পাঁচ মিশালী

ঘানি

আমীরুল হোসেন খান প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৪-২০১৮ ইং ০১:৪৯:৫৪ | সংবাদটি ৭৭ বার পঠিত

সাহেব পেপার! চোখ তুলে তাকাতে তাকাতেই দেখি বড় রাস্তার ওপাশে চলে গেছে। এত দ্রুত! প্রতিদিন সকালে একই নিয়ম। সন্ধ্যায় আবার সাহেব টাকা! যথারীতি আবার উধাও। এত তাড়া কিসের। রোদ-বৃষ্টি, শীত-গ্রীষ্ম বারোমাস কখনো ফাকি নাই! পেপার বন্ধ থাকলে বিরতি না হলে নয়! প্রচ- রোদ যেন অগ্নিবৃষ্টি ঝরছে। ভাই একটু পানি খাওয়া। দোকানের ছেলেটাকে ঠা-া পানি দিতে বললাম। এই সুযোগে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখলাম। চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মাঝামাঝি বয়স। একহারা মাঝারী সাদাসিধে মানুষ! রোদে পুড়ে চেহারা কয়লা বর্ণ ধারণ করেছে। চোখগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশী উজ্জ্বল! হাতল গুটানো শার্ট ঘামে ভিজে শরীরে লেপ্টে আছে। পরিষ্কার ক্ষয়ে যাওয়া কলার, শার্টের সর্বত্র কালো ফুট ফুট ছাতা পড়া! সময় লাগিয়ে আস্তে আস্তে সবটুকু পানি খেল। চোখে মুখে পূর্ণ পরিতৃপ্তির ছায়া! শার্টের হাতলের ভাঁজে মুখ মুছে সালাম। আসি স্যার!!
এই লোকটাকে আগে দেখলে মনে হত বেশ রুক্ষ কাটখোট্টা টাইপের! ওর ক্লান্ত শ্রান্ত চেহারা, কোমল চোখ দেখে সে ধারণা বদলে গেল। প্রতিদিন শহরের এ মাথা থেকে ও মাথা প্রত্যেক দোকান, অফিসে কাগজ পৌঁছে দেয়া ওর কাজ। যেখানে শেষ ওখানের কোন হোটেলে চারটা মুখে গুঁজে গাছতলা বা যাত্রী ছাউনিতে বিশ্রাম নিয়ে আবার প্রত্যেক জায়গা থেকে টাকা তোলা শুরু। অন্য অনেক হকারের বাই সাইকেল থাকলেও তার নেই। পদযুগল ভরসা। সন্ধ্যার আলো আঁধারিতে টাকা নেয়ার সময় অজান্তেই মনে পড়ে ‘পদতলে রক্ত ঝরে’! শতচ্ছিন্ন জুতোর সাধ্য কি আগুন গরম পীচঢালা পথের রুদ্ররোষ থেকে ওকে রক্ষা করে! এমনিতে স্বল্পভাষী!! তোমার কে আছে কাশেম? এক ছেলে এক মেয়ে আর স্ত্রী ! মা বাবা মারা গেছেন ছোটবেলায়। তারপর থেকে এই শহরের অলি গলিতে হুমড়ি খেয়ে বড় হয়েছি! এখন ওরাই আমার একমাত্র আপনজন! তোমার দেরী হয়ে যাচ্ছে না তো? আজ একটু হোক না! স্বগতোক্তির মত বলে যেতে লাগল। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর যা পাই তাতে সংসার কোনরকম চলে। বাচ্চারা স্কুলে পড়ে কিন্তু দেখা হয় সামান্যই। এজেন্সীর হিসাব শেষে বাজার করে ঘরে ফিরতে ফিরত গভীর রাত! বাবার জন্য অপেক্ষা করে বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়ে, বৌটা জেগে থাকে। সকালে ওরা ঘুমঘোরে আমি বেরিয়ে যাই নতুন দিনের আশায়! কতদিন বৌ বাচ্চা নিয়ে কোথাও বেড়াতে যাই না! প্রতিদিনের পেপার বিক্রি বাদ দিয়ে মাসে মাসে বাসা-বাড়ী, অফিসে দাও না কেন? তাতে সময় পাবে! আগে দিতাম কিন্তু সে আরেক হেপা। মাস শেষ হলে কখনো ভাংতি নাই আবার কখনোবা সাহেব নাই। এ মাসের টাকা ও মাসে। আবার কেউ কেউ কয়েকমাস টাকা খাটাতে চায়! পত্রিকাটা যেন ওদের বাপের। মাস শেষ হলে ঘাটতি আসে। ভদ্দরনোকরা বেশীর ভাগ খচ্চর! তার চেয়ে এই ভাল। দিনের হিসাব দিনে শেষ যা পাই তাই খাই!!
হঠাৎ করে একদিন বিকেলে খুব চটে গেল কাশেম! আপনার সাথে কথা বলব না। কেন? আপনি লেখালেখি করেন কোনদিন আমায় বলেন নি! স্মিত হাসিতে আরো চটে গেল। হয়তো ভেবেছেন অর্ধশিক্ষিত হকার লেখার বুঝে কি? এই বাপ ঠা-া হয়ে বস। মনে মনে লজ্জাই লাগল। কতক্ষণ পর একথা ওকথার পর খুশী হলে বলল স্যার চলি। টাকা নিয়ে যাও। আজ থেকে যতদিন লেখা আসবে ততদিন টাকা নেব না! শর্ত আছে। গরম পরোটা চা খেতে হবে ! জ্বী আচ্ছা। এরপর থেকে ওর জ্বলজ্বলে হাসিমুখ দেখলেই বুঝি কড়কড়ে নতুন লেখা এসে গেছে। কি যে আনন্দ ওর! কখন কেমন করে যেন মায়া জন্মে গেল। ভালোবাসা বড় আজব চিজ কার জন্য কোথায় ভর করে কে জানে! তোমার দেরী হয়ে যাচ্ছে যে! না স্যার আপনার সাথে আলাপ করে শান্তি পাই, দিন ভাল কাটে।
কদিন পর ঈদ। প্রচ- ব্যস্ত। দোকানে যে যার কাজে। একটু অবসর নাই। দোকানের সামনে কে যেন কথা বলছে। আর কক্ষনো আসিস না, আমি ভাল আছি বেঁচে থাকব। এ কি এ যে কাশেম! পেপার দিয়ে চলে যেতে উদ্যত। দাঁড়াও। এদিকে তাকাও। দু’চোখ জলে টলমল করছে! কি হয়েছে? আর ধরে রাখতে পারে নি হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। বৌ ঝগড়া করে ক’দিন ধরে বাপের বাড়ীতে চলে গেছে! নাস্তা করতে বলল আমি নিতান্তই গরীব মানুষ। সৎভাবে দু’পয়সা রুজি করে কোনরকমে খেয়ে পড়ে বেঁচে আছি! বাচ্চাদের স্কুলের সবাই নতুন জামা কাপড় পরবে। আমি কোথা থেকে কিনব? এ নিয়ে ঝগড়া। যত রাত হোক বাচ্চাদের চুমো দিয়ে ঘুমাই! আজ কদিন ঘুমোতে পারি না। আসলে আমাদের মত গরীবদের ভালোবাসা থাকতে নেই। হাতের তালুতে চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল। বুকে অফুরান শক্তি, চোখে স্বপ্ন শিরদাড়া সোজা করে হাটা মানুষটি কেমন যেন কুঁজো ছোটখাট হয়ে গেছে! যদি ওর হ্রদয়ে একটু হাত বুলিয়ে দেয়া যেত! চেষ্টা করে ও ভুলতে পারছি না। ওর চলে যাওয়াটা চোখে লেগে রয়েছে। পাশের মার্কেট থেকে যতটা সস্তা সম্ভব উপহার পেকেট করে রেখে দেই। মনের ভিতর খচখচ করছে। ওকে ঠকাচ্ছি না তো? ভীড় তাই দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ক্লান্ত বিধ্বস্ত জীবনযুদ্ধে পরাজিত মানুষ! ভিতরে আস। এটা কি স্যার? আজই ওদের সবাইকে নিয়ে আসবে। পারলে এখন! কি আশ্চর্য আবার কান্না কেন? ঈদের পরদিন বৌ বাচ্চা নিয়ে শহর থেকে দূরে। নীলাকাশ যেখানে ছুঁয়েছে সীমান্ত! আশ্চর্য! স্বপরিবারে কাশেম দৌড়ে এল। কি ফুটফুটে বাচ্চা দুটো! দেখলেই আদর করতে ইচ্ছে করে! টুকটুকে লাল শাড়ীতে নতুন বৌ এর মত লাগছে! উনি আমার সেই স্যার ! পা ছুয়ে সালাম করো। ভালোবাসা কৃতজ্ঞতায় আনত নয়ন! আনন্দাশ্রুতে চোখ দুটো ভরে আছে! স্বর্গের সব সুখ নেমে এলো ধরাধামে ! ওদের এ সুখ যেন চিরদিন সয়। চোখটা কেমন ভারী হয়ে এসেছে। মাথার উপর বিশাল আকাশ! হাজার আলোর বর্ণিল আলোকচ্ছটায় আলোকিত নীল সামিয়ানা!!

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT