সাহিত্য

মালতি

মুহাম্মদ মহিবুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০৪-২০১৮ ইং ০১:১০:০২ | সংবাদটি ৪২ বার পঠিত

তৃতীয় মেয়ের জন্মলগ্নে আনন্দ ছিল না কারও মনে। বাড়িতে উলুধ্বনি পর্যন্ত ঠিকমত দেয়া হল না। বাবা-মা একটি ছেলের জন্য অধীর আগ্রহে ছিলেন। এ জন্যে অনেক তাবিজ, কবজ, ঝাড়ফুঁক, মানত ইত্যাদি করেছিলেন। কিন্তু প্রকৃতি তার নিজস্ব গতিতে চলে। ফল উল্টো হল। এবারও ছেলে হল না, হল মেয়ে। তার নাম রাখা হল মালতি। সে যেন একটা বোঝা হয়ে এল পিতা-মাতার। কেবল একটি ছেলের আশায় আশায় পরিবার পরিকল্পনার নিয়মাবলীকে বাবা-মা অবহেলা করতে দ্বিধাবোধ করেন নি। কিন্তু তবু আশা মিটল না। তাই মায়ের চোখে মালতি অবাঞ্ছিত, অনাদরের। বাবাও সুখী হতে পারেননি। এ যেন প্রকৃতির অভিশাপ তার ওপর।
মালতির জীবন-নাটকের আরম্ভ এ ভাবেই। অত্যন্ত অবহেলার মাঝে। মালতি এখন বেশ বড় হয়েছে। তাই বুঝতে অসুবিধা হয় না মা-বাবার মনের অবস্থা। এ সব বুঝতে পারে বলেই তার মুখখানা ম্লান হয়ে আসে বারবার। কে যেন তার চলাফেরা, কথাবলা এ সবকে এঁটে বেঁধে দিয়েছে। মালতি বুঝতে পারে সব কিছু। জীবনের কোন অর্থ খুঁজে পায় না মালতি। স্বপ্নভরা জীবনেও সে বড়ো একা। সে বড়ো উৎসাহহীন। প্রতিটি মুহূর্ত তার কাছে মূল্যহীন, অকেজো মনে হয়। ফুল, পাখি তাকে যেন ব্যঙ্গ করে।
- কি হে অবিনাশ, মেয়ের জন্মদিন কবে, তোমার মালতির?
- মেয়ের আবার জন্মদিন উৎসব।
- কেন মেয়ের জন্মদিন পালনে দোষ কিসের ভাই?
এভাবে নিবারণ অবিনাশের আলাপ থেকে একটা কথা স্পষ্ট। তৃতীয় মেয়েকে নিয়ে অবিনাশ খুশি নয় মোটেই। ছেলে হলে আনন্দের বন্যা বয়ে যেত যেন।
মা-বাবার প্রবল ইচ্ছে জন্ম দেয় ছেলে-মেয়েদের। এ যেন একটি খেয়া নৌকো ওপার থেকে এপারে নিয়ে আসে একটি টুকটুকে শিশুকে। কাঁদতে কাঁদতে জানান দেয় সে এসেছে পৃথিবীতে।
ফুল সুন্দর, শিশুও তাই। শিশু বড় হতে হতে একদিন মা-বাবা হয়। এই তো নিয়ম। কেউ অজ¯্র দুঃখের মধ্যে বড় হয়, কেউ বা সুখের মধ্যে, আরামের মধ্যে।
ওদের প্রতিবেশী অতীন মন্ডল বুড়ো মানুষ। সব সময় হাসিখুশী, প্রাণখোলা। পাড়ার ছেলে-মেয়েরা ‘বুড়ো দাদু’ বলে যখন ডাকে বুড়ো তখন আনন্দে দু’হাত তুলে নাচতে শুরু করে। এ যেন এক অনেক পাওয়া। তৃপ্তির উৎস। বৃদ্ধের মনেও তাই এ সময় উদ্দাম যৌবন এসে ধাক্কা দেয়। বলে যায় অনেক কথা গোপনে গোপনে ছন্দে ছন্দে।
মাঝে মাঝে বুড়ো দাদু এক একজন করে কাছে ডেকে নাম ধাম ওসব জেনে নেন।
সেদিন বুড়ো দাদুর প্রশ্ন মালতিকে লক্ষ্য করে,- ‘তোমার নাম কি ভাই?’
মালতি উত্তরে বলে,- ‘মালতি নামের আড়ালে আমি এক যাত্রী। আমি বোঝা এ পৃথিবীর।’
তার গোপন বেদনার কথা টের পেয়ে বুড়ো বিস্মিত। তাই বলেন, ‘এমন কথা বলতে নেই। তুমি বড় হবে, লেখাপড়া. গান-বাজনা শিখে মানুষ হবে।’
এই সেদিন মালতির ছোট্ট মুখখানি ধরে ‘বুড়ো দাদু’ বলেছিলেন,- ‘আমি তোর কে বলতে পারিস মালতি?’
মালতি সহজেই উত্তর দেয়, ‘তুমি যে আমার বন্ধু, দরদী বন্ধু। প্রয়োজনে তুমি আমাকে সিনেমা, থিয়েটারে নিয়ে যাবে। যাবে না আমাকে নিয়ে দাদু?’
- নিশ্চয় যাব। বুড়ো দাদুর স্পষ্ট উত্তর।
মালতি এভাবে বুড়ো দাদুর মাঝে তার আনন্দের অনেককিছু দেখতে পায়। আবিষ্কার করে এক অনেক চাহিদার উৎসকে। তাই সে বুঝতে পারল- একা নয় সে। অবাঞ্ছিত নয় মোটেই সংসারে। তারও একটা জীবনগন্ডী রয়েছে। দেবার এবং পাবার অনেক অনেক রয়েছে।
পড়াশুনায় সে কোনোদিন মা-বাবার চিন্তার কারণ হয়ে ওঠেনি। বারবার ভাল ফল করেছে। বি.এ পাশও করেছে ভালভাবেই।
দেখতে দেখতে বিয়ের বয়স হল মালতির। কিন্তু বিধাতার নির্মম পরিহাস। তাই পাত্র পক্ষের ছাড়পত্র চলে যায় এদিক ওদিক। মালতির ভাল লাগে না এসব। বাবা-মার ব্যস্ততা দেখে তার নিজেকে অপরাধী মনে হয়। বাবা-মার অবজ্ঞা বাড়ে দিন দিন তার ওপর। একটা বিশ্রী প্রশ্ন জাগে তার মনে। কিন্তু প্রকাশ করতে পারে না। নিজেকে সে প্রশ্ন করে- এ জন্যে দায়ী কে? সমাজবিদ, রাজনীতিবিদরা এর জবাব দেবেন। তারা দিয়েও থাকেন। কিন্তু মালতি তার হৃদয় মন দিয়ে সঠিক একটা উত্তর খোঁজে। অবশ্যি উত্তর একটা পায়। প্রকাশ করে না- কারণ ঠিক মুহূর্তে বাবা-মা একখানা ছাতা ধরে রেখেছেন মাথার ওপর। বড় প্রয়োজন এ ছাতার তার।
এমন সময় এক পাত্রের সন্ধান এলো। নীলমণি ঘটক সে সম্বন্ধের সব তথ্য সরবরাহ করেন। ছেলে বিদেশে চাকুরি করে। ছুটি নিয়ে বাড়ি এসেছে। বিয়ে করে বউ নিয়ে পাড়ি দেবে বিদেশে।
মালতি একদিন হেসে হেসে বলেছিল ‘বুড়ো দাদুকে বরের কথা। বুড়োর উক্তি- ‘কি রে, দুষ্টু মেয়ে দেশে বুঝি বর পছন্দ হল না। তাই বিদেশ চলে যাবি আমাদের ফেলে। বুড়োর অনুভবে একটুখানি বেদনার ছাপ বাসা বাঁধল।
বিদেশে যাবে ভেবে মালতি খুব খুশি। স্বামীকে নিয়ে সুন্দর সুখের সংসার আরম্ভ করবে। বাবা-মাকে এভাবে সে আনন্দ দিতে চায় চোখের আড়াল হয়ে।
কিন্তু ‘বুড়ো দাদু’র কথাটা তার মনে কেন জানি একটু ভাবনার জন্ম দিল।
মালতির চোখে জল এল। ‘বুড়ো দাদু’ ভেবে পেলেন না কেন কাঁদছে মালতি। সে মা-বাবাকে সুখী করতে চায়। কান্নার মাঝে তারই প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত রয়েছে।
দিনদুপুরে নীল আকাশ এক সময় ঢেকে ফেলে ঘন মেঘে। সূর্যকে লেপ মুড়ি দিয়ে যেন ঘুম পাড়িয়ে রাখে। কিন্তু কতক্ষণ ঝর ঝর বারিধারা- আকাশ পরিষ্কার। আবার সূর্য তার আলো ছড়িয়ে দেয় দিকে দিকে। এ সবই প্রকৃতির খেয়াল। আর এরই মাঝে জীবন চুপি চুপি মেলে ধরে পাখা। তাই সবকিছুই মেনে নিতে হয় পর্বে পর্বে।
বুড়ো দাদু বললেন- ‘শুধু শুধু কাঁদিস না মালতি। তোকে যে আমি সিনেমা, থিয়েটারে নিয়ে যাব- মনে আছে? বুড়োরও সেদিন দু’চোখে জল দেখা দিল। এ যেন সঞ্চিত বেদনার গোপন প্রকাশ।
বাদ্য বেজে উঠল। নিজস্ব গতি। মালতি বধূ আজ। পরলো শাড়ি, শাঁখা, সিঁদুর, হার। এক নতুনরূপ। এতদিন ঘুমন্ত ছিল। আজ জেগে উঠল। যেন এক লক্ষ্মী প্রতিমা। মালতি অনেক দূরে চলে যাবে। আব্দার হারিয়ে যাবে ইঙ্গিতে। বুড়ো দাদুর মনটা কেন জানি বাস্তবের সঙ্গে বে-মিল লাগল। একটা শূন্যতা মনটাকে ভারাক্রান্ত করে তুলল ঘন ঘন। এতদিনের অনাদরের ঘর ছেড়ে মালতি নতুন পথের সন্ধানে চলল।
বধূ বেশে মালতি এসে তার বুড়ো দাদুকে বলল- ‘আবার এলে সিনেমা, থিয়েটার দেখব তোমায় নিয়ে দাদু। তুমি যে আমার চিরকালের বন্ধু।’
বুড়ো দাদু একগাছি নেকলেস গলায় পরিয়ে দিয়ে তাকে প্রাণ খুলে আশীর্বাদ করলেন। মালতি পা ছুঁয়ে প্রণাম করে সাদরে গ্রহণ করল এ অমূল্য ¯েœহের দান। এটার মূল্য যে তার কাছে অনেকখানি।
ওরা বিদায় নিল। বাবা-মা অঝোরে কাঁদলেন। দিদিরা কাঁদল। কান্না সকলেরই ঠিক আছে। অনুষ্ঠানের গা বেয়ে বেয়ে কান্না-হাসি আসে যায়। এর গভীরতা বিচার করলে ধরা পড়ে মানুষের চরিত্র, গতিবিধি, ভালবাসা এবং ভাল লাগা।
পরদিনই খবর এলো পাহাড়ী রাস্তার দুর্গম স্থানে পাতা মাইন বিস্ফোরণে ওদের মারুতি ভ্যান চুরমার হয়ে যায়। কেউই বেঁচে নেই। মালতি এভাবে চির বিদায় নিল।
এ যেন এক নিষ্ঠুর দুঃস্বপ্ন। বিশ্বাস করা যায় না, তবু করতে হয়। বাবা-মা অনেক কাঁদলেন। বুড়ো দাদু হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলেন।
কিছুদিন গেল। ঘটনা পুরনো হল। কিন্তু তার রেশ কেউ মন থেকে মুছে ফেলতে পারল না। অবিনাশ কেমন জানি হয়ে পড়লেন। ঘন ঘন মেয়ের খাতা, বইপত্র, খেলনা, এলবাম- এ সব যাকে তাকে দেখিয়ে কাঁদতে লাগলেন। একটা উদাস ভাব তাকে আনমনা করে ফেলল।
খেয়া নৌকো মালতিকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছিল- সেই খেয়া নৌকো-ই তাকে আর এক জগতে পৌঁছে দিয়ে এল। সে এসেছিল তখন কেঁদে কেঁদে জানান দিয়েছিল এসেছি বলে। সে নীরবে চলে গেল। তার বুড়ো বন্ধুকে নিয়ে আর সিনেমা থিয়েটার এ সব দেখা হল না। এ এক প্রচন্ড অভিমান। রূপ-রস-গন্ধে ভরা এ পৃথিবীতে কেউ টের পায়নি। আজ টের পেলে কী হবে।
মালতি তার কথা রাখতে পারল না। কিন্তু মালতির ছবি বুড়ো দাদুর মন জুড়ে গাঁথা হয়ে রইল।
অনাদরের প্রতীক বিদায় নিল। আর আজ সকলে আদরের দরজা খুলে দিল। মালতির বধূ ছবিটি বিরাট শূন্যতাকে ভরে রাখল। ফুল শয্যার বিছানার ফুলগুলো।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT