শিশু মেলা

পেছনে কে ছিল

সালমান শাহ প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-০৫-২০১৮ ইং ০২:৫৬:৩৩ | সংবাদটি ১৩৬ বার পঠিত

সামনে এসএসসি পরীক্ষা। হেলায় হেলায় পড়াশোনা করলে চলবে না। তাই এখন অনেক রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করতে হয়। আর স্কুলের স্যার এবং ম্যাডামরাও আমাদের পড়াশোনার ব্যাপারে এখন খুব বিকেয়ারফুল। যেই স্যার ক্লাসে এসে চেয়ারে বসে হা করে নাক ডেকে ঘুমাতেন, আমরা ক্লাসে লুঙ্গি ডান্স দিলেও যিনি টেরও পেতেন না, এখন তার সামনে দিয়ে নয়, পেছনে দিয়ে, মশা নয়, পিঁপড়াও যেতে পারে না। প্রতিদিন গোটা পঁচেক বেত ফাঁটিয়ে ফেলেন আমাদের ধোলাই করতে করতে। স্যার একটা কথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন যে, লোহা যতোই শক্ত হোক না কেন, তাকে ভালো করে পেটালে আস্তে আস্তে সেটি বড় হবেই। আর ছাত্ররা যতেই দুর্বল হোক না কেন, তাদের পেটালে তারা আস্তে আস্তে মেধাবী হবেই।
অনেক রাত জেগে পড়ার কারণে আমার চেহারাটা শুকিয়ে একেবারে আমের আঁটির মতো হয়ে গেছে। প্রতি রাতে আধা লিটার করে চা খাই চোখে ঘুম না আসার জন্য। অবশ্য কফি হলে আরও ভালো হতো। কিন্তু কফি বেশি খেলে নাকি আবার স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে। তাই চা-ই খাই। আগামীকাল অংক মডেল টেস্ট দিতে হবে। সব অংক রিভিশনও দিয়ে ফেলেছি অলরেডি। হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম দুইটা বেজে গেছে। এখন না ঘুমালে আবার সকাল সকাল উঠতে পারব না। তাই তাড়াতাড়ি বইখাতা ও দরজা জানালা বন্ধ করে লাইটটা নিভিয়ে চাদর গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়লাম। ঘুমে চোখ জ্বালাপোড়া করছে, কিন্তু ঘুমাতে পারছি না। কিছুক্ষণ বিছানায় ছটফট করে আবার উঠে বাইরে এলাম। বাইরে খুব কুয়াশা পরছে। তার ভেতর দিয়েও চাঁদটা একটু একটু দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ করে ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল। সন্ধ্যা হলে যখন উঠানে হাঁটাহাটি করতাম, তখন মনে হতো যেন চাঁদটাও আমার সাথে সাথে হাঁটছে। আবার দাঁড়িয়ে গেলে চাঁদটাও যেন দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। আরেকটা কথা শুনতাম যে চাঁদে নাকি একটা বড় বট গাছ আছে। আর সেই বট গাছের নিচে চাঁদের বুড়ি বসে বসে সূতা কাটে। মাঝে মাঝে বুড়ির হাত ফসকে সূতা পৃথিবীতে চলে আসে। আরও অনেক আজব সব কথা বিশ্বাস করতাম তখন। মনে হলে এখনো হাসি পায়। চাঁদটা দেখে একটা গানের কলি মনে পড়ে গেল। মৃদু কয়েকটা কাশি দিয়ে গলাটা ঠিক করে গানের কলিটা ধরলাম ‘রাতে যখন উঠে চাঁদ, ছুতে চায় কেন তারই হাত।
আসলে গভীর রাতে গান গাওয়ার মজাই আলাদা। কিন্তু গানটা আর গাইতে পারলাম না। বাড়ির পাশের বট গাছটা মনে হলো হঠাৎ একটু নড়ে উঠল। ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি ঘরে গিয়ে আবার শুয়ে পড়লাম। এবার শুতে না শুতেই ঘুমিয়ে গেলাম। কিন্তু হঠাৎ একটা শব্দে আমার ঘুমটা আবার ভেঙে গেল। শব্দটা হচ্ছিল আমার রুমের দরজায়। মনে হচ্ছে কেউ দরজায় নক করতেছে। আমি কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম। কারণ এতো রাতে তো কেউ আসার কথা না। চোরটোর নয়তো হতেও তো পারে। কারণ গত সপ্তাহে আমাদের গ্রামে তিনটি বাড়িতে চুরি হয়েছে। চোরগুলো এতোই চোর ছিল যে সামনে যা পেয়েছে সব নিয়ে গেছে। এমনকি বদনাটা পর্যন্তও বাদ দেয়নি। আমি লাইট না জ্বালিয়ে খুব সবাধানে বিছানা ছেড়ে উঠে এসে দরজার পাশে দাড়ালাম। ভয়ের মাত্রাটা তখন কয়েকগুণ বেড়ে গেল। বুকের ভেতরটা ফুটন্ত পানির মতো লাফাতে শুরু করল। কিন্তু একটু পরে আমি একেবারে আকাশ থেকে পড়লাম। কারণ দরজার ওপাশ থেকে একটা মেয়েলি কণ্ঠে কে যেন আমায় ডাকছে।
কণ্ঠটা ধরতে আমার এক মুহূর্তও দেরি হলো না। এটা পাশের ঘরের ভাবি, মদন ভাইয়ের বউয়ের কণ্ঠ। যাক বাবা, বাঁচলাম, চোরটোর আসে নি। এবার কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেলাম। বুকের লাফালাফিটাও অনেক কমে গেছে। লাইট অন করে দরজাটা খুলে দিলাম। কিন্তু ভাবিকে দেখেতো আমার চোখ কপালে উঠে গেছে। তার পরনে তার টকটকে লাল শাড়ি, হাতে রেশমী নীল চুড়ি, খোপায় রজনী গন্ধা ফুল, কানে সোনার দুল, ঠোঁটে গোলাপী লিপস্টিক, কাজল কালো চোখ, আলতা রাঙা পায়ে রুপার নূপুর।
আমি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে ভাবিকে প্রশ্ন করলামÑ
Ñকি অইছে ভাবি? এতো রাইতে আফনে! আমি তো মনে করছি চোরটোর আইছে নাকি।
ভাবি আমার প্রশ্নের কোন জবাব না দিয়েই ঘরে ঢুকে আমার চেয়ারটায় বসল। দেখলাম কয়েক ফোঁটা আশ্রু তার গাল বেয়ে মাটিতে পড়ল। এবার বুঝতে পারলাম সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটেছে। ভ্রু কুচকে আবার প্রশ্ন করলামÑ
Ñকি অইছে ভাবি? আফনে কানতাছেন কেরে? আমারে কন।
এখন দুই ফোঁটা নয়, পুরো ঝরনাধারার মতো গাল বেয়ে পানি পরছে। কিন্তু কোনো জবাব নেই। ভাবিকে একটু হাসানোর চেষ্টা করে বললাম। কিন্তু কোনো কাজ হলো না। কিছুক্ষণ পর কান্না থামিয়ে শাড়ির আচল দিয়ে মুখটা মুছে আমার দিকে তাকাল। আমি মুচকি হাসি দিয়ে বললামÑ
Ñকি অইছে ভাবি?
বললো, মদন ভাইয়ের সাথে খুব ঝগড়া হয়েছে। আজই প্রথম মদন ভাই ভাবির গায়ে হাত তুলেছে এবং ঘর থেকে বেরও করে দিয়েছে। মনে মনে মদন ভাইকে কতোক্ষণ বকে নিলাম। তারপর ভাবিকে বললামÑ
Ñআইচ্ছা ঠিক আছে। চলেন মদন ভাইয়ের কাছে যাই। আফনের লগে এমন করল কে রে জিগাইয়্যা আই।
কিন্তু, ভাবি যেতে রাজি হলো না। আমি আবার বললামÑ
Ñগেলে কি এমন অসুবিধা অইব হুনি?
ভাবি বললÑ
Ñপারলে তুমি একলা যাও, যাইতে পারতামনা। আমি বুঝতে পারছিনা তাদের মধ্যে এমন কি ঝগড়াটাই না হল, যে একেবারে ঘর ছাড়তে হয়। অথচ তাদের বিয়ে হয়েছে মাত্র মাস দুই এক হবে। আমি যতোটুকু জানি যে ভাবি মোটেও ঝগড়াটে না। কিন্তু এক হাতে তো আবার তালিও বাজে না। কি করব বুঝতে পারছি না। এদিকে রাতও অনেক হেয়ে গেছে। একটা টর্চ লাইট আর ভাবিকে সাথে নিয়ে ঘর থেকে বের হলাম। বাইরে ঘুট ঘুটে অন্ধকার আর প্রচন্ড কুয়াশা। উঠান পেরিয়ে একটু ডান দিকে মদন ভাইয়ের ঘর। উঠানের মাঝখানে এসে আমি বুড়া মুরুব্বিদেরর মতো কয়েকটা জোরে জোরে কাশি দিলাম। উদ্দেশ্য ছিল যদি কেউ সজাগ থাকে তাহলে বাইরে বের হয়ে আসতে পারে, আর ভাই ভাবির এই ঝগড়াটার সমাধানও হতে পারে। কিন্তু নাহ, কেউ এলো না। সবাই ঘুমিযে একেবারে জল হয়ে আছে। ভাবি হঠাৎ পেছন থেকে আমার হাতটা চেপে ধরে বললÑ
Ñআরেকটু আস্তে আস্তে যাওনা।
আমার সারা শরীর কাটা দিয়ে উঠল। কারণ ভাবির হাতটা সাপের শরীরের মতো প্রচন্ড ঠান্ডা। আমি ভাবলাম বাইরে যে পরিমাণ কুয়াশা পড়ছে তাতে হাত এমন ঠান্ডা হতেই পারে। আমার শরীরটাও অনেক ঠান্ডা হয়ে গেছে। উঠানটা পার হয়ে মদন ভাইয়ের দরজার সামনে গিয়ে আমি দাড়ালাম, আর আমার পেছনে দাড়াল ভাবি। দরজায় টোকা দিয়ে ডাকতে লাগলামÑ
কিন্তু মদন ভাইয়ের কোনো সাড়া শব্দ নেই।
শীতের রাতে বিছানা ছেড়ে উঠতে সবাই একটু আপত্তি করে। কিন্তু মদন ভাই তাড়াতাড়ি উঠে এসে দরজা খুলে দিয়ে বললেন-
Ñকি অইছে? এতো রাইতে ডাহা ডাহি করতাছ কেরে?
আমি বললামÑ
Ñআইচ্ছা আপনার কি মাথা খারাপ অইছে?
মদন ভাই বললÑ
Ñআমার মাথা খারাপ অইব কেরে!
আমি বললামÑ
Ñমাথা ঠিক থাকলে কি কেউ সামান্য ঝগড়ার কারণে এতো রাইতে বউরে ঘর থাইক্কা বার কইরা দেয়?
মদন ভাই বললÑ
Ñকেডায় কার বউরে ঘর থাইক্কা বার কইরা দিছে? এই সব কি কও? আমার কথা শুনে মনে হলে মদন ভাই আকাশ থেকে পড়ল।
আমি বললামÑ
Ñআফনেই তো ভাবিরে ঘর থাইক্কা বার কইরা দিছেন।
মদন ভাই বললÑ
Ñআরে নাহ্, তোমার ভাবিতো খাটে ধুমাইতাছে।
আমি বললামÑ
Ñতাইলে আমার পেছনে এইডা কেডা?
মদন ভাই বললÑ
Ñকই, তোমার পেছনে তো কেউ নাই।
আমি পেছনে তাকিয়ে দেখি সত্যেই আমার পেছনে কেউ নাই। আমার বুকে খুব বড় একটা ধাক্কা লাগল। মদন ভাইকে বললামÑ
Ñসত্যি মদন ভাই, ভাবি আমার পেছনে দাঁড়াইয়া আছিল। আমি ঘরে ঢুকে দেখলাম ভাবি সত্যিই খাটে নাক ডেকে ঘুমাইতেছে। আমি হিসাবটা মিলাতে পারছিলাম না। ভাবি যদি এখানে ঘুমিয়ে থাকে, তাহলে আমার পেছনে সে কে ছিল?

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT