শিশু মেলা

পানির সাথে মিতালি

মোঃ মনজুর আলম প্রকাশিত হয়েছে: ১০-০৫-২০১৮ ইং ০২:১১:০৩ | সংবাদটি ৮৫ বার পঠিত

বর্ষাকাল বলে কথা। যেদিকে চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। এ পানি কারো কাছে বিরক্তিকর, আবার কারো কাছে বিরক্তিকর হলেও পানির সাথে দীর্ঘদিন তাদের মিতালিও হয়ে থাকে। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলের ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও পানির সাথে মিতালি করতে বাধ্য। দুঃখ কষ্টের মধ্যেই তাদের এ মিতালি। সামান্য বৃষ্টি হলে টিনের চালে টাপুর টুপুর শব্দ হয়। ছোট খোকা খুকুর মনে ভীষণ ভয় তারা ঘুম থেকে সজাগ হয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে। সুমন ও সায়মা বিকেল বেলা ক্ষুধায় তাদের মাকে বলে কিছু খাবার দেবার জন্য। বিস্তৃত জলাধার কোথাও গিয়ে কিছু আনতে হলে পানি পার হয়েই আনতে হবে মা রোশনা বেগম দেখেন এক সময় ঘরেই পানি প্রবেশ করছে। দেখতে দেখতে ঘরে হাঁটু পানি। এবেলা আর বাচ্চা দুইটি না খাইয়ে সবুর করতে বলেন, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো, তাদের বাবা সবুর মিয়া এখনো বাড়ি এলেন না। অপেক্ষার প্রহর গুনা হচ্ছে কিন্তু অপেক্ষা শেষ হচ্ছে না। অবশেষে রাত নয়টায় সবুর মিয়া এলেন। ঘরের কাছে এলেই বাচ্চা দুইটি বড়ই খুশি, দেরি হউক এবার তারা খাবে মনে মনে আনন্দের হিল্লোল। কিন্তু ক্রমশ তাদের সেই আনন্দ উল্টো দিকে বইতে শুরু করল সবুর মিয়া আজ খালি হাতে বাড়ি এলেন। প্রবল বৃষ্টিতে কোনো কাজে লাগতে পারেননি। বুক পরিমাণ পানি ভেঙ্গে ঘরে এসে হাঁটু পরিমাণ পানি ঘরের মধ্যে রেখে না খেয়ে বাচ্চা, বউ নিয়ে চকিতে বসে থাকলেন। আবারো বৃষ্টি শুরু হলো প্রবল বৃষ্টি। সুমন ও সায়মা ভয় পাচ্ছে। গুড় গুড় শব্দ, আকাশ চমকাচ্ছে, শন্শন্ বাতাস এই মনে হয় সর সমেত উড়িয়ে নেবে। গভীর আতঙ্কের মধ্যে রাত পোহাল। ছাড়া ভাঙ্গা ঘুম হলো গরিবের সংসার দারিদ্র্যতার সাথে বসবাস। তার উপর আবার পানির সাথে মিতালি। ঘরে বাহিরে পানি। কোনো রকম ঘরের দরজা খোলা হলো। ঘরের মধ্যে মাছের লাফালাফি দেখে সবুর মিয়া দরজা বন্ধ করে দিলেন। এবার রোশনা বেগম ও সবুর মিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন মাছগুলি ধরার জন্য। এই মনে হয় ধরে ফেলেছেন কিন্তু না মাছগুলি ডুব দিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। সুমন ও সায়মা আনন্দে পানিতে ঝাঁপ দেয় আবার চকিতে উঠে বসে। এভাবে বেলা সাড়ে সাতটা হয়ে গেল। মাছগুলিকে আর খোঁজে পাওয়া গেল না। তারা যে পথে এসেছিল সে পথে কখন যে চলে গেছে কেহই বুঝতে পারল না। ঘর থেকে পানি আস্তে আস্তে কমতে শুরু করল। সুমন ও সায়মা চকিতে বসেই মুখ-ধোয়ার কাজ শেষ করল। চকিতে বসে তারা পা দিয়ে পানি ছিটাছিটি করছে। না খেয়ে আর থাকতে পারছে না কেহ। ঘর থেকে বের হতে হবে। সবুর মিয়া কয়টি কলা গাছ কেটে ভেলা তৈরি করলেন। এই ভেলা ভাসিয়ে সুমন ও সায়মা ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল খাদ্য অন্বেষণে। পানির সাথে যাদের বসবাস তারা জানে এ পানির উপরে নিচে কত কি খাদ্য পাওয়া যায়। ভাই-বোন ছোট হলেও পানির উপর কত শাক, শাপলা থাকে এগুলি তারা আনতে পারে। তারা তুলতে লাগল বিভিন্ন শাক। সবুর মিয়া জাল নিয়ে মাছ আহরণে পানিতে হেঁটেই চলছেন। পানি তাদের জীবনের অংশ। পানি ছাড়া তাদের হাঁটা চলা, ঘুমানো কিছু হয় না। রোশনা বেগম ঘরে থেকে পানি সেচে চলছেন। কিছু একটাতো এবেলা রাঁধতে হবে। ছেলে মেয়ে স্বামী হাওড়ের পানি থেকে কিছু নিয়ে আসবে। সবুর মিয়া অনেক মাছ পেলে, তার জালে মাছ উঠল। সুমন ও সায়মা কলমি শাক ও কিছু শাপলা নিয়ে বেশ আনন্দে বাড়ি ফিরল। কিছু মাছ পথেই বিক্রি করে চাল নিয়ে বাড়ি ফিরলেন সবুর মিয়া। রোশনা বেগম শাক, ভাত ও মাছ রান্না করে সবাইকে খেতে দিলেন। পানিতে হাওর অঞ্চলের মানুষের এতোই মিতালি আবার এ পানি অনেক সময় তাদের দুঃখের কারণ। নোংরা পানি জ্বর, সর্দিসহ নানা রোগের কারণ। ডাইরিয়া, আমাশয় লেগেই থাকে সুমন ও সায়মার। পরদিন আবার কিছু খেয়ে খাদ্য অন্বেষণে পানিতে ভাসতে শুরু করল ছোট বাচ্চা দুইটি। বাবার জ্বর উঠেছে ঠান্ডা লেগে। একটু পরে হয়ত তিনি জ্বর নিয়েই যাবেন। সুমন ভেলা বাইতে বাইতে এগুচ্ছে আর সায়মা শাপলা তুলছে। শাপলা ফুলের নিচের দিকে যে লত তা মাছ দিয়ে খুব সাদে খাওয়া যায়। ফুলসহ এই লত সায়মা টেনে টেনে তুলে ভেলার মধ্যে রাখছে। হঠাৎ পানিতে ঝোপ করে শব্দ হলো। সায়মা পানিতে পড়ে গেল। সুমন, সায়মা কেহই সাতার জানে না। সুমন ভয়ে পানিতে নামল না সেও ডুবে যাবে। সে ভেলা নিয়ে বাড়িতে এ খবর দিল, মা বাবা সেই স্থানে বুক ফাটা কান্না করে ছুটে এলেন। কিন্তু সায়মার সলিল সমাধি হয়ে গেল। পানিতে তার চির মিতালি হল।

শেয়ার করুন

Developed by: Sparkle IT