শিশু মেলা

কেক কাটা

মোঃ ইব্রাহিম খান প্রকাশিত হয়েছে: ০৩-০৫-২০১৮ ইং ০২:৫৬:৫৭ | সংবাদটি ১০৬ বার পঠিত

কনকনে শীত। শীতে গাছপালা কুয়াশার চাদরে ঢাকা। মানুষ পশুপাখি জবুথবু। হাড় কাঁপানো শীতে পিপু পড়ার টেবিলে। বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। পিপুকে পড়তে হচ্ছে ভর্তি পরীক্ষার জন্যে। পড়তে তার একটুও ভালো লাগে না। পিপু বুঝে ওঠতে পারে না স্কুলে ভর্তির জন্যে পরীক্ষার কি দরকার। যার যে স্কুলে পড়তে ইচ্ছে করবে ওই স্কুলে ভর্তি হয়ে পড়বে। কে যে এতো বড় একটা ঝামেলার জিনিস আবিষ্কার করল। পিপুর ইচ্ছে করে তার বয়েসী সব ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ভর্তি পরীক্ষার বিরুদ্ধে মিছিল করতে। শ্লোগান দিতে।
অংকটা শেষ হয়েছে পিপু? ড্রয়িং রুমে বসে ম্যাগাজিনের পাতায় চোখ রেখেই পিপুর মা পারুল জিজ্ঞাসা করলেন।
হু করেছি। পিপু বলল।
ইংরেজি গ্রামার খোল। পঁচিশ পাতা পর্যন্ত চোখ বুলাও। তারপর বই বন্ধ করে উদাহরণসহ সংজ্ঞাগুলো লেখ। মা পারুলের পড়ার নির্দেশ শুনে পিপুর মাথায় ভোঁ ভোঁ ব্যথা শুরু হয়। এ ব্যথা সারানোর ঔষধ হলো শিতু আপুর ফুল বাগান। কিন্তু শিতু আপু তাকে বাগানে ঢুকতে দেয় না। বাগানের কাছে তাকে দেখলেই লাঠি হাতে তাকে তাড়া করে। পিপু চুপি চুপি দরজা খোলে বাইরে বের হয়। সে সোজা বাগানের ভেতরে ঢুকে পড়ে। শীতের ফুল ফুটে বাগান ভরে গেছে। পিপু ফুলগুলো হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখছে। ফুলের কাছে নাক নিয়ে গন্ধ নিচ্ছে। পিপু খুশি মনে বাগানে ঘুরছে।
পেছন থেকে পা টিপে টিপে শিতু পিপুর কান ধরে ফেলে। পিপু মাথা ঘুরিয়ে দেখে শিতু আপু লাঠি হাতে তার কান ধরে আছে। পিপু কান ছাড়িয়ে দৌড় দেয়। যাওয়ার সময় সে একটা টবে লাথি মারে। দু’টো গোলাপ ফুল ছিড়ে নিয়ে যায়। শিতু রাগে চেচিয়ে বলে, তুই ফের কোনো দিন আমার বাগানে ঢুকলে আমি তোর মাথা ফাটিয়ে ফেলব।
পিপুর মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। বাসায় গেলে পড়ার চাপ। বাগানে গেলে শিতু আপুর লাঠির তাড়া। তার কিছুই ভালো লাগছে না। সে এলোমেলো হাঁটতে থাকে। অল্পক্ষণ হেঁটে সে একটা বস্তি পায়। বস্তির সামনে একটু খোলা জায়গা। দশ বারটি ছেলে-মেয়ে একসাথে খেলছে। তারা কাগজ দিযে এরোপ্লেন বানিয়ে খেলছে। খুব মজার খেলা। পিপুও তাদের সাথে খেলায় মেতে ওঠে।
পিপু। এ্যাই পিপু। রান্নাঘর হতে ডাকেন পারুল। পিপুর কোনো সাড়া শব্দ নেই। কড়াইয়ে ডিম ভাজা রেখে পারুল ছুটে আসেন। না পিপু তার পড়ার ঘরে নেই। এঘর ওঘর খুঁজে পিপুকে কোথাও পাওয়া গেল না। এতো সকালে কোথায় গেল পিপু। পারুল বাসার বাইরে আসেন। না, বাইরেও নেই। অজানা আতঙ্কে মায়ের বুক কেঁপে ওঠে।
শিতু বাগানে ফুল গাছে পানি ঢালছে। পারুল শিতুর কাছে ছুটে গিয়ে পিপুর কথা জিজ্ঞাসা করেন। শিতু পিপুকে দেখেছ?
জ্বী আন্টি। পিপু আমার বাগানে ছিল। দু’টো গোলাপ ছিড়ে নিয়ে গেছে। চামেলী টবে লাথি মেরে দৌড়ে ওই দিকে চলে গেছে।
পারুল ছুটেন শিতুর দেখানো রাস্তা দিয়ে। পারুল বশির মিয়ার বস্তির সামনে এসে থমকে যান। পিপু বস্তির ছেলে-মেয়েদের সাথে খেলছে। নোংরা ময়লা শরীর। শীতের পাকড় নেই কারো গায়ে। বস্তির ছোট উঠোনে কাগজের এরোপ্লেন ছুড়ে মারছে। আর ধরছে। পিপুও বস্তির ছেলেমেয়েদের সাথে মজা করে এ খেলা খেলছে। এরোপ্লেন ধরতে না পারলে একে অন্যকে ঝাপটা মেরে ধরছে। পিপুও ওদের জড়িয়ে ধরছে। ওরাও পিপুকে ঝাপটে ধরছে। পিপুর গায়ের কমলা রঙের সুন্দর সোয়েটার ময়লা লেগে বিবর্ণ হয়ে গেছে। পিপুকে এ অবস্থায় দেখে পারুলের মেজাজ গরম হয়ে ওঠে।
পিপু। এ্যাই পিপু। এদিকে আয়। পারুল ডাকলেন। ছুটাছুটি, লাফালাফি আর হইচইয়ের মাঝে পারুলের ডাক পিপুর কান পর্যন্ত পৌঁছল না। সে তার আপন মনে খেলে যাচ্ছে। পারুল সহ্য করতে পারছেন না। ছেলেমেয়েদের ভীড় ঠেলে পিপুর হাত ধরেন। পিপু তার আম্মুকে এখানে দেখে চমকে ওঠে। সে খেলার সাথীদের হাত নেড়ে টা টা দেয়। তারাও তাকে টা টা দিয়ে বলে, আবার এসো। পিপু তার আম্মুর সাথে বাসায় আসে। শুরু হয় পারুলের বকাঝকা। পিপু চিৎকার করে গ্রামার পড়ছে। ঘুম ভেঙে যায় ফারিহার। ফারিহা মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার জন্যে রাত জেগে পড়ছে। অসময়ে তার ঘুম ভেঙে যাওয়ার জন্যে তার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। সে বিছানা ছেড়ে ওঠে আসে। পিপুকে ধমক দিয়ে চলে, ষাড়ের মতো এমন চেচাচ্ছিস কেন?
চেচাব কেন। আমি জোরে জোরে পড়ছি। চেচাচ্ছেন যিনি তাকে গিয়ে বল। পড়া বন্ধ করে বলল পিপু। ফারিহা তার মায়ের কাছে গিয়ে বলল, এতো সাত সকালে এমন চিল্লাচিল্লী শুরু করলে কেন?
চিল্লাচ্ছি কি সাধে। পড়ার টেবিলে বই রেখে শিতুর বাগানে ফুল ছিড়েছে। টবে লাথি মেরে উল্টিয়ে ফেলেছে। বশির মিয়ার বস্তির ছেলেমেয়েদের সাথে খেলে ধূলোবালি মেখে হনুমান সেজে এসেছে। আমি এ ছেলেকে নিয়ে মহাবিপদে আছি। এমন দশ্যি ছেলের ভবিষ্যৎ ভাবনায় আমার আরামের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। পারুলের গলা ধরে যায়। তার বুকের মাঝে একটা কান্না জমাট বাঁধে। যে কোনো মুহূর্তে কেঁদে ফেলবেন।
এমন হাড় দুষ্ট ছেলেদের লেখাপড়া হয় না। ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দাও। গ্রামে গিয়ে গরু রাখালি করুক। ভর্তি ফরম তুলেছ। ভর্তি কোচিং করাচ্ছ। ছেলে আমার ভালো স্কুলে ভর্তি হবে। সব মাটি হবে। এমন ফাঁকিবাজ ছেলেদের কপালে ভালো স্কুলে ভর্তির ভাগ্য হয় না। তুমি আদর দিয়ে বাড়িয়েছ। তোমার লাই পেয়ে সে আজ দুষ্টের শিরোমনি হয়ে ওঠেছে।
ফারিহার লম্বা ভাষণ শুনে পারুল কেঁদে ফেললেন। আঁচলে চোখ মুছে বললেন, আমাকে বলিস না। তোর আব্বুকে বল। সব কিছুর মূলে হলেন উনি। ছেলেমেয়েদের প্রকৃতির হাতে ছেড়ে দাও। প্রকৃতি হলো শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। সে তার নিজের মতো করে প্রকৃতি থেকে শিখে নিবে। এতো শাসনের দরকার নেই। এসব দার্শনিক কথাবার্তা শুনিয়ে আমাকে জ্ঞান দান করেন। আমার নাকি বুদ্ধি সুদ্ধি কম। পড়াশুনা কম। আব্বু ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ের বাইরে বেশি ব্যস্ত সময় কাটান। তুমি আমাকে সামলিয়েছ। পিপুকে সামলাও।
ফারিহার কথা শুনে পারুলের মনটা একটু ভালো হয়।
তুই এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছিস। সে আমার চেষ্টাতে সম্ভব হয়েছে। সেই ছোট বেলা হতে তকে আগলে রেখেছি। বাইরে যেতে দেয়নি। আজেবাজে ছেলেমেয়েদের সাথে মিশতে দেইনি।
আমার সফলতার সব কৃতিত্ব তোমার মা। তোমার আদর যতেœ আজ এ পর্যন্ত এসেছি।
ফারিহার মুখ হতে এমন স্বীকৃতি শুনে পারুলের মনটা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যায়। তার চোখে মুখে আনন্দের ঝিলিক ফুটে ওঠে।
যে বস্তির উঠোনে পিপু খেলে সে বস্তির পাশ দিয়ে হেটে গেলে আমি নাকে রুমাল চেপে ধরি। এমন নোংরা আবর্জনা লাগানো পরিবেশে পিপু যেতে পারে! খেলতে পারে! ভাবতেই আমার গা শিউরে ওঠে। মাথা ঘুলিয়ে যায়। কথাগুলো বলে ফারিহা বেসিনে থু থু ফেলে। কয়েকবার কুলি করে।
তোর আব্বু আমার সাথে লেকচার ঝাড়ে। সবার সাথে মিশে শিখবে। সব পরিবেশের মানুষের কাছে শেখার আছে।
শতশত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভীড় স্কুল মাঠে। ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল দেয়া হল পিপুর নাম তিন নম্বরে। আনন্দে পারুলের চোখে পানি এসে যায়। পিপুর এ সফলতার খবর অভিজাত পাড়া ডি ব্লকে ছড়িয়ে পড়ে। কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না। কারণ ভালো শান্ত শিষ্ট ছেলেমেয়েদের নাম তালিকায় নেই। এমন দুষ্টু ছেলে কেমন করে চান্স পেল। অনেকেই তা মানতে পারছে না।
শিতু সকালে বাগানে ঢুকে। সে চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে পিপুকে খুঁজে। পিপু বাগানের বেড়া ধরে দাঁড়ানো। এ্যাই পিপু বাগানের ভেতরে আয়। শিতু মমতা দেখানো গলায় ডাকে।
গেইট খোলে পিপু বাগানে ঢুকে। সে শিতুকে জিজ্ঞাসা করে, তোমার লাঠি কোথায়?
তকে লাঠি দিয়ে আর কোনো দিন তাড়া করব না। তোর যতো ইচ্ছে ফুল ছিড়। এ বাগান এখন থেকে তোর নিজের বাগান।
তুমি আমাকে এতো অধিকার দিচ্ছ কি কারণে? পিপু শিতুকে জিজ্ঞাসা করে।
তুই এখন আমাদের ডি ব্লকে কিং। নাম করা বিখ্যাত কোচিং সেন্টারে গেল। একাধিক শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়ল। মা বাবারাও অনেক দৌড় ঝাপ করল। পরীক্ষার্থীরা ছুটোছুটি করে পায়ে জুতো ছিড়ল। কিন্তু কারো কিছু হলো না। শুধুমাত্র তুই ভর্তির চান্স পেলি। তুই হলি আমাদের পাড়ার একমাত্র জিনিয়াস স্টুডেন্ট। তকে অনেক অনেক অভিনন্দন। বলে শিতু পিপুকে সদ্য ফোটা একটা তাজা গোলাপ দিল।
তোমাকেও অনেক ধন্যবাদ। আমাকে বাগানে ঢুকতে দেয়ার জন্যে।
পিপু তুই তো হাড়ে হাড়ে দুষ্টু। পড়ালেখাও তেমন করিস না। এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াস। তুই এতো ভালো স্কুলে ভর্তির চান্স পেলি কি জাদু বলে?
জাদু টাদু কিছুই না। আমি ক্লাস ফোরের বইয়ের সব পাঠ ভালো ভাবেই পড়েছি বার্ষিক পরীক্ষার পূর্বে। পরীক্ষার হলে মনস্থির রাখতে পারি না। সামান্য ভুল হলে কাটাকুটি করি। শুধু এবার ভর্তি পরীক্ষাটা মনোযোগ দিয়ে দিলাম। আম্মু আর আপুকে বুঝানোর জন্য। আমিও পারি। জান শিতু আপু, আমার একটা বিরাট লাভ হয়েছে।
কি লাভ হলো?
আমি এখন স্বাধীন। মুক্ত বুনো পাখির মতো ঘুরতে পারি। দুষ্টুমী করার কারণে আমাকে কেউ এখন বকাঝকা করে না। তুমি আমাকে বাগানে ঢুকতে দিলে। ফুল উপহার দিলে। সবার কাছে আমার আদর কদর বেড়ে গেছে।
ভালো ছাত্র-ছাত্রীদের সবাই আদর করে।
আমি ভালো ছাত্র না। দুষ্টু ছাত্র। আমার দুষ্টুমী আব্বু ছাড়া কেউ সহ্য করে না। সবাই আমাকে তাড়া করে। দূর দূর করে।
এখন তকে সবাই আদর করবে।
বড় মানুষরা যদি সব সময় ছোটদের আদর ¯েœহ করতেন তবে আমরা ছোট ছোট পিচ্ছিরা এতো ঝামেলা করতাম না।
অনেকে বলেন বেশি আদর পেলে ছোটরা মাথায় চড়ে বসে। ভুল আপু। তুমি এখন আদর করছ বলে আমি তোমার বাগানের ফুল ছিড়চ্ছি না। বেড়া ভাঙছি না। টবে লাথি মারছি না। যখন তুমি আমাকে লাঠি দিয়ে তাড়া করতে তখন আমার মনের মাঝে খুব জেদ কাজ করত। আমি চিন্তা করতাম কি করে তোমার বাগানের ক্ষতি করা যায়। আর এখন তোমার আদর পেয়ে আমি ভাবছি কি করে তোমার বাগানকে নিরাপদ রাখা যায়। কি কাজ করলে বাগানে সৌন্দর্য আরও বাড়বে।
তোর সাথে কথা বলে আমার নিজের একটা ভুল সুধরে নিলাম।
কি ভুল সংশোধন করলে।
ছোটরা আদর পেলে অনেক বেশি ভালো হয়ে যেতে পারে।
ছোটরা বড়দের কাছে শুধু আদর পেতে চায়। তারা আদরের কাঙাল।
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ছোটদের খুব ¯েœহ করতেন। ছোট ছোট বাচ্চাদের ¯েœহ প্রসঙ্গে তোমাকে একটি কবিতা পড়ে শুনাই। বল তো শুনি। বলে শিতু পিপুর মুখের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে থাকল।
[চলবে]

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT