ধর্ম ও জীবন

তাফসিরুল কুরআন

প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-০৪-২০১৮ ইং ০১:৩২:২২ | সংবাদটি ৩২ বার পঠিত

[পূর্ব প্রকাশের পর]
দোয়া করার পদ্ধতি : এ সূরায় একটা বিশেষ ধরণের বর্ণনারীতির মাধ্যমে মানুষকে শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে, যখন আল্লাহর নিকট কোনো দোয়া বা কোনো আকুতি পেশ করতে হয়, তখন প্রথমে তাঁর তা’রীফ কর, তাঁর দেয়া সীমাহীন নেয়ামতের স্বীকৃতি দাও। অতঃপর একমাত্র তিনি ছাড়া অন্য কাকেও দাতা ও অভাব পূরণকারী মনে করো না কিংবা অন্য কাউকেই এবাদতের যোগ্য বলে স্বীকার করো না। অতঃপর স্বীয় উদ্দেশের জন্য আরযি পেশ কর। এ নিয়মে যে দোয়া করা হয়, তা কবুল হওয়ার ব্যাপারে বিশেষ আশা করা যায়। দোয়া করতেও এমন ব্যাপক পদ্ধতি অবলম্বন কর, যাতে মানুষের সকল মকসুদ তার অন্তর্ভুক্ত থাকে। যথা, সরল পথ লাভ করা এবং দুনিয়ার যাবতীয় কাজে সরল-সঠিক পথ পাওয়া, যাতে কোথাও কোনো ক্ষতি বা পদস্খলনের আশঙ্কা না থাকে। মোটকথা, এখানে আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে তাঁর তা’রীফ প্রশংসা করার প্রকৃত উদ্দেশ্যই হলো মানবকুলকে শিক্ষা দেয়া।
আল্লাহর তা’রীফ প্রশংসা করা মানুষের মৌলিক দায়িত্ব : এ সূরার প্রথম বাক্যে আল্লাহর তা’রীফ বা প্রশংসা শিক্ষা দেয়া হয়েছে। তা’রীফ বা প্রশংসা সাধারতঃ কোনো গুণের বা প্রতিদানের পরিপ্রেক্ষিতে উল্লেখ হয়ে থাকে। কিন্তু এখানে কোনো গুণের বা প্রতিদানের উল্লেখ নেই। এতে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, আল্লাহর নেয়ামত অগণিত। কোনো মানুষ এর পরিমাপ করতে পারে না।
কুরআনে এরশাদ হয়েছে : অর্থাৎ, যদি তোমরা আল্লাহর নেয়ামতের গণনা করতে চাও, তবে তা পারবে না। মানুষ যদি সারা বিশ্ব হতে মুখ ফিরিয়ে শুধুমাত্র নিজের অস্তিত্বের প্রতিই দৃষ্টি নিবব্ধ করে, তবে বুঝতে পারবে যে, তার দেহই এমন একটি ক্ষুদ্র জগত যাতে বৃহৎ জগতের সকল নিদর্শন বিদ্যমান। তার দেহ যমীন তুল্য। কেশরাজি উদ্ভিদ তুল্য। তার হাড়গুলো পাহাড়ের মতো এবং শিরা-উপশিরা যাতে রক্ত চলাচল করে, সেগুলো নদী-নালা বা সমুদ্রের নমুনা। দু’টি বস্তুর সংমিশ্রণে মানুষের অস্তিত্ব। একটি দেহ ও অপরটি আত্মা। এ কথাও স্বীকৃত যে, মানবদেহে আত্মা সর্বাপেক্ষা উত্তম অংশ আর তার দেহ হচ্ছে আত্মার অনুগত এবং অপেক্ষাকৃত নিকৃষ্ট মনের অধিকারী। এ নিকৃষ্ট অংশের পরীক্ষা-নিরীক্ষাকারী চিকিৎসকগণ বলেছেন যে, মানবদেহে আল্লাহ তা’আলা পাঁচ হাজার প্রকার উপাদান রেখেছেন। এতে তিন শতেরও অধিক জোড়া রয়েছে। প্রত্যেকটি জোড়া আল্লাহর কুদরতে এমন সুন্দর ও মজবুতভাবে দেয়া হয়েছে যে, সর্বদা নড়া-চড়া করা সত্ত্বেও তার মধ্যে কোনো পরিবর্তন হয় না এবং কোনো প্রকার মেরামতেরও প্রয়োজন হয় না। সাধারণতঃ মানুষের বয়স ষাট-সত্তর বছর হয়ে থাকে। এ দীর্ঘ সময় তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো সর্বদা নড়াচড়া করছে, অথচ এর মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না।
আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেনÑ অর্থাৎ, আমিই মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং আমিই তাদের জোড়াগুলোকে মজবুত করেছি।’ এ কুদরতী মজবুতির পরিণাম হয়েছে এই যে, সাধারণভাবে তা অত্যন্ত নরম ও নড়বড়ে অথচ এ নড়বড়ে জোড়া সত্তুর বছর বা এর চাইতে অধিক সময় পর্যন্ত কর্মরত থাকে। মানুষের অঙ্গগুলোর মধ্যে শুধু চক্ষুর কথাই চিন্তা করলে দেখা যাবে, এতে আল্লাহ তা’আলার অসাধারণ হেকমত প্রকাশিত হয়েছে; সারা জীবন সাধনা করেও এ রহস্যটুকু উদ্ধার করা সম্ভব নয়।
এ চোখের এক পলকের কার্যক্রম লক্ষ্য করলে বুঝতে পারা যাবে যে, এর এক মিনিটের কার্যক্রমে আল্লাহ তা’আলার কতো নেয়ামত যে কাজ করছে, তা ভেবে অবাক হতে হয়। কেননা চক্ষু খুলে এ দ্বারা কতো বস্তুকে সে দেখছে। এতে যেভাবে চক্ষুর ভেতরের শক্তি কাজ করছে, অনুরূপভাবে বহির্জগতের সৃষ্টিরাজিও এতে বিশেষ অংশ নিচ্ছে। সূর্যের কিরণ না থাকলে চোখের দৃষ্টিশক্তি কোনো কাজ করতে পারে না। সূর্যের জন্য আকাশের প্রয়োজন হয়। মানুষের দেখার জন্য এবং চক্ষু দ্বারা কাজ করার জন্য আহার্য ও বায়ুর প্রয়োজন হয়। এতে বুঝা যায়, চোখের এক পলকের দৃষ্টির জন্য বিশ্বের সকল শক্তি ব্যবহৃত হয়। এ তো একবারের দৃষ্টি এখন দিনে কতবার দেখে এবং জীবনে কতোবার দেখে তা হিসাব করা মানুষের শক্তির উর্ধ্বে। এমনিভাবে কান, জিহবা, হাত ও পায়ের যতো কাজ এতে সমগ্র জগতের শক্তি যুক্ত হয়ে কার্য সমাধা হয়। এ তো সে মহৎ দান যা প্রতিটি জীবিত মানুষ ভোগ করে। এতে রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র্যের কোনো পার্থক্য নেই। তাছাড়া আল্লাহ তা’আলার অসংখ্য নেয়ামত এমন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে রয়েছে যা প্রতিটি প্রাণী ভোগ করেও উপকৃত হয়। আকাশ-জমিন এবং এ দু’টির মধ্যে সৃষ্ট সকল বস্তু চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, বায়ু প্রভৃতি প্রতিটি প্রাণীই উপভোগ করে।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT