ধর্ম ও জীবন

ওসিয়্যাতের ইসলামি দৃষ্টিকোণ

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৫-২০১৮ ইং ০১:১২:৫২ | সংবাদটি ১৮৯ বার পঠিত

ক্ষণস্থায়ী এ পৃথিবীতে মানুষের আগমন কিছু কালের জন্য। মৃত্যুই তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। প্রায়ই মানুষ কারো না কারো মৃত্যুর ঘটনা প্রত্যক্ষ করছে। তা সত্ত্বেও সে তার উপর ন্যস্ত বাধ্যতামূলক ও ঐচ্ছিক দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে উদসীন থাকে। কিন্তু যখন মৃত্যুর অপ্রতিরোধ্য থাবা তাকে কাবু করে ফেলে, তখন সে অন্তিম মুহূর্তে অবস্থিত অবস্থায় অনুসন্ধান করে সারা জীবনের দায়িত্ব অবহেলার ক্ষতিপূরণ আদায় করার কোনো উপায় আছে কিনা। ইসলামী আইনে সেই মুহূর্তে ক্ষতিপূরণ করার একটি মাত্র পথ আছে, তা হলো ওসিয়্যাত। ওসিয়্যাতের মাধ্যমে বিত্তশালী জীবনের অন্তিম মুহূর্তে যেমন গরীবের উপকার করতে পারে তেমনি অনেক সময় এর মাধ্যমে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় সামাজিক কাজও সম্পন্ন করা যায়।
ওসিয়্যাত আরবী শব্দ যার অর্থ উপদেশ, পরামর্শ, সুপারিশ, আদেশ, উইল। ‘অ উরপঃরড়হধৎু ড়ভ গড়ফবৎহ ডৎরঃঃবহ অৎধনরপ’ ওসিয়্যাতের অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে, উরৎবপঃরড়হ, ওহংঃৎঁপঃরড়হ, উরংঢ়ড়ংরঃরড়হ, ওহলঁহপঃরড়হ, ঙৎফবৎ, ডরষষ, জবয়ঁবংঃ. সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ-এ ওসিয়্যাতের অর্থ করা হয়েছে, ভার অর্পণ, নির্দেশ। পারিভাষিক শব্দ হিসাবে শেষ ইচ্ছা, ইচ্ছাপত্র বা ইচ্ছাপত্র যোগে প্রদত্ত সম্পত্তি। ‘বিধিবদ্ধ ইসলামী আইন’ গ্রন্থে রয়েছে, ওসিয়্যাত শব্দের অর্থ উপদেশ, মিলানো অর্থাৎ কোনো জিনিস অন্যদের পর্যন্ত পৌছানো। ‘ফাতাওয়া ও মাসাইল’ গ্রন্থে রয়েছে, ওসিয়্যাত শব্দের অর্থ কোনো কাজের অঙ্গীকার গ্রহণ করা, নির্দেশ প্রদান করা।
ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় ওসিয়্যাত বলা হয়, ‘কাউকে বিনিময়বিহীন কোনো কিছুর মালিক বানানো, যা ওসিয়্যাতকারী ব্যক্তির মৃত্যুর পর কার্যকর হবে। ‘বিধিবদ্ধ ইসলামী আইন’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি তার সম্পত্তি বা এর আয় তার মৃত্যুর পর হতে চিরকালের জন্য অথবা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য অপর কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কোনোরূপ বিনিময় ছাড়াই হস্তান্তর করাকে ওসিয়্যাত বলে। ‘ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’ গ্রন্থে রয়েছে, কোনো বস্তু কিংবা তার মুনাফা সম্পর্কে বলে দেয়া অথবা লিখে দেয়া যে, আমার মৃত্যুর পর এটা অমুকের হবে। ইসলামী অনুশাসনে এরূপ অনুরোধকে ওসিয়্যাত বলা হয়। ওসিয়্যাতকারীকে ফিক্হ শাস্ত্রের পরিভাষায় ‘মূসী’ ওসিয়্যাতকৃত বস্তুকে ‘মূসা বিহি’ এবং যার অনুকূলে ওসিয়্যাত করা হয়, তাকে ‘মূসা লাহু’ এবং ওসিয়্যাতকারী ওসিয়্যাতকৃত সম্পত্তি পরিচালনার জন্য প্রতিনিধি হিসাবে যাকে নিযুক্ত করে তাকে ‘ওসী’ বলে। ইসলামী শরীয়তে কার্যকর করার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে।
ওসিয়্যাতকারী ব্যক্তি বিনিময়বিহীন দান করার অধিকার হতে হবে। সুতরাং শিশু বা উন্মাদের ওসিয়্যাত কার্যকর হবে না। শিশু বা উন্মাদের ওসিয়্যাত কার্যকর না হওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তি এই যে, ওসিয়্যাত হচ্ছে স্বেচ্ছাদান আর শিশু স্বেচ্ছাদানের উপযুক্ত নয়। তাছাড়া শিশুর বক্তব্য অবশ্য সাব্যস্তকারী নয়। অথচ তার ওসিয়্যাতের সিদ্ধান্ত দানের অর্থ হলো তার বক্তব্যকে অবশ্য সাব্যস্তকারী বলে সিদ্ধান্ত দেয়া। যেহেতু মানুষের মৃত্যুর পর ওসিয়্যাত কার্যকর করার পূর্বে ঋণ পরিশোধ করতে হয়, এজন্য ওসিয়্যাতকৃত বস্তু ঋণগ্রস্ত সম্পদের অন্তর্ভূক্ত হতে পারে না। কেননা দুটি প্রয়োজনের মধ্যে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণে ঋণের বিষয়টি ওসিয়্যাতের চেয়ে অগ্রবর্তী হবে। ঋণ পরিশোধ করা হলো ফরজ আর ওসিয়্যাত হলো স্বেচ্ছাদান, আর সব সময় পর্যায়ক্রমে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দ্বারাই কাজ শুরু করা হয় কাজেই ঋণগ্রস্ত সম্পদের ওসিয়্যাত সিদ্ধ নয়। যার জন্য ওসিয়্যাত করা হবে সে ওসিয়্যাতের সময় জীবিত থাকতে হবে। চাই সে প্রকৃত পক্ষে জীবিত হোক অথবা জীবিতের হুকুমে হোক। সুতরাং মাতৃগর্ভের যে সন্তান এখনো রূহ প্রাপ্ত হয়নি, তার জন্য ওসিয়্যাত করা যাবে। এ ক্ষেত্রে ওসিয়্যাতের সময় মাতৃগর্ভে সন্তানের অস্তিত্ব প্রতীয়মান হতে হবে এবং ওসিয়্যাত সম্পাদনের ছয় মাসের মধ্যে ভূমিষ্ট হতে হবে। এই সময় অতিবাহিত হওয়ার পর সন্তান জন্মগ্রহণ করলে তার অনুকূলে কৃত ওসিয়্যাত কার্যকর হবে না।
যার জন্য ওসিয়্যাত করা হবে, ওসিয়্যাতকারীর মৃত্যুর সময় সে তার ওয়ারিস হতে পারবে না। অবশ্য এ শর্তটি তখনই প্রযোজ্য হবে, যখন ওসিয়্যাতকারীর অন্য কোনো ওয়ারিস বিদ্যমান থাকে। অন্য কোনো ওয়ারিস না থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ওয়ারিস হলেও তার জন্য ওসিয়্যাত করা যাবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেকের অধিকার যথাযথভাবে বর্ণনা করেছেন, সুতরাং ওয়ারিসগণের জন্য কোনো ওসিয়্যাত নেই।’ ওয়ারিস বিশেষের অনুকূলে ওসিয়্যাত করা হলে অপরাপর ওয়ারিসের স্বার্থহানী ঘটতে পারে। এর ফলে তাদের মধ্যে বিভেদ ও সম্পর্কচ্ছেদ ঘটবে। অথচ উভয়টিই হারাম। আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘ফিতনা হত্যা অপেক্ষা গুরুতর অন্যায়।’
এছাড়াও রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোন একজন নারী বা পুরুষ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ষাট বছর আমল করল। অতঃপর যখন মৃত্যু উপস্থিত হলো তখন তারা ওসিয়্যাতের ক্ষেত্রে অন্যের অনিষ্ট করলো। তাহলে উভয়ের জন্য জাহান্নাম ওয়াজিব হয়ে যাবে। হাদীসটির সনদ যঈফ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন তবে অন্যান্য ওয়ারিস যদি অনুমোদন করে তাহলে ওসিয়্যাত করা যাবে। এই নিষেধাজ্ঞা ছিল তাদের অধিকারের কারণে। সুতরাং তাদের অনুমোদন প্রদানের কারণে তা জায়িয হবে। ওসিয়্যাতকারীর মৃত্যুর পর ওসিয়্যাতকৃত বস্তুটি অপরের মালিকানায় দেওয়ার উপযুক্ত হতে হবে। চাই তা কোনো সম্পদ হোক অথবা সম্পদ থেকে উপকৃত হওয়া যায় এমন কোনো কিছু হোক তা তৎকালে বিদ্যমান থাকুক বা না থাকুক। মূসা বিহি বা ওসিয়্যাতকৃত সম্পদ অবশ্যই মূল্যবান সম্পন্ন জিনিস হতে হবে। যেমন কোনো মুসলমানের জন্য মদ, শুকর ইত্যাদি মূল্যবান সম্পন্ন জিনিস নয়। সুতরাং এগুলোর ওসিয়্যাত বৈধ নয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা যা উপার্জন কর এবং আমি যা ভূমি হতে তোমাদের জন্য উৎপাদন করে দেই, তন্মধ্যে যা উৎকৃষ্ট্ তা ব্যয় কর এবং এর নিকৃষ্ট বস্তু ব্যয় করার সংকল্প করো না।
কোনো মুসলিম ব্যক্তি অমুসলিম ব্যক্তির অনুকূলে এবং কোনো অমুসলিম ব্যক্তি মুসলিম ব্যক্তির অনুকূলে ওসিয়্যাত করতে পারে। প্রথমটির ব্যাপারে কুরআনে এসেছে, ‘দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের স্বদেশ হতে বহিষ্কার করেনি, তাদের প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শন ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না, আল্লাহ তো ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালবাসেন।’ আর দ্বিতীয়টির যুক্তি এই যে, যিম্মাচুক্তির মাধ্যমে মুআমালাতের লেনদেনের ক্ষেত্রে তারা মুসলিমদের সমান হয়ে পড়েছে। এ কারণেই জীবদ্দশায় উভয়পক্ষ হতে স্বেচ্ছাদান বৈধ রয়েছে। সুতরাং মৃত্যুর পরও তাই হবে।
যদি কোনো ব্যক্তি একাধিক ওসিয়্যাত করে তাহলে দেখতে হবে যে, ওসিয়্যাতসমূহের সমষ্টি এক তৃতীয়াংশ হয়, তাহলে তা ওসিয়্যাতকৃত ব্যক্তিদের মধ্যে বণ্টন করে দিতে হবে। তবে কোনো অবস্থাতেই এক তৃতীয়াংশের বেশি সম্পদের ওসিয়্যাত করা যাবে না। হাদীসে এসেছে-‘এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর কাছে জানতে চাইলো, আমি কি আমার পুরো সম্পত্তি ওসিয়্যাত করতে পারব? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, না। তারপর আবার বলল, অর্ধেক সম্পত্তি ওসিয়্যাত করতে পারব? রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, না। তারপর আবার বললো, আমি কি এক তৃতীয়াংশ সম্পত্তি ওসিয়্যাত করতে পারব? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, হ্যাঁ। এক তৃতীয়াংশই অনেক।’
‘ওয়াকফ সংক্রান্ত মাসআলা-মাসায়েল’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, কেউ যদি অপর কোনো ব্যক্তিকে বলে, তুমি আমার মৃত্যুর পর আমার উকিল, তখন সে ব্যক্তি তার ওসী হয়ে যাবে। আর যদি বলে, তুমি আমার জীবদ্দশায় আমার ওসী, তবে সে উকিল পরিগণিত হবে। আর যদি বলে, তুমি একশ টাকা মজুরি হিসাবে পাবে, এই শর্তে যে তুমি আমার ওসী হবে। তবে শর্ত বাতিল হবে এবং ওসিয়্যাত স্বরূপ সে একশ টাকা পেতে পারে এবং নির্ভরযোগ্য মত অনুসারে সে ওসী হবে। কেউ যদি লোকজনকে ডেকে বলে তোমরা সাক্ষী থাক যে, ‘আমি অমুকের জন্য এক হাজার টাকা ওসিয়্যাত করছি,’ তাহলে তা ওসিয়্যাত হিসেবে পরিগণিত হবে। আর যদি বলে-‘আমি ওসিয়্যাত করছি, অমুকের জন্য আমার সম্পদে এক হাজার টাকা রয়েছে,’ তাহলে এ টাকা ওসিয়্যাত নয় বরং স্বীকারোক্তি হিসেবে পরিগণিত হবে।
কেউ যদি ওসিয়্যাত স্বরূপ বলে-‘আমার বাড়ির এক-তৃতীয়াংশ অমুকের, আমি তা অনুমোদন করছি,’ তবে তা ওসিয়্যাত হবে। আর যদি বলে-‘আমুক ব্যক্তির জন্য আমার বাড়ির মাঝে এক ষষ্ঠাংশ রয়েছে,’ তবে তা স্বীকারোক্তি হবে। অনুরূপ যদি ওসিয়্যাতের কথা উল্লেখ করে বলে-‘অমুক ব্যক্তি আমার সম্পদ থেকে এক হাজার টাকা পাবে,’ তবে তা ওসিয়্যাত হবে। কিন্তু যদি বলে-‘আমার সম্পদে অমুক ব্যক্তির এক হাজার টাকা রয়েছে,’ তবে তা স্বীকারোক্তি হবে।
আবার কেউ যদি বলে-‘আমার এই বাড়িটি অমুকের’, এ ক্ষেত্রে যদি ওসিয়্যাত জ্ঞাপক কথার উল্লেখ না থাকে এবং আমার মৃত্যুর পর এ কথা না বলে, তবে তা দান হিসেবে ধর্তব্য হবে। যদি এ দানকারী ব্যক্তির জীবদ্দশায় ঐ ব্যক্তি তা দখল করে নেয়, তবে তা সহীহ হবে। কিন্তু দানকারী ব্যক্তির ওফাতের পর দানের এ কথা বাতিল হয়ে যাবে। কোনো অসুস্থ ব্যক্তি যদি অপরকে বলে ‘তুমি আমার ঋণ-পরিশোধ কর’, তবে সে ব্যক্তি ওসী হবে। যদি কেউ সুস্থ অথবা অসুস্থ অবস্থায় বলে, ‘যদি আমার কোনো কিছু হয় তবে অমুক ব্যক্তি এত পাবে’, তাহলে তা ওসিয়্যাত হিসেবে ধর্তব্য হবে।
ওসিয়্যাত পুন্যলাভের একটি উপায়। ইসলামে ওসিয়্যাত কেবল বৈধই নয়, বরং এটি একটি প্রশংসনীয় কাজ। ইসলামের প্রাথমিক যুগে ওসিয়্যাত একটি অত্যাবশ্যকীয় ইবাদত ছিলো। যদিও পরবর্তীতে মীরাসের আয়াত অবতীর্ণের ফলে সে বিধান রহিত হয়ে গেছে। ওসিয়্যাত এমন একটি কাজ যা দ্বারা নিজের প্রিয় সঞ্চয়কে নিজের পছন্দনীয় কাজে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করা যায়। মানুষকে যেহেতু মৃত্যুর স্বাদ অবশ্যই আস্বাদন করতে হবে, সেহেতু তাকে মৃত্যুর সময় এমন কিছু কাজ করে যাওয়া উচিত, যার দ্বারা সমাজের মানুষ উপকৃত হয় এবং পরকালে কঠিন বিপদের মুহুর্তে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট যা মুক্তির ওসীলা হিসেবে বিবেচিত হয়। সমাজের বিত্তশালীদের পরকালীন মুক্তির ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে ওসিয়্যাত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT