মহিলা সমাজ

মৌন-প্রেম ও ধ্যানের কবি : কালের কালপুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ঝরনা বেগম প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৫-২০১৮ ইং ০২:৫৫:০১ | সংবাদটি ৯২ বার পঠিত

বাংলা সাহিত্যের প্রবাদপুরুষ বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনে সময়কে নান্দনিক উপায়ে রাঙিয়েছিলেন বলেই আজ তিনি সকল সাহিত্য প্রেমিদের কাছে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। প্রত্যেক লেখকের এগিয়ে চলার গল্প, কষ্টের গল্প, প্রেমের গল্প ভিন্ন নয়। সাহিত্যিকদেরও প্রেমিক অথবা প্রেমিকা থাকেন। প্রিয় রমণী থাকতেই পারেন। আমাদের নোবেল বিজয়ী সাহিত্যিক রবি ঠাকুর ও এর সু-শীতল ছায়া পেয়েছেনÑনা হলে এতো প্রেম এতো বিরহ তাঁর কাব্যে আসলো কিভাবে? রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী’রÑএই দিনে তাঁর তিন জন প্রিয় প্রেয়সিনীকে নিয়ে লিখলাম। তিন জনের মধ্যে সর্ব প্রথম রবীন্দ্রনাথ যে নারীর প্রেমে পড়েন তিনি হলেন আন্না তড়খড়। কে এই আন্না? একটু জানার চেষ্টা করি না কেন? হ্যাঁ, মনে পড়ছেÑডা. আত্মারাম পান্ডুরংয়ের কন্যা আন্না তড়খড়। তাঁর সঙ্গে কবিগুরুর সাক্ষাৎ মাত্র এক মাস বা তার সামান্য কিছু বেশি হলেও আন্নার স্মৃতি কবির মনে অম্লান ছিল। আন্না কবিকে ভালোবেসে ছিলেন। কিন্তু বাঁধনে জড়াতে পারেন নি। হয়তো চেষ্টাও করেন নি। তবে রবি ঠাকুরের জীবনে প্রথম প্রেম হয়ে এসেছিলো আন্না। ১৮৭৮ সালের আগস্ট মাসে রবীন্দ্রনাথ তাঁর মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কর্মস্থল আহমেদাবাদ ত্যাগ করে মুম্বাইয়ে বন্ধু ডা. আত্মারাম পান্ডুংয়ের পরিবারে আশ্রয় নিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল স্পোকেন ইংলিশ শিখা এবং ইংরেজদের কৃষ্টি কালচার সম্বন্ধে সামান্য ধারণা লওয়া। বিলাত ফেরত আন্না তখন রবীন্দ্রনাথকে ইংরেজি ভাষা শিখতে হেল্প করতেন। আর এক পর্যায়ে মনের অজান্তে রবীন্দ্রনাথ আন্নার প্রেমে পড়ে যান। কবিদের প্রেমের ভাগ্য বড় খারাপ হয়Ñতাই বোধ হয় ১৮৭৯ সালের ১১ নভেম্বর আন্নার বিয়ে হয়ে যায় বরোদা কলেজের উপাধ্যক্ষ হ্যারল্ড লিটেলডলের সঙ্গে। আন্নার দুই কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে। রবীন্দ্রনাথের সাথে আন্নার আর কোনো যোগাযোগ হয় নি। ১৮৯১ সালের ৫ এপ্রিল এডিনবরা শহরে আন্না তড়খড় মৃত্যুবরণ করেন।
তারপর রবীন্দ্রনাথের প্রেমের গাঁথা রচিত হয়েছিল আর্জেন্টিনার প্লাতা নদীরে তীরে। এই নদীর তীর ঘেঁষে কবির সঙ্গী হয়ে হেঁটেছিলেন বিদেশীনি ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে নিজের কবিতা পড়ে শোনাতেন। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সুবাদে রবীন্দ্রনাথ তখন বিশ্বে খুব পরিচিত ছিলেন। দেশে-বিদেশে তাঁর ছিল অসংখ্য ভক্ত। রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলী’ কাব্যের গভির পাঠক ছিলেন ওকাম্পো। এক সময় কবিতা পড়তে পড়তে রবীন্দ্রনাথের প্রেমে পড়ে যান ওকাম্পো নামের রূপসীনি। বিশ্ব ভ্রমণের এক পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ আর্জেন্টিনায় পৌঁছান। সেখানে তাঁকে বড় রকমের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেই অনুষ্ঠানে ওকাম্পোও এসেছিলেন। প্রিয় কবিকে কাছে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যান। ধীরে ধীরে কবির কাছে তাঁর ভালোবাসা প্রকাশ করে ফেলেন। রবীন্দ্রনাথও তাতে সাড়া দিয়ে ফেলেন। চলে গোছানো প্রেমের প্রহর। এ জন্য অনেক কাব্য রসিক মনে করেন কবিগুরুর বিখ্যাত রবীন্দ্র সঙ্গীতÑ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে/ ওগো বিদেশীনি/ তুমি থাকে। সিন্ধু পাড়ে/ ওগো বিদেশীনি... ওকাম্পোকে ভেবেই লেখা। কিন্তু না, পরে গবেষকরা খেঁটে খুঁটে দেখলেন যে, এই গানটি লেখা হয়েছিল ১৮৯৫ সালে শিলাইদহের মাটিতে বসে। আর রবীন্দ্রনাথ আর্জেন্টিনা যান গানটি রচনার অনেক পরে। সম্ভবত ১৯২৪ সালে। তবে শিলাইদহে যাকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ গান লিখেছিলেন তাঁর প্রেমের উপাখ্যান সবার অজানা রয়ে গেছে।
রবীন্দ্র কাব্যে আধুনিক, পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক মানব মহিমার কথা বর্ণিত হয়েছে। পাশাপাশি প্রেম-বিরহ, দুঃখ-দারিদ্র, সংস্কার-বিশ্বাসÑসব কিছু সাবলিল ভাষায় কবি প্রকাশ করেছেন। তবে রবীন্দ্রনাথ প্রেমের জয়গান গেয়েছেন বেশি। রোমান্টিক অনেক কবিতা পাঠকের মনে তাঁকে চমৎকার একটা জায়গা করে দিয়েছে। যেমনÑগীতাঞ্জলী, পূরবী, পুনশ্চ, জন্মদিনে, সেঁজুতি কিংবা শেষলেখা কাব্য সমগ্র যখন আমরা পাঠ করি তখন মৌন-ধ্যানমগ্ন রবীন্দ্রনাথকে পাই, মানবিক গুণসম্পন্ন ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথকে পাই। আমরা মুগ্ধ হই, পুলকিত হই আবার ব্যথিতও হই। তবু সাহিত্য সাধক রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিমালা থেকে জ্ঞান আহরণের জন্য বার বার পড়ি রবীন্দ্র সমগ্র।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের কাব্যের থীম আমাদের চারপাশের প্রকৃতি ও মানব প্রেম থেকে সংগৃহিত মর্মবাণী। বিরাট বিশ্ব কাব্যের সঙ্গীতময় প্রকাশ। শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক হবার সাধনা আমাদের রবি ঠাকুর সারা জীবন করে গেছেন। তাইতো তিনি বলেছেনÑ‘যে গান কানে যায় না শোনা সে গান যেথায় নিত্য বাজে প্রাণের বীণা নিয়ে যাব সেই অতলের সভা মাঝে।’ রবীন্দ্রনাথ জীবনের কবি, জীবনবাদী কবি। প্রেম, সত্য ও প্রেরণাপরায়ণ কবি। তাঁর সাহিত্যকর্ম কখনো বিষাদের আবার কখনো বা আনন্দের সাবজেক্ট। এসব সাহিত্যকর্ম পড়ে পাঠকের মনের জড়তা দূর হয়, উদার-মুক্ত হয় মন।
ইংরেজ লেখকরা যেমন ঘুরে ফিরে শেক্সপিয়রÑএর সাহিত্য সমগ্র থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এগিয়ে চলেছেন, তেমনি আমাদের নবীন সাহিত্যিকরা রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর লেখার স্টাইলকে ফলো করে এগিয়ে যাবেন বহুমাত্রিক সাহিত্যধারায়।
সঙ্গীত, কবিতা, গল্পÑসকল মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ প্রেমকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। পৃথিবীর যেখানেই তিনি গিয়েছেন প্রেমের মোহাচ্ছন্নতা তাঁকে রোমান্টিক সাহিত্য সৃষ্টি করতে উৎসাহিত করেছে। ভিক্টোরিয়া, আন্না তড়খড়, এমন কি বউ দি কাদম্বরী দেবী’র সাথেও নাকি রীবন্দ্রনাথের প্রেমের সম্পর্ক ছিলÑরবীন্দ্র গবেষকরা সেটা খুঁড়ে বের করে এনেছেন আর আমরা তা জেনেছি। তবে কাউকে রবীন্দ্রনাথ ধরে রাখতে পারেন নি, হয়তো ধরে রাখার চেষ্টাও করেন নি। কেবল তাঁদের ছবি মানসপটে ধারণ করে কাব্য, সঙ্গীঁতÑ এসব রচনা করে গেছেন। পপুলারিটির মোহে সকল লেখকরা সামনে এগিয়ে যেতে থাকেন, পেছনে ফিরে তাকানোর সময় তাঁদের থাকে না। রবীন্দ্রনাথও এর ব্যতিক্রম নন। শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকের আসন ছিনিয়ে আনার জন্য তিনি অনেক কিছু হারিয়েছেন। তাই মৌন রবি, প্রেমের কবিÑশেষ পর্যন্ত এটাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে হারিয়ে যাওয়া সকল প্রেয়সীদের উদ্দেশ্য করে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সঙ্গীতের বাণীতে বলেছেনÑ
তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি/ সকল খেলায় করবো খেলা/ এই আমি/ আহা!/ কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি/ নতুন নামে ডাকবে মোরে/ বাঁধবে, বাঁধবে নতুন বাহুডোরে/ আসবো যাবো চিরদিনের সেÑই আমি/ যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাঁটে/ আমি বাইবো না মোর খেয়া তরী এই ঘাটে গো...।
আমাদের বাংলা সাহিত্যের ভূবনে সকলের প্রিয় কবি চির দিনের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর জন্মবার্ষিকীতে আমি বিন¤্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ সকল খেলায় তুমি করবে খেলাÑ আর আমরা পোনা পোনা লেখকরা তোমায় ফলো করে যাবো। শ্রেষ্ঠ লেখা’র স্টাইল তোমার লেখনী থেকে শিখবো। তুমি বাজাও প্রাণের বীণা।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT