পাঁচ মিশালী

বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে

জ্যোতিষ মজুমদার প্রকাশিত হয়েছে: ২১-০৪-২০১৮ ইং ০১:৫১:৩৩ | সংবাদটি ৯৫ বার পঠিত

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি সৌধ গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় অবস্থিত। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কিছু সংখ্যক বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত বঙ্গবন্ধুকে এখানে সমাহিত করা হয়। বর্তমানে সমাধি সৌধটিকে একটি দৃষ্টিনন্দন স্থাপনায় পরিণত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটি ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ তারিখে বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারত কর্মসূচির অংশ হিসেবে সিলেট জেলার শিক্ষক প্রতিনিধি আমরা কয়েকজন শিক্ষক ১৬ ডিসেম্বর শনিবার বিকেল ৫টায় ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে রাত ১টার দিকে কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দের সাথে যোগ দেই এবং ঢাকা থেকে মাওয়া ফেরিঘাট (মুন্সিগঞ্জ) হয়ে আমরা পরের দিন রোববার সকাল সাড়ে ৮টায় টুঙ্গিপাড়া পৌঁছি।
মধুমতি নদীর তীরে অবস্থিত গোপালগঞ্জ জেলা শহর। গোপালগঞ্জ জেল শহরের নামকরণ নিয়ে কাহিনী রয়েছে। রাজগঞ্জ থেকে গোপালগঞ্জ নামকরণ হয়েছে যার নামে তিনি কোন কৃর্তীমান ব্যক্তি ছিলেন না। মুকিমপুর স্টেটের জমিদার ছিলেন রাণী রাসমনি। তিনি বাস করতেন কলকাতায়। মাঝে মাঝে জমিদারী এলাকায় আসতেন। একবার রাণী রাসমনি তার আদরের নাতি গোপালকেও সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। রাজগঞ্জ এলাকাটিকে খুব ভাল লাগে গোপালের। রাণী তার প্রিয় নাতির ভাল লাগার জায়গাটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য রাজগঞ্জের ‘রাজ’ শব্দটির স্থলে গোপালের নাম যুক্ত করে এলাকার নামকরণ করেন ‘গোপালগঞ্জ’।
টুঙ্গিপাড়া উপজেলা গোপালগঞ্জ জেলার একটি প্রশাসনিক এলাকা। শোনা যায়, পারস্য এলাকা থেকে আগত কতিপয় মুসলিম সাধক অত্র এলাকার প্লাবিত অঞ্চলে টং বেধে বসবাস করতেন এবং কালক্রমে ঐ টং থেকে নাম হয় টুঙ্গিপাড়া। গোপালগঞ্জ শহর থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরে এই টুঙ্গিপাড়া। এখানে চারদিকে গাছগাছালি, খাল-বিল যেন ছবির মতো সাজানো। এই টুঙ্গিপাড়াতেই ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্ম গ্রহণ করেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের বুলেটে মৃত্যুহীন প্রাণ নিয়ে জন্ম মাটি টুঙ্গিপাড়ায় ফিরে আসেন তিনি। পরদিন পারিবারিক কবরস্থানে মা-বাবার পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। বঙ্গবন্ধুর সমাধির পাশেই তাঁর বাড়ি। এখানে ঢুকতেই পাথরের গায়ে লিখা রয়েছে “দাঁড়াও পথিক বর, যথার্থ বাঙালি যদি তুমি হও, ক্ষণিক দাঁড়িয়ে যাও ঐ সমাধিস্থলে। এখানে ঘুমিয়ে আছেন সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা, এদেশের মুক্তিদাতা, বাঙালির নয়নের মণি।”
শত গ্রামের মাঝে যে গ্রামটি অনন্য হয়ে আছে, যেটা সৃষ্টি করে রেখেছে এক সোনালী ইতিহাস, সেটা এই টুঙ্গিপাড়া। টুঙ্গিপাড়াকে বদলে দিয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি সৌধ কমপ্লেক্স। প্রতিদিন দেশ-বিদেশ থেকে গড়ে প্রায় ৫ হাজার দর্শক টুঙ্গিপাড়া আসেন প্রিয় নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। বঙ্গবন্ধুর কবরের বেদির পাশে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানান, তার জন্য কাঁদেন এবং বিশেষ মোনাজাত করেন। টুঙ্গিপাড়া গ্রামটি পাটগাতী ইউনিয়ন পরিষদের অধিনে হলেও এ গ্রামের নামেই উপজেলা সদরের নাম হয়েছে টুঙ্গিপাড়া।
১৯৯৬ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর টুঙ্গিপাড়া বঙ্গবন্ধু সমাধি সৌধ কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদ ১৯৯৯ সালের ১৭ মার্চ সমাধি সৌধের নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ৩৮.৩০ একর জমির উপর ১৭ কোটি ১১ লাখ ৮৮ হাজার টাকা ব্যয়ে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সহযোগিতায় প্রতœতত্ব বিভাগ এ সমাধি সৌধ নির্মাণ করেন। লাল সিরামিক ইট আর সাদা-কালো টাইলস দিয়ে গ্রিক স্থাপত্য শিল্পের আদলে নির্মিত সৌধের কারুকার্যে ফুটে উঠেছে বেদনার চিহ্ন।
কমপ্লেক্সের সামনে দু’পাশের উদ্যান পেরোনোর পরই বঙ্গবন্ধুর কবর। বঙ্গবন্ধু এবং তার বাবা-মায়ের কবরকে ঘিরেই নির্মাণ করা হয়েছে মূল স্তম্ভ। সাদা পাথরে নির্মিত গোলাকার এক গম্বুজ বিশিষ্ট সমাধি সৌধের উপর জাফরি কাটা। এই জাফরি কাটা দিয়ে সূর্যের আলো ভেতরে প্রবেশ করে। উপরে কাচের কারুকাজ দিয়েও আলো ছড়িয়ে পড়ে কবরে। চারদিকে কালো টাইলস ও মাঝখানে শে^তশুভ্র টাইলসে বঙ্গবন্ধুর কবর বাঁধানো। উপরের অংশ ফাঁকা। কবর তিনটি ঘিরে রাখা হয়েছে সংক্ষিপ্ত র‌্যালিং দিয়ে। ২০০১ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু কন্যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সমাধি সৌধের উদ্বোধন করেন। কমপ্লেক্সের মধ্যে রয়েছে পাঠাগার, গবেষণা কেন্দ্র, প্রদর্শনী কেন্দ্র, মসজিদ, পাবলিক প্লাজা, প্রশাসনিক ভবন, ক্যাফেটোরিয়া, উন্মুক্ত মঞ্চ, বকুলতলা চত্বর, স্যুভেনির কর্ণার, প্রশস্ত পথ, মনোরম ফুলের বাগান ও কৃত্রিম পাহাড়।
বঙ্গবন্ধুর সমাধি সৌধের পাশেই তাঁর পৈত্রিক বাড়ী। রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বর থেকে শেখ জামাল পালিয়ে গেলে তাকে খোঁজ করতে হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ১৯ মে বঙ্গবন্ধুর বাড়ীতে চলে আসে। এ সময় তারা বঙ্গবন্ধুর বাড়ি জ¦ালিয়ে দেয়। ঐ দিন হানাদার বাহিনী নির্মমভাবে ঐ গ্রামের ৬ জন লোককে গুলি করে হত্যা করে। ১১ জুলাই মুক্তিযুদ্ধারা (হেমায়েত বাহিনী) বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে অবস্থানরত রাজাকারদের ঘাটি আক্রমণ করে তাদেরকে পরাজিত ও বিতাড়িত করে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT