সাহিত্য

ইতিবাচক রবীন্দ্রনাথ

রতীশচন্দ্র দাস তালুকদার প্রকাশিত হয়েছে: ০৬-০৫-২০১৮ ইং ০২:২০:০৬ | সংবাদটি ৩২ বার পঠিত

মানব জীবন কুসুম শয্যা নয়। কথাটি আমার নয়, একটি ইংরেজি প্রবাদবাক্যের বঙ্গানুবাদ। প্রবাদটি হলো- Life is not a bed of roses আসলে বাংলা বা ইংরেজি প্রবাদগুলো জীবনের গভীর অভিজ্ঞতালব্ধ সৃষ্টি। এসব প্রবাদ কারা সৃষ্টি করেছেন তাদের নাম আমাদের অজানা। তবে এটা সত্য, তারা জীবনকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতেন। অনেক চড়াই উৎরাই, খানাখন্দ পেরিয়ে জীবনের পথ চলতে হয়। অনেক ঘাত প্রতিঘাত অতিক্রম করে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে হয়। এসব যদি জীবনের বাস্তবতা বলে মনে না করি তবে বার বার হোঁচট খেতে হবে, হতাশার ধূ¤্রজালে জড়িয়ে পড়তে হবে। যারা জীবনের কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে ভয় পায়, নিমজ্জিত হয় নৈরাশ্যের বেড়াজালে, জীবন সম্পর্কে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক। আমরা যদি সফলকাম রাজনীতিবিদ, শিল্প সাহিত্যের কৃতবিদ্য ব্যক্তিবর্গের এবং সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রের কৃতী মানুষের জীবন পর্যালোচনা করি, তবে আমরা দেখতে পাব, তারা সবাই জীবনকে দেখেছেন অত্যন্ত চড়ংরঃরাব দৃষ্টিতে। আসলে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কোনো লোকই জীবনে সাফল্যের দেখা পায় না তা তিনি যত মেধাবীই হউন না কেন, অসাধারণ মেধাসম্পন্ন ব্যক্তি ও নৈরাশ্যের চোরাবালিতে হারিয়ে যান। তাই জীবনে সফলকাম হতে হলে, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন অপরিহার্য্য।
আমাদের বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যিনি শুধু কবিই ছিলেন না, শিল্প ও সাহিত্যের বিভিন্ন অঙ্গনে যার ছিল স্বচ্ছন্দ পদচারণা, আধুনিক বাংলা ভাষা যে ভাষায় আজ আমরা সাহিত্য রচনা করছি, এ ভাষা বিনির্মাণে যার অবদান ছিল একক ও অনন্য, আবার জীবন ও পারিপার্শ্ব সম্পর্কেও তাঁর দৃষ্টি ছিল স্বচ্ছ ও সদর্থক। রবীন্দ্রনাথের জীবন পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, জীবন, সমাজ ও মানুষ সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ইতিবাচক। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন এ পার্থিব জীবন ও পৃথিবীর মানুষকে আমি ভালোবেসেছি। এই ভালোবাসা রেখে গেলাম আমার গানের সুরে গেঁথে।
তিনি আরও বলতেন, ‘মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ।’ মানুষে মানুষে যাতে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির সম্পর্ক বজায় থাকে এ আকুতি তাঁর অজ¯্র কবিতা ও গানে তিনি বিবৃত করেছেন। ‘নববর্ষ’ কবিতায় তিনি লিখেছেন- ‘বন্ধু হও শত্রু হও, যেখানে যে কেহ রও/ ক্ষমা কর আজিকার মতো/ পুরাতন বরষের সাথে/ পুরাতন অপরাধ যত।’
আমরা দোষে গুণে মানুষ। তাই চলার পথে কারো কারো সাথে বৈরিতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে, গড়ে ওঠে মতদ্বৈধতা ও মতভিন্নতা। কিন্তু এ সম্পর্ক যদি বয়ে নিয়ে চলি, তবে মনে যে অস্বাভাবিক চাপ (ঝঃৎবংং) সৃষ্টি হয় তা শরীর ও স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে এবং মনে কখনও প্রশান্তির অনুভূতি সৃষ্টি হয় না। রবীন্দ্রনাতের আরেকটি কবিতা পাঠ্যপুস্তকে আমরা অনেকেই পড়েছি এবং পরীক্ষার জন্য মুখস্থও করেছি। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য কখনও হৃদয়ঙ্গম করতে পারিনি। কবিতার কয়েকটি পংক্তি হলো-
‘বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা/ বিপদে আমি না যেন করি ভয়।/ দুঃখ তাপে ব্যথিত চিতে নাই বা দিলে সান্তনা/ দুঃখ যেন করিতে পারি জয়।’
জীবন সম্পর্কে কবির চিন্তা চেতনা কেমন সদর্থক ও নিঃশঙ্ক ছিল তা এ কবিতাটি পড়লে সহজেই উপলব্দি করা যায়।
জীবনে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, বিপদ-আপদের সম্মুখীন হওয়া খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু বিপদ থেকে রক্ষা করার আকুতি তিনি ব্যক্ত করেননি বরং বিপদ যেন সাহসের সাথে মোকাবেলা করতে পারেন সে প্রার্থনাই তাঁর কবিতায় তুলে ধরেছেন। দুঃখ জর্জরিত চিত্তে কেউ সান্তনা বা সহানুভূতি প্রকাশ করুক তাও তিনি চাননি। তিনি চেয়েছেন দুঃখ যন্ত্রণা অতিক্রম করার মানসিক শক্তি। জীবন নিয়ে এর চেয়ে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আর কী হতে পারে। ‘এবার ফিরাও মোরে’ কবিতায় তিনি লিখেছেন-
‘অন্ন চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই মুক্ত বায়ু/ চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ উজ্জ্বল পরমায়ু/ সাহস বিস্তৃত বক্ষপট। এ দৈন্য মাঝারে কবি/ এবার নিয়ে এসো স্বর্গ হতে বিশ্বাসের ছবি।’
এখানে কবি প্রাণোচ্ছল ও আলোকিত জীবন প্রার্থনা করেছেন। চেয়েছেন স্বাস্থ্য উজ্জ্বল ও অফুরান আনন্দভরপুর পরমায়ু এবং প্রার্থনা করেছেন সাহসী ও বিশ্বাসী হওয়ার প্রত্যয়। কবির চিন্তাভাবনায় কোথাও নেতিবাচকতা নেই, বরং আছে সম্পর্কে সদর্থক চিন্তার প্রতিফলন।
আপন জনের মৃত্যুর কালো হাত বার বার কবির জীবনে ছায়া বিস্তার করেছে। খুবই অল্প সময়ের ব্যবধানে হারিছেন প্রেমময়ী স্ত্রী, আদর্শ গুরু পিতা, ¯েœহাস্পদ ছেলে, দুই মেয়ে এবং একমাত্র নাতিকে। এর আগে জন্মদাত্রী মা ও প্রাণপ্রিয় বৌদি কাদম্বরী দেবীর অকাল মৃত্যুও কবি প্রত্যক্ষ করেছেন। কবি শোকাহত হয়েছেন তবে তাঁর সৃষ্টিশীলতার ফল্গু ধারা কখনো থেমে থাকেনি। বরং শোক তাঁর মধ্যে সৃজনশীলতার শক্তি সঞ্চার করেছে। কবির বয়স যখন ১৩ বছর তখন পরম ¯েœহময়ী মা সারদাসুন্দরী দেবীর প্রয়ান ঘটে। ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে কবির জীবনের ধ্রুবতারা এবং সকল সৃষ্টিশীল কাজের প্রেরণাদাত্রী বৌদি কাদম্বরী দেবী আত্মহত্যা করেন। কবি অমির চক্রবর্তীকে একটি চিঠিতে লেখেন- ‘একসময় যখন আমার বয়স তোমারই মতো ছিল তখন আমি যে নিদারুণ শোক পেয়েছিলুম সেই ঠিক তোমারই মত, আমার যে পরম আত্মীয় আত্মহত্যা করে মরেন, শিশুকাল থেকে আমার জীবনের পূর্ণ নির্ভর ছিলেন তিনি। বৌদির মৃত্যুর পর ‘শৈশব সংগীত’ ও ‘ভানুসিংহের পদাবলী’ বৌদিকে উৎসর্গ করে লেখেন- ‘ভানুসিংহের কবিতাগুলি ছাপাইতে তুমি আমাকে অনেকবার অনুরোধ করিয়াছিলে। তখন সে অনুরোধ পালন করি নাই। আজ ছাপাইয়াছি, আজ তুমি আর দেখিতে পাইলে না।’ ১৯০২ সালে স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর প্রয়াণ ঘটে। কবি তখন ব্রজেন্দ্রকিশোর দেবমানিক্যকে লেখেন- ‘ঈশ্বর আমাকে যে শোক দিয়াছেন সেই শোককে তিনি নিষ্ফল করিবেন না। তিনি আমাকে এই শোকের দ্বার দিয়া মঙ্গলের পথে উত্তীর্ণ করিয়া দিবেন।’ কবি জায়ার মৃত্যুর নয় মাসের ব্যবধানে ১৯০৩ সালে সেপ্টেম্বর মাসে কবির মেজো মেয়ে রেণুকা দেবী যক্ষ্মা রোগে মারা যান। হাওয়া পরিবর্তনের জন্য তাঁকে নিয়ে মধুপুর ও হাজারিবাগ গিয়েছিলেন কিন্তু রাজরোগের কালো থাবা থেকে তাঁকে রক্ষা করা যায়নি। কন্যার মৃত্যুর প্রায় দুই বছরের মাথায় ১৯০৫ সালে পরম ¯েœহময় পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মহাপ্রয়ান ঘটে যাকে কবি জীবনের আদর্শ বলে মানতেন। আবার পিতার মৃত্যুর দু’বছরের ব্যবধানে ১৯০৭ সালে প্রাণপ্রিয় কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্র নাথ ঠাকুর কলেরায় মারা যান। তারপর বড় মেয়ে মাধুরীলতা দেবী এবং মেয়ে মীরা দেবীর ছেলে রবীন্দ্রনাথের একমাত্র নাতি নীতীন্দ্র নাথ গঙ্গোপাধ্যায়ও অকালে পৃথিবী ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে যান। এভাবে একের পর এক প্রিয়জনের মৃত্যু কবির জীবনে যেন মিছিল করে হানা দিয়েছে। প্রিয়জনের মৃত্যুশোক তাঁর হৃদয়ে বার বার রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে কিন্তু বাহিরে তিনি ছিলেন অবিচল ও অচঞ্চল। লেখালেখি ও সামাজিক কাজে নিমগ্ন থেকেই তিনি শোককে ভুলতে চেয়েছেন।
পূজা পর্যায়ের একটি গানে তিনি বলেছেন- ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে/ তবুও শান্তি, তবুও আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে/ তবু প্রাণ নিত্যধারা হাসে সূর্য চন্দ্র তারা/ বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে।’
এভাবে দুঃখ, বিরহ ও মৃত্যু শোকের মধ্যেও কবি আনন্দ, শান্তি ও প্রাণময় জীবনধারা খুঁজে ফিরেছেন।
জীবন সম্পর্কে কবি কখনও নঞর্থক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন না। দুঃখ, শোক, বিরহ বেদনা এসবই জীবনের অনুষঙ্গ বলে ভাবতেন। তাই এত শোক, বেদনা ও দুঃখের মধ্যেও অবিচল ও নির্বিকার থেকে অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন আজীবন।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT