মহিলা সমাজ

চশমার ফ্রেমের আড়ালে বাবার অশ্রুপূর্ণ চোখ

শামিমা মনসুর শাম্মী প্রকাশিত হয়েছে: ০৮-০৫-২০১৮ ইং ০২:৫৫:৩৮ | সংবাদটি ১৪০ বার পঠিত

মাকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে অনেক লেখা আছে। বাবাকে নিয়ে লেখা কম। আমার কাছে মনে হয় অত্যন্ত নগণ্য। আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছে, আজ বাবাকে নিয়ে কিছু লিখি। বাবারা কেমন হয় এ বিষয় নিয়ে লিখি। আমার বাবা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা। বাবা শব্দটা কত মধুর তা বুঝানোর ভাষা নেই। হয়তো এমন কোনো শব্দ অভিধানে নেই।
অনেক মানুষ আছে, যারা নিজের ইচ্ছে মতো বিষয় নিয়ে পড়তে পারে না বা সুযোগ পায় না। কিন্ত আমি এই দিক দিয়ে নিজেকে ভাগ্যবতী বলব, কারণ আমার বাবা সবসময় আমার পাশে আছেন। বাংলা সাহিত্য নিয়ে অনার্স পড়ছি জেনে অনেকে কতো কিছু বলছে। আমি ইংরেজিতে চান্স পেয়েও মাইগ্রেশন করে বাংলা নিয়েছি। বাবা জানতেন ব্যাপারটা। তারপরও কিছুই বলেননি।
বাবার অনেক স্বপ্ন আমি পূর্ণ করেছি। বাবার মুখে হাসি ফুটাতে পেরে আমি অনেক খুশি। আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে যতগুলো কৃতিত্ব কাজ করেছে, এর পিছনে আমার বাবার দেয়া উৎসাহ, অনুপ্রেরণা ছিল সর্বাধিক। বাবা আমার পাশে আছেন বলেই আজ আমি এতটুকুপথ আসতে পেরেছি।
২০১১ সালের একটা ঘটনা বলি। বাবার ইচ্ছে অনুযায়ী বিএনসিসি (বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর) তে ভর্তি হই। ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে বিএনসিসির বার্ষিক প্রশিক্ষণের জন্য কুমিল্লা গিয়েছিলাম। প্রশিক্ষণ শেষে বাড়ি ফেরার দিন বাবা আমাকে আনতে গেলেন। বাস থেকে নেমে বাবাকে খুঁজছি। এমন সময় কে যেন বলল ‘স্যালুট ক্যাডেট শাম্মী’, আমি পেছন ফিরে স্যালুটরত যে মানুষটা দেখে অবাক হই, সেই মানুষ আমার বাবা। আমি বাবাকে স্যালুট দেয়ার আগেই বাবা আমাকে স্যালুট দিচ্ছেন, এই দৃশ্যটি আজও আমার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়।
বাবার অনুপ্রেরণায় ক্লাব, স্কাউট, বিএনসিসিতে ভর্তি হয়েছি। এবং প্রশিক্ষণগুলোতে গিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরের জীবনে কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা পেয়েছি। বাবা শুধু আমার ক্ষেত্রেই না, অন্য সবার বেলায়ও খুব উদার প্রকৃতির। এই মানুষটা সারাজীবন অক্লান্ত পরিশ্রম আর ভালোবাসা দিয়ে গেলেন, বিনিময়ে কখনো প্রতিদান আশা করেন নি। হিসেব করলে দেওয়ার পাল্লাটাই ভারী; পাওয়ার হিসেবটা নাই বা করলাম! মধ্যবিত্তের অবস্থান থেকে বাবা যাই করেছেন, সমাজের অনেক উচ্চবিত্তদেরও হার মানায়!
পল্লী কবি জসীম উদ্দীনের ‘প্রতিদান’ কবিতার প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাই বাবার মধ্যে। কয়েকটা লাইন এমন- ‘আমার এ ঘর ভাঙিয়াছে যেবা, আমি বাঁধি তার ঘর,/ আপন করিতে কাঁদিয়া বেড়াই যে মোরে করেছে পর।’
ঠিক এমনটাই আমার বাবা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা উক্তির সাথে বাবার সাদৃশ্য পাওয়া যায়। ‘শাস্তি’ গল্পে ভাই দুখীরামকে বাঁচাতে ছিদাম তার স্ত্রীর উপর খুনের দায় চাপিয়ে দেয় আর বলে, বউ গেলে বউ পাইব, কিন্তু আমার ভাই ফাঁসি গেলে আর তো ভাই পাইব না। উক্তিটির সাথে পুরোটা নয়, তবে আংশিক (ভাইয়ের ব্যাপারটা) মিল আছে। সাদা মনের এই বাবা এতোটাই বোকা। যার মন আসলেই আকাশের মতো বিশাল আর সমুদ্রের মত গভীর। বাবা, অফুরন্ত ভালোবাসার প্রতিদান তুমি পাবে রোজ কিয়ামতের দিন। কারণ এই পৃথিবীটা ভালো মানুষের জন্য স্বর্গ নয়, রক্ত শোষণ করা মানুষরূপীদের জন্য স্বর্গ।
এখন টিউশনি করে প্রতি মাসে বাবার হাতে যখন টাকা তুলে দেই, তখন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মনে হয়। টাকা দেয়ার সময় আমি বাবার চোখের দিকে তাকাই। চশমার ফ্রেমের আড়ালে বাবার অশ্রুপূর্ণ দু’টি চোখ দেখতে পাই। বাবার স্নেহ, আদর আর ভালোবাসায় মাখা হাত দু’টি আজও মাথার উপর ছায়া হয়ে আছে বিধায় আগামীর পথে নির্বিঘেœ এগিয়ে যেতে সাহস পাই। কখনো মুখ ফুটে বলতে পারিনি, কতো ভালোবাসি। আজ না হয় একবার বলিÑবাবা, খুব বেশি ভালোবাসি তোমায়।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT