ধর্ম ও জীবন

সুশীল সমাজ বিনির্মাণে নামাজ

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ০৪-০৫-২০১৮ ইং ০১:১৫:৪২ | সংবাদটি ১২২ বার পঠিত

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন ‘অবশ্যই সফলকাম হয়েছে সেই মুমিনগণ যারা বিনয়-ন¤্র নিজেদের সালাতে, যারা অসার ক্রিয়াকলাপ থেকে বিরত থাকে’ (সূরা : মুমিন, আয়াত : ১-৩)।
নামাজ মানুষকে সকল প্রকার অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। ইরশাদ হচ্ছে- ‘নামাজ কায়েম কর, নিশ্চয়ই নামাজ সকল অশ্লীল ও মন্দকার্য থেকে বিরত রাখে’ (সূরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৫)।
উপরোক্ত আয়াতদ্বয়ের প্রথমটিতে আল্লাহ পাক বলেছেন- ‘যারা বিনয়-ন¤্রতার সাথে সালাত আদায় করে, যারা অসার ক্রিয়াকলাপ থেকে বিরত থাকে তারাই সফলকাম। বিনয়-ন¤্রতা শিক্ষা লাভের উত্তম পন্থা কোনটি? কিভাবে অসার ক্রিয়াকলাপ ও মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকা যায়? পরবর্তী আয়াতেই আল্লাহ পাক পরিষ্কার ভাষায় বলে দিয়েছেন। আল্লাহ পাক বলেছেন- ‘নামাজ কায়েম কর, নিশ্চয়ই নামাজ সকল অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে’। নামাজ মানুষকে সকল ধ্বংসকর অশ্লীল ও ক্ষতিকর মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে। নামাজ মানুষকে পুত-পবিত্র করে। তার দৈহিক ও মানসিক অপবিত্রতা দূর করে। নামাজের মাধ্যমে বান্দাহ আল্লাহর নৈকট্যলাভ করে। নামাজ আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক সুদৃঢ় করে। নামাজ হলো আল্লাহ ও তাঁর বান্দার মধ্যে যোগাযোগের উৎকৃষ্ট মাধ্যম। নামাজের মাধ্যমে বান্দাহ আল্লাহর নৈকট্য এমনভাবে লাভ করে যে, ‘আল্লাহ পাক বলেন- ‘আমি বান্দার কান হয়ে যাই, আমি বান্দার চোখ হয়ে যাই।’ বান্দাহ যখন আল্লাহর নৈকট্য লাভ করবে তখন সে আর কোনো পাপ কাজ করবে না। সে পূর্ণরূপে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পন করবে। সে বলে উঠবে- ‘নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মরণ নিখিল বিশ্বের রব আল্লাহর জন্য’ (সূরা : আনআম, আয়াত : ১৬২)।
বান্দা যখন এরূপ বলবে তখন আর আল্লাহর ভয়ে সে আর কোনো অশ্লীল কাজ করবে না। আর আমাদের সমাজের অশান্তির মূল কারণই হচ্ছে অশ্লীল ও মন্দ কাজ। সেই অশ্লীল ও মন্দ কাজ যখন নামাজ কায়েমের মাধ্যমে দূরীভুত হবে তখন আর সমাজে অশান্তি থাকবে না। সুষ্ঠু সুন্দর, শান্তিপূর্ণ, নিরাপত্তাময় ও উন্নয়নমুখী কল্যাণকর সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে নামাজের তুলনা নেই। নামাজ ব্যক্তি মানস তৈরি করে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে- ‘যে ব্যক্তি সাধনা করে সে তো নিজের আত্মার জন্যেই তা করে থাকে’ (সূরা : আনকাবুত, আয়াত : ৩-৬)
অন্য আয়াতে ইরশাদ হচ্ছে- ‘যে সৎকর্ম করে সে তার কল্যাণের জন্যই করে’ (সূরা : জাছিয়া, আয়াত : ১৫)। সুশীল সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে নামাজের বিকল্প নেই। আর এজন্যই আল্লাহ পাক বলেছেন- ‘নিশ্চয়ই সৎকর্ম (নামাজ) সমস্ত অসৎ কর্ম মিটিয়ে দেয়’ (সূরা : হুদ, আয়াত : ১১৪)
নামাজ মানুষকে সৎ কর্মের প্রতি উৎসাহিত করে থাকে এবং অসৎ কর্ম থেকে বিরত রাখে। যে সমাজের প্রতিটি লোক নামাজ আদায় করে, অসৎ কর্ম করেনা এই সমাজের চেয়ে শান্তির সমাজ আর কি হতে পারে? নামাজই মানুষকে পুত-পবিত্র, সভ্য, ভদ্র, চরিত্রবান, সত্যবাদী, নির্ভীক ও ন্যায়পরায়ণ করে তুলে।
ইহা একটি নির্জলা সত্য কথা যে, সকল প্রকার কাজ কর্মে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা হাসিল করতে হলে দৃঢ় মনোবল দুর্দমনীয় ইচ্ছা শক্তি, কঠোর পরিশ্রম, কর্মঠ হওয়ার প্রেরণা, সুস্বাস্থ্য ও সুস্থ মন মানসিকতার একান্ত প্রয়োজন। কারণ মন্দ স্বাস্থ্য ও মন্দ মন-মানসিকতাজনিত অলসতা আমাদের জীবনের সর্বস্তরে বিষাক্ত অভিশাপ তাই, সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের কর্মময় জীবনে অলসতা, মন্দ স্বাস্থ্য ও মন্দ মন-মানসিকতার মারাত্মক বীজ যাতে শিকড় গজাতে না পারে সে জন্য একটা সুশৃংখলিত ও সুস্পষ্ট জীবন ব্যবস্থার অত্যন্ত প্রয়োজন। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করার মাধ্যমে আমরা সেই মহান ব্যবস্থার সন্ধান লাভ করতে পারি। ‘নামাজ নির্ধারিত সময়ে আদায় করা মুমিনদের উপর অবশ্য কর্তব্য’ (সূরা : নিসা, আয়াত : ১০৩)।
নামাজের ব্যাপারে আল্লাহ পাক আমাদেরকে এই নির্দেশ দিয়ে সুশৃংখল জীবন যাপনের এই মহান শিক্ষা দিয়েছেন যে, যদি কোনো লোক নির্ধারিত সময়ে প্রতিদিন নামাজ আদায় করে তাহলে দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কাজ নির্ধারিত সময়ে করতে সে আগ্রহী হবে। মূলতঃ নামাজের মাধ্যমেই শৃংখলাপূর্ণ জীবন-যাপনের উপযুক্ত শিক্ষা গ্রহণ করা যায়। নামাজের আহবানে মুসলমানরা স্বল্প সময়ে দৈনিক পাঁচবার নির্ধারিত সময়ে একত্রিত হয়। এই নিয়মানুবর্তিতা ও শৃংখলাবোধ যদি দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ করা যায় তাহলে জীবনের সর্বক্ষেত্রে পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে, বিদ্যালয়ে, হাসপাতালে, কল-কারখানায় ও যুদ্ধক্ষেত্রে সর্বত্রই সফলতা লাভ করা যাবে।
দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে আহকাম আরকান তের ফরজ চৌদ্দ ওয়াজিব ও বিশ রাকাত সুন্নত আদায় করতে হয়। এই সমস্ত বিষয়ের দিকে গভীর লক্ষ্য রেখে নামাজ আদায় করতে হয় বলে নামাজী ব্যক্তি স্বভাবতঃ পরিশ্রমী, কর্মঠ, সুস্বাস্থ্য ও সুন্দর মন-মানসিকতার অধিকারী হয়। প্রাতঃকালীন নামাজ আদায় করার জন্য সূর্য উঠার আগেই শয্যা ত্যাগ করতে হয়। তাতে মানুষ শুধু সুস্বাস্থ্য ও সুস্থ মন-মানসিকতা লাভ করে পরিশ্রমীই হয় না; বরং ভোর থেকে সারা দিন কাজ করার সুযোগ ও সময় পায়। ঘুমন্ত দেহে চেতনা শক্তি হ্রাস পায়, দেহ নিস্তেজ ও অলস হয়ে থাকে। এমনকি ঘুম ভেঙ্গে গেলেও বিছানা হতে উঠতে ইচ্ছে হয় না- আরও অলসভাবে সময় কাটাতে ইচ্ছা হয়। সেই জন্য রাত্রে ঘুমিয়ে থাকার পর যাতে আমরা ভোর বেলায় অধিক্ষণ ঘুমের ঘোরে সময় না কাটাই তার জন্যই ফজর বা প্রাতঃকালীন নামাজের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রাতঃকালে শয্যা ত্যাগের গুরুত্ব এতো অধিক যে, মহানবী (সা.) এইরূপ অভ্যাসকে দারিদ্রের মুকাবিলা করতে সক্ষম বলে উল্লেখ করেছেন। অপর দিকে সারা দিনের কাজ কর্মে পরিশ্রমী মানুষটি যাতে তাড়াতাড়ি বিছানায় যেয়ে আরাম করতে পারে সেজন্য এশার নামাজ বা রাত্রিকালীন নামাজের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে-‘ঘুমকে তোমাদের আরামের জন্য সৃষ্টি করেছি। রাতকে তোমাদের আরাম ও বিশ্রামের জন্য এবং দিনকে জীবিকা অর্জনের জন্য সৃষ্টি করেছি।’ সারা দিন কাজ করে ক্লান্ত-শ্রান্ত হাওয়ার পর রাত্রে কতোটুকু সময় পর্যন্ত জাগ্রত থাকা উচিত তা রাত্রিকালীন নামাজ (এশা) দ্বারা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাতঃকালীন ও রাত্রিকালীন নামাজের মাধ্যমে আল্লাহপাক আমাদেরকে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাবার ও অতি ভোরে শয্যা ত্যাগ করার মহান শিক্ষা দান করেছেন। ইহাতে পরিশ্রমী ও কর্মঠ হওয়ার অনুপম শিক্ষা রয়েছে।
যে কারণে আমাদের সমাজে অশান্তি ও অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে তা হচ্ছে আমাদের সমাজে চরিত্রবান লোকের অভাব। চরিত্র মানুষের অমূল্য সম্পদ। চরিত্রবান লোক দেশ ও জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ। যে সমাজে চরিত্রবান লোক বেশি সে সমাজে অপকর্ম ও অশান্তি নেই। সেই সুন্দর চরিত্র গঠনে নামাজের গুরুত্ব অপরিসীম। নামাজ মানুষকে চরিত্রবান করে তুলে। নামাজী ব্যক্তির মধ্যে সর্বদা আল্লাহর ভয় থাকে আর সেই আল্লাহর ভয়ের কারণেই সে অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকে। যে সমাজের সকল লোক নামাজ আদায় করে, সে সমাজের সকল লোক অন্যায় ও অপকর্ম থেকে অবশ্যই বিরত থাকবে। আর যে সমাজে অন্যায় ও অপকর্ম নেই সে সমাজের চেয়ে শান্তির সমাজ আর কি হতে পারে? নামাজ সকলের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করে। নামাজ পরস্পর সৌহার্দ্য সম্প্রীতি সৃষ্টি করে। নামাজ উচ্চ-নিচ, ধনী-দরিদ্র, সাদা-কালো সকল ভেদাভেদ দূর করে। গণতন্ত্র ও সাম্যের এমন সমুজ্জ্বল শিক্ষা আর কোথাও নেই। নামাজ বিশ্ব মুসলিম সংহতি গঠন করে। সমস্ত মুসলমান একত্র হয়ে থাকা, মিলিত হয়ে আল্লাহর বিধান পালন করা, তাঁর বিধান অনুযায়ী নিজেদের জীবন গঠন করা এবং পৃথিবীতে আল্লাহর আইন জারী করার জন্য একে অপরের সহযোগিতা করার প্রেরণা নামাজই দিয়ে থাকে। নামাজ ভিন্ন অন্য কিছুই সুশীল সমাজ-রাষ্ট্রে এরূপ বিরাট ঐক্য শক্তি গঠন করতে পারে।
নামাজ মানুষকে অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। সুশীল সমাজ বিনির্মাণে নামাজের বিকল্প নেই। তাই সমাজের সর্বত্রই নামাজ কায়েম করতে হবে।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT