শিশু মেলা

সেয়ানে সেয়ান

জসীম আল ফাহিম প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৪-২০১৮ ইং ০২:৪৬:২৩ | সংবাদটি ১১৪ বার পঠিত

ছোট্ট খঞ্জনা পাখি! সাদা কালোয় মিশেল শরীর। সুন্দর দুটো চোখ। সরু লম্বা পা। লম্বা লেজ। বড়োই চঞ্চলামতি তার। সারাদিন কাঁদায়-পানিতে থাকে। ভেজা মাটিতে হাঁটে আর লেজ দোলায়। লেজ দুলিয়ে দুলিয়ে সরু লম্বা ঠোঁট দিয়ে মাটি ঠুকে। মাটি ঠুকে ঠুকে খাবার খোঁজে। তার চলার ধরন দেখলে মনে হবে সারাক্ষণ বুঝি সে শুধু নেচেই চলেছে।
খঞ্জনা পাখির ধারণা, পৃথিবীতে সে সবচেয়ে শক্তিমান পাখি। তার এত শক্তি যে চলার সময় সে মাটিতে পায়ের ছাপ রেখে যায়। আঙ্গুলের ছাপ রেখে যায়। কাদা মাটি দিয়ে হাঁটলে যে সকলেরই পায়ের ছাপ পড়তে পারে, এটা সে বুঝতে নারাজ। তার ধারণা শরীরে প্রচ- শক্তি আছে বলেই মাটিতে তার পায়ের ছাপ পড়ে। খঞ্জনা পাখি তাই গর্ব করে বিষয়টা অন্য পাখিদের জানায়। কথাটা বলে সে মনে একপ্রকার শান্তি অনুভব করে।
খঞ্জনা পাখি একদিন বান্ধবী টুনটুনি পাখির বাসায় বেড়াতে গেল। টুনটুনিও ছোটোখাটো পাখি। সারাদিন টুনটুন টুইস টুইস করে গান গায়। বড়োই ছটফটে পাখি! খঞ্জনা পাখি সারাদিন টুনটুনি পাখির সাথে নেচে গেয়ে খুব মজা করল। বনে বনে দুজন আপনমনে ঘুরে বেড়ালো। নানান রকম ফল-ফলাদি খেলো। খেয়ে-দেয়ে আর ঘুরেফিরে যখন রাত নামল, তখন দুজন ঘুমুতে গেল। খঞ্জনা পাখি বিছানায় ডান কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। কিন্তু টুনটুনি পাখি ডান কাত হয়ে শুলো না। সে তার চিকন সরু পা দুটো ওপরে তুলে চিৎ হয়ে শুলো।
ওর এমন আচানক শোয়া দেখে খঞ্জনা পাখি জিজ্ঞেস করল, এ কেমন অভ্যাস রপ্ত করেছ টুনটুনি? চিৎ হয়ে শোয়া!
টুনটুনি পাখি বলল, কেনÑএভাবে শুলে তোমার কোনো সমস্যা আছে?
খঞ্জনা পাখি বলল, সমস্যা তো আমার নয়। সমস্যা তোমার হওয়ার কথা।
টুনটুনি পাখি বলল, আমার তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
খঞ্জনা পাখি বলল, হচ্ছে নাÑতবে হবে। তোমার সমস্যাটা আসলে তুমি ঠিক বুঝতে পারছ না।
টুনটুনি পাখি বলল, কি সমস্যা?
খঞ্জনা পাখি বলল, এই যে তুমি দু-পা ওপরে তুলে চিৎ হয়ে শুয়ে আছো; এটা ঠিক নয়। অস্বাস্থ্যকর শোয়া। নিয়ম হলো, সব সময় ডান কাত হয়ে শোয়া। ডান কাত হয়ে শোয়া স্বাস্থ্যকর। ডান কাত হয়ে শুলে শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া সুষ্ঠু ও সচল থাকে। নাক ডাকা থেমে যায়। নিশ্চয়ই তুমি চাও না তোমার নাক দিয়ে বিরক্তিকর গড়গড় আওয়াজ বের হোক।
টুনটুনি পাখি বলল, তা অবশ্য চাই না। কিন্তু তুমি এত কিছু জানো কেমন করে? আমাকে জানিয়ে ভালো করেছ। আমি এখন থেকে ডান কাত হয়েই ঘুমুব। কিন্তু আমি দু-পা ওপরে তুলে চিৎ হয়ে শুই কেন জানো?
খঞ্জনা পাখি বলল, না জানি না-তো।
টুনটুনি পাখি বলল, দেখছ না মাথার উপর মস্তবড়ো আকাশটা কেমন শূন্যে ঝুলে আছে। বলা তো যায় না, ঘুমের মধ্যে যদি ওটা আবার আমার ওপর ভেঙেটেঙে পড়ে। তাই আগে থেকেই আমি পা দুটো ওপরে তুলে ঘুমাই। যাতে আকাশটা কখনো ভেঙে পড়লেও আমি পা দিয়ে ঠেকাতে পারি।
ছোট্ট টুনটুনি পাখির কথা শুনে খঞ্জনা পাখি অনেক কষ্টে তার হাসি চেপে রাখল। পরে বলল, তাই তো! এত বড়ো একটা আকাশ, ভেঙে পড়লে তো মহাবিপদ। তুমি দেখছি খুবই সচেতন পাখি। আগে থেকেই সব সময় সাবধান থাক। সাবধান থাকা অবশ্য মন্দ নয়, ভালো।
কদিন পর এক দুপুরে খঞ্জনা পাখি এক ডোবাতে জলকেলি করছিল। জলকেলি শেষ করে সে একটি পদ্মপাতার ওপর উঠে বসল। তার কাছেই ছোটো এক গাছে টুনটুনি পাখিটি বসেছিল। পদ্মপাতার ওপর বসে খঞ্জনা পাখি স্বভাবসুলভ তার লেজ দোলাতে লাগল। শরীর ঝাড়তে লাগল। তার এমন লেজ দোলানো দেখে মনে হলো, সে বুঝি পদ্মপাতার ওপর আপনমনে নাচানাচি করছে। তার এমন নাচন দেখে টুনটুনি পাখি অবাক হয়ে বলল, বিষয় কি? তুমি অকারণ এত নাচছ কেন?
জবাবে খঞ্জনা পাখি বলল, নাচছি না-তো। ঝাঁকি দিচ্ছি। ঝাঁকি। ঝাঁকি দিয়ে আমি পৃথিবীর বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছি। দেখছ না, আমার ঝাঁকিতে কেমন ভূমিকম্প হচ্ছে। ঝাঁকি দিয়ে দিয়ে আমি পৃথিবীতে বড়োসড়ো একটি ভূমিকম্প তৈরি করছি। বাস্তবে কিন্তু সে সামান্য পদ্মপাতাকেই ডোবাতে পারেনি।
খঞ্জনার এমন কথা শুনে টুনটুনি পাখি আর কী বলবেÑমুখ টিপে শুধু হাসল। বুঝল, খঞ্জনা পাখিও তার চেয়ে কম সেয়ানা নয়।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT