ধ জগতে। নেশা থেকে পেশাদার অপরাধীতে পরিণত হচ্ছে তারা। সম্ভ্রম হারিয়ে নারীরা বেছে নিচ্ছেন আত্মহননের পথ। ভাঙছে সংসার, ধ্বংস হচ্ছে পরিবার। এই মোবাইল ব্যবহারের মাধ্যমে তারা মেতে উঠেছে পর্নোগ্রাফি দেখায়। তাদের কাছে পর্নোগ্রাফি মানে আধুনিকতা। বিভিন্ন কম্পিউটারের দোকান, ইন্টারনেট থেকে এসব পর্নো ভিডিও ডাউনলোড করে খুব সহজেই দেখছে তারা।
আইসিটি অ্যাক্ট অনুযায়ী সাইবার ক্রাইমের দায়ে দন্ডিত হলে ১০ বছরের কারাদ- এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থদন্ডের বিধান রয়েছে। প্রকারান্তরে এ ধরনের অপরাধের কারণে যদি কারও অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় তবে হত্যা অথবা হত্যার প্ররোচণার (ফৌজদারি কার্যবিধির ৩০২ ও ৩০৪ ধারা) অভিযোগেও অভিযুক্ত হতে পারে, যার শাস্তি যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদ-ও হতে পারে। আইন থাকলেও তা প্রয়োগে দুর্বলতার কারণে কোনোভাবেই প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না এ অপরাধ। মোবাইল ফোন অপব্যবহার কমাতে আমাদের সবার করণীয়, প্রত্যেক পিতা-মাতার তার সন্তানকে পরিপূর্ণ বয়সে পরিণত হওয়ার পর মোবাইল ফোন দেয়া এবং এর অপব্যবহার সম্পর্কে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলা অভিভাকদের দায়িত্ব।
লেখক : কলামিস্ট

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • বদর বাহিনীর হাতে শহীদ হন সাদেক
  • বানিয়াচংয়ের ভূপর্যটক রামনাথ
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্র এবং বাগ্মী বিপিন
  • সিলেটের গৌরব : কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রকৃতিকন্যা সিলেট
  • ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম ক্ষেত্র
  • ইতিহাস সমৃদ্ধ জনপদ জামালপুর
  • সুনামগঞ্জের প্রথম নারী সলিসিটর
  • ইতিহাস-ঐতিহ্যের লীলাভূমি সোনারগাঁও
  • হারিয়ে যাওয়া বর্ণমালা
  • স্বামী হত্যার বিচার পাননি সাহার বানু
  • বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম মিয়ারচর
  • বিভীষিকাময় একাত্তর শ্বাসরুদ্ধকর পাঁচঘণ্টা
  • সিলেটের প্রথম সংবাদপত্র এবং কবি প্যারীচরণ
  • সিলেটের প্রথম সাংবাদিক, প্রথম সংবাদপত্র
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • মুক্তিযোদ্ধা নজরুল এবং অন্যান্য
  • বানিয়াচং সাগরদিঘী
  • খুন ও ধর্ষণ করেছে চরমপন্থিরাও
  • পার্বত্য তথ্য কোষ
  • Developed by: Sparkle IT