মহিলা সমাজ

মল্লিকা

জাহিদা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-০৪-২০১৮ ইং ০৩:০০:৩৫ | সংবাদটি ১৫৩ বার পঠিত

মেয়েটির নাম মল্লিকা! খুব চঞ্চল। পড়ালেখায় খুব একটা মনোযোগী ছিলো না। সারা দিন সে গ্রামে ঘুরে বেড়াতো। এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি, গ্রামের মেঠোপথ, নদীর পাড়, এ গাছ থেকে ও গাছে চড়া, বৃষ্টির পানিতে ভিজে খেলা করা। সইদের নিয়ে সারা দিন হেসে খেলে সময় কাটানো এ ছিলো তার নিত্যদিনের অভ্যাস।
মেয়েটিকে নিয়ে বাবার অনেক চিন্তা। বাবার আর্থিক অবস্থাও তেমন একটা ভালো ছিলো না। মল্লিকার সবার সাথে ভালো সম্পর্ক ছিলো। একটু মেজাজী হলেও সদালাপী ছিলো। তার সইদের সাথে একদিন দেখা না হলে মন খুব খারাপ থাকতো। মল্লিকার জগতে সে ছিলো অন্যরকম। সে ভাবতো সে যা চাইবে, যা ভাববে সবই তার মতো করে পাবে। সকাল বেলা পাখিদের কিচির-মিচির ডাক, বকুল তলায় গিয়ে বকুল ফুল কুড়ানো এসব তার খুবই প্রিয়। ঘুম থেকে জেগে সকাল বেলা চলে যেতো বকুল তলায়। ফুল কুড়িয়ে মালা গেঁথে খোপায় জড়িয়ে আপন মনে সাজতো। বাবা বলতো মা-গো এসব আমাদের সাজে না। মল্লিকা বলতো কেন বাবা? বাবা বলতো তুই এখন বড় হচ্ছিস। তোকে পরের ঘরে যেতে হবে। সংসারধর্ম পালন করতে হবে। মল্লিকা এতে কিছুই বলতো না। সে তার আপন খেয়াল-খুশি মতো চলতো।
মল্লিকার ভালো লাগতো দূর পাহাড়ের গা ঘেষে পাহাড়ী ঝর্ণা, পাখির কলতান, বয়ে যাওয়া নদীর কুলকুল শব্দ, রাখালের বাঁশীর সুর, গ্রামের মেঠোপথ, খোলা আকাশ। এসব তাকে খুব কাছে টানতো। সে ভাবতো যদি পাখির মতো দুটি ডানা থাকতো তাহলে খোলা আকাশে উড়ে বেড়াতো। কে কি বলছে বা না বলছে এসব কিছুই তাকে শুনতে হতো না। আকাশের দিকে তাকিয়ে পাখি উড়া দেখতো। কোথাও যদি দেখতো পাখিরা দল বেঁধে আকাশে উড়ছে, সে সব কিছু ফেলে দিয়ে আপন মনে পাখি উড়া দেখতো, আর বলতো পাখিরা তোমরা কতো স্বাধীন, কতো সুন্দর। মুক্ত আকাশে ডানা মেলে আপন মনে বিচরণ করছো। মুক্ত স্বাধীন এ পাখিগুলো।
সময় ও দিন যেতে থাকলো। কিশোরী মল্লিকা এখন বেশ বড়। একদিন তার বিয়ে হয়ে যায়। পরিচিত মানুষ, গ্রাম, মা-বাবা, ভাই-বোন, সইদের ছেড়ে পাড়ি জমালো শ্বশুর বাড়ি। সংসারের বেড়াজালে কিশোরী মল্লিকা এখন আবদ্ধ। চাইলেও সে আগের মতো হতে পারবে না। গ্রামের সবাই তাকে পছন্দ করতো। মনে পড়ে ফেলে আসা অতীত। কতো সুন্দরে ভরা ছিলো অতীতের দিনগুলো।
মানুষের জীবন কতো বিচিত্র। জীবন জীবনের মতো চলছে, সবাই যার যার মতো করে দিন কাটাচ্ছে। কিশোরী মল্লিকাকে এখন কি আর কেউ মনে রাখছে। মনে পড়ে মল্লিকার, ফরিদা পারভিনের গাওয়া সে মধুর গানটি- তোমরা ভুলেই গেছো/ মল্লিকাদের নাম/ সে এখন ঘোমটা পরা/ কাজল বধূ দূরের/ কোন গাঁয়।
স্বামী সংসার নিয়ে মল্লিকার দিনগুলো অতিবাহিত হচ্ছে। শাশুড়ি তাকে খুব ¯েœহ করেন। ¯েœহ ভালোবাসা দিয়ে তার মন জয় করে নিয়েছেন। মল্লিকা কিছু সেলাই এবং হাতের কাজ জানতো। সে সংসারের প্রতি ধীরে ধীরে মনোযোগী হয়ে উঠলো। একদিন শাশুড়িকে বললো, আমি কাজ করতে চাই। শাশুড়ি বললেন কি কাজ তুমি করবে মা? মল্লিকা শাশুড়িকে সব বললো। শাশুড়ি এতে খুশি হয়ে মল্লিকাকে সব রকমের সাহায্য সহযোগিতা করলেন।
ধীরে ধীরে স্বামীর ঘরে একদিন মল্লিকা নিজের পায়ে নিজেকে দাঁড় করালো। সে সেলাই করে হাতের তৈরি ছোট-খাটো জিনিস বানিয়ে গ্রামের বাজারে বিক্রির জন্য উদ্যোগ নিলো। এতে স্বামী, শাশুড়ি খুব খুশি হয়ে তাকে কাজে উৎসাহিত করলেন। মাল্লিকা এখন কাজকর্ম নিয়ে খুব ব্যস্ত। গ্রামের সবার কাছে এখন সে খুব পরিচিত। তার নাম এখন সবার মুখে মুখে।
মনে পড়ে তার বাবার কথা। বাবা বেঁচে থাকলে অনেক খুশি হতেন। ফেলে আসা অতীত মল্লিকার স্মৃতিতে জ্বলজ্বল করতে থাকে। তার কাজে সে এখন অনেকদূর এগিয়েছে। মাসে অনেক টাকা রোজগার করে। ফেলে আসা অতীত, গ্রামের কথা, সইদের কথা মন থেকে সরাতে পারে না। সইরা এখন যার যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত। বাবাকে খুব মিস করে। ছোট্ট কিশোরী মল্লিকা এখন সমাজ ও সংসারের কাছে প্রতিভাবান সফল মল্লিকা হিসেবে আলোকিত মানুষ।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT