শিশু মেলা

বৈশাখ

মোঃ ইব্রাহীম খান প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৫-২০১৮ ইং ০২:০৮:৩৫ | সংবাদটি ৮৯ বার পঠিত

ঝন্টু মন্টু আর আমি। আমরা তিন বন্ধু। এক গ্রামে বাস করি। আমাদের তিন জনের গলায় গলায় ভাব গাঁয়ের সবার দৃষ্টি কাড়ে। এক সাথে স্কুলে যাওয়া। স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া। ছুটির দিনে দীর্ঘ আড্ডায় বসে নাওয়া খাওয়া ভুলে দিন পার করে দেয়া। ঝন্টু একটু ডানপিঠে। খুব বেশি দুরন্তপনা। সে হুট করে গাছে চড়তে পারে। মগডালে উঠে সিঁদুর রঙের আম পেড়ে নিরাপদে নেমে আসতে তার মুহূর্ত সময় লাগে। বৈশাখ মাসে ভ্যাপসা গরমের রাতে কাচা মিঠা আম খাওয়ায় আমাদের। চাঁদনী রাতে লম্বা নারিকেল গাছ থেকে ডাবের ছড়ি হাতে করে নিয়ে ছেলছেল করে নেমে পড়া তার জন্যে কোনো ব্যাপার না। দূরের কোন গাঁয়ে যাত্রাপালা দেখতে যাওয়া। রাশিদ খুশিদ আর সংতারার বাউল গানের আসরে সামনে বসা। সবই সম্ভব হত তার সাহসের গুণে। সব ব্যাপারেই সে ছিল ঘাঘু। সে কোন কাজ করে সে সফল হলে আমি আর মন্টু তাকে ঘাঘু প্রেয়ার বলে রসিকতা করতাম। সেও আমাদের সাথে সুর মিলিয়ে সাফল্যের হাসি হাসত। মন্টু আমাদের গাঁয়ে লজিং থেকে স্কুলে পড়ে। তার বাড়ি ভাটিতে। তার গ্রাম ধান মাছ আর মৌসুমী পাখিতে ভরপুর। হিজল করচসহ নানা রকম প্রাকৃতিক গাছের উদ্যান। তার গ্রাম বিষয়ে গল্প শুনে শুনে আমাদের দুই বন্ধুর মনের মাঝে একটা নিখুঁত চিত্রআঁকা হয়ে আছে। অনেকবার আলোচনা হয়েছে আমরা দুই বন্ধু বৈশাখ মাসে মন্টুর বাড়িতে বেড়াতে যাব। কিন্তু কখনও যাওয়া হয়নি। ওর বাবার বন্দুক আছে। বর্ষাকালে ওদের গাঁয়ে ডাকাত আসে। ডাকাতের ভয়ে ওরা বন্দুক কিনেছে। মন্টু ও বন্দুক চালাতে শিখছে। পুলিশের কাঁধে অনেকবার বন্দুক দেখেছি। কিন্তু কখনও সেটা ছুঁয়ে দেখিনি।
ঝন্টু আর আমার খুব ইচ্ছে মন্টুদের বন্দুকটা ভাল করে হাতিয়ে দেখব। কেমন করে গুলি ভরে। কোনখানে চাপ দিলে গুলি বের হয়। কোথায় চোখ রাখলে নিশানা ঠিক হয়। এ নিয়ে আমাদের মাঝে অনেক আলাপ আলোচনা হয়। ঝন্টু আর আমার মনে বন্দুক বিষয়ে একটা অচেনা উত্তেজনা ঘুরপাক খায়। দস্যু বনহুর পড়ছি। বন্দুক ডাকাত এসব নিয়ে রোমাঞ্চ মনের লেগে থাকে। মন্টু গ্রামের স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। তখন একদল ডাকাত বর্ষাকালে নৌকা করে ডাকাতি করতে এলো ওদের গ্রামে। গ্রামের মানুষ ভয়ে চিল্লাচিল্লী চিৎকার শুরু করে। মন্টুর বাবা বন্দুক কাঁধে নিয়ে একটা আম গাছে চড়ে বসেন। নিশান ঠিক করে তিনি ডাকাতদের নৌকায় গুলি ছুড়তে শুরু করেন। ডাকাতদলের সর্দারও পাল্টা গুলি ছুড়ে। শুরু হয় ভয়ানক গুলাগুলি অন্ধকার রাতে ডাকাতরা বুঝতে পারছে না কোনদিক থেকে গুলি আসছে। মন্টুর বাবার বন্দুক হতে একটা গুলি গিয়ে পড়ে ডাকাত সর্দারের ডান হাতে। সর্দারের হাত হতে বন্দুক পড়ে যায় বিলের পানিতে। ডাকাতদল ভীত হয়ে পালিয়ে জীবন বাঁচায়। তার বাবার সাহসের কারণে গ্রামের মানুষের নগদ টাকা পয়সা সোনা রূপা রক্ষা হয়েছিল। এ ঘটনার পর হতে মন্টুর বাবা ভাটির বিশ গ্রামের মানুষের কাছে বিরাট বড় বীর বাহাদুর। মন্টুর মুখে এ কাহিনী শুনে আমাদের মনে গেঁথে আছে।
বৈশাখ মাস এলে মন্টু উধাও। বই খাতা ট্যাংকে তালা বন্ধ। স্কুলের খুঁজ খবর নেই। সে বাড়ি চলে যায়। তাদের অনেক ধানের জমি। বৈশাখ মাসে মন্টুকে কিছু পুঁজি বানাতে হয়। সে অভিভাবকের আড়ালে ধান বেচে টাকা জমায়। তার আড়ালে ধান বেচার পরিমাণ আমাদের গাঁয়ের ছোটখাট গৃহস্থের জমিতেফলানো ধানের চেয়েও বেশি। আড়ালে ধান বেচার ব্যাপারটা তা বাবাও জানেন। কিন্তু কখনও শক্ত করে বাধা দেন না। ছেলে পোলেরা সখ মিটানোর জন্যে এমন একটু আধটু করবেই। পরিবারের পক্ষ থেকে এক ধরনের অঘোষিত অনুমতি। এ ধান বেচা নিয়ে মন্টু আমাদেরকে অনেক মজার মজার ঘটনা বলেছে। একবার মন্টু পাঁচ বস্তা ধান বেচার জন্যে আড়াল করে। নদীর পাড়ে বেপারীর কাছে বেচে দিতে একটা গরুর গাড়িতে বস্তাগুলো তুলে দেয়। বিনিময়ে সে তাকে মিষ্টি খাওয়াবে। গাড়িওয়ালা তার সাথীদের নিয়ে আড়াই বস্তা ধানের মিষ্টি খেয়ে ফেলে। বাকী টাকা জমা রেখে সে চলে যায়। বিকেলে ধানের বেপারীর কাছে আড়াই বস্তা ধানের টাকা পেয়ে মন্টুর মাথায় বাজ পড়ে। বিচলিত মন্টুর বিবেক ছড়া বানায়-
আড়ালের মাল আধা
যার হাতে যায়
তার কথা কয়
আর নয় মাল আলাদা।
সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় আর কখনও ধান আড়াল করবে না। টাকা পয়সা যা লাগে সে মায়ের মাধ্যমে বাবার কাছ থেকে চেয়ে নিবে।
মন্টুদের হাওরে বড় বড় মাছ। বড় জালের একটানে বড় মাছে নৌকো ভরে যায়। তরতাজা বড় মাছের স্বাদই আলাদা। মন্টুর মুখে হাওর বাওড়ের বহু গল্প শুনেছি। কোন কোন গল্প অনেক বার শুনে শুনে আমাদের মাথায় মুখস্থ হয়ে আছে।
বৈশাখ মাস শেষ হতে চলছে। স্কুল গ্রীষ্মকালীন ছুটি। আমি আর ঝন্টু প্রতিদিনই বুদ্ধি আটি মন্টুর বাড়ি যাব। মন্টু নেই। তার অভাবে আমাদের মন আনচান করে। অবশেষে বন্ধুত্বের টানে আমি আর ঝন্টু মন্টুর বাড়িতে বেড়াতে রওয়ানা হই। হাওর পাড়ে মেঠো পথ। ঝড় বৃষ্টির জন্যে কোন কোন স্থানে একটু আধটু পানি জমে আছে। মেঠোপথে কোন কোন জায়গায় কাদা। কাদা মাড়িয়েই হাঁটতে হচ্ছে। পায়ে কাদা লাগলে সহজে ছাড়ানো যায় না। দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে আমি ঝন্টু ক্লান্ত। জীবনে কখনও এর আগে এতপথ এক সাথে হাটিনি। হাটতে হাটতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যায়। তবুও পথ ফুরাচ্ছে না। গায়ের জামা কাপড় ঘামে ভিজে চুপসে গেছে। রোদে পোড়ে শরীর তামাটে রঙ ধরেছে।
মন্টুদের গ্রামটা লম্বালম্বিভাবে। গাঁয়ের মাথায় ঢোকে একজনকে জিজ্ঞেসা করি ওদের বাড়ি কেনাটা। কেমন করে মন্টুর কানে খবর পৌঁছে যায় আমরা এসেছি। সে ছুটে আসে। আমাদের দুজনকে সে আবেগে জড়িয়ে ধরে। আমরাও তাকে জড়িয়ে ধরে সারা দিন হাটার ক্লান্তি দূর করি। ওদের গাঁয়ের শেষ মাথায় বিরাট বড় শুকনো মৌসুমের একটা পুকুর আছে। প্রচন্ড গরমের মাঝেও পুকুরে পানি বরফ শীত ঠান্ডা থাকে। অতি গভীরতার কারণে পানি কখনও গরম হয় না। তৃপ্তির সাথে আমরা ওই পুকুরে গোসল করি। বৈশাখ মাসের নতুন চালের ভাত। ভাতের মউ মউ গন্ধে পেটের ক্ষুধাটা মোচড় দেয়। আমি আর ঝন্টু পেট ভরে অনেকক্ষণ ভাত খেলাম।
মন্টুদের বৈঠকখানা অনেক বড়। রাতে ঘরের এককোণে চৌকিতে আমরা শুয়েছি। দরজা জানালা সব খোলা। ভ্যাপসা গরমের মাঝে আরামের বাতাস। বাতাসে শরীর জুড়িয়ে দিচ্ছে হঠাৎ বেশি হাঁটার কারণে সারা শরীর ব্যথা করছে। তিন বন্ধুর মুখে কথার খই ফুটছে। কথা যেন শেষ হয়েও শেষ হয় না। ঘুমে চোখ ঢুলঢুল করছে।
সকালে নাস্তা সেরে মন্টু আমাদের দু’জনকে নিয়ে বের হয়। প্রত্যেক বাড়ির পেছনে ধান মাড়াই আর শুকানোর বড় বড় উঠোন। বৈশাখ মাস শেষ বলে উঠোনে অল্প স্বল্প ধান। কোন কোন উঠোনে কয়েকজন মহিলা কুলা হাতে ধান উড়াচ্ছে। তারা ধান হতে চিটা আলাদা করছে। বিস্তীর্ণ দিগন্ত জোড়া সবুজ মাঠ। বোর খেতে বাদামী রঙের আগাকাটা অর্ধেক ধানগাছ খাড়া হয়ে আছে। কোন কোন খেতে অর্ধেক গান গাছ হতে সবুজ রঙর নতুন ধান গাছ বের হচ্ছে। মাঠজুড়ে গরু বাছুরের পাল সকালে সোনালী মিষ্টি রোদের ঘাস খাচ্ছে। কয়েকটি হাঁসের খামার। হাঁসগুলো জমিতে পড়ে ধান কুড়িয়ে খেয়ে খেয়ে এ জমি ও জমিতে ছুটে যাচ্ছে। প্যাকপ্যাক আর ছিপছিপে পানিতে চরচর করা চলার শব্দ সত্যি বড় মধুর লাগছে। অতিথি পাখিরা বিদায় হয়ে গেছে। কিছু সাদা বক আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। কয়েকটি চিল আকাশের অনেক উপর দিয়ে উড়ছে। আরও বেশ কিছু নানা রঙের পাখি আকাশে উড়াউড়ি করছে। আমরা বোরো জমিনের পাড় ঘেষা একটা কান্দার মেঠোপথ দিয়ে কিছুক্ষণ হাটি। রোদ কড়া হলে মন্টু আমাদের নিয়ে এক বাড়িতে ঢুকে পড়ে।
একটা ছিমছাম পরিপাটি ঘর। ঘরের ভেতরে বড় বড় বোল ভরা মিষ্টি নিমকি আর জিলাপী। কয়েকটি বেঞ্চপাতা। বেঞ্চে বসে কয়েকজন মিষ্টি খাচ্ছে। মিষ্টি দোকানের ময়রা আমাদের দেখে অবাক হয়। সে হেসে জিজ্ঞেস করল, পিন্টু ঝন্টু তোমরা কখন এলে?
গতকাল বিকেলে। ঝন্টু জবাব দিল।
ময়রা কানু কাকা মুখ হাসি হাসি করে বলল, ভালোই হলো। এখন বল কি খাইবা। কি খাইব সেটা আমি বুঝব। মন্টু কানু কাকার কথা কেড়ে নিয়ে বলল। পিন্টু ঝন্টু আমার পাশের গাঁয়ের ছেলে পোলো আমি ওদের একটু আদর আপ্যায়ন করি। কানু কাকা কাতর সুরে বলল।
তুমি অন্যদিন করো। এখন তুমি আমাদের তিনজনকে তিন প্লেট মিষ্টি দাও। মন্টুর গলায় নির্দেশের সুর শুনা গেল।
গরুর খাঁটি দুধের তৈরি ছানার ধবধবে সাদা মিষ্টি। দেখলেই খেতে ইচ্ছে করে। কানু কাকা ভাত খাওয়ার প্লেট ভরে আমাদের তিন জনের সামনে তিন প্লেট মিষ্টি দিল। আমি ঝন্টু কিছুই বুঝতে পারছি না। অবাক মিষ্টি ভরা থালার দিকে তাকিয়ে আছি। আমরা শংকর বাবুর মিষ্টি ভান্ডারে ছোট পিরিচে দু’একটা মিষ্টি নিমকি খেয়ে অভ্যস্ত। পকেটে টাকা বেশি থাকলে একটা বালিশ মিষ্টি। এর বেশি কখনও খাইনি। ভাত খাওয়ার থালা ভরা মিষ্টি একজন খায় এই প্রথম দেখলাম।
আমরা খাচ্ছি না দেখে মন্টু আমাদের দিকে তাকিয়ে তাগিদ দিয়ে বলল, এ্যাই পিন্টু, ঝন্টু খেতে শুরু কর। আমরা তিন জন মিষ্টি খেতে শুরু করলাম। প্রথম মনে হয়েছিল এত মিষ্টি খেতে পারব না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব সাবাড় করে ফেললাম। মন্টু আরও কিছু খেতে বলল। আমি, ঝন্টু তাকে জোর করে থামালাম। কানু কাকাও তার পক্ষ থেকে খেতে বলল। তাকেও আর না বলে থামাতে হলো।
মিষ্টি ঘরে বসা লোকজন ষাড়ের লড়াইয়ের গল্প করছে। মন্টুদের গাঁয়ের বিশাল ষাঁড়কে জেতানোর জন্যে একজন বিখ্যাত টোটকাদার ভাড়া করে আনা হয়েছে। তার টোটকা কড়া ষাড়কে আজ পর্যন্ত কোন ষাড় হারাতে পারেনি। তার হাতে তিন মাথার একটা জাদুর লাঠি থাকে। এ লাঠির অনেক অলৌকিক ক্ষমতা। সব ক্ষমতা প্রয়োগ করলে প্রতিপক্ষের ষাঁড় চোখে কিছুই দেখবে না। এমন সব তাজ্জব ঘটনার বর্ণনা আমি আর ঝন্টু হা করে শুনছি। মনে মনে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। কখন বিকেল হবে। কখন ষাঁড়ের লড়াই শুরু করবে।

 

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT