সাহিত্য

ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সাহিত্যের জনক

 মনযূরুল হক প্রকাশিত হয়েছে: ২২-০৪-২০১৮ ইং ০১:১১:২২ | সংবাদটি ৬২ বার পঠিত

কানাফানিকে আজ হয়তো অনেকেই আর চেনেন না, কিন্তু তার ‘প্রতিরোধ সাহিত্য’ বিশে^ মোটেই অপরিচিত নয়। তিনি যখন ‘ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সাহিত্য’ পরিভাষাটি প্রথম ব্যবহার করেন, নিজের বইতেই লেখেন- আমি আমার গল্পগুলোর চরিত্রসমূহকে কোনো ধরনের মনোভাব সংবরণ ছাড়াই নিজেদের অবস্থান ব্যক্ত করার স্বাধীনতা দিয়েছি। এর পর মাহমুদ দারবিশ, সামিহ আল-কাসিম, ফাদওয়া তুক্কান প্রমুখ একই ধারণা নিয়ে এগিয়ে আসেন। ১৯৪৮ সালের নাকবা (চধষবংঃরহরধহ বীড়ফঁং) এবং ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে ‘ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সাহিত্য’ই ফিলিস্তিনিদের আত্মপরিচয়ের মুখে ভাষা এনে দেয়, যখন সশস্ত্র প্রতিরোধ অনেকটা মুখ থুবড়ে পড়েছিল। পরবর্তী সময়ে তার সম্মানে মাহমুদ দারবিশ ‘প্যালেস্টাইনিয়ান ওয়েডিং’ শিরোনামে প্রতিরোধ সাহিত্য কাব্যের একটি সংকলনও প্রকাশ করেন।
প্রতিরোধের এই বীজাণু তাঁর ভেতরে কী করে স্থান করে নিল, তা নির্দিষ্ট করে বলা না গেলেও একটু অতীতে গেলে পাওয়া যাবে তার বাবা মুহাম্মাদ ফায়েজ আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন একজন লইয়ার এবং ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট যখন ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের অনুপ্রবেশে তা দেয়, তখন ব্রিটেনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো প্রথম সারির লিডার-যদিও কানাফানি তখন মাত্র শৈশবে। বাবার নামের সঙ্গে মিল রেখে তার পূর্ণ নামও রাখা হয়েছিল-গাসসান ফায়েজ কানাফানি। ১৯৩৬ সালের ৯ এপ্রিল একটি মধ্যবিত্ত সুন্নি পরিবারে তার জন্ম হয়, আক্কা (অপৎব) সিটিতে, যা তখন ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধিকৃত। পরে অবশ্য সোজা ইসরায়েলি দখলে চলে গেছে-ফিলিস্তিনিদের অধিকারে আর কখনোই আসে নি। এমনকি তার পাশর্^বর্তী শহর জাফা, যেখানে ফ্রেঞ্চ ক্যাথলিক মিশনারি স্কুলে গাসসান লেখাপড়ার প্রাথমিক পাঠ হাসিল করেছেন, তাও এখন আর ফিলিস্তিনের অংশ নয়।
১৯৪৮ সালের মে মাসে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রকোপ আক্কাতেও ছড়িয়ে পড়লে তার পরিবারকে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয় এবং ভূমিহীনতার এই যন্ত্রণাই তাকে সরাসরি নাকবা আন্দোলনে যুক্ত করে দেয়। কয়েক দশক পরে নিজের ছেলের কাছে লেখা তার এক পত্র থেকে জানা যায়, তিনি অত্যন্ত লজ্জিত ভাষায় লিখেছেন- মাত্র ১০ বছর বয়সে অস্ত্রের মুখে তাকে মাতৃভূমি ছেড়ে আসতে হয়েছে। ১৭ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে গিয়েছেন উত্তর-প্রতিবেশি রাষ্ট্র লেবাননে, সেখান থেকে দামেস্ক, তারপর সিরিয়াতে থাকতে হয়েছে চিরজীবনের মতো উদ্বাস্তু হয়ে। নির্বাসনে একেবারেই নিঃস্ব হতদরিদ্র হয়ে পড়েছিলেন তারা। বাবা কোনোমতে ছোটো পরিসরে আইন প্র্যাক্টিস শুরু করেন এবং সামান্য বাড়তি আয়ের জন্যে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছেলে-ছোকরাদের টিউশনি করাতেন। এই ঘনঘটার মধ্যেই গাসসান মাধ্যমিক পড়াশোনা শেষ করেন (১৯৫২) এবং ফিলিস্তিনি রিফিউজিদের জন্য গঠিত জাতিসংঘের রিলিফ এজেন্সির তরফ থেকে একটা শিক্ষকতার সনদও যোগাড় করে নেন। রিফিউজি ক্যাম্পের সহ¯্রাধিক ছিন্নমূল শিশুদের জন্যে তিনিই ছিলেন প্রথম নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক। এবং মানসম্মত বইপুস্তকের অভাবে শিশুদের বাক-বিচিত্রা শেখাবার জন্য তাকে নিজ উদ্যোগেই গল্প লিখতে হয়েছে। সে-ই শুরু।
এ বছরই দামেষ্ক ইউনিভার্সিটির আরবি সাহিত্য বিভাগে ভর্তি হন। পরের বছর তার সাক্ষাৎ হয় ফিলিস্তিনি খ্রিস্টান রাজনীতিক এবং পিএফএলপি’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ড. জর্জ হাবাশের সঙ্গে। তিনিই তাকে রাজনীতির হাতেখড়ি দেন এবং একই সঙ্গে তার সে-সময়কার লেখাজোখা কী করে আরও প্রভাবশীল হতে পারে, সে বিষয়ে হাতে-কলমে দীক্ষিত হতে সাহায্য করেন। পরবর্তীকালেও হাবাশই তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ১৯৫৫ সালে ¯œাতক বিভাগে উত্তীর্ণ হবার পূর্বেই, এমনকি তিনি যে ‘রেস অ্যান্ড রিলিজিয়ন ইন জায়নিস্ট লিটারেচার’-এর উপরে অভিসন্দর্ভ রচনা করছিলেন তাও সম্পন্ন হতে না দিয়েই তাকে আরব জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগে বিশ^বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। নিরুপায় হয়ে কানাফানি আপন বোন ফায়েজা কানাফানির সঙ্গী হয়ে কুয়েত চলে যান, যেখানে আরেক ভাই কিছুদিন আগেই নিবাসী হয়েছেন। নতুন করে আবার শিক্ষকতা পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি, যার ফলে অফুরন্ত সময় হাতেও পেয়ে যান। এ সময় রাশিয়ান সাহিত্য পাঠের অবাধ সুযোগ লাভ করেন। এবং একই সাথে মুভমেন্ট অব আরব ন্যাশনালিজম সংগঠনের মুখপত্র জর্ডান থেকে প্রকাশিত ‘আল-রায়’ (ঞযব ঙঢ়রহরড়হ) সম্পাদনার দায়িত্ব হাতে নেন।
ষাটের দশকের প্রথম দিকে আবার তিনি আবাস বদল করেন-চলে যান বৈরুত, আল-হুররিয়া পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব পেয়ে। ভৌগোলিক ও পরিপাশির্^ক বিচিত্র কারণে ধীরে ধীরে মার্কসবাদী দর্শন ও রাষ্ট্রনীতিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ৬২ সালে তাকে একবার আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যেতে হয় প্রবাসী হয়েও যথাযথ সরকারি কাগজপত্র না থাকায়। কিছুদিন পরে আবার আলোতে আসেন নাসেরবাদীদের (জামাল আব্দুন নাসের-এর অনুসারী) মুখপত্র ‘আল-মুহাররি (ঞযব খরনবৎধঃড়ৎ) এবং সাপ্তাহিক ‘ফিলাসতিন’ (চধষবংঃরহব) পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে। তবে ১৯৬৯ সাল থেকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি পিএফএলপি’র মুখপত্র সাপ্তাহিক ‘আল হাদাফ’ (ঞযব ঞধৎমবঃ) ম্যাগাজিনের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সংগঠনের বিভিন্ন প্রোগ্রাম-খসড়াও দেখাশোনা করতেন। কর্মজীবনের স্বল্প সময়ে তিনি বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের সঙ্গেও প্রবল যোগাযোগ ঘটাতে সক্ষম হন এবং যারা সারাবিশে^ জায়নাবাদ-বিরোধী ভূমিকা রাখতেন তাদের নিয়ে শক্তিশালী একটি বলয় গড়ে তোলেন, যা সে-সময় আরব অঞ্চলে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
কানাফানির জীবন বিশাল পরিক্রমায় ঘুরেছে। তিনি একই সঙ্গে ছিলেন রাজনীতিবিদ, সামরিক বিশেষজ্ঞ এবং সাংবাদিক। তার প্রতিটি প্রবন্ধ-নিবন্ধ ষাটের দশকের ফিলিস্তিনি রাজনীতিতে নতুন নতুন দিশা উন্মোচন করে দেয়। কানাফানির সাহিত্য-স্টাইল সম্পর্কে সমালোচকদের দুই শব্দের অভিমত ছিল-স্পষ্ট ও সহজবোধ্য। আরবি গল্পে আধুনিক ন্যারেটিভ টেকনিক ব্যবহারে অতীতের ফ্লাশব্যাক তুলে আনায় তার সমকক্ষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ১৯৬২ সালে রিজাল ফিশ শামস (গবহ রহ ঃযব ঝঁহ) উপন্যাস নির্মাণের আগেই তিনি খ্যাতি পেয়ে যান। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির প্রফেসর রশিদ খালিদির (১৯৪৮) মতে- এটি আধুনিক আরবি ফিকশনের মধ্যে সবচেয়ে’ নন্দিত ও উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের একটি। এই উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৭২ সালে প্রখ্যাত আরবি ফিল্মমেকার তাওফিক সালেহ নির্মাণ করেন ‘আল-মাখদুউন’ (ঞযব ইবঃৎধুবফ) চলচ্চিত্র। তারপর ‘মা তাবাকা লাকুম’ (অষষ ঃযধঃ'ং খবভঃ ড়ভ ণড়ঁ, ১৯৬৬) উম্মু সা’দ (১৯৬৯) এবং ‘আয়িদ ইলা হাইফা’ (জবঃঁৎহ ঃড় ঐধরভধ, ১৯৭০) লিখতে লিখতে ফিলিস্তিন আন্দোলনের সিংহাসনে আরোহণ করেন। যদিও আরও প্রায় ২৫ খানা গ্রন্থ তিনি লিখে ফেলেছেন। এমনকি তার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ্যভুক্ত বইও আছে অন্তত ৩ টা। গল্পগ্রন্থ আছে ৫ টা। কবিতাও লিখেছেন বেশ। অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— মাওতু সারির রকম ১২ (অ উবধঃয রহ ইবফ ঘড়. ১২, ১৯৬১), আরদু বুরতুক্বালুল হাযীন (ঞযব খধহফ ড়ভ ঝধফ ঙৎধহমবং, ১৯৬৩), আল-বাব (ঞযব উড়ড়ৎ, ১৯৬৪), ফিল আদাবিস সাহিউনি (ওহ তরড়হরংঃ খরঃবৎধঃঁৎব, ২০১৩) ইত্যাদি। তার রচনা নিয়ে আরবি ও ইংরেজিতে কাজও হয়েছে প্রচুর। তবে তার রচনাবলির বেশিরভাগই প্রকাশিত হয়েছে মৃত্যুর পরেই। ‘ইজজদ্দীন আল কাসসাম’ বিষয়ক তার আর্টিকেল প্যালেস্টাইন রিসার্চ সেন্টার ম্যাগাজিন ‘শুঊন ফিলিস্তিনিয়া’-তে মুদ্রিত হলে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগ্রামের পূর্বসুরিদের পরিচয় জনগণের সামনে চলে আসে এবং এখনকার হামাসের যেই ‘আল-কাসসাম ব্রিগেড’, সেটা সেই সূত্র ধরেই গড়ে তোলা হয়। ১৯৭৫ সালে আফ্রো-এশিয়া রাইটার্স সম্মেলনে তাকে মরণোত্তর ‘লোটাস প্রাইজ ফর লিটারেচার’ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তার সৃষ্টিকর্মের রক্ষণাবেক্ষণে ‘গাসসান কানাফানি কালচারাল ফাউন্ডেশন’ গঠন করা হয়, যা ইতিমধ্যে ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিশুদের জন্যে বিভিন্ন দেশে ৮ টি কিন্ডারগার্টেন পরিচালনা করছে।
১৯৭২ সালের ৮ জুলাই কানফানিকে বৈরুতে হত্যা করা হয়, বয়স তখন তার মাত্র ৩৬ বছর। অস্টিন ১১০০ মডেলের ব্যক্তিগত গাড়ির বাম্পার বারের পিছনে ৩ কেজি প্লাস্টিকের বোমা বিস্ফোরিত হয়। দেখা যায় সতেরো বছর বয়সী ভ্রাতুষ্পুত্র লামিস নাজিমকে কোলে চেপে ধরে তিনি নিথর পড়ে আছেন। বহু বাকযুদ্ধের পরে মোসাদ অবশেষে হামলার দায়িত্ব স্বীকার করে। লেবাননের ডেইলি স্টার যথার্থই লিখেছে-তিনি ছিলেন এমন একজন কমান্ডো, যে কখনও বন্দুক দিয়ে গুলি করে নি; তার অস্ত্র ছিল বল-পয়েন্ট কলম এবং রণাঙ্গন ছিল নিউজপেপার। ফিলিস্তিনের জনগণের কাছে তিনি একজন বিপ্লবী হলেও আধুনিক আরবি সাহিত্য তাকে চিরকাল অমর করে রাখবে।
কানফানি তাঁর ‘প্যালেস্টাইনিয়ান রেসিসটেন্স লিটারেচার আন্ডার অকুপেশন’ (দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সাহিত্য) গ্রন্থে লিখেছেন, ‘সশস্ত্র প্রতিরোধের মতোই ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সাহিত্য ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় একটি নতুন মাত্রার সংযোজন করে আছে, যা ফিলিস্তিনিদের জীবন থেকে অর্ধশতাব্দিতেও বিচ্ছিন্ন হয়নি’।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT