শিশু মেলা

পেটুক

মো. ইব্রাহীম খান প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-০৪-২০১৮ ইং ০২:৪৭:৪৮ | সংবাদটি ৪১ বার পঠিত

চাচী আইজ যদি আমারে কামে না লও তবে উপোস করতে করতে মইরা যামু। কাইল রাইত ভাত খাইছি না। কয়েক বাড়ি ঘুইরা আইছি। কেউ আমারে কামে নেয় না। তাজুদের কষ্টের কথা শুনে শান্তি বিবির মন বেদনায় ভরে ওঠে। মায়াবী গলায় তিনি তাজুদকে বলেন, বাড়িতে কোন কাজ কাম নাই। তুই মুক্তারপুর জিরাতে কামে যা। কাসেম ধান খেত লাগাইতাছে। আমার নাতি মধুও যাইব। তার ইস্কুল বন্ধ। জিরাতে কামে যাওয়ার কথা শুনে তাজুদের মন আনন্দে নাচতে থাকে। সে আনন্দিত গলায় বলে, চাচী কোদাল টুকরিটা দেও। ঘর লেপার মাটি আনি। অনেকদিন ধইরা ঘরডা লেপা অয় নাই। দুপুর বেলা ভাতিজারে লইয়া মুক্তারপুর জিরাতে যামুনে। শান্তি বিবি তাজুদকে কোদাল টুকরি এনে দেন। সে কোদাল কাঁধে নেয়। হাতে টুকরি নিয়ে গাঙের পারে যায়। সে এক টুকরি মাটি এনে গোয়াল ঘরের কোণে রাখে। তাজুদ ক্লান্ত হয়ে গোয়াল ঘরের ছায়ায় বসে পড়ে। সে মধুকে ইশারায় ডাকে। মধু কাছে আসে। তাজুদ হাসি মুখে জিজ্ঞাসা করে, ভাতিজা তোমার মায়ে ভাত রানছে। মধু মাথা নেড়ে জবাব দেয় রান্না হয়েছে। তোমার মায়েরে কও চাইডা ভাত লইতে। আমি হাতমুখ ধুইয়া আই। বার্ষিক পরীক্ষার পর হতে মধুর মন আনন্দে লাফাচ্ছে। সে মুক্তারপুর জিরাতে যাবে। দুইটা গাভী বাচ্চা দিয়েছে। সে গাই দোয়াবে। বাছুরগুলোর মুখে ঘাস তুলে দিবে। বড় গাঙের পারে বসে বড়শি দিয়ে মাছ ধরবে। সে তাজুদের সাথে যাবে। তাই তাজুদের সাথে তার একটু ভাব হওয়া দরকার। মধু রান্না ঘরে যায়। তার মাকে বলে, মা তাজুদ চাচাকে ভাত দাও। চাচার পেটে বেশি খিদা লাগছে। তাজুদ পুকুর ঘাটে হাতমুখ ধুয়ে ঘরে আসে। সে ঘরের মেঝেতে মাটিতে বসে। মধু তাকে ভাত তরকারী এনে দিচ্ছে। তাজুদ গপগপ করে তরকারী ছাড়াই একথালা ভাত খেয়ে ফেলে। বোল ভর্তি ভাত আর বাটি ভরা তরকারী। মুহূর্তের মধ্যে তাজুদ সাবাড় করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে। তাজুদ মধুর দিকে তাকিয়ে হেসে বলে, ভাতিজা তোমার মায়েরে কও আর চাইডা ভাত তরকারী দিতে। এখনও পেট ঠিক মত ভরে নাই। মধু বোল বাটি নিয়ে রান্না ঘরে যায়। মধুর মা ডেগের সব ভাত তরকারী ঢেলে দিয়ে দেয়। তাজুদ আবার খাওয়া শুরু করে। খেতে খেতে সে সব খেয়ে ফেলে। সে থালা চেটেচুটে খাচ্ছে। শান্তি বিবি ঘরে ঢোকেন। তাজুদ তাকে দেখে সাদা দাঁত বের করে হেসে বলল, চাচী মাটি আইনা রাখছি গোয়াল ঘরের কোণায়। চাচী মধু ভাতিজা তুরা ভাত তরকারী দিল। পেট ভরে নাই। আর চাইডা ভাত তরকারী অইলে ভালা কইরা পেট ভরত।
মধু এত সময় ধরে তাজুদের ভাত খাওয়া দেখেছে। অল্প স্বল্প ভাত তরকারী দেয়া হয়েছে শুনে সে অবাক হয়। তাজুদ বেশি খায় সে শুনেছে। কিন্তু এত বেশি খেতে পারে আজ প্রথম নিজের চোখে দেখল। অতিরিক্ত খাওয়ার কারণে কোন কৃষক তাকে পেটে ভাতে কামে নিতে চায় না। শুধু তার দাদু শান্তি বিবি দয়া করে তাকে খাওয়ানোর জন্যে কাম দেন। শান্তি বিবি রান্না ঘরে যান। মধুর মাকে আরেক বোল ভাত দিতে বলেন। মধুর মা বিস্মিত গলায় বলল, মা দুই কেজি চালের ভাত আর দুই পাতিল তরকারী তাজুদ ভাই সব খেয়ে ফেলেছে। মধুর জন্যে কিছু বাকী নেই।
শান্তি বিবি মনে অশান্তি নিয়ে তাজুদকে বলেন, ভাত তরকারী নেই। এখন হাত ধুয়ে ফেল। বৌমা দুপুরে আবার রান্না করব। এখন গাঙের পার হতে আর কয়েক টুকরি মাটি আন। তাজুদ মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, মাটির কাম করলে বেশি বেশি খাওয়া লাগে।
এখন কাজে যা। পরে খাওয়ার ব্যবস্থা হবে। শান্তি বিবি বিরক্তি গলায় বললেন তাজুদকে। তাজুদ কোদাল টুকরি হাতে নেয়। তার পেটের এক কোণা খালি। খালি জায়গাটা খামচাচ্ছে। তার কাজ করতে ইচ্ছে করছে না। সে কোদাল টুকরি সামনে নিয়ে পুকুর পারে আম গাছ তলায় মাটিতে বসে ঝিমাতে থাকে।
তাজুদ কোন কাজের লোক না। কেউ তাকে কাজে নেয় না। তার পেট শুধু খাই খাই করে। বেশি খাওয়ার কারণে তার শরীর বেশ ভারী। সে বেশী নড়াচড়া করতে পারে না। কাম কম খাওয়া বেশি এ হিসেব করে কেউ তাকে কাজে নিতে চায় না। শুধু শান্তি বিবি তাকে একটু আধটু কাজ দেন। উদ্দেশ্য তাজুদকে ভাত খাওয়ানো। শান্তি বিবির দয়া মায়ায় সে বেঁচে আছে।
শান্তি বিবি দুই কেজি চিকনের চাউল। দুই কেজি খেজুরের গুড়। গরম মশলার একটা পুটলা বেঁধে দেন। খেজুরের গুড় আর দুধ দিয়ে বারমাসী কামলা কাসেম ক্ষীর খেতে চেয়েছিল। মধু আর তাজুদ মুক্তারপুরের উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করে। পথে দু’জনের মিলে কথা বলতে বলতে হাঁটতে থাকে।
ভাতিজা তুমি কোন কেলাসে পড়?
ক্লাস সেভেনে।
সেভেন কি?
সেভেন হলো সপ্তম শ্রেণি।
ঔডা আবার কি?
চাচা সেভেন বা সপ্তম হলো সাত নম্বর ক্লাস।
হু। অহন বুঝছি।
চাচা তোমারে একটা কথা বলি। যদি কিছু মনে না কর।
একটা ক্যান। একশটা জিগাও। আমি কেউর কথায় কিচ্ছু মনে করি না। চাচা বেশি ভাত খাওয়া ভালো না। বেশি খেলে পেট শরীর খারাপ করতে পারে। বুদ্ধিশুদ্ধি কমে যায়। কাজে অলসতা আসে। আমরা বিজ্ঞান বইয়ে পড়েছি পরিমিত পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত খেতে হবে। ভাতিজা হুন। দুনিয়া অইল খাওয়ার জায়গা। মইরা গেলে তো খাইতে পারুম না।
দুনিয়ায় সুখে শান্তিতে থাকতে হলে নিয়ম মাফিক খেতে হবে। ভাতিজা তুমি অইলা বিদ্যান পোলা। তোমারে একটা কথা জিগাই। হগলে কয় আমার বুদ্ধিশুদ্ধি নাই। আমারে বুঝাইয়া কও বুদ্ধি জিনিসটা কি।
চাচা বুদ্ধি হলো- মানসিক শক্তি বিশেষ, যার সাহায্যে জ্ঞান আহরণ, সংরক্ষণ ও প্রয়োগ করা যায়।
ভাতিজা, তুমি আমারে খাওয়ার ব্যাপারে জিগাও। আমি ফটফট করে সব খাদ্যের স্বাদ গন্ধ কইতাম পারুম। খাওয়ার বিষয়ে আমার বুদ্ধি কমতি নাই। তোমার গিরস্থির জ্ঞান বুদ্ধি যাচাই করি।
করেন চাচা।
কও দেহি দর্মা ছাড়া কামলা কি?
মুজুরি ছাড়া কাজের লোক।
ঠিক কইছ। আমি অইলাম দর্মা ছাড়া পেটে ভাতে কামলা। অহন কও দেহি জিরাত কি?
জিরাত হলো ভাটি অঞ্চলে হাওড় পারের বোর জমিতে ডেরা বেঁধে উজানের কৃষক লোকদের জমি চাষ করা।
ঠিক ভাতিজা। তুমি অইলা বুদ্ধিমান বিদ্যান বেটা।
ধারামের খেয়া ঘাটে পৌঁছে মধু তার এক ক্লাসমেটকে পেয়ে যায়। তাজুদের আলাপ থেমে যায়। তারা খেয়া নৌকায় চড়ে বসে। দীর্ঘ মেঠো পথ হেঁটে পড়ন্ত বিকেলে তাজুদ ও মধু মুক্তারপুর পৌঁছে। ধানকোণা হাওড়ের পারে শুকনো ঘাস ও বাঁশ দিয়ে শক্ত করে ডেরা বানিয়েছে কাসেম। কাসেমের সাথে আরও তিনজন মৌসুমী কামলা আছে। তারা এখানে এক মাস থাকবে। জমি চাষ রোপণ ও সেচের কাজ করবে। তাদের কাছাকাছি আরও কয়েকটি ডেরা আছে। পেটুক তাজুদকে দেখে কাসেমের মেজাজ বিগড়ে যায়। সে কর্কশ সুরে বলে, এ্যাই তাজুদ্যা তুই কিথার লাগি আইচ্ছে।
তাজুদ হাসি খুশি মুখে বলে, আমারে চাচী পাঠাইছে। কাসেম তোর লাইগা চিকনের চাউল আর খেজুরের গুড় আনছি। মজা কইরা ক্ষীর খাইমু। শীতের ক্ষীর রাতে রাইন্ধা সকালে খাইতে মজা। তাজুদের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বিগড়ানো মেজাজেই কাসেম বলল, তুই তো মজা খাওয়ার লাইগা আইছে। তোর কাম টাম করণের দরকার নাই।
আমি তোরা তোরা কাম করমু। আমার মধু ভাতিজারে কিছু কিছু গিরস্থির কাম শিখাইমু।
হে বেটা বড় বড় পাস দিব। কলমের কাম শিখব। কলম চালাইয়া টাকা রুজি করব। তোর মত মইষ অইত না।
কাসেম তাজুদকে তাড়ানোর জন্যে তাকে রাগানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু তাজুদ কিছুতেই রাগ করে না। তার মুখে হাসি লেগেই থাকে। শুধু পেঠে বেশি খিদা লাগলে তার মুখটা একটু মলিন হয়। মধু পৌঁছে বাছুর দুইটার সাথে খেলা শুরু করে। বাছুরগুলোও লাফাচ্ছে। সে তাদের মুখে ঘাস তুলে খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। মধু ডেরার ভেতরে ঢুকে দেখল একটা বড়শি। সে বড়শি নিয়ে বড় গাঙের পারে বসে পড়ে মাছ ধরত। বড়শি নদীতে ফেলতেই টেংরা পুঁটি মাছ ধরছে। জীবন্ত মাছগুলোর লাফালাফি দেখে মধুর মন আনন্দে ভরে ওঠে। এক ঝাক অতিথি পাখি হাওর হতে উড়ে এসে নদীতে পড়ে। পাখিগুলো দলবেঁধে নদীতে ভেসে বেড়াচ্ছে। গোধুলি লগ্নে এমন সুন্দর দৃশ্য দেখে মধু মুগ্ধ হয়।
রাতে খাওয়া শেষ করে কাসেম ক্ষীরের ডেগ বসায়। ডেরার বাইরে খোলা আকাশের নীচে ক্ষীর রান্না হচ্ছে। শুকনো ঘাসের আগুন। আগুন ধীরে ধীরে জ্বলছে। চার লিটার দুধ দুই কেজি খেজুরের গুড় আর গরম মসলা দেয়া হয়েছে। চুলোর চারদিকে বসে সবাই আগুন পোহাচ্ছে। রান্না শেষ হতে প্রায় মাঝ রাত হয়ে যায়। কাসেম সাবধানে ডেগ ডেরার ভেতরে আনে। ডেগ ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রেখে তারা ঘুমিয়ে পড়ে।
সকালে কাসেম সবাইকে নিয়ে জমিতে যায়। কুয়াশার চাদরে চারদিক ঢাকা। দূরে কোথাও কিছু দেখা যাচ্ছে না। শীতল বাতাস আর ঠান্ডা পানি জমিতে। তারা দ্রুত গতিতে চারা ধান গাছ লাগিয়ে যাচ্ছে। কাসেম সবাইকে বলেছে খেতের ঐ কোনা লাগানো শেষ হলে তারা ক্ষীর খেতে যাবে। স্বাদের ক্ষীর খাওয়ার আনন্দে সবাই দ্রুত হাত চালাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর তাজুদ কাসেমকে উদ্দেশ্য করে বলে, কাসেম আমার খুব বেশি পায়খানায় ধরছে। তোরা খেত লাগা। আমি পেট খালি কইরা আই। তাড়াতাড়ি দৌড় দে। লুঙ্গি নষ্ট হওয়ার আগে ভাগেই যা। কাসেমের কথা শুনে সবাই খিলখিল করে হেসে ওঠে।
তাজুদ দৌড়ে খেত হতে ওঠে পড়ে। কাসেম সহ বাকীরা মনের আনন্দে হালকা পানিতে টপটপ শব্দে ধান গাছ লাগিয়ে যাচ্ছে। খেতের কোনাটা লাগানো শেষ হলেই তারা স্বাদের ক্ষীর খেতে যাবে।
অনেক সময় পার হয়ে যায়। তাজুদ ফিরে আসছে না। খেতের কোনা লাগানো প্রায় শেষ পর্যায়ে। কাসেমের মনে খটকা বাজে। পায়খানা শেষ হতে এত বিলম্ব হওয়ার কথা না। তাহলে তাজুদ। হঠাৎ কাসেম হাতের চারা ধান গাছগুলো ছুড়ে ফেলে দেয়। সে চিৎকার করে বলে ওঠে, ভাতিজা মধু সর্বনাশ হয়ে গেছে। বলেই সে দ্রুত বেগে দৌড় দেয় ডেরার দিকে। অন্যান্যরা তার দিকে হা করে তাকায়। তারা কিছুই বুঝতে পারছে না। পরে বাকীরাও কাসেমের পেছনে ডেরার দিকে দৌড়াতে থাকে।
ডেরার ভেতরে ঢুকে সবাই ভিমরি খায়। তাজুদ দুই পা ছড়িয়ে বসে আছে। তার দুই পায়ের মাঝে ক্ষীর শূন্য ডেগ খা-খা করছে। সে হা করে মুখ দিয়ে শ্বাস প্রশ্বাসের কাজ করছে। তার পেট ফুলে ফুটবলের মত হয়ে আছে। সে নড়াচড়া করতে পারছে না। কাসেমের মেজাজ প্রচন্ড শীতের মাঝেও আগুনের মত গরম হয়ে ওঠে। এতগুলো মানুষের স্বপ্নের স্বাদের খাবার একাই সাবাড় করে ফেলল। কাসেমের ইচ্ছে করছে ওর ঢোলের মত ফোলা পেঠে কয়েকটা লাথি মারে। কা-সে-ম আমারে বাঁচা। আমার পায়খানায় ধরছে। আমি ওঠতে পারতাছি না। আমারে ধইরা বাইরে নে। আমার পেটের সব পায়খানা বাইর অইলে ডেরা ভাইসা যাইব। কোন মতে কষ্টে দম নিয়ে নিয়ে তাজুদ কথাগুলো বলল। তাজুদের কথা শুনে কাসেমের রাগ পড়ে যায়। সে ভাবে শালার পুতে যদি এখন পেটের সব মাল ছাড়া শুরু করে তাহলে ডেরার বারোটা বেজে যাবে। দুইজনে মিলে তাজুদকে খাড়া করে। সে কোন মতে দাঁড়ায়। ডেরার বাইরে যাওয়ার জন্যে পা বাড়ায়। কিন্তু সে বাইরে যেতে পারে না। ভুটভুট শব্দ করে পায়খানা শুরু হয়। মুহূর্তের মাঝে ডেরার মেঝে, বেড়া পাতলা পায়খানায় একাকার হয়ে যায়। পায়খানার অসহ্য টক গন্ধে দুজনই তাকে ছেড়ে ছিটকে দূরে সরে যায়। ছেড়ে দিতেই তাজুদ ধপ করে ডেরার মেঝে পড়ে যায়। সে তার নিজের পায়খানার মধ্যে গড়াগড়ি খেতে থাকে। মাগো বাবাগো চাচীগো পেটের ব্যথায় মরে গেলাম বলে তাজুদ চিল্লাতে শুরু করে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT