সাহিত্য

দু’টি পাখি একটি নীড়

ডা. এম. এ সালাম প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৫-২০১৮ ইং ০২:১৬:৫৯ | সংবাদটি ৩৩ বার পঠিত

বহু মান-অভিমান, ভুল বুঝাবুঝি, ঝগড়া-ঝাটি, বিরহ-যন্ত্রণার অঢেল নির্ঘুম রাত্রি যাপনের পর ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত ইয়ামিন ও শর্বরী চার বছর চুটিয়ে প্রেম করার পর বিয়ে করে ঘর বাঁধল। অর্থাৎ দু’টি পাখি একটি নীড়ে জীবন যাপন শুরু করল। ওরা ক্লাসমেট। ভার্সিটি থেকে প্রেমের যাত্রা শুরু। শর্বরী অসাধারণ সুন্দরী। আর ইয়ামিন বলিউডের সুপারস্টার মিঠুন চক্রবর্তী। জুটি অসাধারণ। কিন্তু দু’জনই দারুণ সন্দেহপ্রবণ। একে অন্যের প্রতি বিশ্বাস রাখতে বড় কষ্ট হয়। যে কোন সময় পরকিয়ায় জড়িয়ে পড়ে, সদা সন্দেহে অতিষ্ট। তার কারণ ভার্সিটিতে থাকতে ইয়ামিনের যেমন অনেক মেয়ে বন্ধু ছিল ঠিক তেমনি শর্বরীরও প্রচুর ছেলে বন্ধু ছিল। বন্ধুত্ব অনেকের সাথে থাকতে পারে কিন্তু প্রেম একজনের সাথেই হয়। প্রেম আর বন্ধুত্ব এক জিনিস নয়। কিন্তু ইয়ামিন ও শর্বরীর প্রেম আজঅবদি অটুট ও অম্লান আছে। তবে বিয়ের পিঁিড়তে বসার আগ পর্যন্ত তাদের জীবন অনেক চড়াই-উৎরাই, সন্দেহ-সংঘর্ষ, কথা কাটাকাটি, কথা বন্ধ, নীরবে এড়িয়ে চলা, কোথায় আছে, কেমন আছে খুঁজ খবর রাখার জন্য দু’জনই স্পায়িং-এর ব্যবস্থা রাখত। কারণ, তাদের মনে সার্বক্ষণিক শঙ্কা ও ভয় থাকত, কে কোন সময় কার সাথে ফেঁসে যায়। আসক্তি যেখানে প্রবল, সংশয় সেখানে তৎপর। চোখের আড়াল হলেই সংশয়ের তৎপরতা বেড়ে যায়। ইংরেজি একটি প্রবাদ আছে, বেশি ভালোবাসাবাসিতে বেশি ভুল বুঝাবুঝি। সর্বরী ও ইয়ামিনের দাম্পত্য জীবনে এই প্রবাদটির তীব্র প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। ইয়ামিন ব্যাংক ম্যানেজার আর শর্বরী গ্রীণবার্ড স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ। বিয়ের পাঁচ বছর অতিবাহিত হতে চললো- তাদের সংসারে কোনো সন্তান আসেনি।
শনিবার ছুটির দিন। শর্বরী-ইয়ামিনের ক্লাসমেট এবং বন্ধু জাফর এসে কলিংবেল টিপল। দরজা খুলে শর্বরী বলল: ওমা, জাফর তুমি অতো সকাল সকাল কোত্থেকে। ইয়ামিন জাফর এসেছে, বন্ধুকে বরণ কর। এসো, ভিতরে এসো। ইয়ামিন চা খেতে খেতে বলল: দেখ জাফর, তুকে দেখলেই আমার হার্টবিট বেড়ে যায়। প্রশ্ন করতে পারিস কেন? জাফর বলল, হ্যাঁ এই প্রশ্ন করা খুবই স্বাভাবিক। সত্যি করে বলতো কি কারণে তোর হার্টবিট বেড়ে যায়। বিষয়টি আমার জানা খুব দরকার? ইয়ামিন বলল: বন্ধুরা সবাই তোকে লেডি-কীলার বলে ডাকত। কারণ, তুই বলিউডের মেগাস্টার দেব আনন্দ-এর মতো হ্যান্ডসাম। যে নায়িকা একবার দেব আনন্দের পাল্লায় পা দিত সে অজান্তেই ফেঁসে যেত। তার অসাধারণ সম্মোহনী ক্ষমতা ছিল। জাফর বলল: দেব আনন্দের গ্লামার এবং অভিনয় নৈপুণ্য উপমহাদেশের সব দর্শকই জানে। তার সাথে আমাকে তুলনা করছিস কেন? আমি তো অভিনেতা নই। শর্বরী ট্রেতে চা-নাস্তা সাজিয়ে এসে ড্রইং রুমে ঢুকল। বলল: গরম গরম মেগি নুডলস, সমোচা খাও। ভালো লাগবে। জাফর তুমি চা-না কফি? আমি জানি তুমি ন্যাসকাপে কফি খুব পছন্দ কর। আমি কিন্তু চা নিয়ে এসেছি। তুমি চাইলে বানিয়ে আনতে পারি। ইয়ামিন বলল: জানি, জানি। জাফর কফি খুব পছন্দ করে। এটা তোমার অজানা নয়। সোনারগাঁ উইন্টার গার্ডেনে বসে দু’জনে বহু বার্গার, স্যান্ডউইচ এবং বিভিন্ন ব্যান্ডের কফি খেয়েছ। কিন্তু জাফর শর্বরীকে এগুতে পারেনি কেবল মাত্র আমার জন্যে। কারণ, আমার বাঁধন ছিল শক্ত, ভালোবাসা ছিল খাঁটি, রূপালী পর্দার নায়কদের মতো ঠুনকো প্রেমের অভিনয় ছিল না।’ জাফর বাঁধা দিয়ে বলল: ইয়ামিন শোন, আমি ইচ্ছে করলে শর্বরীকে তোর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারতাম। আজ শর্বরী তোর বউ না হয়ে আমার বউ হতো। কিন্তু আমি বরাবরই বন্ধু হয়ে থেকেছি, ভালোবাসার প্রস্তাব নিয়ে হাত বাড়াইনি। কারণ, আমি জানতাম তোমরা একে অন্যকে গভীরভাবে ভালোবাস। ইয়ামিন তড়িৎ জবাব দিল: ভাই জাফর, চিরদিন বন্ধু হয়েই থাকিস, ভুলেও কোনোদিন পলাশী প্রান্তরের বিশ্বাসঘাতক সেনাপতি মীর জাফর আলী খাঁ’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে শর্বরীর দিকে হাত বাড়াবিনা। শর্বরী আমার, শুধু আমারই থাকবে। শর্বরী চা-এর কাপ ট্রেতে রাখতে রাখতে প্রফুল্ল চিত্তে বলল: এ্যই শুন, তোমরা দু’জন আমাকে নিয়ে অতো টানা হেঁচড়া করছ কেন? তোমাদের জানা উচিত বাঙালি মেয়েরা জীবনে একবারই বিয়ে করে এবং যাকে বিয়ে করে তাকে আমৃত্যু আঁচল দিয়ে বেঁধে রাখে। যেমন ইয়ামিনকে বেঁধেছি আমি। সংশয়-সন্দেহ ভুল বুঝাবুঝি, ঝগড়াঝাটি প্রায়ই হয় কিন্তু আঁচল ছিঁড়ে বেরিয়ে যেতে পারে না আর কোনোদিন পারবেও না।’ জাফর মুচকি হেসে বলল: আচ্ছা শর্বরী, তোমার আঁচলের বাঁধন যখন অতেটা শক্ত তাহলে দুজন মিলে এই পাঁচ বছরের মাথায় একটি সন্তানও আনতে পারনি কেন? ইয়ামিন ইমপোটেন্ট নাকি? শর্বরী ক্লান্ত কন্ঠে বলল: এটা ওকেই জিজ্ঞাসা কর। বিয়ের পর থেকেই অভিমানের শুরু, দু’জন দু’বিছানায় ঘুমাই, সন্তান আসবে কোত্থেকে? একই বেডরুমে দশহাত দূরে দুটি খাটে ঘুমাই। এই দশ হাত দূরত্ব অতিক্রম করে আমার খাটে, আমার পাশে আসে না, তো বাচ্চা আসবে কোত্থেকে? আকাশ থেকে পড়বে না-কি। ইয়ামিন এবার উচ্চকন্ঠে বলল: জাফর ওর কথা একদম বিশ্বাস করবি না। বহু নির্ঘুম রজনী অতিক্রান্ত হয়েছে, ওকে বারবার কাছে টানতে চেয়েছি কিন্তু আমাকে পাত্তাই দেয়নি। বলে দূরে দূরে থাকাই ভালো, শুধু শুধু ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই। কথায়-কাজে কষ্ট আমাকে কম দাওনি, আমি মুখ বুজে সহ্য করেচ্ছি। কষ্ট দিয়েছ যথেস্ট কিন্তু আমি কোনোদিন অভিশাপ দেইনি। শর্বরী রুষ্টকন্ঠে বলল: শোন ইয়ামিন, তোমার ভক্ত-বান্ধবীর সংখ্যা অনেক, আমি জেনেও না জানার ভান করি, দেখেও না দেখার অভিনয় করি। ইয়ামিন শর্বরীর কথা কেটে দৃঢ়কন্ঠে বলল: শর্বরী আমি যদি বলি তুমি কারো প্রতি আসক্ত যার জন্য আমাকে এড়িয়ে চলে দিন পার করছ, সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় আছ। শর্বরী হুংকার দিয়ে বলল: ইয়ামিন মাইন্ড ইওর ল্যাংগুয়েজ। সাবধানে কথা বল। আমার কারো প্রতি কোন আসক্তি নেই। আমি ভালোবাসি তোমাকে, শুধু তোমাকে। আমি তোমার বিবাহিত স্ত্রী। জাফর সুযোগটি হাতে নিয়ে বলল: শর্বরী তুমি তার বিবাহিত স্ত্রী অথচ তোমরা ব্যাচেলর এর জীবন কাটাচ্ছ। এটা কোন ধরনের দাম্পত্য জীবন। সংসার নয়, কোথায় ভালোবাসায় মোড়া দাম্পত্য জীবন, এটা তো নিঃসঙ্গ কারাগার। অসহ্য যন্ত্রণার কুঠির। তোমরা নিজেদের জীবনের প্রতি অবিচার করছ। প্রকৃতির নিয়ম নীতি মানছ না। তোমরা সৃষ্টির কাছে অপরাধী। আমি ব্যারিস্টার মানুষ, আমার দৃষ্টিতে তোমরা দু’জন অপরাধী। আদালত তোমাদেরকে ছাড়বে না। তোমরা নিজেদের থেকে না শোধরালে আমি তোমাদেরকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করাব। তোমাদের অপরাধ মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে পলাতক আসামির মতো বেঁচে আছ। হযরত আলী (রা:) একটি অতি মূল্যবান উক্তি আছে: অভিমান ও জেদ-এর প্রতি আত্মসমর্পণ করার অর্থ হচ্ছে নিজেদের অধিকার হতে স্বেচ্ছায় বঞ্চিত হওয়া।’ তোমরা দীর্ঘদিন থেকে একে অন্যকে ঠকাচ্ছ। সংসার, ধর্ম-কর্ম নিয়ম-নীতি বিনষ্ট করছ, এক ছাদের নিচে স্বামী-স্ত্রী দুই বিছানায়, তোমরা প্রকৃতির অনুশাসন লঙ্ঘন করে অমার্জনীয় অপরাধ করে রাতদিন পার করছ। তোমাদের শাস্তি হয়ে যাবে আর সেটা আমি করাব। তোমরা দু’জনই আমার ঘনিষ্ট বন্ধু কিন্তু জঘণ্য অপরাধী আর এই শাস্তি তোমাদের প্রাপ্য। আমি শাস্তির পক্ষে ওকালতি করব। এটা আমার পেশাগত কর্তব্য এবং ধর্ম। শর্বরী মুক্তাছড়ানো হাসি দিয়ে বলল: জাফর আমি ঠিকই বুঝতে পারছি আমাকে পেয়েও না পাওয়ার তীক্ষè জ্বালা আর হতাশা অহরহ তোমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। প্রেমের যুদ্ধে ইয়ামিনের সাথে তুমি পেরে উঠোনি, পরাজিত হয়েছ। তাই মামলা করে আমাকে জয় করতে চাও। দেখ, ইয়ামিন ও আমার দ্বন্দ্ব একান্ত ব্যক্তিগত ঘরোয়া ব্যাপার আর তাই এ ব্যাপারে তোমার নাক গলানো উচিত নয়। এটা অনধিকার চর্চা। জাফর, আমি দেখছি তোমার মোড অফ হয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি তোমার জন্য এক কাপ গরম কফি নিয়ে আসি। গল্প জমবে ভালো। জাফর উচ্চকন্ঠে বলল: শর্বরী থাম। কফি টফি লাগবে না। তোমাদের ব্যাপারটি আর ব্যক্তিগত রইল কই? তোমরা সৃষ্টির নিয়ম-নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছ তাই ব্যাপারটি যখন সার্বজনীন একটি চিহ্নিত অপরাধ। তোমরা নারী-পুরুষের মৌলিক শারীরিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছ। অভিমান করে পাঁচ দশ দিন থাকা যায় কিন্তু বছরের পর বছর আলাদা থাকা অভিমান নয় বরং এটা শত্রুতা এবং জঘণ্য অপরাধ। তাই হয় তোমরা নিজেরা নিজেদের এই সংঘাত মিটিয়ে ফেলবে নতুবা আদালতের কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়াবে। এই আমার শেষ কথা বলে গেলাম। ডিসেম্বর মাস চলছে। আগামী ডিসেম্বরে তোমাদের কোলে একটি ফুটফুটে সন্তান দেখতে চাই। বলে, হন্ হন্ করে ঝড়ের বেগে জাফর বেরিয়ে গেল।
ইতোমধ্যে দু’সপ্তাহ অতিবাহিত হল কিন্তু ইয়ামিন শর্বরীর সমঝোতার কোনো উল্লেখযোগ্য লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। একদিন রাত্রে শোবার আগে দু’জন দু’বিছানায় বসা অবস্থায় ইয়ামিন বলল: শর্বরী সেদিন জাফর যে সতর্কবাণী দিয়ে গেল ঐ ব্যাপারে কিছু ভেবেছে কি? আমি বাবা জেল খাটতে পারব না। ওর উদ্দেশ্য মোটেই ভালো নয়। ও চাচ্ছে তোমার-আমার দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছে ডিভোর্স হয়ে যাক। আর সে তোমাকে মন-ভুলানো গল্প দিয়ে পটিয়ে বিয়ে করে ঘর বাঁধবে। তার সহানুভূতির সারমর্ম এটাই। অবশ্য এটা আমার ব্যক্তিগত এ্যাসেসমেন্ট। তোমার কি প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তুমি এ ব্যাপারে কি ভাবছ। শর্বরী প্রেমের হাসি দিয়ে বলল: আমার কোন প্রতিক্রিয়া নেই। এ ব্যাপারে কিছু ভাববার কোন প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। আর জাফর একটি প্রাণহীন দেহ বিয়ে করে কি করবে। আমার মনপ্রাণ যে তোমার পিঞ্জরে বন্দী জাফর সেটা ভালো করেই জানে। সে ব্যারিস্টার, জেনে শুনে মামলা হারবে না। ইয়ামিন বলল: ভালো কথা। কিন্তু জাফর শর্ত দিয়েছে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আমাদের কোলে সন্তান দেখতে চায়। অন্যথায় মামলা করবে। শর্বরী ক্লিষ্ট হাসি দিয়ে বলল: তোমার তো বান্ধবীর সংখ্যা একেবারে কম নয়, একটাকে বিয়ে করে ঘরে আন, সন্তান পেয়ে যাবে। তোমাকে জেল খাটতে হবে না। আর আমাদের ডিভোর্স তো এমনি এমনি হয়ে গেছে। আমি তো ডিভোর্সী মহিলা হিসাবে বেঁচে আছি। আনুষ্ঠানিক ডিভোর্সের প্রয়োজন কি? তোমার ঘরকন্যার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি একজন মিসট্রেস হিসাবে, স্ত্রী হিসাবে নয়। ব্যাপারটি তুমি অস্বীকার করতে পারবে, পারবে না। ইয়ামিন বাঁধা দিয়ে বলল: থাম শর্বরী। তুমি প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলছ। এতে মন-মালিন্য আরো ঘণিভূত হবে, তিক্ততা বাড়বে। সংঘাত সৃষ্টি হবে। আমি বহুবার তোমাকে কাছে টানতে প্রবল ইচ্ছা প্রকাশ করেছি কিন্তু তুমি নিজেকে গুটিয়ে রেখেছ, সমর্পণ করোনি, কিন্তু কেন? এই রহস্যটি আজ আমার কাছে অজানা, অধরা। কিন্তু শর্বরী, এভাবে জীবন চলে না, চলতে পারে না। এর বিকল্প চিন্তা আমাদেরকে এখনই করতে হবে। সূর্যোদয়ে জীবনের গান, সূর্যাস্তে অন্ধকার আর হতাশার করুণ সংগীত শোনার কেউ থাকবে না। ক্লান্তকন্ঠে শর্বরী বলল: খুব সুন্দর বলেছ। আমি তোমার অতিপ্রায় খুব বুঝতে পেরেছি। রাত দুপুরে তোমাকে আর হতাশার সংগীত গাইতে হবে না। আমি ভোর হলেই ঘর ছেড়ে যাচ্ছি, চিরতরে চিরদিনের মতো। তোমার পথের কাঁটা সাফ করে দিচ্ছি। তুমি সময় নষ্ট না করে ঘর বাঁধো। ফুটফুটে সন্তান আসলে অচিরেই আমাকে ভুলে যাবে। আমার ভিসা খুব শিগগীরই হয়ে যাবে। আমি আমেরিকায় চলে যাব। ভাইয়া অনেক আগেই এ্যপলাই করে রেখেছেন। ইয়ামিন কান্নাজড়িত কন্ঠে বলল: শর্বরী এটা কি তোমার মনের শেষ কথা। আমাকে এভাবে একা ফেলে যেতে পারবে? শর্বরী তড়িৎ জবাব দিল: হ্যাঁ, এটা আমার মনের কথা। আর তুমি তো একা থাকতেই ভালোবাস। অতোকাল আমরা এক ছাদের নিচে একা একাই তো বসবাস করছি। এক ঘরে সংসার পাতলেই সুখী দাম্পত্য জীবন হয় না বরং এই জাতীয় জীবনকে বন্দি কারাগার বলাই ভালো। আমি আছি, তুমি আছ কিন্তু দাম্পত্য জীবনে আমরা কেউ কারো নই। এই জীবনই তো অতোকাল পার করে আসলাম। কিন্তু আর নয়। এবার নিজেদের পথ নিজেরাই খুঁজে নেয়া উত্তম। ও-কে গুড নাইট। রাত অনেক হয়েছে। এবার ঘুমিয়ে পড়। আলো ফোটার আগেই আমি বেরিয়ে পড়ব।
গভীর রাত। রাতজাগা পাখি ও ঝিঝি পোকার বিরতিহীন কনসার্ট রাতের ¯িœগ্ধ বাতাসে ভেসে আসছে। কিছুতেই ইয়ামিনের ঘুম আসছে না, মনে হচ্ছে মাথায় প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে। অশান্তি ও আতংকে সারা গা ঝিমঝিম করছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় কিনা, কে জানে। ভোরের আলো ফোটার আগেই শর্বরী আমাকে ছেড়ে চিরদিনের জন্য বেরিয়ে যাবে। অজান্তেই চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল। হায়। বড় সাধ করে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য, বিয়ের প্রথম বছরের মাথায় আমাদেরকে নির্বাসনে রেখে ভালোবাসা পালিয়ে যায়। আমরা দু’জন অচেনা আগন্তুক এর মতো সময় পার করতে থাকি। শর্বরী ভোরে চলে যাচ্ছে। শর্বরীর মোহনীয় মায়া ভরা মুখ আর এই কুঠিরে দেখব না। তার মিষ্টি কন্ঠের প্রেমালাপ আর শুনব না। জ্যোৎ¯œা ঝরা হাসি আর দেখব না। তার নয়নকাঁড়া হিল্লোলীত মোমে গড়া আকর্ষণীয় শরীরে আর কোনোদিন হাত বোলাতে পারব না। তাহলে আমার আর বেঁচে থাকায় কি অবলম্বন রইল। অমূল্য রতœ আমি হারাতে বসেছি। ভাগ্যবানরাই শর্বরীর মতো হীরের টুকরো স্ত্রী পেয়ে থাকে। হায় বিধি। আমি পেয়েও হারাতে বসেছি। না, না, কিছুতেই না। আমাকে এক্ষুণি একটা কিছু করতে হবে। রাত দ্রুত গড়িয়ে যাচ্ছে। কাছে কোথাও ভোরের পাখি ডাকছে। ইয়ামিন বিছানা ছেড়ে ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে শর্বরীর বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। শর্বরী ঘুমুচ্ছে। ইয়ামিন শর্বরীর শরীরের দুপাশে দুটি হাত রেখে ঘুমন্ত শর্বরীর গোলাপ পাপড়ির মতো মায়াভরা ফর্সা মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ থেকে বৃষ্টির মতো অশ্রু ঝরতে লাগল। তপ্ত ফোটা ফোটা অশ্রু শর্বরীর কপালে, মুখে ঝরতে লাগল। শর্বরীর ঘুম ভেঙ্গে গেল এবং অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখলো ইয়ামিন তার শরীরের উপর ঝুকে আছে এবং চোখ থেকে অবিরাম অশ্রু ঝরছে। শর্বরীও যথার্থকন্ঠে বলল: ও-মাই-গড। ইয়ামিন তুমি কাঁদছ? তোমার কি হয়েছে ডীয়ার ইয়ামিন? তোমাকে তো জীবনে কখনো কাঁদতে দেখিনি। ইয়ামিন শব্দ করে কেঁদে বলল: তুমি তো ভোরে চলে যাচ্ছ। তাই শেষবারের মতো তোমাকে চুমু খেতে এসেছি। ভোরে তুমি বেরিয়ে গেলেই আমি ঘুমের ওষুধ খেয়ে তোমার খালি বেডে শুয়ে আত্মহত্যা করব। তুমি নাই আমিও নাই। শর্বরী হাউমাউ করে কেঁদে কেঁদে বলল: ইয়ামিন তুমি এসব কি বলছ? তোমার মতো বিজ্ঞ এবং ঈর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন একজন মানুষ অর্বাচীন বালকের মতো প্রলাপ বকা শোভা পায় না। বলে, ইয়ামিনকে জোরে জড়িয়ে ধরল। অনেক দিন পর যেন বৃষ্টি এলো। বলল: ইয়ামিন, তুমি-আমি আছি বলেই এই পৃথিবীটা আজ অতো সুন্দর। আমি তুমি চলে গেলে ¯্রষ্টার এই মনোরম পৃথিবীতে কাবা বাস করবে বলো? ইয়ামিন বলল: তুমি যে বললে ভোর হলেই চলে যাবে। শর্বরী ইয়ামিনকে বুকের মাঝে আঁকড়ে ধরে বলল: দূর বোকা। তোমাকে ছেড়ে কি আমি বাঁচতে পারব। তোমার হৃদয়ে আমার স্থান কোথায় একটু পরীক্ষা করলাম মাত্র। তুমি আমার আছ,্ আমারই থাকবে চিরকাল।
ইয়ামিন চোখ মুছতে মুছতে বলল: শোনে খুব খুশি হলাম। রাত দুপুরে তোমার ঘুম ভাঙালাম, আমাকে ক্ষমা কর। এবার ঘুমাও। আমি আসি। শর্বরী মুক্তাছড়ানো হাসি দিয়ে বলল: ইয়ামিন তুমি হেরে গেছ, আমি জিতে গেছি। আবার বলছ, আসি। আসি মানে? তুমি আমার বুকের বাঁধনে আটকে আছ। এভাবে থাকবে চিরকাল। এসো, জড়াজড়ি করে শুয়ে পড়ি। বাতি নিভিয়ে দাও। সকালে ঘুম ভাঙলে ইয়ামিন শায়িত শর্বরীর কপালে একটি মায়াচুম্বন এঁকে দিয়ে বলল: শর্বরী আমি হেরেও জিতে গেছি। শর্বরী জ্যোৎ¯œাঝরা হাসি দিয়ে বলল: হ্যাঁ তা ঠিক। আমি তনমন দিয়ে উপলব্ধি করেছি। আবহাওয়া বার্তায় বলেছিল বঙ্গোপসাগরে গভীর নি¤œচাপের সৃষ্টি হয়েছে এবং সেটা আরো ঘনিভূত হয়ে ঘূর্ণিঝড়ে রূপান্তরিত হয়ে গতরাতে আমার উপর দিয়ে বয়ে গেছে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT