ইতিহাস ও ঐতিহ্য

জেনারেলের বাড়িতে গণহত্যা

তাজুল মোহাম্মদ প্রকাশিত হয়েছে: ০৯-০৫-২০১৮ ইং ০২:০৬:৪৩ | সংবাদটি ৯৮ বার পঠিত

চট্টগ্রাম-ঢাকা, চট্টগ্রাম-সিলেট কিংবা চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ রেলপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ জংশন স্টেশন ফেনি। বৃহত্তর নোয়াখালীর একটি মহকুমা। এখন পরিপূর্ণ জেলা। আমাদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, জাতীয়তাবাদী লড়াই সংগ্রাম-সবকিছুতেই রয়েছে এই জেলাবাসির গৌরবজনক ভূমিকা। ১৯৬৯ এর ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান, ৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন এবং ৭১ এর অসহযোগ আন্দোলনের কালে ফেনির জনগণ অসাধারণ অবদান রেখেছেন। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে-চালিয়েই প্রস্তুতি নিয়েছেন তারা সশ¯্র সংগ্রামের। প্রথম প্রহরেই গর্জে উঠেছেন, প্রতিরোধ গড়ে তোলেছেন। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আন্দোলন করেছেন রাস্তায়। পাশাপাশি সম্ভাব্য সামারিক হস্তক্ষেপ মোকাবেলার প্রস্তুতিও গ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে ছাত্র যুবকরা অস্ত্র চালনার কসরত করে বলেছেন নানা ভাবে। নোয়াখালী-২ আসনের জাতীয় পরিষদ সদস্য (এন-ই-১৪৬, নোয়াখালী-২) খাজা আহমদের নেতৃত্বে ছিল শক্তিশালী সংগ্রাম পরিষদ। যুক্ত হয় ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি সহ প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল সমূহ। অন্যদিকে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর বাঙালি অফিসার এবং জোয়ানদের মধ্যে চলছিল নিরব প্রস্তুতি। এর মধ্যে ছিলেন নোয়াখালীর তথা ফেনির বহু কৃতি সন্তান।
ফেনি জেলার ফুলগাজি উপজেলায় ছিল ক্যাপ্টেন জাফর ইমামের পৈত্রিক নিবাস। ২৪ ফ্রন্ট্রিয়ার্স ফোর্স রেজিমেন্টের একজন অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে। প্রয়োজনে জাতির পক্ষে যুদ্ধ করার মানসিক প্রস্তুতি অনেক দিনের। কৌশলে সেনানিবাস থেকে পালিয়ে গিয়ে প্রাথমিক অবস্থায়ই যুক্ত হয়ে যান মুক্তিযুদ্ধে। বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য অর্জন করেছেন তিনি বীর বিক্রম খেতাব। অবসর গ্রহণ করেছেন লে. কর্নেল হিসেবে। পরে মন্ত্রিত্ব করেছেন জেনারেল এরশাদ সরকারের সময়। অন্যদিকে ফেনি সদর উপজেলার আনন্দপুর গ্রামের বিখ্যাত হাসামপুর চৌধুরী পরিবারের সন্তান ক্যাপ্টেন আমিন আহমদ চৌধুরী। ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামে ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে ট্রেনিং এ্যাডজুট্যান্ট হিসেবে কর্মরত। আমাকে দেয়া তাঁর সাক্ষাৎকার, নিজের আত্মজীবনী এবং সে সময় ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের কমান্ড্যান্ট এম. আর. মজুমদারের একটি সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায় একাত্তর সালের একেবারে গোঁড়া থেকেই আমিন আহমদ চৌধুরী প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন। ২৫ মার্চের অনেক আগে থেকেই পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ রচনা করার চেষ্টা করেছেন। চেয়েছিলেন পাকিস্তানিরা পুরোপুরি প্রস্তুতি গ্রহণের আগেই আক্রমন করে বাংলাদেশ স্বাধীন করবেন। কিন্তু বলয় পাননি তাঁরা রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে। সে প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন এম. আর. মজুমদার, ই. বি. আর. সির সিনিয়র ইন্সট্রাক্টর লে. কর্নেল এম. আর. চৌধুরী, ই. পি. আরের এ্যাডজুট্যান্ট ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম (বীর উত্তম, মেজর সাংসদ, মন্ত্রী)সহ আরো অনেকে। সেতো প্রথম পর্যায়, শুরুর শুরু। কিন্তু জুন মাসে পুরোদমে চলছে গেরিলা যুদ্ধ। দুঃখজনক ঘটনা হলো মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার ১ মাস আগেই যারা যুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন তাঁদেরই একজন ক্যাপ্টেন আমিন আহমদ চৌধুরী (বীর বিক্রম, মেজর জেনারেল, রাষ্ট্রদূত, মরহুম) বার বার ছুটে গিয়েছেন চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা, এম. আর. সিদ্দিকী, জহুর আহমদ চৌধুরী, আব্দুল হান্নান প্রমুখদের কাছে। ছুটোছুটি করেছেন চট্টগ্রাম-ঢাকা। গিয়েছেন জেনারেল এম.এ.জি ওসমানীর কাছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম. আর. মজুমদারের পক্ষ থেকে নানা দলিলপত্র পৌঁছে দিয়েছেন তাঁকে। যুক্তি উপ-স্থাপন করার প্রয়াস চালিয়েছেন- কেন আক্রমন করতে চান- পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর বিরুদ্ধে। এসব কারণেই ব্রি. জেনারেল এম. আর. মজুমদার এবং ক্যাপ্টেন আমিন আহমদ চৌধুরীকে হত্যা করার তারেই হেলিকপ্টার করে নিয়ে যান ঢাকা। আমিন আহমদ অবশ্য বুদ্ধি করে সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে আসতে সমর্থ হয়েছিলেন। এসব ঘটনার কালে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে অন্য সামরিক অফিসার, ৮ম ই. বি. আরের টুয়াইসি মেজর জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম, মেজর জেনারেল, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক, রাষ্ট্রপতি, নিহত) চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙ্গঁর করা সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করছেন। যে অস্ত্র বাঙালিদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্যে নিয়ে আসা হয়েছে পাকিস্তান থেকে। এই একই বুলেট বিদ্ধ করবে ওরা বাঙালি সৈন্য, মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধেও। সেই আমিন আহমদ চৌধুরীকে পাকিস্তানপন্থি হিসেবে অভিহিত করেন জিয়া। যে কারণে ভারতের জেলে কাটাতে হয়েছে তাঁকে দুই-আড়াই মাস। এর জন্যে জিয়াউর রহমান দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘আমিন, মারাত্বক ভুল হয়ে গেছে। আই. এম. ভেরি সরি।’ জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ক্যাপ্টেন আমীন একজন পাকিস্তানী চর। তিনি ব্রি. জেনারেল মজুমদারকে পাকিস্তানীদের হাতে তুলে দিয়ে আরো বড় ধরনের সাবোটাজ করার জন্য মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। জিয়াউর রহমান আমিন আহমদকে মুক্তিযোদ্ধা বললেন না-পাকিস্তানের চর বললেন সেটি বিষয় ছিলো না- পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর কাছে। ওরা জানতো আমিন আহমদ চৌধুরী কোথায় এবং কি করছেন। ওদের কাছে আমিন আহমদ একজন দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা এবং পাকিস্তানের শত্রু। আমিন আহমদকে ২৫ মার্চের আগেই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন ব্রি. জেনারেল মুজমদারের সঙ্গে। সে দিন তা করতে পারেনি বলে এতোটুকুও ক্ষোভ কমেনি তাঁর ওপর। তাঁকে পাচ্ছে না-তাতে কি? আমিন আহমদ চৌধুরীর বাড়ি আছে, আত্মীয়-স্বজন রয়েছেন তাদেরকে হত্যা করলেও তো ক্ষোভ তাদের প্রশমিত হবে কিছুটা। তার গ্রামের দিকে চালায় পাকিস্তানি বাহিনী একটি যুদ্ধযাত্রা।
ফেনি থেকে বিলোনিয়ার দিকে প্রথম রেল স্টেশনটার কাছেই আনন্দপুর গ্রাম। সদর উপজেলার আনন্দপুর ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত। সে অঞ্চলে দাপুটে জমিদার আশরাফ আলী চৌধুরী পাশের গ্রাম থেকে এসে আনন্দপুর গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। সে ১৮৪০ সালের দিকে হতে পারে বলে জানিয়েছেন আমীন আহমদ চৌধুরী। তাঁর পুত্র ছিলেন ৫ জন তন্মধ্যে হোসেন উদ্দিন চৌধুরী কয়েক মেয়াদে ৩৭ বছর ছিলেন ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট (বর্তমানে চেয়ারম্যান)। ১৯৭১ সালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। খুবই সম্মানী লোক। নোয়াখালির জুরি বোর্ডের সদস্যও ছিলেন। বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। যদিও জানতেন নাতি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবার ফলে বাড়িতে অবস্থান করাটা তাঁর খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু বাড়ি ছেড়ে যাবেন না তিনি কোথাও।
সেদিন ১৬ জুন ১৯৭১ সাল। পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর একটি গ্রুপ রওয়ানা করে আনন্দপুর গ্রাম অভিমুখে কেন, কি কারণে শহর থেকে চার মাইল দূরবর্তী আনন্দপুর গ্রামে যাবে? কি বিষয় সেখানে? সেই আনন্দপুর গ্রামেইতো হাসামপুর চৌধুরী বাড়ি। ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ও জুরি বোর্ডের সদস্য হোসেন উদ্দিন চৌধুরীর বাড়ি। তাঁর নাতি আমিন আহমদ চৌধুরী ছিলেন পাকিস্তান সেনা বাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই পাকিস্তানের সঙ্গে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে যোগ দিয়েছেন যুদ্ধে। ইসলাম এবং ইসলামি রাষ্ট্র পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত। এই ইসলাম বিরোধী পাকিস্তান বিরোধী কর্মকান্ডের প্রতিকার করতে চায় পাকিস্তান সৈন্যরা। তাইতো সাজ সাজ রব ওদের ডেরায়। ওরা যাচ্ছে আনন্দপুর-হাসামপুর চৌধুরী বাড়ি। সেখানে হবে ক্যাপ্টেন আমিন আহমদ চৌধুরী সংক্রান্ত দফা রফা। পাকিস্তানী মিলিটারি আসছে গ্রামের দিকে। সে তো প্রকাশ্য দিবালোকে। আসছে মিলিটারি প্রত্যক্ষ করছে গ্রামবাসি। ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে সবাই। ওরা অগ্রসর হচ্ছে নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে। সে দিন কিছু সময়ের জন্যে ডানে-বায়ে লক্ষ্য নেই। একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই আসা। সেই কারণে, বিশেষ অভিযান সফল করতে ছুটে যাচ্ছে সামনে। ডানে নয়-বায়ে নয়। লক্ষ্য ওদের স্থির। শহর ছেড়ে ৪ মাইল অতিক্রম করার পর ঢুকলো গ্রামে। যেন নেভিগেটর নিয়ে যাচ্ছে পথ প্রদর্শন করে করে। হ্যাঁ, শান্তি কমিটি, জামায়াত সৃষ্ট রাজাকার বাহিনী ইত্যাদি তখন নেভিগেটর অপেক্ষা উত্তম পথ প্রদর্শক। নিয়ে গেলো হাসামপুর চৌধুরী বাড়ি। বাড়ির অধিকাংশ লোকই পালিয়ে গেছেন হায়নাদের আগমন বার্তা পেয়ে কিন্তু বয়স্করা? মূলতঃ যুবক বয়সীদেরই অধিক ভয়ের কারণ। তাঁরা আত্মগোপন করেছেন নানা গোপন স্থানে। আমিন আহমদ চৌধুরীর দাদারা ছিলেন বাড়িতে। পালাননি তাঁরা। আত্মগোপন করার সুযোগ হয়তো ছিলো। কিন্তু তা করতে রাজি হননি তাঁরা কেউ-ই।
হানাদার সৈন্যরা গ্রামে প্রবেশ করছে। গ্রামসুদ্ধ লোকজন পালাচ্ছে। চৌধুরী বাড়ির লোকেরাও পালিয়ে যাচ্ছেন। পালাবেন না হোসেন উদ্দিন চৌধুরী। অনেকেই অনুরোধ জানালেন পালিয়ে যাবার। কিন্তু তা তিনি করবেন না। কিছুতেই নিজের বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও যাবেন না। যারা বাড়ি থেকে সরে যাবার পরামর্শ দিয়েছিলেন তাদের উদ্দেশ্যে হোসেন উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমি পাকিস্তান আন্দোলনের সময় এই অঞ্চলে ছিলাম প্রধান সংগঠনক, পুরোধা ব্যক্তি। সম্পত্তির অর্ধেক চলে গেছে ভারতে। তবু আন্দোলন করেছি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার তরে। সেই পাকিস্তানের মিলিটারিরা আমাকে কেন মারবে। আমি কোনো দিন কোনো অন্যায় করিনি। এই যে আমার পৈত্রিক বাড়ি, দালান কোটা এসব ছেড়ে কোথায় যাবো আমি? অন্যের বাড়িতে গিয়ে থাকবো কেন? তা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। আমি আমার দালানের ভেতরেই থাকবো। যেই কথা সেই কাজ তাঁর। গেলেন না কোথাও তিনি। যাবেন না-এ বিষয়ে অনঢ়। এর মধ্যেই বাড়িতে প্রবেশ করে হানাদার সৈন্যরা। এখনো হয়তো গা ঢাকা দিতে পারতেন। না, তা করবেন না। বাড়ির প্রবেশ পথে তিনি অবস্থান করছেন। মুখোমুখি হলেন পাকিদের। শুরু হলো তাঁর সঙ্গে পাকিদের সওয়াল-জওয়াব।
পরিচয় নিশ্চিত হবার সাথে সাথেই প্রশ্ন- ক্যাপ্টেন আমিন কোথায়? গম্ভীর স্বরের এই প্রশ্নে মোটেই ভীত হলেন না হোসেন উদ্দিন চৌধুরী। বরং ততোধিক গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দিলেন- ক্যাপ্টেন আমিন মানে নাতি কোথায় সেটি আমি জানব কেমন করে। জানার কথাতো তোমাদের। আমার নাতি চাকুরি করে তোমাদের সঙ্গে। এখন তার সংবাদ তোমরা জানো না- এ কেমন কথা। আর আমিই বা জানবো কেমন করে? এ নিয়ে শুরু হয়ে যায় তর্কাতর্কি। বাড়তে থাকে তাঁর গলার সুর। উচ্চ কণ্ঠে উচ্চারণ করছেন প্রতিটি শব্দ। তোমরা যদি আমার নাতির খবর রাখতে না পারো-তা হলে তো ওকে তোমাদের কাছে পাঠানোই ঠিক হয়নি। নিজেদের লোকজনদের খবর রাখতে পারো না তোমরা। এতটাই দুর্বল তোমাদের প্রশাসন-তাতো জানতাম না।’ এভাবে তর্ক করে করে আরো উত্তেজিত হয়ে পড়েন। রাগতঃস্বরে বলে উঠেন, ‘নিজেদের মানুষজনদের হিসাব রাখতে পারো না-তোমরা দেশ শাসন করবে কেমন করে? চরমে পৌঁছে গেছে তার গলার আওয়াজ। একই সঙ্গে পাকিরাও থর থর করে কাঁপছে। ওরা আবার কথা বলে কম। হাতে আগ্নেয়াস্ত্র থাকতে মুখে বেশি কথা বলবে কেন? না, আর কোনো কথাই বলতে চায় না। শুধু একটি শব্দ বা চোখের ইশারাই কাফি।
একটি পাকিস্তানী সেনা উঁচু করলো হাতের আগ্নেয়াস্ত্রটি। কি নাম এর? কোন দেশে তৈরি? নাম দিয়ে কি হবে। ট্রিগারে চাপ দিলেই বুলেট বের হয়ে আসে। এর চেয়ে বেশি প্রয়োজন আর হয়নি। নির্মাণ করেছে পেন্টাগণ কিংবা বেইজিং। যে দেশেরই হোক বুলেটগুলো সবই প্রাণঘাতি। ভেদ করে যায় বুক থেকে পিঠ। একসাথে সংহার করতে পারে অনেকগুলো প্রাণ। সিপাহিটি ততোক্ষণে তাক করেছে হোসেন চৌধুরীর মাথা। বুক রেখে মাথা হলো টার্গেট। তা কেন? সেটি তার ইচ্ছে। কথায় আছে না কর্তার ইচ্ছেয় কর্ম। বাহ বেশ সময় নিয়ে তাক করছে যন্ত্রটি। অথচ হোসেন উদ্দিন চৌধুরী নির্বিকার। উত্তেজনায় কাঁপছেন তিনি। কিন্তু প্রাণ ভয়ে ভীত নন। একটুও নড়ছেন না। ততোক্ষণে অন্য যারা এসেছিলেন কাছাকাছি কিংবা আটক করেছিল সেনা সদস্যরা তারা ছুটে আসেন তাঁকে রক্ষা করতে। মানব বর্ম রচনা করবেন। কিন্তু মানবতার প্রতি সামান্যতম শ্রদ্ধাবোধতো নেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর। ওরা পশুর চেয়েও পশু। ওরা হায়েনার চেয়ে অধিক হায়না। নিয়ে গেলো সামনে। কোথায় একটি সুবিধেজনক স্থান পাওয়া যায়? হ্যাঁ মনোঃপুত হলো একটি জায়গা।
হাসামপুর চৌধুরী বাড়িতে ১৯২৩ সালে নির্মিত একটি দালান ছিল। এর পেছনে পুকুর পাড়ে একটি বাবলা গাছ। সেই বাবলা গাছের নিচের জায়গাটা বধ্যভূমি হিসেবে পছন্দ হলো ওদের। নিয়ে যায় সেখানে। তার পর চাপতে থাকে ট্রিগার। হত্যা করবে সবাইকে এটা জানতেন হোসেন উদ্দিন চৌধুরী। তাই সবাইকে বললেন তারা যেন সূরা ইয়াসিন পাঠ করেন। জোরে জোরে সমস্বরে পাঠ করছেন সূরা ইয়াসিন। আর তখনই ভেসে আসে দ্রাম-দ্রাম শব্দ। লুটে পড়লেন : আনন্দপুরের সাবেক জমিদার, ইউনিয়ন বোর্ডের সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং জুরি বোর্ডের সাবেক সদস্য হোসেন উদ্দিন চৌধুরী (৮৭), সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (৮৬), মমতাজ উদ্দিন চৌধুরী (৭৬), মকবুল আহমদ (৩৮), আব্দুল মতিন, বাদশা মিয়া (বাড়িরপালকি বাহক), সুজা মিয়া, আব্দুস সাত্তার, শেরু মিয়া, হেরাজ মিয়া (প্রতিবন্ধী), বদিউজ্জামান চৌধুরী (৮৫), হোসেন উদ্দিন চৌধুরীর ছোট ভাই। এর মধ্যে আব্দুল মতিন এবং শেরু মিয়া আহত হয়ে লাশের সঙ্গে পড়ে থাকেন। তাঁরা শেষ পর্যন্ত প্রাণে বেঁচে যান। আর অন্যরা তাৎক্ষণিক প্রাণ ত্যাগ করে হয়ে যান স্বাধীনতার শহীদ। লাশগুলো পড়ে থাকলো পুকুর পাড়ের সেই বাবলা গাছের নিচে। আর, অপারেশন সফল করার আনন্দে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে হায়নার দল। ওরা হাঁসছে। স্ফুর্তি করছে। কর্কশ হাসি বেদনা ছড়াচ্ছে পুরো আনন্দপুর গ্রাম জুড়ে।
মৃতদেহের নাকি কোনো শত্রু থাকে না। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাঙালির লাশও পাকিস্তানিদের প্রতি হুমকি ছিল। ভয় করতো মৃতদেহকে। বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল আমিন আহমদ চৌধুরী বীর বিক্রম এর বাড়িতে নির্মমভাবে হত্যাকান্ডের পর সেই লাশগুলোকেও শত্রু হিসেবে গণ্য করেছে শক্তিধর সেনা বাহিনী। ওরা গ্রামের লোকজনদের আহবান করে ঘোষণা দিলো তাঁদের লাশ যারা দাফন করবে তাদেরও একই পরিণতি বরণ করতে হবে। এই ভয়ে দাফনতো দূরের কথা ধারে কাছেও আসেনি কেউ। জনগণ যাকে বার বার ভোট দিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেছে এবং তিনি দীর্ঘকাল জনগণের সেবা করেছেন সেই জনপ্রিয় প্রেসিডেন্টকে কবরস্থ করারও সুযোগ পাননি তারা। তিনি শাসন-শোষণ নয় মানুষের মন জয় করেছেন হৃদয় দিয়ে। ভালোবাসতেন মানুষকে, মানবতাকে। মানুষের তরে কাজ করে গেছেন আজীবন। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও নির্ভয়ে বলে গেছেন সত্য কথা। তিনি ছিলেন নির্ভিক। ডর ভয় বলে কোনো কিছু ছিলো না তাঁর। তাই পাকিস্তানী মিলিটারির আগমন প্রত্যক্ষ করেও পালাননি বাড়ি থেকে কিংবা আত্মগোপন করেননি-নিজে। বরং নাতির নিখোঁজ হওয়ার দায় চাপিয়ে দিয়েছেন পাকিস্তানী সেনা বাহিনীর ওপর। নির্ভয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন সেনা কর্মকর্তার প্রতিটি শব্দের।
৯টি মৃতদেহ পড়ে থাকলো বধ্যভূমিতে। এক এক করে কাটলো দিন। লাশগুলো পঁচে দুর্গন্ধ ছড়ালো চারদিকে। মাংস টেনে টেনে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেলো কুকুর আর শিয়াল। খেতে খেতে পরিতৃপ্ত হয়ে লাশের উপরই ঘুমিয়েছে শিয়াল আর কুকুর-পাশাপাশি। কা কা রব তুলে ঠোকর দিতে দিতে টুকরো টুকরো মাংস নিয়েছে কাকেরা। এ সংবাদ পৌঁছলো ভারতের একিনপুর শরণার্থী শিবিরে। সে শিবিরের একজন বাসিন্দা তখন জেনারেল আমিন আহমদ চৌধুরীর মামা টুক্কু চৌধুরী। সংবাদ গড়িয়েছে তাঁর কানেও। তখন গোপনে পৌঁছালেন তিনি দেশের অভ্যন্তরে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গেলেন ফেনির আনন্দপুর গ্রামে। গলিত লাশগুলো তুলে-তুলে নিয়ে কবরস্থ করলেন পারিবারিক গোরস্থানে। এভাবেই একজন বীর মুক্তিসেনার বাড়িতে নারকীয় গণহত্যা ঘটিয়েছিল কাপুরুষ পাকিস্তানী সৈন্যরা।

শেয়ার করুন
ইতিহাস ও ঐতিহ্য এর আরো সংবাদ
  • মুহররমের দাঙ্গাঁ নয় ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা যুদ্ধ
  • দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিচিতি
  • সিলেটের প্রথম মুসলমান সম্পাদক
  • কালের সাক্ষী পানাইল জমিদার বাড়ি
  • জনশক্তি : সিলেটের একটি দীর্ঘজীবী পত্রিকা
  • ঋতুপরিক্রমায় শরৎ
  • সৌন্দর্যের লীলাভূমি বরাকমোহনা
  • যে এলাকা পর্যটকদের হৃদয় জোড়ায়
  • উনিশ শতকে সিলেটের সংবাদপত্র
  • হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশঝাড় চাষের নেই উদ্যোগ
  • হারিয়ে যাচ্ছে বেদে সম্প্রদায়ের চিকিৎসা ও ঐতিহ্য
  • একটি হাওরের অতীত ঐতিহ্য
  • বদর বাহিনীর হাতে শহীদ হন সাদেক
  • বানিয়াচংয়ের ভূপর্যটক রামনাথ
  • সিলেটের দ্বিতীয় সংবাদপত্র এবং বাগ্মী বিপিন
  • সিলেটের গৌরব : কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ
  • প্রকৃতিকন্যা সিলেট
  • ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম ক্ষেত্র
  • ইতিহাস সমৃদ্ধ জনপদ জামালপুর
  • সুনামগঞ্জের প্রথম নারী সলিসিটর
  • Developed by: Sparkle IT