ইতিহাস ও ঐতিহ্য

পার্বত্য তথ্য কোষ

প্রকাশিত হয়েছে: ১৮-০৪-২০১৮ ইং ০২:৩৯:০২ | সংবাদটি ৬১ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
(তাং- রোববার ১৬ আশ্বিন ১৪০৭ বাংলা, ১ অক্টোবর ২০০০ খ্রি., দৈনিক গিরিদর্পণ, রাঙামাটি)
সরকার বাঙালি সেটেলারদের আনয়ন ও ভূমি দান করেছেন। প্রচলিত রীতি হলো : ভূমিদানের প্রক্রিয়ায় জেলা প্রশাসক কর্তৃক হেডম্যান ও চীফদের রিপোর্ট তলব ও বিবেচনা করা হয়। এর কারণ হলো : তারা স্থানীয় রাজস্ব এজেন্টরূপে, প্রার্থীত জমি খাস, দখলমুক্ত ও বন্দোবস্তিযোগ্য কি না সে সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল। এটা এ কারণেও জরুরি যে, জায়গাটি কারো বন্দোবস্তির প্রক্রিয়াধীন থাকতে পারে। জায়গাটি সামাজিক ও রাষ্ট্রের পক্ষে মূল্যবান বন ও খনিজ সম্পদ বা নদী-নালা সড়ক গোরস্তান শ্মশান, খেলার মাঠ, প্রাতিষ্ঠানিক স্থাপনা বা সামাজিক ব্যবহার উপযোগিতা সম্পন্ন কিছু হতে পারে, অথবা এটি কারো দীর্ঘ ভোগ দখলাধীন জমি। বাঙালি সেটেলারদের পুনর্বাসনের সময় উপজাতিভুক্ত এই সব হেডম্যান ও চীফদের সুপারিশ এ কারণে নেয়া হয়নি যে, তারা তাতে বাধ সাধতে পারেন এবং জনসংহতি সমিতির বিরোধিতাকে অনুসরণ করে, গোটা পরিকল্পনাটিকেই বানচাল বা জটিলতায় আবদ্ধ করে দিতে পারেন।
কার্যতঃ হেডম্যান ও চীফদের অনুমোদন ও রিপোর্ট লাভ আইনতঃ বাধ্যতামূলক ও নয়। তাদের রিপোর্ট ও অনুমোদনের সাথে দীর্ঘসূত্রিতা আর অনিশ্চয়তা ও জড়িত। সরকারের নির্বাহী ক্ষমতা বলে সহজে ও ত্বরিতগতিতে কাজটি সম্পন্ন করার প্রয়োজন ছিল। তবু কাজটিতে প্রক্রিয়াগত কিছু ভুল ক্রটি থেকেও গেছে। যদ্দরুণ সেটেলারদের সবাইকে বন্দোবস্তি দলিল পত্র দেয়া এখনো অনেক ক্ষেত্রে সম্পন্ন হয়নি। কিছু কিছু জায়গা জমিতে অংশতঃ পাহাড়ি দখলদার ছিলো। যাদের বন্দোবস্তি দলিলপত্র না থাকলেও আবাদী অধিকার স্বীকার্য। এটা এ কারণেও ঘটেছে যে, বিদ্রোহ উপদ্রুত ঐ সব জায়গায় আমিন কানুনগোদের সশীরের উপস্থিতি ছিলো বিপজ্জনক। তাই তারা খাস রেকর্ডের ভিত্তিতেই জমি বরাদ্দ দিতে বাধ্য হয়েছে। অধিকাংশ হেডম্যান কারবারী নিজেরাও নিরাপত্তার অভাবে সরেজমিন অনুপস্থিত ছিলেন না বা নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তরিত হয়ে গিয়েছিলেন। সুতরাং এগুলো জাতিগত বিদ্বেষ বা ইচ্ছাকৃত ভুল ত্রুটি নয়। এই ভুল ক্রটি হলো বিদ্রোহজনিত বিপন্ন পরিস্থিতির ফসল। এগুলোকে উদারদৃষ্টিতে বৈধতা প্রদানই সঙ্গত। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভূমিহীন পাহাড়ি লোকদের ভূমিদান ও পুনর্বাসন করে ক্ষতিপূরণ করা আবশ্যক। এ জন্য ক্ষতিগ্রস্তদের খাস জমি বরাদ্দ করাই সমাধান।
অনিয়ম আর ত্রুটির জন্য শাস্তি বিধান করতে গেলে প্রধান ও প্রথম আসামী হোন সরকার। ভবিষ্যতে এরূপ ত্রুটি এড়াতে হলে আইন ও দাপ্তরিক জটিলতাকেও আগে সারাতে হবে। এখানেও সারা দেশের মতো অভিন্ন ভূমি প্রশাসন আইন ও নীতি প্রচলন আবশ্যক, যাতে ভূমি রেজিস্ট্রেশন ও মিউটেশনে দীর্ঘ সময় ক্ষেপণের অবসান হয়। জনসাধারণকে ভূমির স্বত্ব দিতে হবে। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা প্রশাসকের অনুমোদন সাপেক্ষ খরিদ বিক্রি ও মিউটেনশন আইন, প্রলম্বিত উপনিবেশবাদী ও সামন্তবাদী ব্যবস্থা। এটি মানুষের সহজ ভূমি অধিকারের পরিপন্থী ও পরাধীনতার বাহন।
পার্বত্য অঞ্চল এখন পরাধীন উপনিবেশ নয়। এই আইনের দ্বারা বাঙালি আগমন, বসবাস ও ভূমি মালিকানা লাভ আগেও ঠেকান যায়নি, এখনো ঠেকান যাবে না, বরং তদ্বারা বাঙালি ও উপজাতীয় জনসাধারণ, অদৃশ্য বাধা নিষেধ ও প্রতিবন্ধকতায় আবদ্ধ হয়ে, কূপ মন্ডুকে পরিণত হয়েছে এবং হচ্ছে। আগে উপজাতীয় হেডম্যান ও চীফদের নিকট থেকে সুযোগ সন্ধানী বহিরাগতরা, অত্রাঞ্চলে অধিকার প্রতিষ্ঠার সনদপত্র চড়া দামে কিনে নিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। এখন ঐ তালিকায় জেলা চেয়ারম্যান পদবিধারীদের সংযোগ ঘটেছে। তাদেরও পক্ষ করে নিয়ে সুযোগ সন্ধানী বহিরাগতরা ঠিকই জায়গামতো বসে যেতে পারছে এবং পারবে। স্থানীয় হওয়ার সদনপত্র হলো একটি মূল্যবান পণ্য। এটি হাত করা সুযোগ সন্ধানীদের পক্ষে কঠিন নয়। মাওলানা শাজাহান বরিশালবাসী। বিবাহসূত্রে স্থানীয় টাটগেঁয়ে জামাই। রাজনীতির মারপ্যাচে এখন পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সদস্য। এই তিনি হলেন এর উজ্জ্বল উদাহরণ।
উপজাতীয় জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা বাবু জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা, বা অন্য কোনো নেতা কি এই নিযুক্তি ঠেকাতে পেরেছেন? শীর্ষ পদ, ক্ষমতা, নিযুক্তি ও ভূম্যাধিকারের উপজাতীয়করণ এভাবেই ধীরে ধীরে উবে যাবে, এ ধারণা অবশ্যই করা যায়। এই ধারাবাহিকতায় কোনো বিদ্রোহী নেতাই, পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রী পদ, তিন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদ, উদ্বাস্তু পুনর্বাসন টাক্স ফোর্স আর পার্বত্য উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান পদটিও পাননি। ভবিষ্যতে পাবেন সে আশা কি করা যায়? তাদের একমাত্র সন্ত¦না হলো ক্ষমতাসীন আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদটি সন্তু বাবুর ভাগে পড়েছে এবং পরিষদে তাঁর দলের কয়েকজন মাত্র সদস্য অন্তর্ভুক্ত হতে পেরেছেন। ভবিষ্যতে নির্বাচন হলে এই শীর্ষ পদগুলোতে আর তিন সংসদ সদস্য পদে বরিত হওয়া তাদের পক্ষে কি নিশ্চিত?
জাতীয় নির্বাচনে গনেশ পাল্টে, বিরোধী দলীয়রা ক্ষমতাসীন। ভবিষ্যতে পার্বত্য চুক্তি, প্রচলিত ঔপনিবেশিক আইন, উপজাতীয় সামন্তবাদ, আর সদ্য প্রণীত পার্বত্য আইন সমুহকি যেমন আছে তেমন থাকবে? একটু ভিন্ন চিন্তা করে দেখা আবশ্যক। পরিবেশ পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে চলাই বুদ্ধিমত্তার কাজ। পার্বত্য অঞ্চলকে বাঙালিমুক্ত রাখা সম্ভব নয়। হতে পারে, ভূমি কমিশনই বাঙালি ভূমি স্বত্বের প্রতি চূড়ান্ত অনুমোদনের সীলমোহর এঁটে দিবে। এই সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া কি সম্ভব?
[চলবে]

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT