ধর্ম ও জীবন

আযান : কল্যাণের পথে আহবান

সৈয়দা মানছুরা হাছান (মিরা) প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৫-২০১৮ ইং ০১:১০:৫১ | সংবাদটি ৩৪ বার পঠিত

আমরা মুসলমান, হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর উম্মত। আমাদের ধর্ম ইসলাম। ইসলাম হচ্ছে একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান। মানবজীবনের প্রতিটি বিষয়ে ইসলাম দিক নির্দেশনা দিয়েছে। যে পাঁচটি স্তম্ভের ওপর ইসলাম প্রতিষ্ঠিত, যেগুলি ইসলামের খুঁটি-তার প্রথমটি হল তাওহীদ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ যার অর্থ-‘নেই কোনো মাবুদ আল্লাহ ব্যতিত এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর প্রেরীত রাসুল।’ এ সম্পর্কে আল কুরআনের ঘোষণা করা হয়েছেÑ‘সৎকর্ম শুধু এই নয় যে পূর্ব কিংবা পশ্চিম দিকে মুখ করবে বরং বড় সৎকাজ হল এই যে, ঈমান আনবে আল্লাহর ওপর, কিয়ামত দিবসের ওপর, ফেরেশতাদের ওপর এবং সব নবী রাসুলের ওপর।’ (সূরা : বাক্বারা, আয়াত : ১৭৭)
মুসলমানের নিকট সবচেয়ে বড় পরিচয় হিসেবে আল্লাহ তা’আলা আল কুরআনে ঘোষণা করেছেনÑ বলুন তিনি ‘আল্লাহ’ এক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেন নি এবং তাকে কেউ জন্ম দেয় নি। তার সমতুল্য কেউ নেই। (সূরা : ইখলাছ, আয়াত : ১-৪)
ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ হলো সালাত। সালাতের মধ্যে আমরা সাহায্যের জন্য আবেদন করি, আল্লাহর বন্দনা করি। সালাতের মধ্যে আমরা পথ নির্দেশনা পাই। সাধারণত মুসলমানরা দিনে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে। সালাতের আহবান জানানোর জন্য হযরত মুহাম্মদ (সা.) আযানের প্রচলন করেছিলেন। আযান আররি ভাষায় এবং যে সব শব্দে রাসুল (সা.) থেকে শ্রুত ও বর্ণিত হয়েছে সেভাবে হতে হবে। আযানের শব্দাবলী সহীহ তারতীবে আদায় করতে হয়। মজিদের বাইরে এবং উঁচু স্থানে আযান দেয়ার উদ্দেশ্য হল আওয়াজ ছড়িয়ে দেয়া। বর্তমানে মাইকে আযান দেয়ার ব্যাপক প্রচলন ঘটেছে এবং মসজিদের মধ্যে থেকেই সাধারণত মাইকে আযান দেয়া হয়। যেহেতু মাইকে আযান দিলে আওয়াজ এমনিতেই দূরে পৌঁছে যায় এবং বাইরে উঁচু স্থানে আযান দেয়ার যে উদ্দেশ্য তা হাসিল হয়ে যায়। তবে মসজিদের ভিতর জোরে আওয়াজ করাটা খেলাফে আদব মনে হয়, তাই সম্ভব হলে মসজিদের বাইরে থেকেই মাইকে আযানের ব্যবস্থা করা উত্তম।
‘নামায বেহেশতের চাবি’। আর এই শাশ্বত কল্যাণের পথে উদাত্ত আহ্বানের নামই হলো আযান। আযানের চিরন্তন বাণীতে বিমোহিত হয় প্রতিটি মুমিন মুসলমানের অন্তর। মুক্তির পথে ডাকেন মুয়াজ্জিন দৈনিক পাঁচ বার। ‘আল্লাহু আকবার’ অর্থ ‘আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ’Ñ এই বাণীটি উচ্চারিত হয় আযানে। এর মাধ্যমে আল্লাহর প্রশংসা করা হয়। তাইতো কবি কায়কোবাদ লিখেছেনÑকে ওই শোনাল মোরে আযানে ধ্বনি/ মর্মে মর্মে সেই সুর, বাজিল কি সুমধুর/ আকুল হইল প্রাণ, নাচিল ধমনী।/ কি মধুর আযানের ধ্বনি!
উল্লেখ্য যে, ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন হলেন হযরত বেলাল (রা.)। মুয়াজ্জিনের কণ্ঠের সুমধুর আযানের ধ্বনি শুনে মুমিনের অন্তর ব্যাকুল হয়ে যায় সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য লাভের জন্য। রাত্রির ঘনঘোর অন্ধকার শেষে ফজরের আযান শুনে আমরা নিদ্রাভঙ্গ করে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য ফজরের নামায আদায় করি। প্রতিপালকের প্রশংসা করি। দিনে অতি ব্যস্ততার মাঝখানে যোহরের আযান শুনে আমরা আল্লাহর ডাকে সাড়ে দিয়ে তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য মাথা অবনত করি বিশ্ব ভূবনের মালিক মহান অধিপতির নিকট। দুপুরের পরে বিকেলে যখন আসরের আযান হয়, তখন আমরা ঠিকই সময় বের করে নেই নামায আদায়ের জন্য। কারণ পৃথিবীতে আমাদের সবচাইতে বড় কাজ হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। দিবা-রাত্রির পালা বদলের ক্ষণে হয় মাগরিবের আযান, আমরা ভালো-মন্দ, সুস্থ-অসুস্থ তথা সব কিছু নির্ধারণের মালিকের কাছে মোনাজাত করার জন্য মাগরিবের নামাজ আদায় করি। কারণ, আমাদের এই পৃথিবীতে ভালো থাকা এবং সুস্থ থাকা যে একমাত্র পরম করুণাময় আল্লাহর হুকুমে। রাতের প্রথম ভাগেই এশার আযান হলে, এর নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সাথেই একটি দিনের সমাপ্তি ঘটে। আর এভাবেই আযান প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের আহবানের মাধ্যমে আমাদেরকে কল্যাণের পথে তথা সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য লাভে অনুপ্রাণিত করে।
ফজরের আযানে যখন উচ্চারিত হয়, ‘আস্সালাতু খাইরুম মিনান্নাউম’ অর্থাৎ-‘ঘুম থেকে নামায উত্তম’Ñ তখন আমরা উপলব্ধি করি যে পৃথিবীতে আমাদের সময় খুব কম, সময় থাকতে পরকালের ফিকির করতে হবে। এই সতর্ক বাণী আমাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভে সচেষ্ট করে। বিপদে, আপদে, সুখে, শান্তিতে সব সময় বিধাতার কাছ থেকে আমরা শক্তি কামনা করি। গাছে গাছে পাখি, বনে বনে ফুল সবাই ¯্রষ্টার কাছে সিজদায় অবনত হয়। তার অফুরন্ত দয়ায় জগতের সব কিছু চলছে এবং আমরা শুধু তার সাহায্য প্রার্থনা করি।
¯্রষ্টার অপার করুণা লাভ করেই বিশ্ব সংসারের প্রতিটি জীব ও উদ্ভিদ প্রাণ ধারণ করে আছে। তার দয়া ছাড়া আমরা এক মুহূর্তও চলতে পারি না। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তিনিই একমাত্র ভরসা। আমরা যেন সৃষ্টিকর্তার আরাধনায় নিজেকে নিবেদন করতে পারি।
আযানের সুমধুর সুরে আকৃষ্ট হয়ে আল্লাহর উপাসনায় নিজেকে যেন সম্পূর্ণরূপে সঁপে দিতে পারি এই কামনা থাকুক প্রতিটি মুমিনের অন্তরে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT